হিমালয়ের গহীনে : প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মাঝে যাত্রা (পর্ব-৬)

আইরিশ পাবে গান বাজছে। যে সমস্ত পরিব্রাজকের আগামীকালের তাড়া নেই তারা আয়েশ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমি আমার ডেরা হোটেল নেষ্ট এ ফেরত যাই। খুব সময় নিয়ে রাতের খাবার সারি। এখানেই পরিচয় ঘটে যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী প্যাটেল বাবুর সাথে। একাই এসেছে আমার মতন। পার্থক্য শুধু উনি ৬ মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এভারেষ্টে আসার আগে। সাথে আলাদা গাইড ও পোর্টার ও প্রয়োজনীয় সমস্ত উপকরণ সমৃদ্ধ। মজার মানুষ প্যাটেল বাবু। আমার দীর্ঘপথ যাত্রায় বাকি পথ টুকুতে উনাকে প্রায় সব খানেই পেয়েছি। আলাপচারিতায় আনন্দময় হয়েছে সময়। রসিকতায় উনি অনন্য। বিশ বছর ধরে যুক্তরাষ্টের ভার্জিনিয়ায় বাস করেন, পেশায় ফার্মাসিষ্ট। পেশাল খুব সকালে রওনা হতে হবে বলে আমাকে আড্ডা শেষ করার তাগিদ দেয়।

সকাল হয় উজ্জ্বল রোদ্দুরের অভিবাদনে। দ্রুত নাস্তা সারি তারপর নামচে বাজারকে বিদায় জানাই। হোটেলটা চমৎকার লাগায় ফিরতি যাত্রায়ও বুকিং রেখে যাই। যদিও নামচে বাজারে অনেক হোটেল। এমনকি পাঁচ তারকা খচিত হোটেলও আছে অতি উচ্চমূল্যের। হোটেল থেকে বেড়িয়ে ওঠা শুরু।

শহরের অলি গলি ছাড়িয়ে উঠছি তো উঠছি। একসময় পুরো শহরটা একবারে চোখে পড়ে। দূরের ‘কংগে রি’ র পথে সুদৃশ্য একটা বাড়ি দেখে প্রশ্ন জাগে ওখানে কেমন করে যায় মানুষজন! দূর্গম খাড়া! পেশাল জানায় একমাত্র হেলিকপ্টার যায় ওখানে। শহরের শেষ প্রান্তে কতগুলো মনোহরণকারী লজ চোখে পড়লো। মাস এর পর মাস এসব লজ এ থেকে যাওয়া বিরক্তিকর হবে না আমার কাছে। একটা মাঠ চোখে পড়লো ষ্টেডিয়াম এর মতন সমতল তার থেকে একটু এগিয়েই এয়ারপোর্ট। লোক বসতি পেড়িয়ে চলে এলাম উষর পাহাড়, গাছপালা কম, গা ঘেষে সরু রাস্তা মাঝে মাঝে বিপদজনক ভাঙাচোরাও আছে। তবে উৎকট চড়াই বা উৎরাই নেই। লাইন ধরে দেখলাম কিছু সুন্দরী রমণী হেঁটে যাচ্ছে। ২৮ জন রমণী এসেছে ইংল্যান্ড এর ওয়েলেস থেকে গন্তব্য বেইস ক্যাম্প। তাদের গাইডেড ট্যুর, বোঝাই গেলো ট্যুর অপারেটররা তাদের দিয়ে ব্যবসা ভালোই করেছে। এই গ্রুপে অতি স্থূলকায় এক নারীকে দেখলাম, মনে মনে ভাবলাম সাহস আছে এর! যাওয়া তো পরের কথা এ পর্যন্ত এসেছে আর যাবে অতদূর সেটি ভাবতে পেরেছে সেটাই কম কি? পুরো পথে কোথাও আমাকে কোন অনুদান দেবার আহ্বান জানানো হয়নি। এখানে পথের ধারে বসে একজন চাইছে, কারণ এই রাস্তা মেরামত আর পথে পথে যে প্রার্থনা স্তম্ভ সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য। যৎসামান্য দিয়ে যাই- দিচ্ছে সবাই। লিখে রাখছে কে দিল, কোন দেশের ইত্যাদি। বেইস ক্যাম্পের পথে নামচে বাজার ছাড়ার পড়ই একদিকে পাহাড় অন্যদিকে গিরিখাত আর বাকি পথ হয় অরণ্য না হয় তেমন বেশী খাদ নয়। দূরে তাকিয়ে একটি মনোরম ঝুলন্ত ব্রিজ। পেশাল জানাল, জোরেশাল পার হয়ে ঐখানে সেই ‘লারজা ব্রিজ’ যা পার হওয়া খুবই কষ্টকর অভিজ্ঞতায় পর্যবাসিত হয়েছিলো। অথচ আজ কি সুন্দর মনে হচ্ছে তাকে। আর একটু এগিয়ে বাঁকে বিশ্রাম নেবার জন্য কিছু বেঞ্চ তৈরী করে রাখা আছে, এটি আর একটি এভারেষ্ট ভিউ পয়েন্ট কিন্তু দূরে মেঘের আধিক্যে আজও দেখা হলো না রহস্য মাখা এভারেষ্ট। যেহেতু পথের চড়াই উৎরাই কম তাই হাঁটার গতি ভালো। অসুবিধা উচ্চতায় অক্সিজেন কম থাকায় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া।

বৃক্ষহীন পাহাড়ের পালা শেষ ধীরে ধীরে দু’পাশে গাছ চোখে পড়ছে। এ যে সেই বিখ্যাত রডডেনড্রন বাগান। প্রচুর ফুল মনোরম এক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। মনে হচ্ছে স্বর্গের পথে হাঁটছি মর্ত্যলোকের আমি। কিছুদূর গিয়ে একটা লজ সামনে পাহড়ের গায়ে খোলা রেস্তরাঁ। গাইডের ট্যুরের পরিব্রাজকদের চা নাস্তা খাওয়ানো হচ্ছে। চমৎকার জায়গা, এখান থেকে বিখ্যাত ‘আমা দাবালাম’ শৃঙ্গ স্পষ্ট দেখা যায়। দুটো শৃঙ্গ আমা দাবালাম এর মূল চূড়া ২২৩৪৯ ফুট আর পশ্চিমে ছোট চূড়াটি ১৮৩৫১  ফুট।

এখান থেকে শুরু করে ডিংবোচে পর্যন্ত ‘আমা দাবালাম’ পুরে পথের সঙ্গী। মনে হলো বৃত্তের কেন্দ্র ধরে ঘুরে আর এক পাশে পৌঁছানো। পশ্চিম আকাশের দিকে তাকালে আমা দাবালাম যেন নিরব সঙ্গী হিসাবে সঙ্গ দেয় সর্বদা। ১৯৬১ সালের ১৩-ই মার্চ নিউজল্যান্ডের মাইক গিল, ওয়ালী রোমানেস, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারী বিসপ আর যুক্তরাজ্যের মাইক ওয়ার্ড প্রথম আমা- দাবালাম চূড়ায় ওঠেন ‘সিলভার হাট’ সাইস্টিফিক এক্সপিডিশনের অংশ হিসাবে যার নেতৃত্বে ছিলেন স্যার এডমুন্ড হিলারী। ২০০৬ এর নভেম্বরে ঝুলন্ত গ্লেসিয়ার থেকে বড় আকারের অ্যাভালাঞ্জে ৬ জন (তিন ইউরোপীয় ও তিন শেরপা) মারা যায়। এই ভিউ পয়েন্টে চমৎকার থাকার ব্যবস্থা আছে। এখান থেকে লোৎসে সার, তেবোচে, কাটেংগা, থামসেরকুও দেখা যায়। রডডেনড্রন বাগানের মাঝ দিয়ে এর পর হেঁটে চলা। ছোট ছোট ঝর্ণার শব্দ পথের সৌন্দর্য্যকে আরো রাঙিয়ে তুলছে। আর একটু এগিয়ে পথ চলে গেছে খুমজুং গ্রামের পথে। এটিও বেশ বড় গ্রাম এ অঞ্চলে। এ পথেই সোলো খুম্বু অঞ্চলে ওম মানী চিহ্নিত দীর্ঘতম ওয়াল আছে। খুমজুং এ স্যার এডমুন্ড হিলারীর আবক্ষ মুর্তি আছে। গ্রামটি আর এভারেষ্টের পথের প্রায় সব জনবসতি খুমজুং গ্রাম উন্নয়ন কমিটির আওতায় পড়েছে। খুমজুং এ স্কুল আছে এবং নামচের পরই সবচাইতে বৃহৎ জনবসতি এ খানেই। আমার যাবার পথে পড়বে না খুমজুং, যদি হাতে সময় থাকতো তবে অবশ্য ঘুরে যেতাম।

খুমজুং এ যাবার পথ ছেড়ে কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর চৈতাং খারখা, বেশ অরণ্য আর পাহাড়ের মাঝে ছোট ছোট ঝর্ণায় ভরা ছোট্ট গ্রাম। প্রচুর রডডেনড্রন ফুটে আছে। এই গ্রামটি পেরুনোর পর শুধু নামছি আর নামছি। যাবার পথে নামা ভয়ংকর, মানে ডাবল ওঠা। নামছি তো নামছিই…। একটি নদী পেরুতে হবে, খিদেও পেয়েছে প্রবল। পেশাল জানায় নদী পেরিয়ে তবে খেতে। নামতে নামতে মনে হলো যেন পুরো পাহাড়টাই নেমে পড়লাম।

একটা লজের সাথে রেস্তরাঁয় লেখা থ্যাংবোচে যাবার পথেই এটি শেষ খাওয়ার জায়গা। আঁতকে উঠলাম! তবে কি এই খিদে পেটেই আমাকে বাকি পথ যেতে হবে। পেশাল অভয় দেয় নদী পেরুলেই আছে। নদী পেরুনোর পর বেশ ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, মনটা ঈষৎ বিরক্ত হয় কই সেই রেস্তোরাঁ। তবে বাঁক ঘুরতেই চমৎকার রডডেনড্রন বাগান পাশে খোলা জায়গায় পাথর দিয়ে আলাদা করা খাবার জায়গা। প্রবল বাতাস, মাথার টুপি উড়ে দৌড় দিচ্ছে যেন! মাঝে মাঝে ঝিরিঝিরি পানিও বাতাসের তোড়ে উঠে আসছে উড়ে।

তাই ছোট্ট ঘরে আশ্রয় নেই এবার সাথে প্যাটেল বাবুও আছেন। খুবই ছোট্ট ঘর। সাথে আর তিনজন জার্মান বসেছে খেতে, আর কোনো জায়গা নেই। অর্ডার করলাম ভেজিটেবল স্যুপ আর নুডুলস। নুডুলস এ ডিম যুক্ত করলে অতিরিক্ত ১৫০ রুপী। আমি ডিমসহ অর্ডার করলাম। খাবার চলে এলো। পুরো পথে এত সু-খাদ্য খাইনি আমি। প্যাটেল বাবুও আমার সাথে একমত। এত দ্রুত তৈরী করে দিলো মজাদার খাবার। প্যাটেল বাবু প্রতি কাজেই তার পত্নীকে নিয়ে রসিকতা করেন। বলল, এবার তাকে এর কাছে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠালে মন্দ হয় না। কিন্তু তিন জার্মানের কাহিল অবস্থা, সর্ষের তেলের ঝাঁজ আর কাঁচামরিচের ঝালে তারা নাস্তানাবুদ। বেশীরভাগ খাবার না খেয়েই তারা উঠে গেলো। খাদ্য বিরতির পর যাত্রার শুরুটা মনোরম। একটি নেপালী সেনাবাহিনীর ক্যাম্প আছে। তাকে ঘিরে প্রচুর রডডেনড্রন ফুটে আছে কিন্তু ছবি তুলতে সাহস হয় না। যদি সেনা নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করেছি বলে বেঁধে রাখে!

মনোরম পথের শেষ থাকে, শুরু হলো আমার পাহাড় ভাঙা, পেশাল জানাল অত কষ্ট হবে না। তবুও উচুঁতে তো ওঠা! গন্তব্য আমার থ্যাংবোচে। খুব বিখ্যাত জায়গা এটা, বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এখানে আসেন মনাষ্ট্রি দর্শনে। ১২৬৮৭ ফুট উচ্চতায় বলা যায় এটা মূল এভারেষ্ট ভূখন্ডে ঢোকার মুখে গ্রাম। খুবই ছোট্ট একটা জায়গা, অত উঁচু পাহাড়ে একটা বেশ বড় ঢালু মাঠ এক কোনে বিশাল মনাষ্ট্রি যা বহু দুর থেকেও দৃষ্টি গোচর হয় আর ৪/৫ টি ছোট ছোট লজ। থ্যাংবোচে থেকে একসাথে অনেকগুলো পর্বত চূড়া দেখা যায় ‘থাওচে’, ‘এভারেষ্ট’, ‘নুপুৎসে’, ‘লোৎসে’, ‘আমা দামালাম’ আর ‘থামসেরকু’। তেনজিং নোরগে যিনি প্রথম স্যার এডমুন্ড হিলারীর সাথে প্রথম এভারেষ্ট চূড়ায় উঠে ছিলেন তার জন্ম এখানেই থানি নামে গ্রামে, যাকে থ্যাংবোচে মনাষ্ট্রিতে পাঠানো হয়েছিলো সাধু হবার জন্য। খুম্বু ভ্যালীর এই গ্রামটি যেখানে অবস্থিত ৩৫০ বছর আগে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব আসে। লামা সংঘ্যা দরজি এখানে ও প্যাংবোচে গ্রামে সবচাইতেপ্রাচীন মনাষ্ট্রি ও ছোট ছোট প্রার্থানালয় প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন। এখানের ধর্ম প্রচারক আর তাদের প্রার্থনাগৃহ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে বহু মিথ প্রচলিত। তবে বাস্তাবতা এ পর্বতমালায় থ্যাংবোচে মনাষ্ট্রি বর্তমানে বৃহত্তমও পরিব্রাজকদের অন্যতম আকর্ষণ ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় কিন্তু ১৯৩৪ সালে ভূমিকম্পের কারণে এটি ধ্বংস হয়ে যায়। পরপর তা আবার মেরামত করে আগের রূপে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ১৯৮৯ সালের ১৯ জানুয়ারীর এক অগ্নিকান্ডে এটি আবার ধ্বংস হয়ে যায় এবং পুনরায় স্বেচ্ছাসেবক ও বৈদেশিক সাহায্যে পুনঃনির্মাণ করা হয়। লামা গুলু এই মনাষ্ট্রি নিমার্ণ করেন। ১৯৩৪ এ তিনি জীবিত ছিলেন না, তার উত্তরসূরী উমজে গেলডেন’র উদ্যোগে নাগওয়ং তেনজিং নবরু’র সক্রিয় সহযোগিতায় তা আবার নির্মিত হয়। অনেক মূল্যবান মূর্তি, ম্যুরাল, কাঠের কারুকাজ সবই আগুনে পুরেযায়। তেনজিং নোরগে এ অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় সকলের দৃষ্টি এ মনাষ্ট্রির প্রতি আকৃষ্ট হয় বেশী। থ্যাংবোচে অত্যন্ত সুন্দর জায়গা। আমার পৌঁছুতে পৌঁছুতে মেঘ জমে গেল, প্রচন্ড ঠান্ডা। যে লজে উঠলাম ভাড়া মাত্র ২০০ হলেও খুব একটা যুৎসই নয়, বিশেষ করে নামচে বাজারের তুলনায়। আমার লজের গা ঘেষেই মনোরম একটা লজ কিন্তু আজ সব আসন পূর্ণ। পথে আমার পুরোনো সাথী জেসান অবশ্য জানিয়ে ছিলো আর এক ঘন্টা হেঁটে গেলে নদীর পারে চমৎকার একটা গ্রাম আছে ডেবুচে নামে। ও ওখানে গিয়ে থাকবে। আমার শরীর সায় দিচ্ছিলো না আর থ্যাংবোচে মনাষ্ট্রি ঠিকমতো না দেখে চলে যাওয়া অন্যায়। এমনিতেই এর প্রধান উৎসব মাস অক্টোবরে না আসায় আক্ষেপ কাজ করছে খুব। মনিরিডিমু উৎসব জগৎজুড়ে এর সুখ্যাতি নিয়ে আছে এই থ্যাংবোচেতেই। তিব্বতীয় পঞ্জিকার দশম চন্দ্রমাসে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

 

চলবে…

 

 

মারুফ কবিরের সব লেখা ও এই ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত