তাসের ঘর

জনশূন্য রাস্তার দিকে তাকিয়ে আমার মনটা হুহু করে উঠল। মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার এই এক সমস্যা। অভ্যাসের দাস বনে যাওয়া। কয়েকদিন আগেও ঢাকা শহরে এতো মানুষ, প্রাইভেট কার, বাস, সিএনজি, রিকশা আর এর ফলে উদ্ভুত শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ আর যানজটে আমি তিতবিরক্ত ছিলাম, অথচ এখন মনে হচ্ছে পথচারিরা কে কোথায় চলে গেছে, শহরজুড়ে কেন এমন কানফাটানো নিরবতা! আমি রাস্তার বিপরীত পাশে, অর্থাৎ যেখানটায় জব্বার মিয়া কয়েকদিন আগেও বসে বসে সিদ্ধডিম বিক্রি করত, সেদিকে তাকালাম। না, কোথাও কেউ নেই! অথচ সিদ্ধডিমের ক্রেতাদের কারণে ওখানটায় দাঁড়ানোই ছিল মুশকিল। জায়গাটা আমি যে সংবাদপত্রে কাজ করি তার সামনে হওয়ায় মাঝে মাঝে ডিমবিক্রেতার সাথে আমার কথাটথা হতো। ‘কি, মিয়া, ব্যবসা কেমন চলছে?’ আমি জানতে চাইতাম। ‘আর ব্যবসা! চান্দা-চুন্দা দিতে দিতে জীবন শ্যাষ।’ ‘তারপর লাভ থাকে?’ ‘থাকে সামান্য। না হয় কি আর বসতাম?’ আচ্ছা, আচ্ছা বলে আমি এগিয়ে যেতে থাকলেই জব্বার মিয়া বলে উঠত: ভাইজান কি একটা ডিম খাইবেন? জব্বার মিয়া নাই, তার পাশে যে ঝালমুড়িওয়ালা বসত সেও নাই। এই কথা ভাবতে ভাবতে আমি ডানদিকে তাকালাম। তখনই আমি লোকটাকে দেখতে পেলাম। ফুটপাতে আমি যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেদিকে এগিয়ে আসছে। ময়লা শার্ট, প্যান্ট পরা, হাতে কি যেন একটা পুটলির মতো পেঁচানো। পায়ে একজোড়া চামড়ার নাকি রাবারের স্যান্ডল সড়কবাতির আলোয় ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। লোকটাকে পাগল বলে মনে হলো। তবে লোকটা আমার কাছ থেকে একটু দূরে এসে হঠাৎ থেমে গেল। কিছুক্ষণ কি জানি ভাবল, তারপর পুটলিটা থেকে বের করে আনল একটা ময়লা-নোংরা চাদর আর মেলে দিল তা হকারদের উল্টা-করে-রাখা একটা টেবিলের চারপায়ের উপর।
‘কী করছেন?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘ঘর বানাচ্ছি। আগে ফুটপাতে শুইতাম, এখন ঘরে শুই।’
‘কেন, এখন ঘরে কেন?’
‘কি জানি একটা জীবাণু নাকি আইসে, সবাই সবাইরে ঘরে থাকতে কইতাছে।’
এই কথা বলে লোকটা তার সদ্যবানানো ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। আমি ভাবলাম আজ রাতে ঝড়-বৃষ্টি না এলেই হয়। আর তখনই চৈতালি হাওয়াটা ছুটল। হাওয়াটা শহরের ফাঁকা রাস্তা ধরে একরাশ ধূলি উড়িয়ে ছুটে এল, চাদরের তৈরি ঘরটাকে ভেঙ্গে দিল।

দ্বীপটা বাঁচবে কেমন করে

করোনার এই দিনগুলোতে মনে পড়ে যাচ্ছে সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা, যার সাথে আমাদের সেন্টমার্টিনে দেখা হয়েছিল। সেবার আমরা মানে আমি ও আমার বউ আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে বেরিয়ে পড়েছিলাম সমুদ্র দেখব বলে। হ্যাঁ, সমুদ্র আমরা দেখেছিলাম কক্সবাজারে, তারপর চলে গিয়েছিলাম আরো দক্ষিণে সেন্টমার্টিনে। আমরা সমুদ্রের নীল হাওয়া গায়ে মেখে বেড়াতে বেড়াতে লোকালয়ের দিকে চলে গিয়েছিলাম আর তখনই মেয়েটার সাথে আমাদের দেখা হয়ে যায়। সে আমাদের একটা কথা বলেছিল আর আমরা বিয়ের পর প্রথমবারের মতো কোন বিষয়ে একমত হয়েছিলাম কোন আলোচনা বা তর্ক-বিতর্ক ছাড়াই, শুধু পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে। আমরা আবার ফিরে গিয়েছিলাম বেলাভূমিতে আর আমার বউয়ের হাতব্যাগ থেকে এক এক করে ফেলে দিয়েছিলাম প্রবাল খন্ডগুলো। আমরা অন্যান্যদের তুলনায় কমই নিয়েছিলাম। তবে সমুদ্রের গন্ধ গায়ে মেখে ঢাকা ফিরে আসলে আমার বউয়ের হাতব্যাগের কোন কোনা থেকে কে জানে ছোট্ট একটা প্রবালখন্ড বের হয়ে পড়েছিল, তখন আমাদের আবার ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। আমাদের ছোট্ট সংসারের ছোট্ট টেবিলে রেখে দিয়েছিলাম সেটা। প্রবালখন্ডটার দিকে তাকালে আমাদের মনে পড়ে যেত সমুদ্রের কথা, আর সমুদ্রের কথা মনে হলে আমাদের ভাবনা জুড়ে শোনা যেত সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা। আমি জানতে চেয়েছিলাম: ‘তুমি কার কাছ থেকে শিখেছ কথাটা?’ ও বলেছিল: ‘স্কুলের আপার [শিক্ষক] কাছ থেকে।’ আমি আরও জানতে চেয়েছিলাম: ‘তুমি কোন ক্লাসে পড়?’ সে বলেছিল: ‘ক্লাস টু।’
এইক্ষণে, এই করোনাকালে, যখন শুনলাম কক্সবাজারে বহুকাল পর ফিরে এসেছে ডলফিনের দল, বেলাভূমিতে সাগরলতা ফোটাচ্ছে ফুল আর ঝাঁকে ঝাঁকে লাল কাঁকড়া কুয়াকাটা সৈকতে রোদ পোহায়, তখন আবার আমার মনে পড়ে যাচ্ছে ছোট্ট সেই মেয়েটির কথা, যে আমাদের বলেছিল: ‘আপনারা যদি ব্যাগ ভরে প্রবাল নিয়ে যান, দ্বীপটা বাঁচবে কেমন করে!’

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত