স্মৃতির কাঠপোল

বেশ কয়েক বছর আগে আমি আমার একটি বিশেষ স্মৃতিকে বিদায় জানিয়ে বলেছিলাম, বিদায়। বহু অনুশোচনা ও আত্মবিলাপের মধ্যে আমার বিষণ্ণ স্মৃতিকে যখন বিদায় জানাচ্ছি তখন বেলা শেষের রোদ আমার বাড়ির কার্নিশে থেকে বড়ই অবেলায় সরে গেছে। আমি আমার ক্লান্ত খোলসের গভীরে আত্মগোপন করতে চাইলাম কিন্তু ঠিক তখনই মায়ের ঘামে ভেজা রুমালটি কে দেখতে পেলাম কাঠ পোলের ওপরে পড়ে আছে। নিঃসঙ্গ কাঠপোল শুধু মানুষের পায়ের দাগ আর সাইকেলের চাকার দাগ নিয়ে পড়ে আছে একটি শুকনো তক্তার মতন, বালি বুকে নিয়ে ফালি নদীর ওপরে। একেবারে গ্রামের সীমানাকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়ে সেই কাঠপোল এখনও সেইরকমই আছে। সাদা রুমাল সচরাচর বিধবা রমণীদের কাছে যেমন থাকে ঠিক তেমনিই মলিন রুমাল। সাদা থানের টুকরো কেটে সেই সব রুমাল রুমালের মতন নয়। অনেকটা সর্দি কাশি বা চোখের জল মোছার জন্য কোমড়ের ভাঁজে চাবির সাথে মায়েদের কাছে যেমন থাকে।

কোথায় যেন যাচ্ছিলাম? যাচ্ছিলাম মায়ের সাথে হাঁটতে হাঁটতে। অবসরে মাঠের ওপরে কিছু একটা খুঁজে যাওয়া যেমন হারানো কালির দোয়াত হতে পারে, হতে পারে বাবার সেই সাদা ঘোড়াটি যাকে বাবা গর্বিত হয়ে বলতেন মরুভূমির ঝড়। উপড়ে যাওয়া শতরঞ্চি ঘুড়ি বা মায়ের অবসরের গান বা আমার দাদামশাইয়ের ধ্বংসপ্রায় একটি গ্রন্থাগার। মা গান গাইতেন। রবি ঠাকুরের গান। মায়ের গলায় বেশ প্রার্থনা সঙ্গীতের মতন শোনাত। মা গাইছিলেন রবি ঠাকুরের গান। আর ফিরে ফিরে দেখছিলেন ফালি নদীর পারটিকে। এই তো গেল মাসেই নদীর পারে ওইখানে দাহ করা হল বাবাকে। মা যেন বুঝতে পেরেছিলেন। স্থানটিকে সঠিক সনাক্ত করে একটি চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

তারপরে আমার দিকে তাকিয়ে নিস্পলক চোখের ভাষায় যেন বলতে চাইলেন,- ওইখানেই তো?

আমিও মাথাটিকে মায়ের কাঁধে রেখে বলেছিলাম, -তোমার হাতে ফাল্গুনি আচারের গন্ধ কেন? ফাল্গুন মাসে আচারের তেলের গন্ধ এমনই হয়।

মা অনায়াসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, – পুঁটি মাছ ভাজা।

হাঁটছিলাম আর আমার দুই পাশ দিয়ে কল্পনায় সরে সরে যাচ্ছিল আমার সংগ্রহে থাকা বাবার লেখার পাণ্ডুলিপি। কখনো পাণ্ডুলিপির হলুদ পাতাগুলি বাতাসে উড়ছিল। আবার গাছের শুকনো পাতার মতন মাটিতে পড়ে গড়াচ্ছিল। আমি চলতে চলতে পকেটে হাত দিয়ে ঘরের চাবিটিকে যথাসাধ্য কচলে নিলাম। চাবির গোছা ঠিকই তো আছে। তাহলে কেন ভাবছি বাবার লেখার পাণ্ডুলিপি গ্রামের মাঠের এইখানে বাতাসে উড়ছে?

আমি বাবার সব লেখাই পড়েছি। বাবা অধিকাংশ সময়ই যা লিখেছেন তাতে তিনি ব্যক্ত করেছেন ফিউডাল ব্যবস্থার মায়াবী বিষণ্ণতার কথা। আমি তাঁর লেখার ভাষার মধ্যে নিসর্গ খুঁজে পেতাম। যেমন বাবা অনায়াসে লিখে দিতেন প্রার্থনা যখন জাদু মঞ্চে… তখন শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হয়… বাবুইয়ের ঠোঁটে যখন জোনাকি… মাঠের আলের ফালি জলে পারসে ধানদুধ ঠুকরোয়…। আরও নানান বিন্যাস, মায়ের উদ্দেশে বাবা অনেকবার একই কথা লিখেছেন রুমাল যদি কাঠপোলে ভুল করে ফেলে দিয়ে যাও…পিছন ফিরে একবারও দেখো না তুমি… এমন সব নানান কথা লিখতেন কখনো কখনো আমার কথাগুলিকে প্রাচীন উপকথার মতন মনে হত। বাবা কেন লিখতেন জানি না। লিখে যেতেন সবসময় কিন্তু কোনো লেখাই পরিণতি লাভ করত না। সেই অর্থে বাবার কোনো লেখাই গল্প হয়ে উঠত না। কবিতা তো নয়ই। এমন কি নাটকের মতন সংলাপ মোটেই লিখতে পারতেন না। বাবা কি যে লিখতেন আমি তা কখনই বুঝতে পারতাম না। বাবার লেখা পড়ে আমার কেন জানি মনে হত উনি বিশেষ কারণে একজন অনুশোচিত মানুষ ছিলেন। কথা বলতেন না । আমার সঙ্গে আমার মায়েরই বেশি কথা হত। মা খুব কথা বলতেন। আমিও মায়ের সঙ্গে খুব কথা বলার চেষ্টা করতাম। মা অনেক কিছু বলতেন যেমন ফাল্গুন চৈত্রর ধুলো মাঠ সংক্রান্ত কথা, ফরাশগঞ্জে গরুর হাটের কথা, বাখড়গঞ্জে পাখির মেলার কথা, গাছের ডালের শিকড় ছুঁয়ে ফেলার কথা, ফালি নদীর ক্রমশ শুকিয়ে ওঠার কথা আরও নানান কথা যা মোটেই তাঁর নিজের জীবনের কথা নয়। একেবারেই অন্যরকম কথা। মা কোনো কথাই গুছিয়ে তুলে রাখতে পারতেন না। আসলে গুছিয়ে তোলা জীবন তাকে কোনো দিনই তেমন ভাবে আকর্ষণ করে নি। বেশ এলোমেলো করে রাখা জীবন তাকে বিমোহিত করত । মা কখনই বিশ্বাস করতেন না – যাওয়া আছে বলেই ফেরা আছে। বিশ্বাস করতেন যাওয়া মানে যাওয়াই। যাওয়া যে সময়কে ছুঁয়ে যায় পরবর্তীতে ফিরে আসে না আর। ফিরে আসার বদলে মা ব্যবহার করতেন শুধুমাত্র আসাকেই। অথবা এল। ফিরে এল একেবারেই নয়।

আমার দাদামশাই তিনি খুব রক্ষণশীল ছিলেন। আসলে তিনি একটি গ্রন্থাগার নিজের মতন করে বহু বছর ধরে লালন করেছিলেন। সেই গ্রন্থাগারটি কি অবস্থায় আছে আমার মায়ের কাছে চিন্তার বিষয় ছিল বৈকি? বাবার মৃত্যুর পড়ে মা এই কাজটিকে খুব জরুরি মনে করে আমাকে নিয়ে বোধহয় সেই দিকেই যাচ্ছিলেন । আমি নিশ্চিত নয় বলেই মা কে আর জিজ্ঞাসা করি নি। আমার বাবার গ্রন্থাগারটি সম্পর্কে কোনো রকম কৌতুহল বা উৎসাহ ছিল না। বাবা বেঁচে থাকাকালীন মা গ্রন্থাগারটি বিষয়ে কোনো রকম প্রসঙ্গই তুলতেন না। কারন গ্রন্থাগারটি সম্পর্কে মা, বাবার দুঃস্থ মনোভাবটি জানতেন। মা মনে মনে খুব দুঃখ পেলেও বাবাকে সম্পূর্ণ ভুল বুঝেছিলেন। মা বলতেন ভুলটা আমিই করেছিলাম। তোর বাবার আমার প্রতি ভালোবাসাটি বুঝতে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হল। ভুলটা আমাকে দিয়ে করিয়েছিলেন তোর দাদামশাই। আমার বাবা নিশিথরঞ্জন। আমাকে মা কথাটি ঠিক এইভাবেই বলেছিলেন,-

তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় দুইবার ঠেকে তারপরে পাস করলাম। পাস করার পড়ে বেশ মনে আছে গ্রামবাসীরা সবাই আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে এল। বাড়িতে সেই দিন অন্যরকম পরিবেশ। চারদিকে ইলিশ মাছ ভাজার গন্ধ মাতিয়ে তুলেছে আর গাছের ডালে শাকচুন্নি পেত্নীর জিভের লোল টপ টপ করে মাটিতে পড়ছে। বেশ মনে আছে আমার জাদুকর দাদা মানে তোর বড় মামা যিনি তোর জন্মের অনেক আগেই মারা গেছেন। তিনি গ্রামবাসীদের আনন্দে জাদু দেখাতে থাকলেন। আমাদের গ্রামে তখন মেয়েদের মধ্যে আমিই প্রথম ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় পাস করলাম। সারাদিন ইলিশ মাছ ভাজার গন্ধ এবং দাদার হাতের জাদু এবং আমার বাবার বই সংগ্রহ এবং গ্রন্থাগার বিষয়ে কথাবার্তা এক অন্য মাত্রা নিল। তোর বাবা তখন বুক সটান করা এক দাপুটে যুবক। একটি সাদা ঘোড়ায় চেপে আমদের বাড়িতে এল। আমাকে শুভেচ্ছা জানালো তারপরে কাঁচের গ্লাসে ঢক ঢক করে জল গলা দিয়ে নামিয়ে ঘোড়ার পিঠে আবার চেপে বসল। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেল,- তুমি ভারি সুন্দর রবীন্দ্রনাথের গান গাও। তোমার গান আমার কাছে প্রার্থনা সঙ্গীতের মতন লাগে। তোমার পড়াশুনোর চাইতে বেশি জরুরি গান গাওয়া যেটি তুমি অনেক ভালো পারো। আমি তো অবাক হয়ে গেলাম । গ্রামের সবাই যখন আমার লেখাপড়া নিয়ে অবিরাম প্রশংসার কথা বলছেন তখন তোর বাবা আমাকে গানের কথা বলছে।

গান আমি গাইতাম। কিন্তু গাইতে পারতাম কি না জানি না। অন্যরা বলতেন আমি না কি ভালো গান গাই ? আমার মা বাবা ও দাদা আমার গানের বিষয়ে কোনোদিনই কিছুই বলেন নি। একদিন বিকেলে আমাদের বাড়ির পিছনের দিকে চাঁদখোলা মাঠের গভীরে অনেকটা দূরে এগিয়ে গেলাম। ওখান থেকেই একটি টুকরো অরণ্যের শুরু। এমন কিছু গভীর নয়। সামান্য কিছু বন্য পশু যেমন শিয়াল খাটাশ আর বিষাক্ত সাপ থাকত। নির্জনতা পেলে সাপগুলি ধান মাঠে চলে আসত। বাবা প্রায়ই দাদা এবং আমাকে সতর্ক করে দিতেন । ভুল করেও আমরা যেন ওখানে না যাই। আমি আমার মধ্যে ডুব দিয়ে গান গাইছি। আর কালো মেঘ দেখে চুল খুলে দিলাম। গান গাইছি আর মনের মধ্যে সে কি প্রশান্তি। সেই দিনটার কথা আমি কিছুতেই ভুলতে পারি নি। আমি গান গাইতে গাইতে বিভোর হয়ে গেছিলাম। বুঝতেই পারি নি কখন একটি সাদা দুধের মতন ঘোড়া আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

অশ্বারোহী তোর বাবা, আমি চমকে উঠলাম তারপরে গাইল আমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে … এই করেছ ভালো নিঠুর হে … আমি অবাক হয়ে গেলাম তোর বাবার কণ্ঠস্বর শুনে। সেদিনকার মতন সে কি চমৎকার সময়। সেই দিনটির কথা ভাবলেই আমার আজও শরীর ছুঁয়ে যায় কালো মেঘ। তারপরে আর কোনোদিনই শুনি নি তোর বাবার তেমন কণ্ঠস্বর। গান থেমে যাওয়ার পরে আমরা দুজনেই আহ্লাদের হাসি হাসলাম। কি অবলীলায় তোর বাবা আমাকে বলে দিল,- আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। আমি সেই সময় কিছু বললাম না । তবে না করলাম না। এরপরে বেশ কয়েকদিন সাদা ঘোড়াটায় চেপে এলো এবং একই কথা বলতে থাকল । আমি একদিন বিরক্ত হয়ে বললাম, -আমার বিয়ের বিষয়ে দাদা এবং বাবা চূড়ান্ত মতামত দেবেন।

একদিন দুপুরে বাবা আফ্রিকা মহাদেশের গল্প পড়ছিলেন আর তরমুজ খাচ্ছিলেন। দাদা হাত নেড়ে নেড়ে হাত জাদুর অভ্যাস করছিল। তোর বাবা সেই সাদা ঘোড়াটি নিয়ে দুরন্ত বেগে ছুটতে ছুটতে আমাদের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,-
হ্যাঁ মহাশয় আমিই ঘোড়ার চাকর প্রভু বন্ধু যাই বলুন তাই। আমার কোনো অস্ত্বিত্ব নেই। আমি চৈত্রের দুপুরের বাতাসের মতন বিভ্রম। আমার গতি আছে আবার গতি নেই। আমার কোনো অতীত নেই। ভবিষ্যৎ নেই। আমি এখন আছি। আমার ছায়া শুধু আমার সাথে আছে। আমাকে আপনি অবলীলায় এক মুঠো বিস্বাদ খেজুর বলতে পারেন। আমার একটি প্রস্তাব আছে?

বাবা হাসতে হাসতে বলল, – তোমার গ্রন্থের লেখার অংশ তুমি যতই আমাকে শোনাও আমি কোনো লেখাই অথবা তোমার একটি বইও আমার গ্রন্থাগারে রাখব না। কারন তুমি তোমার দাসত্ব দিয়ে তোমার মধ্যে প্রবাহিত পরাধীন চেতনা দিয়ে লেখাকে নির্মাণ করেছো। আমি আমার গ্রন্থাগারে পরাধীন জাতির বই সংগ্রহে রাখি না।

তোর বাবা বলল ,- আমি আমার ঘৃণার কথা লিখেছি। পরাধীনতার যন্ত্রণা আপনি বুঝবেন না। কারন আপনাদের হৃদয় জুড়ে ছড়িয়ে আছে ইউরোপ আর ইউরোপের দম্ভ এবং পাশ্চাত্য বিভ্রম আপনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আপনি আমার কোনো গ্রন্থ নাই বা রাখলেন তাতে ইতিহাসে সামান্যতম দাগ পড়বে না। কিন্তু দয়া করে আপনি আপনার দম্ভ দিয়ে গ্রন্থাগার সাজাবেন না?

বুঝতে পারছিলাম একটা ভীষণ কিছু ঘটতে চলেছে। কিন্তু না। বাবাকে এই প্রথম দেখলাম কি চমৎকার নম্র হয়ে গেল। ঠোঁটের ফালিতে সামান্য হাসি এনে এক ফালি তরমুজ এগিয়ে দিয়ে বলল, –

এই নাও। বালি মাটি যেখানে যত গরম হবে তরমুজ ততই মিষ্টি হবে। জানি তোমার মনের কষ্টটা। আমি কি জানি না? ভেবেছ? স্যামসন দারোগার সেপাই ভুষো কালির মাঠে তোমার বাবাকে গুলি করে হত্যা করল। আহা! আমার চোখে এখনও লেগে আছে সেই হত্যাকাণ্ড। প্রতিবাদের জন্য তোমার বাবার আত্মবলিদান আমাকে আজও মুগ্ধ করে। তুমি কি আমার কাছে কিছু বলতে এসেছ? না এমনিই দেখা করতে এসেছ?

আমার তো বুকের ভিতর দিয়ে যেন ষ্টীম ইঞ্জিন গড়িয়ে যাচ্ছিল। এবার তোর বাবা খবরদার যেন সেই কথাটি না বলে? কয়েকদিন বিকেলে ঘোড়া থেকে নেমে যা আমাকে ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম। আমাদের বাড়িতে দুইটি ছোটো মাটির বারান্দা ছিল। একটি ছিল পুরুষদের বসার জন্য, আরেকটি ছিল মেয়েদের বসার জন্য। মেয়েদের বসার জন্য বারান্দায় বসতাম আমি,মা ও ননী পিসি। ননী পিসি বাবার একমাত্র বোন ছিল। তোর জন্মানোর এক বছর পরেই মারা যায়। বিয়ে হয়েছিল। বরের বাড়ি থেকে একবছরের মধ্যেই সেই যে ফেরত এসেছিল আর শ্বশুর বাড়িতে যায় নি। ননী পিসি তার খেয়ালি মনে আমাদের বলত,- আমার নাম ননী নয়। তোমাদের সংসারে শুধু কেন? তোমাদের আপন ঘরের মাদুর জানে আমার শরীরের কোনো গন্ধের চিহ্ন মাত্র নেই। আমি তোমাদের পরিবারে জন্মেছিলাম এটি তোমাদের বিভ্রম। আমি তো শুধুমাত্র একটি চিহ্ন। আমরা সবাই তাই। বন্যপশু শুধু চেনে তাদের মতন আরও একটি পশু চিহ্নকে। আমরা আমাদের নিয়ে বড় বেশি আদিখ্যেতা করি। আমাদের নামের মোহোর পিছনে ছুটে বেড়াই। অথচ কখনই বলি না উপস্থিতির কথা, ভাবি না মানুষের অস্ত্বিত্বের কথা। নামের প্রতি যত আমাদের মায়া ও মমতা। অস্ত্বিত্বের প্রতি আমাদের কোনো টান নেই। অথচ আমাদের অস্ত্বিত্বই আমাদের অতীত ও বর্তমানকে বহন করে।

আমরা ননী পিসির কথার অর্থ বুঝতে পারতাম না। বাবা কিছুটা বুঝতে পারত বাকিটা বুঝতে পারত না। বাবা আমাকে বলত, তোর পিসির অস্ত্বিত্ব চিন্তার মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। যে কথাগুলি ননী বলে সেই কথাগুলি আমাদের এই সমাজ অনুমোদন করে না। আসলে ওর কথার সাথে অন্য কথার বন্ধন নেই। ওকে কিছুতেই বোঝাতে পারি নি অস্ত্বিত্ব নামচিহ্ন বংশ পরিচিতি পারিবারিক সম্পর্ক এ সমস্ত কিছু নিয়েই তো মানুষ? মানুষ কি শুধু একটি চিহ্ন?

যাক গে সে কথা। ফিরে আসি তোর বাবার গোগ্রাসে তরমুজ খাওয়ার কথায়। সে কি দৃশ্য? দুই গাল দিয়ে তরমুজের লাল রস গড়িয়ে পড়ছিল। থুতনিতে তরমুজের রস এসে টুপ টুপ মাটিতে। আমি তো ভাবছিলাম লোকটা তরমুজ খাওয়াতেই ব্যস্ত থাকুক। এই ভাবেই যাক। তরমুজের ঋতুপ্রহর চলতে থাকুক। আমার বাবা তোর বাবার তরমুজ খাওয়া দেখে বেশ অনাবিল আনন্দ পেল। আবার আরও একটা ফালি একটু চৌকোণ করে কেটে তোর বাবার হাতে তুলে দিয়ে বলল,-

বেশ তো আমি কয়েকটা বড় আকারের দিয়ে দিচ্ছি। বড় থলিয়াতে ভরে দিচ্ছি। ঘোড়ার পিঠে আমিই না হয় বেঁধে দেব। কি সুন্দর ঘোড়া তোমার? দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। তোমার ঘোড়া দেখলেই মনে হয় তোমাকে আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধে ফেলি। এত সুন্দর গতি ওর, ঘোড়াটি যখন ছুটে যায় তখন তাকিয়ে দেখি সীমানায় বুঝি তুষার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আমি কোনোদিন তুষার ঝড় দেখিনি। তবে কল্পনায় ভেবেছি খুব সাদা হয় কি?

তোর বাবার হাতে আমি কাঁচের গ্লাস দিয়ে জল ঢেলে দিচ্ছিলাম। তরমুজের রস খুব আঠালো হয়। তোর বাবা হাত মুখ ধুয়ে রুমাল দিয়ে মুছে কোনো কথা না বলে বাবাকে মাথা নত করে অভিবাদন জানিয়ে বলল,-

আমিও আপনার মতন তুষার ঝড় কোনোদিন দেখিনি। কারন আমরা দুজনেই তুষারের দেশে থাকি না। তবে আমি কিন্তু তুষারের সাথে থাকি। আমার ঘোড়া সত্যিই তুষার। আমি কখনো ওকে তুষার বলে ডাকি। কখনো ওকে মরুঝড়ের কথা মনে করে ডাকি আলেকজান্দ্রা। আলেকজান্দ্রার বালি ঝড়।

বাবা বলল,- দেখেছ কখনো?

তোর বাবা বলল,-আমরা আমাদের জীবনে যা কিছু দেখি অধিকাংশ দেখাটাই তো কল্পনায় দেখি। বাস্তবে কম দেখি। তাহলে আপনি কল্পনায় হোক বা বাস্তবেই, আপনি আমার তুষারের সাথে সম্পর্ক গড়বেন? আমি মালিক হিসেবে উপলক্ষ মাত্র।

বাবা উচ্ছসিত হয়ে বলল, -তাহলে তোমার প্রস্তাব কি ?

তোর বাবা সেদিন যে গলায় রবি ঠাকুরের গান গেয়ে আমার কণ্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে ছিলেন ঠিক হ্যাঁ একেবারেই সেই কণ্ঠেই বাবাকে অনেকটা যেন গানের কথার মতন কথায় অবশেষে বলল, -আমি আপনার কন্যাকে বিবাহ করতে চাই।

কোথাও কোনো এক দূরের দেশে জমাট বরফ ভাঙ্গার শব্দ পেলাম যেন। তারপরে বরফের জলে ভেসে থাকা সারস পাখি ডানা মেলে ক্রেঙ্কার তুলে উড়ে গেল। কিছু পালক ওদের পড়ে থাকল ভালবাসার স্মারক হিসেবে। আকাশের বিষণ্ণ সাদা ক্রমাগত খণ্ডিত ছেঁড়া ছেঁড়া নীল হয়ে ভেসে গেল বেহুলার উপাখ্যানের মতন। তখন তো জানতাম না রে, বিশ্বাস কর জানতাম না ভালোবাসা মানুষের জীবনে এক পান্থনিবাসে আশ্রয়ের মতন। ভালোবাসা ওই পাখির শরীরের পালকের মতন। কিছুকাল পাখসাটে থেকে একদিন ঝড়ে যায়। ভালো যদি কাউকে বাসিস খোকা তুই, শুনছিস তো?

হ্যাঁ বলো মা। বলো? শুনছি।

ভালবাসবি মিসরের সেই কথকের মতন। যে গ্রামে গ্রামে বিচরণ করে গ্রামবাসীদের গল্প শুনিয়ে যেত। সেই কথক যে কুইন অব আলেকজান্দ্রিয়াকে ভালবেসেছিল তার নিজের সমস্ত স্বত্বা দিয়ে, নিজের জীবনের সঞ্চিত সমস্ত কথা দিয়ে, কথকের সারা জীবনের সঞ্চয় একটার পর একটা কাহিনি সে উজাড় করে রানিকে উপহার দিয়েছিল। নিবেদন করেছিল তার হৃদয়কে, কথক নীরবে কুইন অব আলেকজান্দ্রিয়াকে তার জীবিত অস্তিত্ব নিবেদন করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছিল রে। কথক নিঃস্ব হয়ে গেল। সে কোনো দিন রানি কে বলে নি ভালোবাসি। রানিকে সে বলেছিল আমি তোকে নিয়ে যাপন করি তোকে আমি ধারণ করেছি। নিল নদের ধারে ধু ধু মরুভূমির আকাশের দিকে তাকিয়ে হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে সে বলেছিল -সোনা আমার যা কিছু ছিল আমি তোকে দিয়ে দিলাম। আমি এখন মরুভূমির বালির মতন নিঃস্ব । আমাকে আর তুই ডাকিস না রে রানি। আমাকে আর ডাকিস না …।

বহু বছর পরে কুইন অব আলেকজান্দ্রিয়া খবর পেয়েছিল কথক এসেছে কায়রো শহর থেকে হেঁটে তার সাথে দেখা করতে কিন্তু রানিমহলের অনুমতি পায়নি বলে সে একটি বাবলা গাছের নিচে বসে প্রতীক্ষা করছে। রানি শুনে বিচলিত হয়ে প্রহরীকে আদেশ করল, -এখনই যাও কথক কে ডেকে নিয়ে এসো। রানি তারপরে তার সজ্জার ঘরে নিজের হাতে আলপনা আঁকতে বসল। অপরূপ মরূদ্যানের গুল্মলতা এঁকে কথকের সামনে যখন রানি এল তখন কথকের শরীর ছুঁয়ে প্রবাহিত নিল নদের আদিম স্রোত। রানি বলল, তুমি খুব ক্লান্ত। কথক দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে তার জীবনের সবচাইতে সুন্দর মরুভূমির সংগৃহীত একটি পাথর উপহার দিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকল আর বলতে থাকল,-ভালোবাসার থেকে শব্দহীন কথা কিছু হয় না। তাই কথা বলে ছেড়ে দিয়েছি। এখন আমি গল্প বলা ছেড়ে দিয়েছি। ভেবে দেখেছি রানি, তোর থেকে সুন্দর নিসর্গ পৃথিবীর কোথাও নেই তাই আর গল্প বলি না। তোর কথা ভাবি আর সারাদিন কায়রো শহরে ভিক্ষে করি। সামান্য ভিক্ষে তে আমার বেশ চলে যায়। রানি কথককে পৃথিবীর একটি সেরা মোহোর উপহার দিয়ে বলল,-এই নাও তোমাকে দেওয়ার মতন দামি বস্তু এই পৃথবী বহন করে না। তবুও রাখো। আমার চিহ্ন হিসেবে। কথক বলল,-এই সামান্য মোহোর দিয়ে আমি কি করব? তুই এই পৃথিবীর খোদার সবচাইতে সুন্দর ও দামি উপহার। আমি তোর সাথে প্রতিদিন যাপন ছেড়ে দিয়ে এই সামান্য মোহোর নিয়ে থাকব? রানি কেঁদে উঠল ফুঁপিয়ে আর কথকের সামনে দুই হাতের মরূদ্যানের আলপনা মেলে দিয়ে বলল, -আমাকে আমার জীবনের সেরা উপহারটি এবারে দাও?

কথক রানির দুই হাতে চুম্বন দিয়ে বলল,- ভালো থাকিস সোনা। ভালো থাকিস। নিল নদের ধারে দুই গজ জমি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি যাই। আমি ভীষণ ক্লান্ত । আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।

মা খুব কাঁদতে থাকলেন । তারপরে বললেন,- খোকা তোর বাবাও কথা বলা ছেড়ে দিয়েছিল বলে সারাদিন লিখত। সাদা ঘোড়াটি একদিন নিঃসঙ্গতায় আক্রান্ত হয়ে বরফ হয়ে গেল। তারপরে তাকে পুঁতে দেওয়া হল একটি বাবালা গাছের নিচে। একদিন দেখলাম গ্রামে এক বেদুইন একটি উট নিয়ে এল। সেই উট বাবলা গাছের কাঁটা চিবিয়ে চিবিয়ে রক্তাক্ত হয়ে গেল। গ্রীবা দিয়ে রক্ত স্রোত টুপ টুপ মাটিতে পড়ছিল।

তাই বলছিলাম খোকা কাউকে যদি কোনোদিন ভালোবাসিস তাহলে সেই কথকের মতন আর তোর বাবার মতন ভালবাসবি। জানিস যারা ভালোবাসে তারা খুব বোকা হয়।

মা কে দেখছিলাম নদীর সেই পারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলেন। বন্ধ দুটি ঠোঁট দিয়ে কি অসহায়ের মতন চাপা উফফ উচ্চারিত হচ্ছিল। মানসিক ভাবে যতটা অস্থির হয়ে উঠেছিলেন ততটাই বাহ্যিক প্রকাশে কঠিন পাষাণের মতন। এতদিন মাকে আদর করে বলতাম, -তুমি তুলোমন। মা রসিকতা করে বলতেন, – পারলে ভিজিয়ে নিস। আমি হেসে বলতাম, – তোমার সুখের চোখের জলে। মা হয়তো ভাবছিলেন, – কথা বলত না ঠিকই কিন্তু মানুষটা ছিল নিজের মতন, খাতায় কলমে। ভাবতাম নীরবতায় মানুষ কত কথা বলে। তোর বাবা এমনই ছিল। নীরবে মানুষ এত কথা বলে তোর বাবাকে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এই সময়ে মায়ের যে কথাগুলি ভাবা উচিৎ মা ঠিক তাই ভাবছেন। আমার বাবাকে নিয়েই ভাবছেন আর ভাবতে ভাবতে কাঠপোল আর নদীর পারটিকে দেখছিলেন। বাবার পুড়ে যাওয়া দেহের সামান্যতম ছাই নদী পারের মাটি সাময়িক চিহ্ন হিসেবে বহন করে চলেছে।

আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম কাঠপোলের দিকে। বেশ কিছুটা যাওয়ার পরে মা পিছন থেকে ডাকলেন,-

খোকা কোথায় যাচ্ছিস?

-কাঠপোলে।

-কেন? আবার অতটা যাবি? দেরি হয়ে যাবে। এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে।

-বাঃ রে? তুমি রুমালটা কাঠপোলে ভুল করে ফেলে এলে যে?

-ও তাই তো? রুমালটা নেই যে ? ঠিকই তো ?

-যাই নিয়ে আসি। তাড়াতাড়ি পা চালিয়েই যাচ্ছি। এই আসছি। তুমি অপেক্ষা করো।

মা কি যেন ভেবে তারপরে বললেন,

– না তুই যাবি না? একদম যাবি না। মনে নেই তোর বাবা কি লিখেছিল?

-আমি অবাক হয়ে বললাম, – কি লিখেছিল?

-মা বললেন,-মনে নেই তোর?

-আমি বললাম, – না তো ? মনে পড়ছে না।

মা, মা আমার কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে থাকলেন, -প্রার্থনা যখন দেবী মঞ্চে… শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হয় …বাবুইয়ের ঠোঁটে যখন জোনাকি … মাঠের ফালি জলে পারসে ধানদুধ ঠুকরোয় … রুমাল যদি ভুল করে কাঠপোলে ফেলে দিয়ে যাও … পিছনে ফিরে একবারও দেখো না তুমি …মা কথাটি শেষ করার পরে আমার বেশ মনে পড়ল, মনে পড়ে গেল হ্যাঁ তাই তো বাবা প্রায়ই বলতেন কথাটি। কিন্তু এই কথাটির অর্থ আমরা আজও বুঝতে পারি নি।

আমি ফিরে এলাম। মায়ের কাছে। দুইজনে পাশাপাশি হাঁটতে থাকলাম। এগিয়ে যেতে থাকলাম দাদা মশাইয়ের গ্রন্থাগারের দিকে। একটি বিভ্রমের দিকে যেখানে আমার বাবার লেখা একটিও গ্রন্থ নেই।

                  

                 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত