| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

স্বাধীনতা-উত্তর পুরুষ

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

এমনিতে আমরা স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালিরা পেটপাতলা। তেলেভাজা মুড়ি ছাড়া কিছু মুখে দিলে চোঁয়া ঢেকুর ওঠে। সেদিন মিউনিসিপ্যালিটির লোক এসেছিল, দিলাম দু-কথা শুনিয়ে। বললাম, এই করে শহরের ডেভেলপমেন্ট করবে। যে শহরে এদিক ঢাকতে ওদিক উদোম হয়ে যায় সেখানে এত অপচয়!
লোকটা কটমট করে তাকিয়ে বলে,কী করে?
আমি হিসেব দিলাম। একদিনে একটা লোকের পানীয় জল লাগে তিন থেকে চার লিটার। সেখানে আপনার বেরিয়ে যাচ্ছে কত?

-মিনিটে দু লিটার। অর্থাৎ যদি দু’ঘন্টা করে দু’বেলা জল দেয় তবে হিসেবটা গিয়ে দাঁড়াল….টু ইন্টু টু হান্ড্রেড ইন্টু যতগুলো ট্যাপকল খোলা আছে। তার মানে যদি ধরা যায়…
-রাখুন তো মশাই আপনার হিসেব। মিউনিসিপ্যালিটির লোকটা খ্যাঁক করে ওঠে।
-আর একদিনে একটা লোকের কারেন্ট দরকার হয় তিন থেকে চার ইউনিট আর রাস্তার ধারে একটা পোলে সারাদিন এল ই ডি হোক আর যাই হোক নুন্যতম খরচ পড়বে চল্লিশ ইন্টু টুয়েলভ ইন্টু কত গুলো পোল হবে সারা শহরে …তা ধরুন …।
-ধুর মশাই ! যা বলার সাহেবকে বলুন গে।
লোকটা রেগেমেগে চলে যেতেই বাড়ির ভেতর থেকে সাবধানবাণী বেরিয়ে আসে।
-দিলে তো খচিয়ে। গোন্ডগুলে সাধে বলি! ওদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ মানে রেপুটেশন বারোটা।তারপর কোনও দায় বিপদ হলে তখন?

-বউটা আমার উথলে ওঠে।
-যাঃ বাবা! এই টুকু সত্যি কথা বললে রেপুটেশন খারাপ হ্য় বুঝি!
-মাথামোটা আর কাকে বলে! ঘরের কোণে এসব বিছিকিচ্ছিরি সংলাপ চললে কার ভালো লাগে। মনকে বোঝায় কেন ,কেন এসব কর। বর্তমান যেদিকে যাচ্ছে গড়িয়ে গড়িয়ে ঠেলেঠুলে হুটোপুটি করে যাক, তাতে তোমার কি! দরকার হলে হামাগুড়ি দাও। বরঞ্চ ভালো থাকবে। কথাগুলো নিয়ে জাবর কাটছিলাম একটা শপিং মলের ওয়েটিং ক্যাম্পাসে। এমন সময়-
-এ আবার কি কথা বন্ধু!তুমি না ডিসেন্ডেন্টস অব ফ্রিডম ফাইটার।

-স্বাধীনতা-উত্তর পুরুষ!
-আয়নার ওপাশে ক্যা রে…! চমকে তাকিয়ে দেখি ঠিক আমারই মত দেখতে একজন ওপাশে বসে। কানের পাশে ধূসর চুল। চোখে মাইনাস ইলেভেন পয়েন্ট ফাইভ পাওয়ারের চশমা। মুখটা ঠিক ঝুনো নারকেলের মত।খটখটে। চেনা জানা নয় ।তবু বড় চেনা চেনা লাগে। বললাম,

-না মানে এখন যা অবস্থা কানে বধির, মুখে মূক আর চোখে অন্ধ হতে হবে।তবেই তুমি মানুষ।ভালোমানুষ।
-সে ভালোমানুষ তুমি হতে পারবে কি? লোকটার চোখে মুখে সন্দেহ।
-কেন। কেন পারব না? লোকটা হেসে বলল , তোমার বীজে প্রবলেম।
-মানে ?
-মানে তোমার দাদু। দেশমুক্তির সৈনিক! তোমার গরম রক্তের সোর্স।
-হ্যাঁ, সে আমি জানি। পরাধীন ভারতের শেষদিকে ওনার জন্ম। উনিশ শ’ তিরিশ-টিরিশ হবে বোধহয়।
বিয়াল্লিশের আগষ্ট আন্দোলনে হাঁটুর ওপরে দেশি তাঁতের ধুতি পড়ে বড়দের সঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে দেশোদ্ধার করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনতা সৈনিকের সার্টিফিকেটও পেয়েছিলেন।ওই মানপত্র নিয়ে বুড়ো দিব্যি কয়েক বছর সুখে স্বাচ্ছন্দে পার করে দিয়েছিলেন। তারই–এটোঁকাঁটা আমি এদিক সেদিক পেয়ে থাকি। সভাসমিতিতে একটা করে চেয়ার পেয়ে দুটো একটা বুকনি দিলেও লোকে কিছু মনে করে না।
-ওঃ হো! বড্ড গরম।মাথার ওপর যদিও এ সি মেসিনের ডিজিট্যাল সংখ্যাগুলো ঠিক ঠাক জ্বল জ্বল করছে। গলার কাছ থেকে শার্টের দুটো বোতাম খুলে ফেললাম। ভাবলাম একবার বাইরের করিডর থেকে ঘুরে আসি। কিন্তু এখানে এত্ত ভিড় একবার চেয়ার ছেড়ে দিলে আর ফিরে পাবার আশা নেই। তাছাড়া সামনের দেয়ালে মস্ত আয়নাটাতে নিজের
মত লোকটাকে দেখতে ভালোই লাগছে। যদিও চেহেরাটা মোটেই আহামরি নয়। মাথা আর গোটা ধর মিলে ‘কাঠির ওপর আলুর দম!‌’ তা হোকগে।এখন কিছুতেই বাড়ি ফেরা যাবে না। আসলে আধাঘন্টা হয়ে গেল এখানে এসেছি। আধা শহর। প্রত্যন্ত জেলার প্রত্যন্ত শহর। আধুনিকতার রূপ-রস
-গন্ধ-শব্দ এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে যাচ্ছে, তখন এই শহরইবা বাদ থাকে কেন! ইলেকট্রোমিডিয়া, শপিং মল, উঁচু উঁচু ফ্ল্যাট, সঙ্গে শ্লীল-অশ্লীলতার গন্ডিছেঁড়া পুতিগন্ধ মাখানো রাজনীতি। বেসলেশ বেসিক, ইললজিক্যাল ধুমধারাক্কা মন্তব্য। সঙ্গে ভিয়েনে ফুটন্ত ধর্মের চাঁদোয়ার তলে ফিচেল হাসি, আর হিংসার হিমোগ্লোবিনে স্নান। বর্তমান চাঙ্গা। আর আছে আমাদের পলকা সহ্যশক্তি। মাঝে মাঝে দাদুর জন্য রাগ হয়। কেন যে দাদুকে এতখানি মাথার মধ্যে পুরে রেখেছি। এই সবেতেই নাক গলানো মনোভাবটা আমার জন্মজরুলের মত। অ্যাদ্দিন ধরে তনিমা বুঝতে না পারলেও ঔরসজাত মেয়েটা বোঝে। মায়ের মত বেমক্কা মন্তব্য করেনা। তনিমা যখন বলল, দ্যাখো শহরে মাল্টিকমপ্লেক্স হয়েছে। সাথে শপিং মল। উদ্বোধন আজকে। একই ছাতের তলায়
পোশাক আসাক গয়নাগাটি, কসমেটিক্স, ফেবরিক, লেদার সব কিছু ।

-আগে কখনও দেখেছ? আমি ওর জল বিছুটি গায়ে না মেখে বলি, কিন্তু তোমরা যাবে কি করে? নতুন জায়গা। কি ব্যাপার! কোন অসুবিধা হবে কিনা। আগে আমার দেখে আসা উচিৎ। যদি কোন অঘটন ঘটে তখন আমাকে বলতে ছাড়বে না –বুদ্ধি নেই।মাথায় গোবর। কি ঠিক বলি নি? শমি ফিকফিক করে হেসে ওঠে।

-বাবা তুমিও না।
-না মা, তুই বুঝিস না। চারপাশে যা দলদলি। বুঝে সুঝে পা ফেলাই ভালো ।
-বাবা আমরা কি একা যাচ্ছি নাকি! ওরা যেভাবে অ্যাড দিয়েছে, তাতে গোটা শহরটাই না ঝাঁপিয়ে পড়ে।
-ওটাইতো! এত্ত ভিড়ে…
-ছাড় না শমি, ওকে ওর মত কাজ করতে দে।তনিমার কথাই আবার সেই অবজ্ঞার বোল্ডার ছুটে আসে। এখন আর তনিমাকে ঘাঁটতে ইচ্ছে করল না।পায়ে চপ্পল গলিয়ে বেরিয়ে যাই। সঙ্গে সঙ্গে শমিও বাইরে আসে। বলে,

-ফোনটা তো নিয়ে যাও। আধঘন্টার মধ্যে ফোন করে জানাবে কিন্তু। আমরা ততক্ষণে রেডি হই।মেয়ের দিকে তাকাতেই হঠাৎ যেন মনে হলো মেয়েটাও বড় হচ্ছে। ডানাতে তার রঙ। হঠাৎই মনটা কেমন হলদেটে হয়ে যায়। বললাম, ঠিক আছে।
হাইভোল্টেজ শপিং মল। থিকথিকে ভিড়। ডিপ ব্লু সী’ কালারের ইউনিফর্মে সেলসের ইয়ং ছেলেমেয়েরা প্রজাপতির মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছাতের তলায় তলায় ক্যামেরার উঁকি দেওয়া গোলমুখ।পুবদিকের কোণায় ক্যাস কাউন্টারে লম্বা কিউ। সেকেন্ড ফ্লোরে রিলিফ জোনে একটা চেয়ারে বসে জায়েন্ট মিররের সামনে ভাবছি, এরা সবাই আধুনিক। আল্ট্র মডার্ন। বাইরে ভেতরে দেহে মনে সবেতেই। আমি সিওর মাল কত কিনবে জানি না তবে উল্টে পাল্টে দেখবে সব।

-এটা কী? ওটার প্রাইস কুপন! বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ অফার কোন প্রোডাক্টে ছেড়েছে। এ মা- এর রেটটা অনেক হাই!
মিররের কাচটা এমনভাবে সেটিং করা, আমার বাঁ পাশে মলের সবটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কে আসছে কে যাচ্ছে, কে কি বাচ্ছে সব। সকাল দশটাই ওপেন করেছে।এখন দশটা পঁয়ত্রিশ। এরই মাঝে ভিড় উপচে পড়ছে। গেটের বাইরেও বেশ গ্যাদারিং।হল টুইটুই। কতকগুলো কলেজ ছাত্রী কলকলিয়ে ওঠে। সব কটা জিন্স আর টপ। আমাদের কলেজ কালে সালোয়ার ছিল। ওদেরকেও ভাল্লাগতো। তবে দুইয়ের লুকিং স্মার্টনেসের ফারাক অনেক। তা হোকগে, ভদ্রভাবে শরীরে লজ্জ্বা নিবারণ হলেই হয়।
এখন আর অতটা গরম নেই। হালকা শীত শীত করছে। চোখ দুটো ঝুলে পড়ার উপক্রম। ঝিমুনি ঝিমুনি ভাব। এসির আরামে একটু পাওয়ার ন্যাপ নিলে মন্দ হত না। শমিকে একবার ফোনও করতে হত। আমার সেলোফোনটা বেশ বড়। শমিই কিনে দিয়েছে। ওর মতে, স্মার্ট ফোন স্মার্ট লোকেরাই ব্যবহার করে। সুইপ করতে যাব, অমনি কানে কি সব যেন ভেসে এল,

-হাউ ডেয়ার ইউ! -অসভ্য -জানোয়ার -ইতর। 
তড়াক করে শরীরে ঝাঁকুনি এল। কী ক-কী হল!ঝিমুনি ভাবটা উধাও। দেখি এক ভদ্রমহিলা জোর চেল্লাচ্ছে। পাশে তার মেয়ে।

-আমার পেছনে হাত দিলে কেন? অসভ্য, ছোটলোক। ওদের সামনে কতগুলো ছেলে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসছে। ওদের দাঁত বের করা দেখে আমার কেমন মনে হল একটা ঝড় আসছে। প্রচন্ড জোরে ঝড় বয়ে যাবে এইখানে। আমার প্রোটেকশন দরকার। আমি লক্ষ্মীসোনার মত সানগ্লাসটা বুক পকেট থেকে বের করে চোখ আটকে দিলাম। অকারণে নাক গলিয়ে লাভ নেই। নিজের সমস্যা নিজেই মিটিয়ে নেবে। গুটি গুটি পায়ে গর্তে ঢুকব ভাবছি। হঠাৎ আয়নার ওদিকে লোকটা ফোঁস করে উঠে। আমি বললাম, চেপে যা। দেখে যা।
-কিন্তু চাপবে কেন? এ তো অন্যায়। এতগুলো লোকের মাঝে মহিলাকে অপমান! লোকটা আবার ফুঁসছে।
-তাতে কী! এখানে আমার কী কাজ?
-কী কাজ মানে? ওপাশ থেকে লোকটা গর্জে ওঠে, সুস্থ সভ্য নাগরিক হিসেবে তোমার প্রতিবাদ করা উচিৎ।
-কেন আর লোক নেই? কই তারা তো কিছু বলছে না।যে যার মত শপিং করছে।
-সবার সঙ্গে তোমার তুলনা। যাও একটা কিছু কর।
-ধুর! আমি কেন মেয়েদের মাঝে এন্ট্রি নেব। ওরা এখনকার স্মার্ট মেয়ে। ওরা ঠিক ব্যবস্থা করে ফেলবে। ওদিকে জটলা আরও জটিল হতে শুরু করে। ছেলেগুলো এখনও ওদের কাছে দাঁড়িয়ে।আমি মাঝে মাঝে সানগ্লাসের তলায় চোখ বুজে থাকছি। চোখ বন্ধ করলে কি আরও বেশি দেখা যাই। সিকিউরিটি এসে হাজির। ওদেরকে দেখে মহিলার গলা বোধহয় একটু চড়েই গেল। ভাবলে বুঝি এবার একটা সম্মানজনক বিহিত হবে। কিন্তু সে রকম কিছু হল না। মৃদু ধমকে ওদেরকে সরিয়ে দিল। তাতেই বাবুদের গোসা।

-গায়ে হাত দিলে কেন? ছেলেগুলো রুখে দাঁড়ায়।
এবার আরও কিছু হবে। হয়তো আরও কিছু …।
সামনের জনকে মাথা নেড়ে বিজ্ঞের মত বললাম, দেখলে তো আগেভাগে নাক গলালে কী হত! গোটা ঝড়টা আমার ওপর আছাড় খেত। মনে মনে তনিমাকে ধন্যবাদ দিলাম।
আবার সেই লোকটার উত্তেজনা স্পষ্ট হল।

-দ্যাখো দ্যাখো, ছেলেগুলো ফোন করছে।
-ফোন করতেই পারে। তাতে কী?
-ওরা বাইরে থেকে লোক ডাকছে ।আমার মনে হচ্ছে বেশ বড় একটা ঘোঁট পাকাবে।
এ হে! এ তো দেখছি আমার পেছন ছাড়বে না। বললাম, গরম খেঁচুড়ির মধ্যে হাত চুবালে কি হয় জানো? সুস্থ শরীরে শান্তি-অবসর বলে যা কিছু বেঁচে-বর্তে আছে আগামী দিনগুলোতে তাও থাকবে না। বিষাক্ত হয়ে থানা, পুলিশ নিয়ে ঘরকন্না করতে হবে। ও আমি পারব না।
-আচ্ছা ধরিবাজ তো!
সে তুমি যাই বল,ওতে আমি নেই। বললাম তো! তবুও বাঁপাশে ডানপাশে একবার তাকালাম। আমার মত অনেকগুলো লোক বসে। বসে থাকবারই কথা। কেননা ভিড় ঠেলে ঠেলে একতলা তিনতলা করা চাট্টিখানি কথা না। এদিক ওদিক ঘোরার চেয়ে এখানে ঝিমোনোই বেটার। দেখি বেশির ভাগ লোকই সেলোফোনে ব্যস্ত। কেউ কেউ আবার ঝিমোচ্ছে। ঘরের লোকেদের সঙ্গে পেরে উঠছে না। কার বাচ্চা কেঁদেই যাচ্ছে। তারই মাঝে ছাতের কোণায় কোণায় ডিনারের মিউজিক। মনে মনে স্থির করেই নিলাম, ওরা যদি পারে ইগনোর করতে আমি কেন নই।
কিন্তু সে ক্ষণিকের। লোকটা আমায় ধমকালো।

-দেখতে পাচ্ছ না, ঐ ছেলেগুলোকে কিচ্ছু না বলে ওই মা মেয়েকেই সিকিউরিটি বার করে দিচ্ছে।
ভালোই তো। আমি বললাম, ওরা বরঞ্চ নিরাপদে থাকবে।
-আচ্ছা অমানুষ তো! এতে তো ওদের আরও সাহস বেড়ে গেল। ওরা আবারও কোনও অকাজ করবে। তখন!
-নিজের সমস্যা নিজেকেই মেটাতে হবে। পেপারে দেখলে না, ক্যারাটে মার দিয়ে এক পুচকে কিশোরী কেমন তিন দস্যি ছেলেকে কাত করে দিয়েছে। শোনো আমি বাপু ওতে নেই।
-বেশ তুমি ঐ তথ্য দিয়ে যুক্তি খাড়া কর, ছেলেগুলো ততক্ষণে সমাজটাকে বিষিয়ে দিক। ও হ্যাঁ, ওই সানগ্লাসের তলায় আধমরা হয়ে পড়ে থাক। আর কোনও দিন বলবে না যে তোমার গায়ে ফ্রিডম ফাইটারের রক্ত বয়ছে।
-মুচকি হেসে বললাম সে তুমি যাই বল ,অত সহজে আমাকে হেলাতে পারবে না। খানিকক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করেছি, ভাবছি লালমুখোরা আরও বেশ কয়েক বছর এ দেশে থাকলে এ পোড়া দেশেরই হয়তো ভালো হত।- আবার এক খোঁচা।

-আরও লোক ডাকছে দেখে তুমি কি ভয় পেলে? আসলে এ বাঙালি সে বাঙালি নয়। এ ঘরকুনো বাঙালি, ভেতো বাঙালি যাদের মুখেই সমস্ত বল কাজ করে। সেই বঙ্কিমি বাবুদের মনে আছে? এবার আমি ওর মুখের দিকে কটমট করে তাকালাম, চোখে চোখ। আমার সরু লম্বা মুখটা তখন আরও সরু দেখাচ্ছে। বললাম, আমাকে কি বোকা পেয়েছ? ওই তিন শেরের মাঝে আমি একা বাগরবিল্লা নিজেকে উপহার দেব নাকি! আমার ক্ষমতা শুধু খ্যাঁক খ্যাঁক করা। থাবার জোরে মাংস তোলা নয়।
আমি যেমন মুখটা দেখালাম আমাকে ঠিক ততখানি ঐ মুখভঙ্গি, চোখে বিরক্তি আর ধূর্তুমি সেও ফিরিয়ে দিল। বাগরবিল্লা!

-তুমি! একটা আকাট তেজহীন আধবুড়ো গাধা কোথাকার! যে শুধু ঘাস ছেঁড়ে আর খ্যাক খ্যাক করে। একটা ব্যাঙ দেখেও ভয়ে দু-পা পিছিয়ে যায়।
ভদ্রমহিলা ওনার মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আগে আগে প্রাইভেট সিকিউরিটি। ছেলেগুলো হ্যা হ্যা করে দাঁত বের করে এখনও হাসছে। ভাবছি দোষটা কার? গোটা পরিস্থিতিটা মাথার মধ্যে মিক্সির মত বাঁটতে লাগলাম। দেখি কী জিস্ট বেরোয়। কিন্তু তার আগেই চিরন্তন অপরাধীরা যে ভুল করে থাকে সেই ভুলই ওরা করে ফেলে। আবার ওই ছেলেগুলোর একটা পাশে দাঁড়ানো অন্য এক মহিলার নিতম্বে খামচাল।  মহিলা গ্যাঁক করে আঁতকে উঠল। অমনি ‘ভেজা’ আমার গরম হয়ে উঠল। লোকটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে স্মার্ট ফোনটা শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়ালাম। আপনা আপনি ডান হাতটা মুঠো হয়ে গেল। অনামিকা আর মধ্যমায় ঘোড়ার নাল ও প্লাটিনামের আংটি দুটো ঠিক করে নিলাম। আর তারপরই গিদ করে মারলাম সেই ছেলেটার মুখে। দুম করে পড়ে গেল।অন্যজনকেও এক খানা গিদ। উল্টে পড়ল। আরেক জনও বাকি থাকে কেন। শক্ত মোবাইলফোনটা চালিয়ে দিলাম কানের নিচে। সঙ্গে সঙ্গে গল গল করে রক্ত গড়াতে লাগল। সাদা ধবধবে টাইলস চিটচিটে লাল রক্তে ভেসে গেল। লোকটা ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করল মনে হল। বলল, দ্যাটস্ দ্য স্পিরিট! সত্যিকারের বাঘের বাচ্চা, উত্তর স্বাধীন ভারতের প্রকৃত সৈনিক। নিচে তাকালাম। মৃতদেহ ঢাকা সাদা কাপড়ের মত টাইলসে পড়ে আছে তিনটে নিথর দেহ। রক্ত বয়ে চলেছে। চুঁইয়ে চুঁইয়ে অনেকটা মেঝে জুড়ে ভারতবর্ষের রঙিন মানচিত্রের মত ছড়িয়ে গেছে। ধুয়ে যাচ্ছে স্থান-কালের পরিসীমা
রেখা। ডুবে যাচ্ছে স্বাধীন ভারতের চড়া। আস্তে আস্তে সেই সব মহান মানুষের মৃতদেহগুলো ভেসে উঠেছে। তাদের মুখগুলো কেমন বিবর্ণ ভীত। কি গভীর আশ্লেষে হতবাক হয়ে নির্নিমিষে চেয়ে আছে। ততক্ষণে গলগল করে কালচে গড়ানো রক্তধারা ওই মুখগহ্বরে ঢুকে পড়ছে। আর মানচিত্রের সীমারেখা বরাবর ভয়ংকর সব হায়না শিয়ালেরা তাদের লোল জিহ্বা দিয়ে রক্ত চাটছে।বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে চেয়ে দেখি এ কোন ভারতবর্ষ! রক্তের ভারতবর্ষটাকে দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হল আমার বমি বমি লাগছে। মাথা ঘুরছে। এতক্ষণে আমার খেয়াল হল, আমার প্রেসার হাই। সুগার মার্জিন লাইন ক্রস করে গেছে। এবার হয়তো আমি চেয়ার থেকে উল্টে পড়েই যাব।
ঘামে ভিজে গেছে আমার পায়ের তলা। বুকটা ধড়াক ধড়াক করছে। চমকে এপাশ-ওপাশে তাকিয়ে দেখলাম ঠিক আগের মতই মানুষজন এখান সেখান করে নিজের পছন্দ মত জিনিস খুঁজছে। এখনও সেই স্যাক্সোফোনে ওয়েস্টার্ন কোনও ধুন বেজে যাচ্ছে। আর ছেলেগুলো! ছেলেগুলো কোথায়।তাহলে আমি কি এতক্ষণ …।
তৎক্ষণাৎ সানগ্লাসটা চেয়ারের তলা থেকে খুঁজে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। আর কোনরকম সময় নষ্ট না করে এ-সারি ও-সারি, এ-গলি ও-গলি করে ভিজেবেড়ালের মত চুপিচুপি বেরিয়ে গেলাম। না এখনও পর্যন্ত কেউ আমাকে দেখতে পায় নি। এমনকি ঐ লোকটাও না।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত