| 18 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

বন্ধন 

আনুমানিক পঠনকাল: 10 মিনিট

” হ্যালো – কি খবর?  কেমন আছো?”  শুনেই রণি  যেন কেমন অস্থির হয়ে উঠলো কন্ঠস্বরের মালিক কে খুঁজে বের করার জন্যে। গলাটা সেই একইরকম মনে হচ্ছে। আশেপাশে কতজনের কানেই তো  মোবাইল, তার মধ্যে যে কোনজন!   কণ্ঠস্বর অনুসরণ করতে করতে অবশেষে ধাক্কাধাক্কি করে ভিড় বাসে উঠেও পড়লো ও। কণ্ঠস্বরের মালিক ততক্ষনে খড়ের গাদায় সুচ হয়ে  ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়েছে।  এদিকে যতক্ষণ না ঠিকমতো করে গলাটা শুনতে পাচ্ছে এ এক দারুন ক্যাচাল মাইরি। “কি অসভ্য ছেলেরে বাবা!  মাসি কাকী জ্ঞান নেই?  বাসে উঠেই কনুইবাজি  শুরু করেছে” সামনে দাঁড়ানো মাঝবয়সী মহিলার মুখ নিঃসৃত মধুর বচনে গতি থামাতেই হলো রণিকে।আশেপাশের  জনতা উৎসাহভরে শার্টের হাতা গোটাবার  আগেই কাচুমাচু মুখে ক্ষমা চেয়ে নিজের পিঠ ও মুখ দুইই বাঁচালো রণি । আর তখনই মহিলার সাথে সাথে আরো অনেকেই  খেয়াল করলেন,  যাকে এতক্ষন ধরে বাক্যবাণে বিঁধছেন  সে আসলে  একটি মেয়ে। তার বয়েজ কাট চুল, সিরিঙ্গে মার্কা চেহারা আর সাজ-পোশাকের কারণেই হয়তো এই বিভ্রম। এতে ওনার বিরক্তি বিন্দুমাত্র তো কমলই না, ” আহা কি ছিরি! মেয়েছেলে বলে চেনার  উপায় নাই”।কি জানি, ছেলের মতো দেখতে বলে হয়তো মেয়ের সাথে ছেলেটাও   জুড়ে বললেন। ছোটবেলায়  নাকি ওকেওআর বাকি মেয়েদের মতোই দেখতে লাগতো। যদিও ইদানিং এইধরণের অভিব্যক্তিতে একটুও অবাক বা লজ্জিত কোনোটাই ও হয়না। এদিকে  যে কারণে এই  বিপরীতমুখী বাসে ওঠা, তাও কাজে এলোনা। কণ্ঠস্বরের মালিককে এই ভিড়ে খুঁজে পাওয়াআর তার কণ্ঠ চেনা দুটোই  ইয়েতি অভিযান তুল্য। মনে মনে দু-চারটে জোরালো খিস্তি আওড়ে ধুস  শ্লা ভাল্লাগেনা বলে নেমে পড়লো বাস থেকে।                                                       

‘ চলো মন নিজ নিকেতন’  বলে  রণি অর্থাৎ রণিতা  রওনা দিলো বাড়ির পথে।কিন্তু বাবা তো এখন বাড়ি নেই,ডাক্তার দেখাতে  গেছে।  তালা খুলে বাড়ি ঢোকাটা রনির অপছন্দের তালিকায় এক্কেরে ডাহা প্রথম। বাবা সেটা জানে বলেই সবসময় চেষ্টা করে রনির ফেরার সময় হলে বাড়িতেথাকতে।  এমনকি ছোটবেলায় যখন  দুপুরে স্কুল থেকে ফিরত, যে করেই  হোক একটুক্ষণের জন্যে হলেও বাবাবাড়িতে চলে আসতো দোকান ছেড়ে।এই দুপুরের একটু ছুটির জন্যে বাবাকে দোকানে যেতেও হতো  সবার আগে আর রাত্রে ফিরত ও সবার শেষে। তখন তো নিজেদের এই ছোট দোকানটাও ছিলোনা। বড়ো কাপড়ের দোকানে বাবা কাজ করতো। এই সামনের মাসেই তো ওর  জয়েনিং।এখন টুকটাক টিউশনি করে খুব কম তো হাতে পায়না। বাবাকে বলেওছে বহুবার এবার খাটনি কমাও কিন্তু সেই একই কথা, বাপ-বেটিতে রোজগার করবো একসাথে। এতে নাকি নিজেকে ইয়ং লাগবে বাবার।ওদিকের কি ব্যাপার জানার জন্যে রনি  বারবার ফোনাচ্ছে কিন্তু বাবার  ফোন গেছে দিকশূন্যপুর,  বাওয়াল দিচ্ছে  লাগছেনা।                                                               

ওর নিজেরও  এখন একদম বাড়ি ঢোকার মুড্ নেই।  অন্য অনেক কিছুর সাথে সাথে এখন নতুন আরো অনেক কিছু নট রিচেবল হচ্ছে ওর লাইফে । মা তো সেই ছোট থেকেই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।পায়ে পায়ে রনি মোড়ের চা দোকানে এসে দাঁড়িয়েছে। ইচ্ছে কালো কাকার কাছে চা খেয়ে বাবা আসার আগে বন্ধুর বাড়ি ঢুঁ মারবে একবার।  – কি দিদিমনি চা নেবে তো, অত কি ভাবছো?- আরে দাও দাও তোমার চা অমৃত!   কিছু শব্দ কিছু কথা কখনো  চেতনায় খুব স্পষ্ট  হয়ে ওঠে আবার কখনো আবছা হয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে বিন্দু হয়ে  যায়। খুব কষ্ট হয় ওর, কাউকে কিছু বলতেও পারেনা , বোঝাতেওপারেনা কখনো। বাবাকে তো নয়ই।কিছু প্রশ্নের উত্তর তো ওকে পেতেই হবে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যখন উত্তরদেবার মানুষ ছিল তখন ও শোনারমতো হয়নি, আর যখন হলো তখন শ্লা!হুঁশ হয় কালো কাকার ডাকে,- কি গো দিদিমনি ফোনটা ধরো।দেখে ছাত্রীর মা ফোন করেছে।                   

কথা সেরে  অনিচ্ছার বোঁচকা পিঠে ঝুলিয়ে শেষ অবধি ওবাড়িতেই ঢুকলো। রোজই মায়ের ছবির সামনে একই জিজ্ঞাসা নিয়ে দাঁড়ায়, “কেন তুমি ছেড়ে চলে গেলে আমাকে এই অসংখ্য প্রশ্নমালার  মাঝে”। রোজ দুপুরে ফোনের অপর প্রান্তের কথা শোনাটা  নিয়ম করে ফেলেছিলো রনি একসময়,  সেসব কথার ধড়  মুন্ডু কিছু না বুঝলেও।তবুও আজ প্রশ্নটা ওকে তাড়া করে কে ছিল অপর প্রান্তে? কার গলা শুনতো ও? খুঁজে বের করতেই হবে সেই মানুষটাকে।  তার কাছেই তো ওর জীবন অংকের  উত্তরমালার ছেঁড়া পাতাগুলো লুকানো আছে। কতজনের তো বাবা-মা কেউই থাকেনা, ওর বাবা তো ওকে সবটুকু দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে! হাঁটি হাঁটি পা পা থেকে কলেজের র‍্যাগিং সবেই তো বাবার আঙ্গুল ধরে এগোনো। বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরলে চুল মুছিয়ে দেওয়া,  আদা-চা  নিয়ে আড্ডা দেওয়া এমনকি কোন ছেলে ওকে ঝাড়ি মারলো বা ও কোন ছেলেকে দেখে কুপোকাত সব। সবটাই ভাগ করে নেয় বাবার সাথে। মাসের অসুবিধের দিনগুলোতেও ব্যাথা হলে  পা টিপে দেয়  বাবা,  ঠিক ছোটবেলায যেমন দিতো গ্রোইং পেন এ। মায়ের অভাব বুঝতেই দেয়না  কখনো। কতবার যে না বলা মনের কথাগুলো  পড়ে নিয়ে সমাধান খুঁজে দিয়েছে!   

                                                                                                  বেশ লড়ঝড়ে হয়ে বাবা বাড়ি ঢুকলো।দরকারে এক আধদিনও তো  ট্যাক্সিতে উঠবেনা, ওসব বিলাসিতা নাকি সাজেনা। সেই কবে বাইকে এক্সিডেন্ট করেছিল তারপর থেকেই হাঁটতে কষ্ট হয় বাবার। তখন তো বিয়েও হয়নি। আরে বাবা তোমার রনি এখন চাকরি পেয়েছে! আর এক বদগুণ বাড়ি ফিরেই প্রেসক্রিপশন হারানোর অভিনয় শুরু হবে। এতো পাকা অভিনেতা চাইলেই নাসিরুদ্দিন শাহের রুজি রোজগারে তালা লাগাতে পারতো। সুগারের রুগী তো, পাছে ওষুধ কেনা টেস্ট করানোর জন্যে চাপদেয়। রনিও এখন অভিনয়ের মুখোশ খোলার গিঁট গুলো চিনে গেছে। – তুমি কখন  ফিরবে  সেই নিয়ে চিন্তা করছিলাম। – তো ফোন করলেই হতো। -হুমম, সেইই। নাহ!  – কি হ্যা না করছিস, তবে  ভালোই,ধৈর্য্য রাখা ভালো। নতুন চাকরি ধৈর্য্য না থাকলে নিজেই মুশকিলে পড়বি। – সেতো তোমাকেও রাখতে হবে, ধরো প্রায় পৌনে দু মাস। অমন ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছ কেন, দুজনের জন্যেই এক নিয়ম। তুমিও তো খুশিমতো আমাকে ক্রিং ক্রিং করতে পারবেনা। আজ ভিড় বাসে কেউ একটা হাতের খেলা দেখিয়েছে নাকি আমিই ছড়িয়েছি। – বোঝো, কতবার বলি খেয়াল রাখবি সাবধান হবি। এখন ?-এখন কি, স্যালারি পেয়ে এক্কেবারে ঝাক্কাস একটা, নাহ দুটো মোবাইল কিনবো।  তারপর তুম্হারী মেরি বাতে!- সে হবেনা, তুই কি অফার আছেদেখে এখুনি বুক করে দে। টাকার জন্যে ভাবতে হবেনা। অমনি বাবা ধনপতি কুবের। টাকার ভাবনা আদৌ কোন পাগলে ভাবে!পাঁচ -সাত হাজার টাকা ঠিক রান্নাঘরের আরশোলার মতো এদিক ওদিক থেকে বেরিয়ে আসবে। টাকাটা হস্তগত করা অবধি মিয়োনো মুখেইথাকতে হবে রণিকে। -কালই একটা বড়ো ডাক্তারের কাছে তোমাকে দেখানোর ব্যবস্থা করিবুঝলে, যাতে প্রেসক্রিপশন হারালেও নো চাপ। সব ডিটেল খামে ভরেল্যাপটপে রেখে দেবে ডাক্তার। -উফফ এর মধ্যে আবার প্রেসক্রিপশন এলো কোত্থেকে! সে আমি পরে খুঁজে নেবো। -উহুহু,  প্রেসক্রিপশন পেলে তবেই ফোন কিনবো। চলো দুজন মিলে খুঁজি। অমনি সাইকেলের সিটের তলা থেকে  বা ধূপের প্যাকেটের ভেতর থেকে সুরসুর করে প্রেসক্রিপশন বেরিয়ে আসবে,  আর রণিও মোবাইল বের করে  কোথায় কোথায় বাবার কি কি টেস্ট করতে হবে সেসব দেখতে বসবে। এরকম ই নিত্য নতুন খেলা চলে রনি আর নিশীথবাবু মানে রনির বাবার মধ্যে। মা মারা যাবার পর পুরোনো শহর ছেড়ে ওকে নিয়ে বাবা এসে উঠেছিল শিয়ালদহ তে। রণির ভালো স্কুল ভালো কোচিং এই সবকিছুর জন্যে ঘরে-বাইরে কি পরিশ্রমই না করেছে!  মায়ের আঁচল আর বাবার শক্ত মুঠি দুইই রনি পেয়েছে নিশীথ বাবুর কাছে।

                        জ্ঞান হবার পর থেকেই রণি বহুবার জানতে চেয়েছে মা আত্মহত্যা করেছিল কেন? একই উত্তর শুনতে শুনতে আজ রনিওসেটাই বিশ্বাস করে নিয়েছে ।ব্যবসাতে অত বড়ো লস,  ছোট্ট রণির ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মা কে এতটাই বিচলিত করেছিল যে, মা ভরসা রাখতে পারেনি তার বাইরে বাইরে কাজে ব্যস্ত থাকা স্বামীর ওপর। এক বন্ধুর সাথে জয়েন্টে বাবা ব্যবসা ফেঁদেছিলেন । সেই  ধনী বন্ধু অর্থাৎ শোভন ব্যানার্জী  টাকার সিংহভাগ  দিয়েছিলেন আর ওর সৎ পরিশ্রমী বাবা টাকার সাথে নিজের নিষ্ঠা আর কর্মক্ষমতাও। এইভাবেই বাড়তি অর্থ আর নিষ্ঠার সমতা রক্ষা হয়েছিল।অপরপক্ষ যেহেতু কেবল অর্থই লগ্নি করেছিলেন, নিষ্ঠা বা সততা দেখানোর প্রয়োজনীয়তা কোনোদিনই অনুভব করেননি, এমনকি ওর বাবাকে  ব্যবসায় ঠকিয়ে তার নিষ্ঠার সুযোগ নিয়ে  অফার ফুরিয়ে যাওয়া সিমের মতো ছুঁড়ে ফেলে দেবার সময়েও  না। ভালোমানুষ বাবাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছিলো ওই মুখোশধারী বন্ধু।         

                                           বেশিরভাগ দিন দুপুরেই চলতো ফোনালাপ। রণিরও বেশ মজা লাগতো শোবার ঘরের ফোন টা নিয়ে কথা শুনতে। ছোট্ট রণিকে দুপুরে ঘুম পাড়িয়ে মা একতলায় কাজ সারতো।হঠাৎ একদিন বিছানা থেকে নেমে শোবার ঘরের ফোন টা নিয়ে খেলতে গিয়ে শোনে মা কথা বলছে বাবার সাথে। ও নিজেও তখনি জমানো কথা বলতে শুরু করে দেয়।  কাজের কারণে শিশুবেলায় বাবাকে কমই পেয়েছে রণি। কিন্তু কিছু বোঝার আগেই ফোন রেখে মা উঠে এসেছিলো একতলা থেকে। অস্পষ্ট হলেও এইটুকু মনে আছে  অপরাধ লঘু হলেও দণ্ড কিন্তু  সেদিন শুধু চড় কানমলায় থেমে ছিলোনা।  রণির মোটা মাথায় কিছুতেই ঢোকেনি বাবার সাথে কেন ও কথা বলতে পারবেনা। আর রাগও হয়েছিল, বাবাই বা কেন বলতে চাইলোনা! লুকোচুরি খেলার মতো ফোন বাজলেই লুকিয়ে লুকিয়েকথা শুনতো রণি  কিছু বুঝুক ছাই না বুঝুক। বেশ টিভির সিরিয়ালের মতো লাগতো। – আমার মেয়েটা আমার মতোই দুষ্টু হয়েছে দেখছি আর বুদ্ধিও!   খুশি ঝরিয়ে মা বলতো, – আহা, আমার মতো নয় কেন ?- আমার মেয়ে বড়ো হয়ে আমারব্যাবসা সামলাবে। আমার তখন পুরো অবকাশ, আমি শুধু আমার নীলাকেনিয়ে থাকব। – তাই!  কতদিন হলো তোমাকে দেখিনি বলতো! কখনো সখনো মাঝরাত্রেও ঘুম ভেঙে মা কে বিছানায় পেতোনা রণি। ভয়ে কেঁদে উঠতো, তবে আস্তে আস্তে কিভাবে যেন নিজেই বুঝে গেছিলো এইসময় কাঁদলেও মা আসবেনা। শিশু রণি অভিযোগও করেছিল বাবার কাছে, “ তুমি দুপুরে শুধু মায়ের সাথে কথা বলবেনা, আমার সাথেও বলবে”।কি নিপুন ভাবে মা বুঝিয়ে দিয়েছিলো বাবাকে, যে পুরোটাই ওর ছেলেমানুষিনিছক কল্পনা। বাবাও আদর করে বলেছিলো হুমম বলবোই তো। কতসবকথা বলত দুজনে রোজ নিয়ম করে।রোজ  শুনতে শুনতে বুঝে গেছিলএটা বাবা নয় ,  বাবার গলাই নয়। কিছু কথা কিছু ঘটনা এমনভাবেই চেতনায় বিঁধে আছে, যা ওকে আজও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। মায়ের প্রতি ভাললাগার অনুভূতিটা ফিকে হতে হতে এখন অনেকটাই ফ্যাকাশে!     

                                                                                                আজ তো ও জানেই যে নিশীথ সরকার ওর বায়োলজিক্যাল  ফাদার নয়। শুধু এই  আঙ্গিক ছাড়া আর কোনো আঙ্গিকেই মানুষটাকে বাবার জায়গা থেকে সরানো যাবেনা।এই  চরম সত্যটা রণি কোনোদিনই জানাবেনা  ওর বাবাকে।   একটা ভয় একটা চূড়ান্ত স্বার্থপরতা হয়তো ওই অমানুষ বাবাটার কাছ থেকেই ও অর্জন করেছে। এই মানুষটার জন্যেই ও এই আজকের রনি। নিশীথ সরকার ওর জীবনের পুরোটা জুড়ে,  কোনো মূল্যেই ও এই মানুষটার মুঠো আলগা হতে দেবেনা। যদি এই বীভৎস সত্যটা জানতে পেরে মুঠি থেকে রণির আঙ্গুলটা ছেড়ে যায়! ও তো হারিয়েইযাবে এই বিশাল পৃথিবীতে! কলেজের নতুন জীবন, বন্ধুদের সাথে হইচই কোনটাতেই বিন্দাস হতে পারছিল না ও । মনের অস্থিরতায় উদব্যাস্ত রনিঅগত্যা সেই বিজ্ঞানের দোরগোড়ায়।ডিএনএ রিপোর্টটা পুড়িয়ে ছাই করেও স্বস্তি মেলেনি ওর। সাথে সাথে নিজের যাবতীয় কালিমাও মুছে ফেলতেচেয়েছিল। কিন্তু জিনগত স্বার্থপরতা ততক্ষনে ঘুটি সাজিয়ে ফেলেছে। নিজেকেই স্তোক দিয়েছিলো রণি,কেন এই মানুষটাকে নতুন করে কষ্ট দেবে অত জীর্ণ পুরনো একটা ঘা কেখুঁচিয়ে।  যে সত্যটার আজ আর নতুন করে কোনো মূল্যই নেই ওদের কাছে।মা তো কবেই কাঠগড়া থেকে পালিয়েছে সে আত্মগ্লানিই হোক বা ব্যবসার আর্থিক সংকটই হোক না কেন। মানুষটা যখন ধীরে ধীরে রনিকে নিয়ে বাঁচার মানে খুঁজে নিচ্ছে তখন তাকে নতুন করে কষ্ট দিতে মন সায় দেয়নি।               

কিন্তু সেই ঠকবাজকে ও আজও খুঁজে চলেছে। বহুবার সবার মুখে শুনেছে শোভন ব্যানার্জি বাবাকেকি ভীষণভাবে ব্যাবসায় ঠকিয়ে ছিল! আর সেই ঘটনার দিন সাতেক পরেই মা আত্মহত্যা করেছিল। সব অর্থেই বাবা তখন পরাজিতের দলে।   আগেও পড়তো আর এখনো খুবই মনে পড়ে মায়ের হাসিমাখা মিষ্টি মুখখানা। কিন্তুক্রমে ক্রমে বদলাতে বদলাতে মা যেন কেমন অবুঝ হয়ে গেছিলো। তবে হ্যাঁ মায়ের এই রুক্ষতা বেশিদিন দেখতে হয়নি রনিকে, অসহ্য হবার আগেই মা পাড়ি দিয়েছিলো অজানা পথে। আর সেই ঘিনঘিনে অনুমানটা! সেটানিজের কাছে সত্য প্রমাণিত হবারপরেও খুব মনে হয় মায়ের কথা।একবার! অন্ততঃ একটিবারের জন্যেও যদি মা কে পেতো, তাহলে জেনে নিতো আসল গল্পটা।  যেটা বাঁধানো মলাটের আড়ালে লুকিয়েই রইলো চিরকাল।                               

শোভন ব্যানার্জি কতজন আছেন,  কি তাদের ফোন নম্বর, সব খুঁজে খুঁজে একটা ফোল্ডারে  লিখে রাখছিলো রনি।কখন যে বাবা এসে পেছনে দাঁড়িয়েছেহুঁশই হয়নি। চোখাচোখি হতেই বাবা বিরক্তি নিয়ে বললো, – আহ অনেক পুরোনো ঘটনা,  এগুলো এখন মনে করে বর্তমান জীবনকে আর ব্যতিব্যস্ত করোনা। তুমি নিজের কেরিয়ারে নজর দাও। আমার ওই পুরোনো অতীত নিয়ে একটুও মাথাব্যথা নেই। – না বাবা, শেষ তো দেখতেই হবে।লোকটা কি পার পেয়ে যাবে নাকি এভাবে? রনি থামিয়ে দেয় বাবাকে,  থেমেও যান উনি। কেবল একটিই কথা বলেন যেটা রনিকে চুপ করানোর জন্যে যথেষ্ট । – যা গেছে তা একেবারেই যেতে দাও, আর ফিরিয়ে আনতে চেয়োনা। সব ফেরা জীবনে সুখপ্রদ নাও হতে পারে। আর কথা এগোয় না। রনি ভাবে অর্থ,  ব্যবসা এসবের জন্যেই তো শুধু নয়, তোমার জন্যেও আমার লড়তে ইচ্ছে করে বাবা। তোমার মনটাকে মর্যাদা না দিয়ে , তোমাকে ঠকিয়ে,  যারা আজ ভালো আছে বা নেই দুর্ভাগ্যবশতঃ তাদের একজন আমার জন্মদাত্রী।সত্যিই কি খুব প্রয়োজন ছিল নীলা নামক মহিলার প্রথাবিরুদ্ধ ভাবে স্বামী ব্যাতীত অন্য পুরুষের সন্তান ধারণ করার! নিশীথ সেনের কি স্ত্রীর প্রতি সত্যিই খুব অবহেলা ছিল! এতো যত্নবান একটা মন, কিভাবে বিবাহিতা স্ত্রী কে দূরে ঠেলতে পারে কিছুতেই বুঝে পায়না রনি। মা কে কোনোদিনই অশ্রদ্ধা করতে শেখাননি উনি।চিরকালই দেখেছে মায়ের প্রতি কোনোরকম বিরূপ আচরণে বাবা শুধু বিরক্ত না ,  খুবই কষ্ট পান। রনি তাই অনেক সংযত হয়েছে পরবর্তীতে।                       

            আজ আক্ষরিক অর্থেই অনাথ হলো রণি । বাবা নেই এটা  কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা।ঘরের প্রতিটি অংশে বাবার ছাপ। বাবা তো শুধু নিজের ভূমিকায় না,  মায়ের ভূমিকাতেও ছড়িয়ে দিয়েছিলো নিজেকে। এই বারো দিন প্রতিটা কাজে ওর বাবাকে দরকার হয়েছে,রোজকার জীবনের ওঠা-পড়ায় বাবাকে ছাড়া  ও কিছু ভাবতেই পারেনা। গত একমাস এ ডাক্তার সে ডাক্তার করার সময়েও বাবাকেই জিজ্ঞেস করেছে কত কি। ঢেউয়ের থেকেও দ্রুত ভাঙছিল দিন-রাত।হঠাৎই জানা গেলো হাতে গোনা দিন বা মাস। মারণ ব্যাধি বাসা বেঁধেছে কিডনিতে। লুকানোর সুযোগ বাবাকেও দেয়নি আগ্রাসী সেলগুলো।তাও কি ধীর অবিচলিত থেকেছে শুধু রনির জন্যে। মাত্র ৭ দিন নার্সিংহোমে কাটিয়ে এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় রনিকেএকা রেখে বাবা চলে গেলো। সব দিক দিয়ে সব অর্থেই একা হয়ে গেলো। মা তো সেভাবে নেই ই কোনোদিন, না স্মৃতিতে – না ভালোলাগায়!  ঘাট শ্রাদ্ধ নিয়মভঙ্গের পাট চুকিয়ে রনি আজ একদম একা, নিজের মুখোমুখি অলস অবসন্ন।                                               

বাবার আলমারি খুলে বসেছে রনি। জামা-প্যান্ট , কোট ,  সব  দিয়ে দেবে রাঁধুনি দিদির বরকে, কালো কাকাকে।  শুধু একটা সাদা শাল রেখে দিলো নিজের কাছে,  ওতে বাবার ওম আছে!মনখারাপের রাতে ওটা জড়িয়ে বাবাকে পাবে, কোলে মাথা রাখবে ছোট্টবেলার মতো। কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবেনা বাবাকে ওর জীবন থেকে। আর তো কেউ নেইই ওর!একটা বড়ো ফাইলে সব জিনিস কত যত্নে বাবা গুছিয়ে রেখেছে, কি নিখুঁত পরিপাটির চিহ্ন সবখানে! ওহ , বাবা ডায়রি লিখতো! অবাক হয়ে যায় রনি।ওর স্কুলজীবনের, কলেজের কত মজার মজার ঘটনা বাবা লিখে রেখেছে! পড়তে পড়তে এতো দুঃখেও ওর ঠোঁটের কোণে হাসি ঝিলিক মারে।কিন্তু শিলিগুড়ির কথা কিছুই লেখেনি।এমন কোনো ঘটনাই লেখা নেই ডায়রির কোনো পাতায়,  যেখান থেকে রনির আবছা স্মৃতি কিছুমাত্র স্পষ্ট অবয়ব পেতে পারে। হয়তো তখন বাবা লিখতো না, বা হয়তো তখনকার জীবনের কোনো স্মৃতি সংরক্ষিত থাক এটা চায়নি। চোখ ভরে আসে রনির পরম মমতায়।   

           একটা হলদেটে খাম উঁকি মারে স্তূপীকৃত জামাকাপড়ের ভিতর থেকে। ভেতর থেকে জীর্ণ একটা কাগজ বের করে মেলে ধরে চোখের সামনে। আবছা কালিতে অক্ষর অস্পষ্ট। অক্ষরের কালি অস্পষ্ট হলেও বক্তব্য কিন্তু খুব স্পষ্ট, ” আমি আজ স্বেচ্ছায় তোমাকে মুক্তি দিচ্ছি।জানি কখনো ক্ষমা করতে পারবেনা,তবুও আজ শেষবারের মতো  নিজেকে দাঁড় করালাম কাঠগড়ায়।শোভন  শুধু তোমার ব্যবসার  নয় পরিবারেরও ক্ষতি করেছে। আমিও সেই পাপের সমান ভাগিদার। তোমার অনুপস্থিতি আর শোভনের মনভোলানো ব্যবহারে আকৃষ্ট হই আমি। দিনের পর দিন মুখোশ পড়ে তোমাকে ঠকিয়েছি! রনি শোভনের সন্তান।  গ্লানিতে অনুতাপে দগ্ধ আমি,স্বীকার করতে লজ্জা নেই তোমার সাথে সাথে আজ শোভন আমাকেও প্রতারণা করেছে। আজ বুঝছি পুরোটাই খেলা ছিল!  কতখানি ভুল আমি করেছি! যে ভুল কখনোই শোধরাবার নয়। মুক্তি দিলাম তোমাকে। সুদূর ভবিষ্যতে যদি কখনো পারো ক্ষমা করো সেদিন প্রকৃত অর্থে মুক্তি পাবো আমি।  চললাম” – নীলা।                                                   

স্বরবর্ণ-ব্যাঞ্জনবর্ণের যুগলবন্দীতে  কখন যে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমেছে, আর সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত ডানা মেলেছে রনি বুঝতেই পারেনি।  একটাই কথা বারবার মনে হচ্ছে বাবা জানতো! এতো বছর, এতদিন, কতভাবে কতরকম অভিনয় করে যে সত্যটা গোপন করতে চেষ্টা করেছে, সেটা বাবা জানতো!  মায়ের মৃত্যুর সময় থেকেই! কি অসীম মমতায় উনি দুই প্রতারকের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে মানুষ করেছেন। এখানের কাজ গুছিয়ে নয়ডা  চলে যাবে, যদিও জয়েনিং একটু দেরি আছে।  যেখানেই কাজ করুক আর যে দেশেই থাক এই বাড়িটা ও কোনোদিনই হারাতে দেবেনা ওর জীবন থেকে। এতো স্মৃতি এই বাড়িতে ওর  বাবার! হ্যাঁ বাবাই তো,  শুধুমাত্র ঔরসজাত হলেই সেই সন্তানের বাবা হওয়া যায়না। বাবা হতে গেলে মুঠোয় ভরা তুলতুলে হাতটাকে ধীরে ধীরে বাড়তে দিতে হয়, যতদিন না সেই হাতটা বলিষ্ঠ হয়ে অপর কাউকে ভরসা দেবার মতো হচ্ছে। আজ মনে হলো সবাই যে বলে,মায়ের থেকে বাবার মমতা কম কেন কে জানে! সবাই তার বাবাকে দেখুক আর জানুক মমতার আরেক নাম নিশীথ সেন! এই প্রথম ওর ইচ্ছে হয় তাকের ওপর রাখা নারায়ণ ঠাকুরের পাশে বাবার ছবিটা রেখে রোজ সকাল সন্ধ্যে ধুপ দিতে। 

                                            সব কাজ চুকিয়ে রাঁধুনি দিদির হাতে ঘরের চাবিটা দিয়ে রনি বেরিয়ে পড়ে ট্রেন ধরতে। হঠাৎ দেখে রাঁধুনি দিদির ছেলে আসছে ছুটতে ছুটতে।  রনির হাতে একটা আধ ছেঁড়া ফাইল দিয়ে বলে, ” মাসি তুমি যে পুরনো বইগুলো আমাকে পড়তে দিয়েছ, সেই প্যাকেটেই ছিল। মা বললো যদি কাজের হয়”। ট্রেনে উঠে সব গুছিয়েনিজের সিটে বসে। ফেলে দেবার আগে একবার ফাইলটায় চোখ রাখে। ওহ, এত বাবার এক্সিডেন্টের ফাইল! ভেতরে বাবার এক্সিডেন্টের সময়ের নার্সিংহোমের বিল আর কিছু টেস্টের রিপোর্ট। অত পড়ার ধৈর্য্য থাকেনা রনির। উল্টেপাল্টে চোখ বোলাতে বোলাতে একটায় থমকে যায়। বাবার সিমেন অ্যানালিসিস রিপোর্ট! পড়তে পড়তে চোখের সামনে  মানুষ জন সব দুলে ওঠে। হাত থেকে কাগজটা পড়ে যায় পায়ের কাছে। তুলতে গিয়ে দেখে রিপোর্টের উল্টো পিঠে বাবার হাতে লেখা “আমাকে ক্ষমা করো নীলা, সত্য গোপন করে বিয়ে করার জন্য আর আজীবন গোপন রাখার জন্যে আমি অনুতপ্ত।” তলার তারিখটা মায়ের মৃত্যুদিন। দূর পাল্লার ট্রেন দ্রুত ছুটে চলে। চারপাশের মানুষ গাছপালা ঘরবাড়ি নিমেষে হারিয়ে যেতে থাকে চোখের সামনে থেকে। আস্তে আস্তে যেন গোটা পৃথিবীটাই হারিয়ে যায়!কেবল কিছু অক্ষর নাচতে থাকে চোখের সামনে। একটাই প্রশ্ন ভেসে ওঠে কি প্রয়োজন ছিল এইমিথ্যাচারের? গতিময়তার মাঝে রনি কেবল স্থবির নিস্পন্দ ডুবে যেতে থাকে ভাবনার অতলে !!  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত