হিমালয়ের গহীনে : প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মাঝে যাত্রা (পর্ব-৭)

মনিরিডিমু উৎসব জগৎজুড়ে এর সুখ্যাতি নিয়ে আছে এই থ্যাংবোচেতেই। তিব্বতীয় পঞ্জিকার দশম চন্দ্রমাসে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।ইংরেজী অক্টোবর-নভেম্বরে এটা হয়। নয় দিন ব্যাপী এ উৎসবে প্রচুর লোকসমাগম হয়। শরতে ট্রেকিং আসা পরিব্রাজকরাও অংশ নেয়, উপভোগ করে এ বর্ণিল উৎসব। ধর্মীয়ভাবে এ উৎসবে দুটো অংশ একটি উৎসব আর এটি বিশেষ ধরনের মেডিয়েশান, এই মেডিয়েশান এর নাম দ্রুবচেন যা তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মবলম্বীরা ১০ দিনব্যাপী করে থাকে। মানি রিমডুর মানে হলো ‘মানি’ যেটা অবলোকতিশ্বর এর প্রতি প্রার্থনা আর ‘রিমডু’ মানে ছোট লাল পবিত্র ট্যাবলেটের মতন জিনিস যা অংশগ্রহণকারী সকলের মাঝে বিতরণ করা হয়ে থাকে। এই উৎসবে এ ১৬ টি নাচ পরিবেশন হয় এবং তা থেমে থেমে নানান মজার বিষয় তুলে ধরা হয়। মংকরা মুখোশ পড়ে বর্ণিল নৃত্যের মধ্য দিয়ে অসুরের ধ্বংস আর তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের জয়গান তুলে ধরেন। তিব্বতীয় বৌদ্ধর্ধমের ঐতিহাসিক প্রণেতা গুরু রিমপোচের জয় বন্দনা এ উৎসবের মূল সুর। নেপালের অন্যতম আকর্ষণ এই উৎসব।

আমি এখানে আসার আগে রবিবাবুর যে নাটকটি নিয়ে রবীন্দ্র স্বার্ধশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দিল্লী ও কোলকাতা গিয়েছিলাম ঐ নাটকে ‘মানি রিমডু’ নাচ নির্দেশক ব্যবহার করে নাটকের বৈচিত্রময়তা বাড়িয়ে তুলছে পাহাড়ের জনগণের অধিকারের কথা তুলে ধরায়। থ্যাংবোচে পৌঁছে লজে ঢোকার পর ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত হলেও তিব্বতীয় ধাঁচে গড়া এমন বাড়িতে এই প্রথম। এর বাথরুম একেবারে বাইরে। বিদেশী সাদা চামড়ার লোকজন এই ঠান্ডায়ও খালি গায়ে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার হচ্ছে। আমি দ্রুততায় মুখে চোখে পানি দিয়ে বাকিটা রুমের ভেতর ভেজা টিস্যু পেপারের মাধ্যমেই সারি। অতটা পরিষ্কার নয় লজটি কিন্তু চারিদিক থেকে যেন তুষারের পাহাড়গুলো ঘিরে ধরেছে। আজ আমার ডাউন জ্যাকেট ব্যবহারের প্রথম দিন। আসলেই এই জ্যাকেটটি বেশ কার্যকর। অতি ঠান্ডায় বেশ দ্রুত শরীর গরম করে দেয়। ভাবলাম লজ এর বাইরে গিয়ে কিছু ছবি তুলবো। কিন্তু আলো খুব কম। এত বেশী ঠান্ডায় ক্যামেরার ফোকাস ঠিক করে ছবি তোলা মুশকিল। মাঝের ঢালু মাঠের দিকে তাকালে সাধ্য কার বোঝে এটি কত উঁচুতে। মাঠে কয়েকটা ইয়াক চড়ছে। র্জামানি একদল পরিব্রাজক আমার সাথে একই লজে আর নিঃসঙ্গ এক জাপানী বয়স্ক মহিলা। খাবার এসেই অর্ডার করেছি। সন্ধ্যে সাতটার মাঝে খাবারের পাঠ চুকানোর তাড়া থাকে, এখানে সর্বোচ্চ আটটা। র্জামান দলের সাথে জমে ওঠে না। জাপানী মহিলা প্রতিবছরই একা আসেন এই দূর্গম জনপথে একবার। সারাদিনের পরিশ্রমে যথেষ্ট ক্লান্ত ছিলাম। গোগ্রাসে সমস্ত খাবার চেটেপুটে শেষ। জাপানী মহিলা খাবারের অর্ডার বেশ করলেও কিছুই খেল না। আমি অবাক হলাম এদের প্রাণশক্তির রহস্য কি? খাওয়া শেষে রুমে ঢোকার জন্য খোলা আকাশের নীচে যেতেই বৃষ্টি মতন শুরু হলো, আসলে বৃষ্টি নয় তুষারপাত। জীবনে প্রথম তুষারপাতের অভিজ্ঞতা তাও এমন উচ্চতায়। প্রচন্ড শীতে দাঁড়ানোর  জো নেই, দ্রুত রুমে ঢুকে ঘুম।

থ্যাংবোচে তো আমারই সাথে এসেছে দুটো বড় গ্রুপ একটির কথা আগেই বলেছি ওয়েলেস-এর ২৮ নারীর দল আর একটি হলো ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়েলডান সোসাইটির সব ডাক্তারকুল। সন্ধ্যার আগ দিয়ে জ্যাকেটে ও টুপির ফাঁক গলে এক ভারতীয় চেহারার লোক আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। প্রথম ভুল করে ভেবেছিলাম আসিফ মুনীর তন্ময় ভাই কিনা। পরে ভালো করে দেখলাম উনি নয়, অন্য কেউ ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে তৈরী হয়ে যাওয়া পরবর্তী গন্তব্যের জন্য। তৈরী হয়ে দ্রুত নাস্তা সেরে বাইরে এলাম থ্যাংবোচে মনাষ্ট্রির কিছু ছবি তুলবো বলে। অপূর্ব উজ্জ্বল আলোমাখায় বেশ লাগছে। মনে হচ্ছে সারারাত বৃষ্টি ধোয়া আকাশ যেমন উজ্জ্বল তেমনি, কিন্তু ঠান্ডা প্রবল। সকালে যাত্রার শুরুতে ওয়েলডান সোসাইটির একজন এসে আলাপ করলো স্পষ্ট বাংলায়। ভদ্রমহিলা ভারতীয় বোঝা যায় কিন্তু এমন পরিষ্কার বাংলা আশা করিনি। জিজ্ঞাসা করলেন আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা? ড. বানু দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আর কাল সন্ধ্যায় যাকে আসিফ মুনির তন্ময় মনে করে ছিলাম উনি তার স্বামী। বিহার রাজ্য বাড়ি হলেও পশ্চিমবঙ্গে বেড়ে ওঠায় বাংলা রপ্ত ভালোই করেছেন তিনি। অত্যন্ত স্বজ্জ্বন মহিলাটি পরবর্তীতে আমাকে কত যে উপকার করে  কৃতজ্ঞ করেছেন! এই দূর্গম অঞ্চলে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। থ্যাংবোচে থেকে যাত্রার শুরুটা বেশ আরামদয়ক। রডডেনড্রন বনের মধ্য দিয়ে নেমে যাওয়া। বাঁ দিকে নদী ঘেষে ডেবুচে গ্রাম। অতীব সুন্দর গ্রামটি। বেশ খানিকটা নিচে থ্যাংবোচে থেকে কিন্তু নামাটা কষ্টকর নয় কারণ খাড়া ঢালু পথ নয় আরামদায়ক। ডেবুচে গ্রামে বিশ্রাম কিছুক্ষণ।

এই গ্রামে বেশ চাষাবাদ হয়। রোদ্রের উজ্জ্বলতা আজ বেশী, কাল রাতে চারপাশের পর্বতগুলোয় বরফ বেড়েছে তাতে সূর্যের আলোর প্রতিফলন উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তুলেছে। আরো নিচে নামতে হবে কারণ নদী পার হবার পালা এবার। আর নদী পার হবার মানেই হল বিশাল ঝক্কি। নামো বহু নিচে তারপর আবার ওঠো, আর এই উচ্চতায় তা বড় কষ্টকর বটে। নদী পার হবার পর দুটো দ্রষ্টব্য প্রথমটি হলো এরপর থেকে গাছপালা উল্লেখ্যযোগ্য ভাবে কমে গেছে তার ওপারেই বিখ্যাত প্যাংবোচে গ্রাম।

এ অঞ্চলের সবচাইতে প্রাচীন ও ঐতিহ্যমন্ডিত। প্যাংবোচে গ্রাম ১৩০৭৪ ফুট উচ্চতায় ইমজা খোলে ভ্যালীতে অবস্থিত। প্যাংবোচে আপার ও লোয়ার দু’ভাগে বিভক্ত। বেশ কিছু লজ, দোকান পাঠ আছে এখানে আর মনাষ্ট্রি, যেখানে মিথ মানব ইয়েতির মাথার খুলি ও হাত আছে। প্যাংবোচে গ্রামের উত্তর দিকে ধুকলা লেক ও গ্রেসিয়ার,এই গ্রামে বিশ্রাম নয়, আমার গাইড কাম পোর্টার দূরের একটা গ্রাম দেখায় যেখানে পৌঁছে বিশ্রাম আর দুপুরের খাবার, মনে হয় আর আধ ঘন্টায় পৌঁছে যাব ওখানে। পথ নদীর পাশ ঘেঁষেই উঠে যাচ্ছে, ছোট ছোট জল বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রামগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা মেটায় যা খুবই পরিবেশ বান্ধব। জল বিদ্যুৎ এর জন্য কোন কৃত্রিম লেক সৃষ্টি করে পরিবেশ ধ্বংস করা হয়নি। প্রচন্ড বাতাস পথে। পথের পরিশ্রমের ফলে গা থেকে ডাউন জ্যাকেট খুলে ফেললেও ঠান্ডা লাগছে বেশ। উইন্ড চিটার কেন প্রয়োজন এখন পুরোপুরি উপলব্ধি করেছি। পুরো পথেই আমা দাবালাম  সাথে আছে। একজায়গায় পথ নিচে বহু নিচে ছোট ষ্টিলের ব্রীজ দিয়ে নদী পার হবার জায়গা, আমাদাবালামের বেইস ক্যাম্পে যাবার পথ। ধীরে ধীরে পথটি ক্লান্তিকর হয়ে উঠলেও ঐ গ্রামটি আর সহজে আসছে না। পা ভারী হয়ে উঠেছে। পথে পাথরে শেরপাদের নানা মন্ত্র ও কর্মগাঁথার বর্ণনা। বাঁকে বাঁকে স্তুপায় প্রার্থনা বাক্যের সমাবেশ। রীতি হলো বাঁ হাতে এই স্থাপনা রেখে এগুতে হবে। অবশেষে এল সেই ‘সোমারে’ গ্রাম, মাত্র কয়েকটি রেস্তরাঁ কাম লজ। সাথে উঠে এসেছে সেই স্কটিশ মহিলা দল। এক রেস্তরাঁয় খেতে গেলে আজ আর খাওয়া জুটবে না কপালে তাই বুঝে শুনে একটায় ঢুকে পড়ি। অতটা ভাল না হলেও অর্ডার দিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে দেখি তখনও খাবার আসেনি। তারও বেশ কিছু পর খাবার এলো এমন রোস্তেরায়, খাবারের সাথে তাবাষ্কো সস দেখে ভাবতেই অবাক লাগে। এমন জায়গায়ও এরা খদ্দেরদের রুচিকর খাবার উপহার দিতে আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখেনি। রেস্তোরাঁর মালিক এভারেষ্ট চূড়ায় উঠেছেন তার দেয়ালের সর্বত্র লাগানো নানান পুরস্কার আর কৃতিত্বের সনদ দেখতে দেখতে খাওয়া শেষ। ‘সোমারে’ গ্রামে গাছপালা নেই বললেই চলে এখানে এসে ধুলোবালি যন্ত্রণা মনে হলো খুব।

পোর্টার পেশাল জানালো আর বেশী পথ নয়। আশ্বস্ত হই আমি কিন্তু বাস্তবতায় তার দেখা মেলে না, এটা সত্য যে শারীরিক সক্ষমতা থাকলেও এতো উঁচুতে অক্সিজেনের অভাব দ্রুত ক্লান্ত করে দেয়। গ্রাম ছাড়ানোর পর পাহাড়ের পাড় ধরে ক্লান্ত আমি হাঁটছি। পেশাল আমাকে রেখে এগিয়ে গেলো আবার ছোট একটা নদী পার হতে হবে। আর নদী পার না হয়ে চলে যাওয়া যায় বাম দিকের রাস্তায় ‘ফেরিচে’-র দিকে।

চলবে…

মারুফ কবিরের সব লেখা ও এই ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত