হিমালয়ের গহীনে : প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মাঝে যাত্রা (পর্ব-৫)

এই নির্জন জঙ্গলে আঁধার নেমে আসে যেন দ্রুত। আমার বাঁ পায়ের হাঁটুতে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করি, কিন্তু থেমে থাকার উপায় নেই। চড়াই পেরিয়ে পৌঁছতে হবে। ভরসা মাউন্টেন ষ্টিক দুটো দিয়ে ভর করে এগিয়ে যাওয়া। পথ যেমন ক্লান্তিময় দীর্ঘ! তেমনি কষ্টকর।আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছে। ঘন অরণ্যে আমার নিঃসঙ্গ লাগছিলো। হঠাৎই ভয় পালিয়ে যায়। ভাবি আসুক অন্ধকার, কি আসে যায়, কিন্তু কিছু দূরে গিয়ে বসে পড়ি ক্লান্তিতে। অল্প বিশ্রামে আবার হাঁটা শুরু। দু’পাশে গভীর অরণ্য। আমি বোকার মতো কোন ঘড়ি সাথে আনিনি। উচিৎ ছিলো তাপমাত্রা ও উচ্চতা পরিমাপক যুক্ত প্লাষ্টিক বডির একটি ডিজিটাল ঘড়ি। এখানে ধনী গরিব সবার হাতে আছে, আমি না নিয়ে আসার জন্য আক্ষেপ পুরো পথেই করতে হয়েছে। পেশাল এগিয়ে চলে গেছে, প্রায় অন্ধকার পথে একা হাঁটছি যেন অনন্তকাল ধরে এই পথ চলা। দু’পাশে বিশাল বিশাল বৃক্ষ ছাড়া কিছুই নেই। আমার শারীরিক সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বইয়ে পড়েছি ফাঁকদিং থেকে ৬ ঘন্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় নামচে। যদিও নিসর্গ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে অতিরিক্ত কিছু সময় ব্যয় করেছি কিন্তু সবাই যারা রওনা দিয়েছিলো পৌঁছে গেছে আমি একা পথে। অবশেষে দূরে পথের ধারে একটা ঘর মত চোখে পড়লো সেই উত্তেজনায় ছুটে গেলাম। নামচে বাজার ঢের দেরী থাকলেও ঘরটি বনবিভাগের একটি চেক পোষ্ট আর জানান দিচ্ছে নামচে বাজার সামনেই। কেউ নেই বদ্ধ অন্ধকার। পথের সামনে কেমন আলো দেখা গেলো, ভাবলাম অবচেতন মনের কল্পনা বুঝি। না সত্যি সূর্য ডোবার পরও যে আলোর রেশ থাকে তা। আর কিছু দূর যাবার পর পথের পাশে মানুষ পেলাম জিজ্ঞসা করলাম আর কতদুর? পথ তো এদিকেই নাকি! সম্মতি সূচক মাথা নাড়ানো আমার মাঝে অনুপ্রেরণা যুক্ত করে, তবু যেন পথ শেষ হয় না। অবশেষে একটি মানুষ দ্বারা নোংরা পথের পাশে কিছু ভাঙ্গা বাড়িঘরের কাছে পৌঁছলাম, ভাবলাম এই বুঝি নামচে, খুব হতাশা লাগলো কিন্তু পথের ধারে খেলতে থাকা শেরপা শিশুরা জানালো সামনের পাহাড়ের বাঁক ঘুরে তবে নামচে, আবার হাঁটা। নামচে বাজারে পৌঁছানোর আগে পাহাড়ের একটা বাঁক পুরো শহরকে আড়াল করে রেখেছে দূর থেকে, বাঁকের উপর থেকে দেখলাম পরিব্রাজক দল লজগুলোর বাইরে শেষ আলোর রেশটুকু গায়ে মাখছে। সিগারেট ফুঁকছে। কাঠের তৈরি হওয়ায় অধিকাংশ লজে ধূমপান নিষিদ্ধ। হাতের নাগালের শহরে যখন ঢুকলাম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে এসেছে। শহরে ঢোকার মুখেই একটি অতিব সুন্দর হোটেল নেষ্ট এর সামনে পেশাল অপেক্ষা করছে। ঢুকতে গিয়ে ভাবলাম এতো ভালো হোটেলে কে জানে ভাড়া কত নেয়? সব হোটেল লজ এর মত ডাইনিং হল-এ ঢুকে ম্যানেজার এর সাথে কথা বললাম, রুমভাড়া ৪০০ টাকা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা। এতো কমে এই হোটেল, তাই জিজ্ঞেস করলাম গরম পানি সহ বাথরুম লাগানো রুমের ভাড়া কত?  ৩,০০০ জানালো, আমি হিসাব করলাম আমার ৪০০ টাকার রুমে থাকলেও খরচ ১,৫০০ ছাড়িয়ে যাবে, ফোন চার্জ, ক্যামেরা ব্যাটারী, গরম পানির গোসল সহ। আর রুমও ছোট ৪০০ টাকায়। ম্যানেজারকে পটানোর চেষ্টা করি, ‘দেখ আমি ইউরোপ আমেরিকার মত বড়লোক দেশের লোক নই’ ম্যানেজার রমেশ জিজ্ঞসা করলো কোথা থেকে এসেছি? বাংলাদেশ বলতে সে আর ওখানে উপস্থিত তার বন্ধু বলে উঠলো তোমরা তো ক্রিকেট দারুণ খেলো। আর একটু হলেই চ্যাম্পিয়ানই হয়ে যেতে। যাও তোমার জন্য ১,৫০০ টাকা ভাড়া। দুদিনের জন্য রফা হয়ে গেলো। ক্লান্তি নিয়েও আমরা বাঙালীরা দরদামে যে পঁটু তার প্রমাণ রাখলাম আর ক্রিকেটাররা জয়তু তাদের কল্যাণে আমার আরামদায়ক অবস্থান নিশ্চিত হলো। আটটার ডিনার শেষ হয়, আমার হাতে একদম সময় নেই আমি অর্ডার দিলাম স্যুপ, পিৎজা; দিয়েই ছুট, সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে ফেলতে গরম পানিতে গোসল দেব। নামচে বাজার সোলো খুম্বু জেলায় সবচাইতে বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র ১১২৮৬ ফুট উচ্চতায় এর শুরু। নামচে বাজারের উপরের অংশেই যেতে দম বেড়িয়ে যাবে। সমতলের মানুষ আমি, এটি অতি সুউচ্চ আমার জন্য আর শীতের কথা নাই বা বললাম। বাথরুমে আগুন গরম পানি, বুদ্ধি করে একটা বালতি আর মগ চেয়ে নিলাম। বেশ বড়সর ব্যক্তিগত বাথরুম। গরম পানি বালতিতে ছাড়তে উষ্ণ বাষ্পে পুরো বাথরুম ভরে গেলো। অসম্ভব আরামদায়ক পরিবেশে গোসল সেরে খেতে গেলাম। বেশ উষ্ণ ডায়নিং হল ও এত মজাদার পিৎজা পাব আমি কল্পনাও করিনি। সবজি স্যুপ সহযোগে চমৎকার রাতের খাবার। মনেই হচ্ছিলো না আজ দুপুরের পর হতে কতটা উদ্বেগ উৎকন্ঠায় অমানুষিক পরিশ্রমের ক্লান্তি মাখিয়ে আমাকে এখানে আসতে হয়েছে। গরম পানি চব্বিশ ঘন্টা আমার রুমে। একটা বোতলে ভরে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর রেখে দিলাম। বরফ জমানো শীতে কিছুটা স্বস্তি। পরদিন আমার অ্যাকলাইমাইজেশান দিন। অর্থাৎ উচ্চতার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য আমার একদিন বিশ্রাম তাই সকালে ওঠার তাড়া নেই। পেশাল বললো, ‘এভারেষ্ট ভিউ পয়েন্ট দেখতে যাব কিনা’, আমি মৃদু হেসে জানালাম যার দোড়গোড়ায় যাবার মনস্থির করেছি, বিশ্রামের দিনে অযথা কেন পরিশ্রম। পেশাল ইতোমধ্যে বাংলা বুঝতে শুরু করেছে। ওর স্থানীয় কথ্য ভাষার সাথে বাংলার ভালোই মিল আছে।

একটু দেরিতেই ঘুম থেকে উঠলাম। আজ আমি পশ্চিমা পরিব্রাজকের মত আয়েশ করে দেখবো নামচে বাজার। আর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নেব। নামচে বাজার আমার ধারনার চাইতে বেশী আধুনিক, প্রচুর দোকান পাট। পাহাড়ের চড়ার সরঞ্জামই বেশী। এখানে আধুনিক খাবার রেস্তোরাঁ, বেকারী, ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোর, ওষুধের দোকান সবই আছে। আছে একটি ব্যাংক ও সাথে এটিএম। প্রায় সব ধরনের ক্রেডিট কার্ড চলে এখানের দোকানগুলোতে মজার বিষয় এভারেষ্ট এর পথে শেষ জনবসতি গোরখশেপেও ক্রেডিট কার্ড চলে। সাইবার ক্যাফেও আছে। নামচে বাজারে দ্রব্যাদির দাম অনেক বেশী তাও নয়। কাঠমন্ডু থেকে একটু বেশী, অত উঁচুতে বহন করে নিয়ে আসার খরচটাতো যুক্ত হয়। আমার হোটেলের ম্যানেজার রমেশ জানালো হোটেলের কাঁচামালের সাপ্লাই আসে হেলিকাপ্টারে করে এখানে। নামচে বাজারের নিকটতম দুটো পর্বতচুড়া হলো ‘কংগে রি’ ২০২৯৯ ফুট উচ্চতায় বেশ বিস্তৃত পর্বত আমার হোটেলের বাগানে বসলে দেখা যায় এক পাশ পুরো আগলে রেখেছে বরফের প্রান্তর। আর সোজা তাকালেই থামসেরকু’র চূড়া ২১৭২৯ ফুট উচ্চতার। ‘থামসেরকু’ দেখতে অপরূপ সেই তুলনায় ‘কংগে রি’ বেশ ভীতি সঞ্চারক বটে। পেশাল আমাকে নিয়ে চললো শহর পরিভ্রমণে আর শুনেছি নিজে দরদাম না করে স্থানীয়দের দিয়ে কেনালে কম খরচ পড়ে। শেরপা শিশুরা অপরিচ্ছন্ন মাঠে নোংড়ায় খেলছে। শহর মানে বর্জ্য প্রচুর সৃষ্টি হবে আর তা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে বাধাগ্রস্থ করবেই। পাহাড়ি ঝিরির পাশ ঘেষে ভাঙ্গা পথ উপরে উঠে গেছে, ঝিরির পানি দিয়ে প্রার্থনা চক্র ঘোরানোর ব্যবস্থা আছে। এই দিকটা একটু দারিদ্র পীড়িত। দেখলাম কয়েকজন বসে জুয়া খেলছে দোকানে আর একটু উপরে উঠেই আমার আক্কেল গুরুম। চমৎকার সব জিনিসপত্র পাওয়া যায় কাঠমন্ডুর মতনই। পেশাল নিয়ে গেল আমাকে অনু শেরপার দোকানে। মূল বাজারটির তিন নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত। অনু শেরপার দোকানে প্রচুর পর্বতে ওঠার সরঞ্জাম। দু-একটির প্রতি লোভ হলো না তা নয় কিন্তু দাম দেখে দমে আসা ছাড়া উপায় নেই। তার দোকান থেকে একটি সত্যিকারে ডাউন জ্যাকেট দৈনিক ৮০ নেপালী রুপীতে ভাড়া করা হলো আবার ফিরে এসে আমার জামানত ৫,০০০ রুপী ফেরত পাব এই শর্তে। সাবধান করে দিলো যাতে আগুনের কাছে না যাই। বহুল ব্যবহৃত এই ডাউন জ্যাকেট নতুন কিনতেও এত টাকা লাগবে না আমি নিশ্চত কিন্তু এখানে আমার আর বিকল্প নেই। যথার্থ উইন্ড চিটারও এখানে পাওয়া যায় কিন্তু অত দাম দিয়ে কেনার সাহস করলাম না। এখানে বেশ দামী দামী দোকানও আছে। একটি ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোরে ঢুকে নল দিয়ে পানি খাওয়া যায় এমন একটি জিনিস কিনলাম যা পিঠের ব্যাগে ঝুলিয়ে রাখা যায়। দেশে থাকতেও এটা দেখেছি আমেরিকান এ্যাম্বেসীর লোকজন প্রচন্ড গরমে ব্যাগের বাইরে বের করা নল থেকে পানি খায়। কিনলাম বটে কিন্তু আমার এর থেকে পানি টেনে খেতেও নাভিশ্বাস, তার চাইতে আমার এ্যালুমিনিয়ামের ফ্লাক্সই ভালো। স্নিকার আর বাউন্টি খুব কমন খাবার পাহাড়ে আসা মানুষের কাছে, প্রচুর এনার্জি দেয়। দেশে প্রচুর দাম হওয়ায় আসার আগে দিল্লী থেকে বেশ কিছু নিয়ে এসেছিলাম। নামচে বাজারে এসে মনে হয় অত কষ্ট করে আনাটা অর্থহীন ছিলো। এখানে তেমন বেশী দাম নয়। তবে নামচে বাজারের নির্দিষ্ট দু-একটি দোকানের বাইরে সারা পথেই এর দাম কয়েকগুণ বেশী। এখানে বেশ ক’টি বেকারী আছে, অসম্ভব সুন্দর গন্ধ বেরুচ্ছে পাশ দিয়ে যেতেই মনে হচ্ছে ঢুকে সব খাই। জার্মান বেকারীতে ঢুকে এ্যপেল পাই আর চিনামন রোল দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম।

নামচে বাজারে এয়ারপোর্ট আছে বলে জানতাম ‘স্যাংবোচে এয়ারপোর্ট’ ১২৩০৩ ফুট উচ্চতায়। প্লাটিলাস পি-৬ পোর্টার প্লেন ৫ মিনিটে লুকলায় যায়। কিন্তু বিভিন্ন জনের কাছে প্রশ্ন করে এয়ারপোর্টের হদিস পেলাম না, তবে হেলিকপ্টার নামে সেখানে শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত এই এয়ারপোর্ট। নামচে বাজার ছেড়ে যাবার সময় দেখা মিললো সেই এয়ারপোর্টের। যারা এয়ারপোর্ট শব্দটির উচ্চারণের সাথে সাথে এক ধরনের কল্পনা করে ফেলেন তাদের ধাঁধায় ফেলে দেবে নিশ্চিত। আমি নামচে বাজারের আনাচে কানাচে ঘুরিনি, কারণ প্রতিটি স্থান হয় চড়াই না হয় উৎরাই তবে শহরটি সর্ম্পকে একটি সাধারণ ধারনার জন্ম দিয়েছে। বাজারে দুটো ওষুধের দোকান চোখে পড়লো। ফেরার সময় ৬ রুপীর একপাতা প্যারাসিটামল ৩০০ রুপীতে কিনতে বাধ্য হয়েছিলাম। ওষুধগুলো নেড়েচেড়ে দেখলাম বেশীর ভাগই সাধারণ অসুস্থতার ওষুধ, পেটের পীড়া, বেদনা নাশক জাতীয় এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।পরিব্রাজক দল নিজেদের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সাথে করে নিয়ে আসে। অত্যাবশকীয় ওষুধ ডায়ামক্স যা ওষুধের দোকানের বাইরে ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোরেও পাওয়া যায়। উচ্চতা জনিত অসুস্থতা মোকাবেলায় কার্যকর খুব তা সবার কাছ থেকেই জেনেছি। নামচে বাজারে একদিন বিশ্রাম নেবার পালা কখন ফুরিয়ে গেলো টের পেলাম না। যখন দেখলাম থামসেরকুর চূড়া পড়ন্ত রোদ্দুরে অদ্ভূত মায়াময় লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। কুসুম কাংগুরুর উত্তরে চূড়া থেকে একটি বরফের রিজ পূর্ব দিকে ‘কাটোং গা’ পর্যন্ত চলে গেছে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখলাম আলোর খেলা পর্বত জুড়ে। পাহাড়ী অঞ্চলে সন্ধ্যার পর চলাচল সীমিত হয়ে পড়লেও নামচে বাজারে সন্ধ্যায় লোক সমাগম মন্দ নয়।

চলবে …

 

 

 

 

মারুফ কবিরের সব লেখা ও এই ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত