| 14 এপ্রিল 2024
Categories
দেশান্তর ভ্রমণ

হিমালয়ের গহীনে: প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মাঝে যাত্রা (পর্ব-৯)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

অধিক উচ্চতায় ঠান্ডা জনিত কারণে পানির দুঃপ্রাপ্যতায় যদি পানি যথাযথভাবে পান না করা হয় তবে মারাত্মক। তাই শুধু পানির উপর নির্ভর না করে চা, কফি, লেমন বা হেলথ ড্রিংক জাতীয় পানীয় খাওয়া উচিত। গরম পানি অনেক বেশী পয়সায় কিনতে হলেও তা রাখা উচিৎ। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সস্তায় পরিশুদ্ধ পানির যোগান দেয়, তা বোতলজাত পানির চাইতে কোন অংশে খারাপ না। সুতরাং এই সহজ নিয়মগুলো মেনে পাহাড়ে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। এ্যাকলাইমাজেসন না করায় আমার চাইতে বহু দ্রুতগামী অভিযাত্রীকে শেষমেশ আমারও অনেক পড়ে পৌঁছুতে হয়েছে বেইস ক্যাম্পে। আর যারা আরো উপরে উঠবেন বা চূড়া জয় করবেন তারা তো দীর্ঘদিন বেইস ক্যাম্পে এ্যাকলইমাজেসন করে তারপর পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ওঠেন।

আমার উড়োজাহাজের সঙ্গী জেসান ইমজাসে’র চূড়ায় দ্রুততম সময়ে উঠতে গিয়ে শেষ মেশ অসুস্থতায় শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। ফেরার পথে আবার দেখা। তাড়াহুড়ো শুধু সাধারণ অসুস্থতা নয় মারাত্মক বিপদও ডেকে আনতে পারে। সাধারণ নিয়ম হলো যে জায়গায় আপনি ঘুমাবেন পরদিন যেন ৩০০ মিটার বা ১০০০ ফুটের বেশী অর্ধেক উচ্চতায় আপনি না ঘুমান। মাথা ব্যাথা প্রাথমিক লক্ষণ, ডিহাইড্রেশান তারপর আক্রমণ করবে বমিভাব, খাবারে অরুচি, চরম ক্লান্তিভাব, ঘুম না আসা, ঝিমঝিম ভাব, দ্রুত পালস বেড়ে যাওয়া, অস্বস্তিবোধ করা যা পরবর্তীতে পালমোনারী এডিমা (ফুসফুসে পানি) ও সেরিব্রাল এডিমা (মস্তিকে অস্বাভাবিক আচরণ) মারাত্মক অবস্থানে নিয়ে যায়। যদি কেউ এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় তার জীবন বাঁচাতে করণীয় বিষয়গুলো দ্রুততায় অবলম্বন করা উচিৎ নতুবা মৃত্যু দ্রুত গ্রাস করবে। অসুস্থ হলে কেউ, তাকে দ্রুততায় সমতলের দিকে আনতে হবে মারাত্মক আকার ধারনের আগেই। হেলিকপ্টার ইভাকুয়েশান অনেক ব্যায়বহুল হলেও এটা ছাড়া দ্রুত সমাধান আর নেই। এই অঞ্চলে ফেরিচেতেই একটি মেডিক্যল সেন্টার আছে যেখানে AMS’র চিকিৎসা হয়। হিমালয়ান রেসকিউ এসোসিয়েশান ও এভারেষ্ট মেমরিয়াল ট্রাষ্ট কর্তৃক সৃষ্ট এ হাসপাতালে পর্বতারোহী অভিযাত্রীদের জন্য একটি বিশাল সুবিধা এনে দিয়েছে। ১৮০১০ ফুট উচ্চতায় এটি অভিযাত্রীদের চিকিৎসা সেবার পাশাপাশী AMS সম্পর্কে ফ্রি লেকচার ক্লাসের আয়োজনও থাকে যেখানে অভিযাত্রীরা উচ্চতাজনিত অসুস্থতা ও প্রতিকার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান নিয়ে যেতে পারে। AMS আক্রান্তদের চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অক্সিজেন দেয়া যেতে পারে, এছাড়া গামাউ ব্যাগ যা বহনযোগ্য হাইপরে ফ্যাবরিক চেম্বার বিশিষ্ট যেখানে অলটিচিউড ৫০০০ ফুট পর্যন্ত কমিয়ে আনা যায় তবে শুধু রেসকিউ-এ এটা ব্যবহার হয়। আগেই বলেছি এসিমক্স/ডায়ামকক্স (এক্টাজোলোমাইড) সহায়তা করে শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় রাখতে, উপসর্গগুলো হ্রাস করে, অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়। পেরু, বলিভিয়ায় কোকো পাতা হতে তৈরী চা AMS উপশমে ব্যবহৃত হয়। আর মারাত্মক ক্ষেত্রে ষ্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধানে ব্যবহৃত হয়। যেখান থেকে AMS সর্ম্পকির্ত জ্ঞনগর্ভ আলোচনায় শুরু ফিরে আসি আবার, কবর গুলো এপিটাফে এলিজিতে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো।

এই সব অভিযাত্রীদের দূর্ভাগ্যের পরিণতি দেখে আর আকাশ ও আবহাওয়ার লক্ষণ মন খারাপের উপর তুলির প্রলেপ দিয়ে জলরং আঁকার প্রস্তুতি নিচ্ছে বুঝতে পারলাম। একে ওকে জিজ্ঞাসা করি লেবুচে কতদূর বলে এক ঘন্টা মানে আমার জন্য দুই ঘন্টার উপর। এখন নামতে হবে। দূরে দেখা যাচ্ছে বরফের উপর দিয়ে অভিযাত্রীরা গোকিয়ে লোক, চোলা পাস থেকে লেবুচে আসছে। অদ্ভূত দৃশ্য সেটা বর্ণনার যদি শক্তি থাকতো আমার তবে তা সত্যিকারে তুলে ধরতে পারতাম। নামার মুখে দেখলাম একজন শক্ত সার্মথ্য লোককে দুজন ধরে এগিয়ে নিয়ে আসছে, ক্রমাগত দাঁড়িয়ে পড়ছে আর বমি করছে। আহা বেচারা, দ্রুত উচ্চতা হ্রাস করে অসুস্থতা কমানোর চেষ্টা চলছে। এই ভয়ংকর পথ আর কত দ্রুততায় কমানো যায়। আমার চারপাশের মানুষ কমছে অনেকটা নেমে এলাম ঐ ভয় জাগানো পাহাড় থেকে। ঘন অন্ধকারের মেঘ কিছুটা কমলো আলোর রেখায় আমি এগিয়ে যেয়ে আবার এক শেরপাকে জিজ্ঞাসা করলাম কতদূর লেবুচে একই উত্তর এক ঘন্টা তবে যে এক ঘন্টা হেঁটে এলাম এর মাঝে! চিন্তিত হয়ে পড়ি আবহাওয়ার পরিবর্তনে, চিন্তা বাড়ে গায়ে ডাউন জ্যাকেট বা রেইন কোট কিছুই নেই। সব খুলে পেশালকে দিয়ে দিয়েছি ওজন কমিয়ে নিজের আরামে। মোহময় দৃশ্যগুলো এখন দুঃসহ লাগছে। ঘাসের গুড়োর মতো পেছন থেকে গায়ে এসে লাগছে, এর নামই ফ্লুরিস। হয়তো যথার্থ পোশাক থাকলে উপভোগ করতাম কিন্তু ভয় চেপে বসলো, আর সাথে সাথে শুরু হলো তুষারপাত, ধীরে ধীরে মাত্রা বাড়ছে, আশে পাশের সবার গায়েই ডাউন জ্যাকেট আমি তেমন কিছুই পড়িনি শুধু আইস প্যান্ট ছাড়া, ভয় চেপে ধরেছে আমাকে যেন সব মানুষ জন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলে আর এই গ্লেসিয়ারের উপর পথেরও নিশানা নেই যে নিশ্চিন্তে হেঁটে যাব। সিদ্বান্ত নিলাম হাঁটা থামাবো না যতই ক্লান্তি ভর করুক। অসুরের শক্তিতে এগিয়ে যাবোই সামনে দ্রুত। প্রচন্ড তুষারপাতের আঘাত গায়ে বর্ষার ফলার মতো বিঁধছে চোখে সানগ্লাস ছিল বলে রক্ষা।

আমি প্রাণপণে এগিয়ে চলছি হঠাৎ হঠাৎ দু-এক জন দৌড়ে যাচ্ছে তাদের থামিয়ে পথ সম্পর্কে নিশ্চিত হই। হাত পুরোপুরি অসার হয়ে আসছে উলের হাত মোজা কোন কাজে আসছে না, মাথাও ঠিকমতো কাজ করছে না এই বিপদে। ঠান্ডায় আমার সব জমে যাচ্ছে, তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেঁটে যাচ্ছে উপায়ও নেই পানি বের করে খাবো, দ্রুত এগুচ্ছি, পুরো শরীর অসার হবার আগে যতটা এগিয়ে যাওয়া যায়। একটু আগের কবরের দৃশ্য মনে এল আফসোস হলো এখানে মরলে তো আমার ঢাকা মেডিক্যালে এ দান করা দেহ অতদূর পৌঁছুবে কে। পাথরের নিচেই চাপা দেয়া হবে, তবে যদি লিখে যেতে পারতাম এপিটাফের এলিজি, চমৎকার হতো তবে। আর পারছি না হাঁটু মুড়ে যাচ্ছে মনের জোর আর আমাকে টেনে নিতে পারছে না সামনের দিকে। মাউন্টেন স্টিক দুটোর উপর যতটা শক্তি দিয়ে ভর করা যায় দিয়ে চেষ্টায় মত্ত আমি, হেরে যাওয়া যাবে না এই শেষ মুহুর্তে। চোখেও ঠিক দেখছি বলে মনে হচ্ছে না ঠান্ডার দাপট আমার শরীরের দাপটকে পরাস্ত করে মনের দাপটে চরমভাবে আঘাত হানছে সেই মুর্হুতে দূরে একটা মূর্তির ছায়া দেখে মূহুর্তেই আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। দৌড়ে আসছে পেশাল ডান হাতে আমার ডাউন জ্যাকেট এর প্যাকেট। শরীরও যেন মূহুর্তে চাঙ্গা হয়ে উঠলো আমি যেন কয়েকগুণ শক্তিতে সোজা হয়ে দাঁড়াই। পেশাল ছুটে এসে ডাউন জ্যাকেট খুলে দেয় আমাকে, যেন দেবদূত আমার জীবন রক্ষায় ছুটে এসেছে। দ্রুত জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে কান, মাথা ঢাকি। তুষার ঝড়ের মাত্রা কমেছে। শরীর কিছুক্ষণের মধ্যে অসাড়তা কাটিয়ে উঠলো। পেশাল এর সাথে হাঁটা ধরলাম, এ যাত্রায় তবে রক্ষা হলো। শুনেছিলাম এভারেষ্ট অঞ্চলে আবহাওয়া যে কোন মূহুর্তে বদলে যায়, ভয়াবহ আকার ধারণ করে, আজ করুণভাবে সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে বুঝলাম কেমনতর সেই ভয়াল মূহুর্ত যা আমাকে নিজের এপিটাফের এলিজি নিজেই রচনা না করে যাবার হতাশায় নিমজ্জিত করেছিলো।

দূরে দেখা যাচ্ছে লেবুচে পিক আর নিচে মাত্র দু-তিনটে ঘর। ছোট্ট একটা মাঠে কয়েকটা তাবু আর তার পাশে ইয়াক ও ঘোড়া দাঁড়িয়ে। ওদের দিকে তাকিয়ে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হলো। এই অল্প পথটুকু কত দূর মনে হয়। পুরো শরীরে আবার অবসন্ন বোধ করি, আগেই পেশাল এর কাছে ক্যামেরার ব্যাগ হস্তান্তর করে দিয়ে ছিলাম। লজে যখন ঢুকছি শেষ বিকেলের রৌদ্দুর উঁকি দিচ্ছে তুষার ঝড় শেষ করে। পুরো এভারেষ্ট ভ্রমণে এই লেবুচের লজটিই তেমন পছন্দ হলো না, কেমন একটা গন্ধ, ইয়াক এর চিজ মুখে দিয়ে যেমন গন্ধ পেয়ে ছিলাম ঠিক তেমনটা। আমেরিকান ডাক্তার গ্রুপ যে লজে উঠেছে ভাড়া বেশ কিছুটা বেশী, আমি যদিও আগ্রহী ছিলাম ওখানে উঠি কিন্তু পেশাল মনে রেখেছে যে আমি বলেছিলাম দরিদ্র দেশ থেকে এসেছি, আমাকে ইউরোপীয় আমেরিকানদের মতন দামী লজ এ নিয়ে উঠিও না। তাই জোর করে এ লজেই রাখলো আমাকে। বুট ভিজে গেছে, গা হাত পাও ক্লান্তিতে ভেজা, একটু ঝেড়ে নেই। রুমে ঢুকে মনে হলো কখন বের হবো। নেমে এলাম ডাইনিং হলে গরম বাতাসের লোভে, এসে দেখি এখনো চুলো জ্বলেনি। তাই বেরিয়ে পড়ি বাইরে।

ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আমেরিকান ওয়েলডান এসেসিয়েসান এর বড় গ্রুপ এসেছে বলেছি, তাদের মাঝে ডা: বানু বেশ সজ্জ্বন মহিলা, উনি আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন ঐ লজটাতে। নামটা বড় সুন্দর ‘মাদার আর্থ লজ’ ধরীত্রি মাতা লজটি দোতালা, ডাইনিং বেশ বড় আর আধুনিক, চমৎকার উষ্ণ, আমার তো বের হতে ইচ্ছা হচ্ছিলো না। এখানেও ফোন নেটওয়ার্ক এর সমস্যা। এই গ্রুপ এর প্রধান একটু উঁচুতে উঠেছেন তুষার উপেক্ষা করে কারণ আজ তার বিবাহবার্ষিকী, স্ত্রীর সাথে কথা বলার চেষ্টা তার। আমি ও অভিনন্দন জানিয়ে সন্ধ্যার মুখে ফেরত আসি আমার কালাপাথর লজ-এ। এখন ডাইনিং হল সরগরম চুলার উত্তাপ আর মানুষের ভীড়। র্জামান দলের সাথে আবার দেখা, কুশল বিনিময়। ভাব জমে উঠলো পোল্যান্ড এর একটি তরুণ দলের সাথে যারা গোকিয়ো লেক ও চোলা পাস ঘুরে এখন কালাপাথর যাবে কিন্তু বেইস ক্যাম্পে যাবে না। অসম্ভব প্রাণশক্তিতে ভরা এরা, আমার মতো র্দূবল নয়। ডায়ামক্স কেন খাওয়া উচিৎ নয় এ নিয়ে আমাকে জ্ঞান দিল একজন। এই যে তরুণ তরুণীরা এসেছে একসাথে, হল্লা করছে ঘুরছে, কার সাথে কি সর্ম্পক মুখ্য নয়, ধর্ম মুখ্য নয়, শুধুই বন্ধুত্বও নয় কিন্তু কি চমৎকার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাবে আর আজীবনের সমৃদ্ধির খোরাক পাবে।

বাঙালীরাও বদলাচ্ছে কিন্তু খুব ধীরে। খাবার মোটামুটি কিন্তু অমন ক্লান্তিময় তুষার ঝড়ে বিধ্বস্ত আমার কাছে ভালোই লাগলো বেশ। পরদিন কখন রওনা হওয়া উচিৎ এ নিয়ে র্তক হলো। কেউ কেউ যুক্তি দেখাচ্ছে আলো ঠিক মত না ফুটলে বেরুনো উচিৎ নয় কারণ তুষার ঝড়ে পথ ঘাট বেশ পিচ্ছিল হয়ে রয়েছে। আর আমি ভাবি পথ কই সবই তো বড় বড় পাথরের চাই। খুম্বু গ্রেসিয়ারের পথ ঘেষে লেবুচে গ্রাম সন্ধ্যের অন্ধকার নামার সাথে সাথেই নিস্তব্ধ। জানালা খুলে লেবুচে পর্বতের চূড়ার দিকে তাকাই বিছানায় স্লিপিং ব্যাগে ক্লান্তিভরা শরীরটা গুজে দিতেই ঘুম চলে আসে।

 

[চলবে]

 

 

 

 

 

মারুফ কবিরের সব লেখা ও এই ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত