| 20 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

সম্ভ্রান্ততন্ত্র

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
 
সুনেত্রা যখন জিন্‌সের ওপর টপ চড়িয়ে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে রোদ চশমায় চোখ ঢেকে, হাই হিল জুতো পরে ক্যাট ওয়াকিংএ  রাস্তা পার হয়, বয়স্ক পুরুষ মানুষও একবার  না তাকিয়ে পারে না। আমাদের মানে এই নবীন  সংঘের সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলেদের কিন্তু সুনেত্রার চালচলন মোটেই পছন্দের নয়। কারণ সুনেত্রাকে ছোট থেকে দেখে আসছি,একটা টেপ ফ্রক পরে  বস্তির নোংরা মেয়েগুলোর সাথে এক্কা দোক্কা খেলত।  ওর বাবা বীরেন হালদারের বাজারে গুড়ো চায়ের দোকান ছিল,খদ্দেরহীন অবস্থায় শুকনো  মুখে বসে থাকতে  দেখেছি অনেক দিন । এর পর যা হয় দোকানটা উঠে গেল, বীরেনবাবু এখন বাজারের সবচেয়ে বড় চায়ের দোকানের কর্মচারী। যেহেতু একই পাড়ার বাসিন্দা বলে আগে বীরেন কাকা বলতাম,  উনি তুমি বলতেন, এখন চা কিনতে গেলে উনিও আপনি বলেন। ঘসা কাঁচের আড়ালে কর্মচারীর থেকে  তফাতে  বসে থাকা দোকানের মালিক যদি অসন্তুষ্ট হয় খদ্দেরকে তুমি সম্বোধনে।আমি আপত্তি করে সংশোধন করে দেবার চেষ্টাও করিনা। কারণ  বীরেনবাবু কখনোই আমাদের সগ্রোত্রীয় নন। আমিও এখন যথেষ্ট নায়েক হয়েছি। এম এ পাস করেছি, সুতরাং আপনি না বললেই বরং আপত্তির কারণ ছিল।  সুনেত্রার মা দু’তিন বাড়ীতে সকালের দিকে  রান্নার কাজ করে।সন্ধ্যের দিকে নিকটেই একটা দর্জির দোকানে বিভিন্ন সাইজের পিচবোর্ডের কাট আউট ফেলে ব্লাউজ পিস কাটে। অতএব  সেই মেয়ে যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন তাকে নিয়ে কোন স্বপ্ন দেখা চলে না, বিশেষ করে আমাদের মত সম্ভ্রান্ত ঘরের  ছেলেদের। তবে সুনেত্রা যে কি করে সেটা নিয়ে যে আমাদের কৌতুহল নেই তা নয়,ক্লাবে  ব্রিজের আসর সুরু হবার আগে সুনেত্রাকে নিয়ে দু’চার কথা রোজই একবার করে হয়। বিশেষতঃ মিহির সুনেত্রার কাম কাজের রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেয়ে নিয়ে স্বকল্পিত ধারণার  ওপর অনেক বেশী আস্থাশীল প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও। সুনেত্রার নিত্যনতুন আধুনিক সাজ পোষাকের ধরন দেখে  আমাদের  যে চোখ টাটাতো না তা নয়। জহরের পেশ করা সুনেত্রাদের পরিবারের আন্দাজী আর্থিক সালতামামি দেখে সেই  সন্দেহ হওয়া খুব স্বাভাবিক। তাই  মিহির আর সেদিন  চুপ করে থাকতে পারেনি। 
“আরে কিছু বুঝি না নিত্যনতুন জামাকাপড়ের এত বাহার এত স্টাইল কোথা থেকে হয়”। মিহির যেটা ইঙ্গিত করতে চায় সেটা আমরা সকলেই বুঝতে পারি, তবে রুচিবোধের কারণে  সেটা নিয়ে আলোচনার গভীরে যাই না। ইতিমধ্যে মোহন খবর নিয়ে আসে সুনেত্রা আয়া সেন্টারে নাম লিখিয়েছে। সেদিনও মিহিরের আয়াদের কার্যকলাপ  সম্পর্কিত  আলোচনা বেশ দীর্ঘস্থায়ী হল, সকলেই আমরা এতে অংশ নিলাম যার মুখ্য অংশ জুড়ে ছিল পক্ষাঘাতাক্রান্ত বৃদ্ধরাও কিভাবে তাদের অবদমিত কাম আয়াদের ওপর নিরসন করে থাকে।তাছাড়া হাসপাতালে রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়া পাবার পর কিংবা মেটারনিটি ওয়ার্ডে  নজাতককে নিয়ে বাড়ী যাবার সময় রোগীর আত্মীয় স্বজন খুশী মনে যেটা আয়াদের হাতে তুলে দেন, সেটা ন্যায্য প্রাপ্তি মনে করে তাদের ওপর চাপ দিয়ে অতিরিক্ত টাকা কিভাবে রোজগার করতে হয় সেই শিক্ষায় তারা খুব দ্রুত শিক্ষিত হয়ে ওঠে।মোহন এর সঙ্গে আরো যোগ করল, সম্প্রতি সুনেত্রা ফিজিও থেরাপির শর্ট কোর্সের ট্রেনিং নিয়ে সেই অভিজ্ঞতাও নাকি কাজে লাগাচ্ছে। তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেল  এর কদিন বাদেই এমএলএ নরেশ চাকলাদারের হোন্ডাসিটি রাত দশটার পর সুনেত্রাকে ওদের বাড়ীতে নামিয়ে দিয়ে গেল।  অনুসন্ধানে জানা গেল এমএলএ সাহেবের বৃদ্ধা মা সেরিব্র্যাল এ্যাটাকের পর  একেবারে শয্যাগত, তার দেখভালের দায়িত্ব এখন সুনেত্রার। এরপর সুনেত্রার চরিত্র নিয়ে আর কোন সন্দেহ থাকল না।  নরেশ চাকলাদারের ছেলে চঞ্চলকে প্রায়শঃই দেখা যেত মোটরবাইকের পিছনে নিত্য নতুন মেয়েদের বসিয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে।শুধু তাই নয় শহরে এবং শহরের বাইরে  বিভিন্ন রিসর্টে তার অবাধ যাওয়া আসা।   নতুন মুখ হিসাবে সুনেত্রা যে সেখানে যুক্ত হবে সে বিষয়ে আমাদের আর কোন সন্দেহ থাকল না। নন্দ আমাদের এই আলোচনায় সামান্য আপত্তি তুলেছিল। “ দেখ একদিনই রাত্রে সুনেত্রাকে গাড়ী করে নামিয়ে দিয়ে গেছে, চঞ্চলের সঙ্গে এক মোটর সাইকেলে ঘুরে  বেড়াতে  কিন্তু কোন দিন দেখিনি, তাই রিসর্টে যাওয়ার কোন প্রমাণও আমরা পাইনি। সুতরাং এই আলোচনা এখন না করাই  ভালো যতই হোক সে তো আমাদের পাড়ার মেয়ে, ছোট থেকে দেখে আসছি”। আমি নন্দের দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে ছিলাম। ওর কি সুনেত্রার প্রতি কোন দুর্বলতা দেখা দিয়েছে নাকি। ও কি ভুলে গেছে আমরা সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলে। আমাকে কিছু বলতে হল না। মিহিরের দেওয়া প্রত্যুত্তর যুক্তির দিক দিয়ে এতই অকাট্য যে তারপরে আর কোন কথা চলে না। 
“দেখ নন্দ জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধের নতুন করে প্রমাণ হয়না, ধরে নিতে হয় ওটা সঠিক। ওটার ওপর ভিত্তি করেই অন্যান্য থিয়োরেম সল্‌ভ করতে হয়। এখানেও চঞ্চল যে চরিত্রের তাতে ধরেই নিতে হবে আমরা যেটা অনুমান করছি সেটা স্বতঃসিদ্ধের মত অভ্রান্ত, এর সত্যতা নিয়ে কোন তর্ক চলতে পারে না”।    
রবিবার সকালে আমাদের শহরে অভিজাত মিষ্টির দোকান মহাপ্রভু মিষ্টান্ন ভান্ডারে গিয়ে দেখি,  বীরেনবাবু প্রচুর মিষ্টি  দু’ হাঁড়ি দই এর অর্ডার দিচ্ছেন, বেলা বারোটার মধ্যে  যেন পৌঁছে  দেওয়া হয়। সঙ্গে রূপালী ক্যাটারারের অমিয়। আজকে হঠাৎই  আমাকে দেখে বীরেনবাবু  হেসে কথা বলতে শুরু করলেন-“ আরে বিজন শোননি বোধহয়, সুনেত্রার বিয়ের ঠিক হয়ে গেল,সামনের অঘ্রাণে বিয়ে।  আজ পাকাদেখা, হঠাৎ করেই সব ঠিক হয়ে গেল, ধনী পরিবার, ছেলেটিও ভালই চাকরী বাকরী করে, সুনেত্রা নিজেই পছন্দ করেছে, আমাদের আর  অমত করার কি আছে বলো।যতই হোক সুপাত্র।   এসো না বাবা আজকের দুপুরে একটু মিষ্টি মুখ করে যেও, তোমরা পাড়ার শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত  ছেলে, তোমরা উপস্থিত থাকলে পাত্র পক্ষের কাছে আমাদের মান বাড়বে ।  সকলকে তো ইচ্ছে থাকলেও বলতে পারছি না, জানোই তো আমার অবস্থা”।অনেক দিন পরে বীরেনবাবু আমাকে আবার তুমি বললেন।আমি আর সেদিন আপত্তি করলাম না। সেটা অসৌজন্য হত বলেই মনে হয়েছিল। আমি যেরকম সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলে, সুনেত্রার বাড়ীতে পাত পাড়তে যাব তা তো হতে পারে না। তবে কৌতুহল দূর করার জন্যে আড়াল থেকে সুনেত্রার বাড়ীর ওপর নজর রাখছিলাম, দেখলাম বীরেনবাবুর   কথাগুলো  মিথ্যে নয়, দুপুরবেলাই  তিনটে প্রাইভেট কার তার মধ্যে একটা বি এম ডাবলু ছিল, মোট  মহিলা পুরুষ মিলিয়ে প্রায় জনা দশেক’কে নামতে দেখা গেল সুনেত্রার বাড়ীতে।  তাদের পোষাক আশাক দেখে আন্দাজ করাই যায় , আমাদের মত সম্ভ্রান্ত ঘরেরই হবে।   
সেদিন ক্লাবে আর ব্রিজ খেলা হল না,নেপু বেঙ্গল খেলতে যাবে বলে প্র্যাকটিসের প্রয়োজন আছে বলে  জোর করছিল।  ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে  সারাক্ষণ সুনেত্রার বিয়ে নিয়েই আলোচনা চলতে থাকল,মিহির যেন আর সহ্য করতে পারছে না,- “ প্রেমের বিয়ে না হয় বুঝলাম কিন্তু ছেলেটা কি জানে , যে ওর ভাবী স্ত্রীকে   রুগীদের বেডপ্যান পরিষ্কার করতে হয়, তাছাড়া যারা ফিজিও থেরাপী করে তাদের শরীরের অনেক অস্থানে কুস্থানে হাত দিতে হয়” । রমেন আমাদের বয়সী হলে হবে কি একটু বিজ্ঞ।  মিহিরের কথার সুত্র ধরেই বলল,  “ আয়াদের কাজটা তো নার্সের কাজ নয়, তার জন্যে ট্রেনিং লাগে, পরীক্ষায় পাস করতে হয়, হাসপাতালে আয়াদের ভূমিকা অনেকটা  জমাদারনীর মতই,মিহির ঠিকই বলেছে  ব্যাপারটা একবার ভাল করে চিন্তা কর দেখ্‌ দেখি যে মেয়ে কিনা  বিয়ের আগে রূগীদের গু মুত কাড়ত,  সে কিনা ওইরকম বড়লোক বাড়ীতে বউ হয়ে যাবে, এটা কি মেনে নেওয়া যায়। মোহন বলল,” চঞ্চলের ব্যাপারটাই বা তোমরা চেপে যাচ্ছ কেন, খুব সঙ্গত কারণেই তার চেসষ্টি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে”। মোহনের এই কথার পর আমরা সকলেই  অনেকক্ষণ চুপ করে বসে  থাকলাম,শেষে আমিই  বললাম “ দেখ আমাদের কিন্তু একটা কথা জানতে হবে, সুনেত্রা বর্তমানে যে  কাজ করে সেই বিষয়ে  পাত্রপক্ষরা কতটা  জানে? ”। কথার উত্তরে  মিহির বলল “ কোন কাজের কথা তুই বলছিস” 
“সব রকম কাজের কথাই বলছি।”  
“ শোন আমি নিশ্চিত সুনেত্রা তার আলগা চটক দেখিয়ে ছেলেটাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেছে, পাত্রপক্ষ এত কিছু   জানলে  কখনোই এতদূর এগোত না। যতই হোক ওরা তো সুনেত্রাদের ক্লাস বিলং করে না। বিজন তাদের নিজের চোখে দেখেছে। ওর কথা শুনে মনে হয়েছে ওরা আমাদের মতই সম্ভ্রান্ত বংশ। সেখানে বিয়ে হবার পর সুনেত্রা আমদের সমগোত্রীয় হয়ে যাবে এটা কি মেনে নেওয়া যায়”। মিহিরের কথার যথার্থ অনুভব করে আমারা সকলে এক গভীর আলোচনায় মগ্ন হলাম। শেষ পর্যন্ত রমেনই বলল, “ ঠিক আছে, এত টেনশন নিচ্ছ কেন সকলে।   আজ শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তি তার মানে অঘ্রাণের  আগে বিয়ে হচ্ছে না। এর মধ্যে খোঁজ খবর দিয়ে ছেলেদের বাড়ীতে সব কিছু জানিয়ে দিতে হবে, তাতে যদি বিয়ে ভেঙ্গে যায় যায় যাবে,আমাদের কিছু করার নেই তাতে”।     
আমরা সকলেই রমেনের  কথা সমর্থন করলাম, দীর্ঘ আলোচনায় যে এমন একটি সমাধান সুত্র বেরিয়ে আসবে তা ভাবতে পারিনি।  তিন মাস সময় যখন  আছে, কায়দা করে পাত্রপক্ষের ঠিকানাটা জানতে হবে।  সুনেত্রা সম্পর্কে কোন কিছুই  আমাদের অজানা নয়।  এর মধ্যে সব কিছু জানিয়ে দিয়ে  একটা  চিঠি  নিশ্চয় লিখে ফেলতে পারব। কি বলেন আপনারা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত