| 20 জুলাই 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

দুনিয়া নাই

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

আমাদের তখন ফড়িংয়ের দোয়েলের মতো জীবন। ঘাস লতাপাতার মতো উচ্ছ্বল ছলছল কৈশোর। হাঁটার বদলে দৌড়ানো, অকারণ হাসি আর চিৎকার করে বেসুরো গানই তখন জীবন। আমরা তখন দল বেঁধে নতুন বর্ষায় কোমর পানিতে ডুবে থাকা ধানের জমিতে দড়ি টেনে মশারীতে মাছ ধরি হৈ হৈ করে। তারপর পানির কামড়ে গা চুলকাতে চুলকাতে মাকে তাগাদা দিতে থাকি গুড়া মাছের চচ্চড়ি দিয়ে গরম ভাত দেয়ার জন্যে। ক্ষুধা লাগুক আর নাই লাগুক, এতগুলো তাজা মাছ ধরে আনার পরও মা কেন বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে তাড়াতাড়ি খাবার দিচ্ছে না – সেই আহত অভিমানে ‘তোমার ভাত আমার লাগবে না’ বলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাই এবং আশেপাশেই ঘুর ঘুর করতে থাকি মা কখন বাবা-সোনা বলে ডেকে নেবে সেই অপেক্ষায়। আমরা তখন বর্ষার পর ধানের জমি থেকে নাড়া তুলে এনে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘর বানাই, কখনও বাড়ির পাশে জমিতে গর্ত করে নাড়ার বেড়া দিয়ে পায়খানা বানাই। সেসব গ্রামের মানুষকে এনজিওদের ঠিক মতো পায়খানা করতে শেখানোর আগের কথা। আমরা তখন অষ্টমীর মেলা থেকে কিনে আনা চাকু কোমড়ে গুঁজে ঘুরে বেড়াই – কাঁচা আর কচু গাছের বংশ নির্বংশ করতে করতে। আর তাল খুঁজতে থাকি কিভাবে একটা চাইনিজ কুড়াল, নয়তো ড্যাগার, নিদেন পক্ষে একটা নানচাক্কুর মালিক হওয়া যায়। কৈশোরের টলোমলো আনন্দ ভাল লাগলেও আমাদের তখন যুবক হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে। সিনেমার সোহেল রানা বা ড্যানি সিডাক আর পাশের গ্রামের এরশাদের দল করা মাস্তানরা আমাদের যুবক হয়ে ওঠার পথ দেখায়, আমাদের স্বপ্নে হানা দেয়।

আমাদের সেই থরোথরো কৈশোর থেকে যুবক হয়ে ওঠার আগেই একদিন চিৎকার-গালাগালির প্রবল ঝঞ্ঝায় আমরা বিহ্বল হয়ে পড়ি। আমাদের আর যুবক হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। বিড়ালের বাচ্চার মতো ছোট্ট হয়ে মায়ের পেটের ভেতর লুকিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। সেই প্রথম বড়রা অবাক হয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে দেখে, আমরা একদল ছানাপোনা একসাথে হয়েও কোন কথা বলি না।

পাশের বাড়ির জামশেদ চাচার কামলা আশ্রাফ সেদিন বিকালে মাঠ থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে গ্রামে ঢোকে। হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়াতে দৌড়াতে সে শুধু একটি কথাই বলতে থাকে, ‘দুনিয়া নাই, দুনিয়া নাই’। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত আশ্রাফ খাঁ বাড়ির গাব গাছের তলায় বসে খানিক হাঁপিয়ে নিয়ে আবারও যখন হা-হুতাশ করে জানায়, ‘দুনিয়া নাই’, তখন নানা কিছিমের মানুষ তার ওপর নিকলা বিলের জ্বীনের আছড়ের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার কথা ঘোষণা করলেও কেউ জায়গা ছেড়ে যায় না। আরও একটু পর মাথা নিচু করে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে কাটতে আশ্রাফ যা বলে তাতে তার মনিব জামশেদ মিয়ার কাছ থেকে মুফতে দুই মন ধান পাওয়ার শর্ত লঙ্ঘিত হয় আর তাকে ঘিরে থাকা মানুষেরা কেউ ‘বুইড়া জামশেদ মিয়া’ উচ্চারণ করে মুচকি হাসে, কেউ হা করা মুখ বন্ধ করতে ভুলে যায় আর কেউ কেউ পালিয়ে বাঁচে, বিশেষত পাড়ার কিশোরী বউয়েরা। একটু পর শুরু হওয়া মৌমাছির চাক ভাঙ্গার মতো একটা গুঞ্জরণ এবং এক পর্যায়ে চিৎকার-গালাগালিতে সেদিন আমরা দুনিয়া না থাকার কারণ জানতে বাধ্য হই। যদিও মাঠে ঘাস কাটতে যাওয়া আমাদেরই বয়সী রক্তাক্ত মেয়েটিকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা কারোই মনে আসে না। মেয়েটির বাপ-চাচারা পিটিয়ে শোধ নেওয়ার চেষ্টা করলেও মূলত ধনী বংশের মুরুব্বি জামশেদ মিয়ার বাড়ির মেয়েদের নানা জনের কাছ থেকে অসঙ্গত যৌন সম্পর্কের ঘোষণা শোনা ছাড়া তেমন কিছুই আর ঘটে না। দিন শেষে গরিবের বিচারের দায়িত্ব আল্লার ওপর ছেড়ে দিয়ে গ্রামের মানুষেরা আশ্রাফের কথা মতো দুনিয়া আসলেই আছে কি নাই সে বিষয়ে ভেবে দেখতে ভুলে যায়।

ড্যাগার বা চাকু ছাড়াই একটা মানুষকে রক্তাক্ত করার বিষয়টি আমাদের মতো বোকা কিশোরদের বুঝিয়ে বলতে উৎসাহী লোকের অভাব না হলে আমরা ঘুমের মধ্যে পা পিছলে শূন্যে পড়ে যাওয়ার মতো গা শিরশির করা অথৈ শূন্যতায় হারিয়ে যেতে থাকি এবং অতঃপর আমরা যুবক হওয়ার পর বৃদ্ধ হওয়ার ভয়ে, মানে জামশেদ মিয়ার মতো গালি খাওয়া বৃদ্ধ হওয়ার ভয়ে, যুবক হয়ে ওঠার শিহরণময় স্বপ্ন থেকে পালাতে থাকি।

তারও অনেক বছর পর জামশেদ মিয়া গাছ থেকে পড়ে ধুঁকতে ধুঁকতে মারা গেলে অথবা আশ্রাফ তখনও কামলা দিয়ে খেতে থাকলে দুনিয়ার থাকা না থাকা নিয়ে আমাদের মধ্যে নতুন কোনও প্রশ্ন তৈরি হয় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, দুনিয়া আসলে আছে। সেদিনের পয়লা বৈশাখের টিএসসিতে কাউকেই বলতে শোনা যায়নি যে, দুনিয়া নাই। তার মানে, দুনিয়া আসলে আছে, আশ্রাফ ভুল বলেছিল।

কৃতজ্ঞতাঃ বয়ান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত