| 21 এপ্রিল 2024
Categories
পাঠ প্রতিক্রিয়া সাহিত্য

সামনে কুয়াশা

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট
‘সম্পর্ক মাঝে মাঝে ব্যাধবেশে ঘোরে।…’ 
কবি রামকিশোর ভট্টাচার্যের কবিতার এই পংক্তিটি তপশ্রী পালের নভেলা ‘ত্রিবেণীসঙ্গম’ ও ‘কিন্নর কৈলাস’ পড়ার শেষে বার বার অনুরণিত হচ্ছিল। ঠিক যেমন ‘ছিনে জোঁক’ নামক বড়গল্পটি পড়ে অনুরণিত হল, কবি রামকিশোর ভট্টাচার্যের কবিতার আরো একটি পংক্তি ‘ হাঁটু মুড়ে বসে থাকে শৈশব আর তাকে বোঝানো হয়/ রাত্রিকালের মানে।’
হবে নাই বা কেন! কলকাতা বইমেলা, ২০২০ তে, দ্য ক্যাফে টেবল থেকে প্রকাশিত তপশ্রী পালের তিনটি নভেলা, চারটি বড়গল্প, ও তিনটি অণুগল্পের সংকলন ‘সামনে কুয়াশা’ র পরতে পরতে শিহরণ।  প্রতিটা গল্পে, নভেলায় লুকিয়ে আছে এক একটি রহস্য। অবশ্য এটাও ঠিক লেখিকা গল্পের শেষে পাঠকদের সমস্ত রহস্যের কুয়াশা সরিয়ে পৌঁছে দেন রহস্য উদঘাটনের দোরগড়ায়। ফলে পাঠকরা উপভোগ করে থ্রিলার গল্পের গন্ধ।
তপশ্রী পাল তাঁর গল্প ও নভেলাগুলোকে দাম্পত্য জীবনের সন্দেহ, বহুজাতিক সংস্থার হাতবদল, মহাকাশ গবেষণায় স্যাবোটেজ, এ সমস্ত বিষয় দিয়ে সাজিয়ে তুলে দিয়েছেন পাঠকের হাতে। অস্বচ্ছ গভীর কুয়াশা পেরিয়ে গল্পগুলি খুন,  ধর্ষণ,  অপহরণ, আতঙ্কবাদ, এমনকি পরাবাস্তবতা জাতীয় বিষয়কে আশ্রয় করে নিজের গতিতে এগিয়ে চলে সমাধানের দিকে।
‘দুপুরে স্নান সেরে পুজোয় বসেছিলেন নমিতা।’ – (শিকার, অণুগল্প)
‘কনফারেন্স রুম থেকে বেরোল শ্রীতমা।’ –
(রাতবিরেত, অণুগল্প)
‘সকালে জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিল রিমা।’
– ( ত্রিবেণীসঙ্গম, নভেলা)
নমিতা, শ্রীতমা, রিমা, এরা কারা? এদের জানতে হলে পড়তে হবে তপশ্রী পালের লেখা রহস্য রোমাঞ্চে সমৃদ্ধ  গল্পগুলো। 
‘ডলারের গায়ে রক্ত’, ‘তিন নম্বর লিফট’ ও ‘ত্রিবেণী সঙ্গম’ গল্পগুলি গোয়েন্দা গল্পের সবকটি বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে লেখা হয়েছে।
‘শিকার’ ও ‘রাতবিরেত’ গল্পদুটিতে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। ‘মলিকিউল’ গল্পে রকেট উৎক্ষেপণকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র দেখানো হয়েছে। ‘প্রাণের প্রদীপ’,  ‘কিন্নর কৈলাস’ ও ‘ছিনে জোঁক’ গল্পে ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে ঘটনা রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে। 
গল্পগুলিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রথমেই ক্রাইসিস দেখতে পাওয়া যায় অর্থাৎ ঘটনা তুঙ্গে উঠেছে প্রথমেই। এরপর লেখিকা ধীরে ধীরে কাহিনীকে রসসিদ্ধ পরিণতি দেবার চেষ্টা করেছেন। ‘ ত্রিবেণীসঙ্গম’ নভেলাটি ১৮ টি পর্বে বিভক্ত। যার চতুর্থ পর্বেই লেখিকা বৈজয়ন্ত খুনের ঘটনা বলেন। এবং বাকি ১৪ টি পর্ব ধরে ধীরে ধীরে সেই খুনের কিনারা করেন। 
‘তিন নম্বর লিফট’ গল্পে লেখিকা প্রথমেই শিশু মৃত্যু ও সিরিয়াল ব্লাস্টের খবর জানিয়ে দেন ডিটেক্টিভ অনিকেত মল্লিককে। পরে ধীরে ধীরে দুটি ঘটনাকে একই সুতোয় বাঁধেন।
যদিও তাঁর গল্পের ঘনঘটা মানুষের ঝলমলে জীবনকে নিমেষেই ঢেকে দিতে পারে কুয়াশার চাদরে। তবে কাহিনী প্রধান গল্প ও নভেলাগুলো বিভিন্ন রূপে ও আকারে রহস্যের চাদর বিছালেও তিনি ধীরে ধীরে গল্পের শেষে সেই চাদর ভেদ করে পাঠককে নিয়ে গেছেন সমাধানের দোরগড়ায়। 
‘ত্রিবেণী সঙ্গম’ গল্পের শেষে লেখক জানান, “প্রতীক মারা গেছে।” এই গল্পে প্রতীক, বৈজয়ন্ত নামে চরিত্রটির খুনের প্ল্যানার। 
‘কিন্নর কৈলাস’ গল্পের শেষে লেখক রেকর্ডেড ম্যাসেজে খুনী অর্জুন ও ভিক্টিম আবীবের গলা শোনান। যা খুনীকে স্পষ্ট করে চিনিয়ে দেয়। 
তবে ‘ডলারের গায়ে রক্ত’ তে মুম্বই পুলিশ অপহৃত মানসীকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে পায় না। এমনকি অপরাধী মণিকুন্তলাও ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। 
‘তিন নম্বর লিফট’ গল্পে লেখিকা ‘কেসটা পাকিস্তানি জঙ্গী গোষ্ঠীর’ বলে সমাধানের জন্য সরকারর দিকে ঠেলে দেন। ‘প্রাণের প্রদীপ’ গল্পে স্ত্রী মন্দিরার ধর্ষণ ও খুন আর্মি গোষ্ঠীর এক সিনিয়র অফিসার করেছেন তা জানতে পেরেও উৎসব আর্মির ডিউটিতে যোগ দিয়ে দেশের জন্য একজন সৈনিকের নেওয়া শপথ সবার আগে এই কথার সত্যতা বজায় রাখে।
বইটা পড়া শেষ করে অনেক চরিত্রের একাকীত্ব, অনেক মৃত্যুর জন্য কষ্ট, অনেক নির্জনতা কুয়াশা হয়ে ঢেকে দিয়েছিল মনকে। প্রশ্ন উঠেছিল মনে, সামনে কুয়াশা আরো কত পথ ধরে নেমে এসেছে? প্রশ্ন নিয়ে আমি পাঠক অপেক্ষায় আছি। এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন একমাত্র তপশ্রী পালের ‘ সামনে কুয়াশা’ বইটির নতুন পাঠকরা। আর তখনই ‘অশ্রুমোচনের সব দাগ আগুনগন্ধ মেখে উঠে আসবে ‘। 
সামনে কুয়াশা
লেখক : তপশ্রী পাল
প্রকাশক : দ্য ক্যাফে টেবল
দাম : ১৭৫/-

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত