| 14 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

সবুজ কার্ড

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট

স্কুল যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল কবিতা। বুকুন ডাকল ‘ মা দেখে যাও তাড়াতাড়ি’। বলল বটে, কিন্তু মার যাওয়ার অপেক্ষা করল না, অধৈর্য পায়ে চলে এল ভেতরের ঘরে, যেখানে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির প্লিট ঠিক করছিল কবিতা। এরপর চুলটায় একটু চিরুনি ছোঁয়ানো আর আয়নার গায়ে লাগানো  টিপের রাশি থেকে একটা  নিয়ে ভুরুর মাঝখানে বসিয়ে দেওয়া। আজ সেটুকু করতেও টেনশন হচ্ছিল। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। কথাকলি কিন্ডার গার্টেনে এতক্ষণে কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেছে। তার মধ্যে বুকুন আবার ঘাড়ের কাছে এসে জ্বালাচ্ছে ‘ মা দেখো দেখো’। কবিতা মুখ না ফিরিয়েও বুঝতে পারছিল নির্ঘাত মোবাইলে কিছু দেখাতে এসেছে। একটা কিছু দেখলেই মাকে না দেখিয়ে শান্তি নেই ছেলের। নায়াগ্রা ফলসের ভিডিও, বিশ্বের সবচেয়ে বেঁটে মেয়ের ছবি, কিংবা টাইগার সাফারিতে গিয়ে বাঘের হাতে মরার নির্মম দৃশ্য। তাছাড়া ফেসবুকে পিপল ইউ মে নো- তে রোজই  সে এক বা একাধিক চেনা মুখ খুঁজে পায়, আর পেলেই উত্তেজিত হয়ে  ছুটে আসে মাকে দেখাতে। কবিতা ভাবল সে রকম কিছু। সে বিরক্ত গলায় বলল ‘ এসে দেখব। এখন সময় কোথায় তাই ক। কত দেরি হয়ে গেছে আজ’ বলতে বলতে আয়না থেকে টিপটা কপালে লাগিয়ে দেওয়ালে ঝোলানো ব্যাগটা টেনে নেয় কবিতা। বাসা থেকে বেরিয়ে একটা গলিপথ ধরে গিয়ে একটা মস্ত পুকুর, পুকুরের পাশে বড় বড় পাম গাছের সারি, সেটা পেরোলেই কথাকলি কিন্টার গার্টেন। যেতে পাঁচ মিনিটও লাগে না, কিন্তু দেরি হয়ে গেলে সেই পথটুকুই হাজার মাইল মনে হয়। বারান্দায় রাখা জুতোর র‍্যাক থেকে চটি পায়ে গলাতে গলাতে কবিতা বলল ‘নাস্তা ঢাকা রইল, খেয়ে নিস। আর কোথাও বেরোলে চাবিটা মুনিরা আপার কাছে রেখে যাস’

বুকুন ওসব কথায় কান না দিয়ে ওর মোবাইলটা কবিতার চোখের সামনে তুলে বলল ‘ মা দেখো মামা’

মামা! শুনেই কবিতার বুকটা ধক করে উঠল। ফেসবুক  অ্যাকাউন্ট খুলেই তমালকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল বুকুন। তমাল তা অ্যাক্সেপ্টও করেছে। তারপর থেকে বুকুনের মাধ্যমে ওদের কানাডার বাড়ি, গাড়ি, বাচ্চার ছবি দেখতে পায় কবিতা মাঝে মাঝে। বুকুনকে কষ্ট দেবে না বলেই দেখতে হয়, কিন্তু প্রতিবারই বুকের মধ্যে একটা তীব্র কষ্ট হয়। সেটা গোপন করে বলল ‘নে দেখা কী দেখাবি’

দেখাল বুকুন হাসি মুখে। ‘এই দেখো মামা মামী, এষা ঈষা। চারজন। হাতে কী ধরে আছে দেখেছ’?

চশমা ছাড়া ভাল দেখতে পায় না কবিতা, সে আবছা আবছা দেখল তমালরা চারজন বিজয় পতাকার মতো কী যেন উঁচু করে ধরে আছে।

‘কী রে? ভালো দেখা যাচ্ছে না’

‘আরে গ্রিন কার্ড। মামারা গ্রিন কার্ড পেয়ে গেছে এতদিনে। তাই হাতে করে ফেসবুকে পোস্ট করেছে।’ ঝলমলে মুখে বলল বুকুন।

গ্রিন কার্ড!

‘আবার জিগ্যেস কোরো না গ্রিন কার্ড  কী। আচ্ছা যাও, তাড়াহুড়ো করো না। বলছি একটা বাইক কিনে দাও। তাহলে আমিই রোজ পৌঁছে দিয়ে আসতে পারতাম’।

কবিতার কানে কিছু ঢুকছিল না।  চট্টগ্রামে ঢোকার আগে সীতাকুণ্ডতে তাদের বাসা। এই বাসার বারান্দা থেকে চন্দ্রনাথ পাহাড় দেখা যায়। চন্দ্রনাথ এখন  সবুজে সবুজ সদ্য বরষার জল পেয়ে। ওখানে একবার নজরুল এসেছিলেন। রচনা করেছিলেন ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’।

ওখানে  অনেকবার গেছে   কবিতা। তমালকেও নিয়ে গেছিল  একবার। ঝরণাটা শুকিয়ে গেছে, তবু কি সবুজ চারপাশ। কিন্তু এখন   সব সবুজ ছাপিয়ে অন্য একটা সবুজ তার চোখে ভাসছিল।

নলসোঁদা গ্রামের সামনে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে করুটিয়া কলেজের দিকে। সে রাস্তায় অন্য দিন কত কলরবলর, হাসি, ফাত্রামো। আজ, শুধু আজ কেন, গত কয়েকমাস ধরেই সব শুনশান। কলেজ পড়ুয়াদের ভিড় নেই । যারা একান্ত বেরোয়, পেট চলে না বলেই বেরোয়। জানলা দিয়ে দেখে জ্যোৎস্না কাজের ফাঁকে ফাঁকে, আর ভাবে এই সময়ে ময়মনসিংহ  থেকে এখানে না এলেই ভালো হত। সেখানে বাবার কত নাম ডাক , ডাক্তার হিসেবে প্রভাব প্রতিপত্তি,  ৬ নম্বর নাটক ঘর লেনের বাড়িটাতে ঢুকে পড়লেই হল, সেখানে কেউ ছুঁতে পারবে না তাকে। কিন্তু শাশুড়ি সেসব বুঝলে তো? বংশের প্রথম নাতি, তাকে না দেখলে নাকি তাঁর প্রাণটা ফাঁতফাঁত করে।  অথচ এই তো সবেই অন্নপ্রাশন দিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে গেল বাবার বাড়ি। সেখানে দুদিন জিরোতে না জিরোতেই ঘন ঘন তলব।  এখুনি চলে এসো নাতিকে নিয়ে, নাতির মুখ না দেখে থাকতে পারছেন না আঙুর। সেই খবর নিয়ে বারবার আসছিল সেজ দেওর সুবল।

সুবল কিছুদিন ছায়াবাণী সিনেমা হলে  টর্চ দেখাত, থাকত এখানেই কাদু পিসিমার বাসায়। তখন সে প্রায়ই জ্যোৎস্নার বাবার বাড়ি রাতে খাবার নিমন্ত্রণ পেত,  এখন ময়মনসিংহ ছেড়ে যাবার পরেও তাই  বউদির বাবার বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগের সে-ই মূল সেতু। খবরাখবর দেওয়া হোক, কিংবা জ্যোৎস্নাকে বাবার বাড়ি দেওয়া নেওয়া করা হোক। অন্নপ্রাশনের পর সুবলই  রেখে গেছিল জ্যোৎস্নাকে  কবু সবু আর তমু সুদ্ধু। পনেরো দিন পেরোতে না পেরোতে সেই আবার এসে হাজির হল আঙ্গুরবালার জরুরি তলব নিয়ে। দেশের পরিস্থিতি খুব খারাপ। কবে কখন কি হয়ে যায়। মরার আগে নাতির মুখ দেখে যেতে চান আঙুর। পরিমল কী ভাবছে এ ব্যাপারে তা জানার উপায় নেই কোন। মির্জাপুর হসপিটালে ব্যস্ত ডাক্তার সে। ছুটি মেলে না সহজে। আর খুবই সম্ভব এসব মেয়েলি প্যাঁচাল তার কানে আদৌ তোলেননি আঙুর, তোলার প্রয়োজনইি মনে করেননি, এত বিপদের মধ্যে বৌমা আর নাতিকে টেনে নিয়ে আসতে পারতেন না  তিনি পরিমল জানতে পারলে। জ্যোৎস্না তবু বুদ্ধি করে কবু আর সবুকে রেখে এসেছে মায়ের কাছে। নাতনিদের ওপর আঙ্গুরের আদৌ টান নেই। মেয়ে সন্তান তো। ওদের মুখ না দেখে মরলেও তাঁর চলবে।  

মায়ের ওপর কথা বলার সাহস নেই সুবলের, তবু বউদি আর ভাইপো ভাজতিদের সে খুব ভালবাসে, আর বাসে বলেই মার আদেশের পাশাপাশি সে ফিসফিসিয়ে বলে ‘ মা যাই কইয়ুক, আপনি যাইয়েন না বউদি, এ তাও টাউন এলাকা, আর সগগলে তাউই মশাইয়ের পেশেন্ট, এইহানে আপনাগো গায়ে কেউ আঁচড় দিব না। আর অইহানে গ্রামের মধ্যে রাজাকার এলে কোথায় যাইবেন? আর বাড়ির লগে করুটিয়া কলেজ, তার অর্ধেক রাজাকারদের সঙ্গে, আর অর্ধেক মুক্তিযোদ্ধা।  আপনারে কেমনে বাঁচাব তাই কন?’

বলে জ্যোৎস্নার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সুবল। তার এই মেজবউদিকে অবিকল সুচন্দ্রার মতো দেখা যায়। ছায়াবাণীতে লাইট দেখাতে দেখাতে পরদায় যে সুচন্দ্রাকে দেখত সে। মার অবিবেচনা সেই মেজবউদিকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। কিছু করতে না পেরে তার বুকে উথাল পাতাল করতে থাকে। জ্যোৎস্না বাবার দিকে চায়, ভাবে বাবা নিশ্চয় বাধা দেবে যেতে। বলবে ‘ যাইয়া কাজ নাই দুধের বাচ্চা নিয়া আগুনের মধ্যে। শাশুড়ি কইলেই তো হল না।’ কিন্তু জ্যোৎস্নাকে অবাক করে দিয়ে নির্মল ডাক্তার বলেন ‘ যাও মা, শাশুড়ি কইসেন যখন। কবু সবু থাক।’   অভিমানে জল এল চোখে, কিন্তু তাও সে বুঝতে পারল বাবা কেন একথা বললেন। ছেলে সন্তান রাখার ঝুঁকি তিনি নিতে চান না, যা হবে তাদের ওখানেই হোক। কবু সবু তো মেয়ে, ওদের প্রাণের আর মূল্য কী? বুঝে চুপ করে গেল জ্যোৎস্না। এটা তো ঠিক, দুই মেয়ের পর অনেক সাধের এই ছেলে, বাবার কাছে থেকে তার কিছু হয়ে গেলে বাবা মুখ দেখাবেন কী করে? সুবলও কিছু বলল না তাউই মশাইকে। তবে সে তার মতো করে চেষ্টা করল একটা।  ময়মনসিংহ বাজার থেকে একটা বুরখা কিনে নিয়ে এল জ্যোৎস্নার জন্যে, আর নলসোঁদা অব্দি আসতে আসতে জ্যোৎস্নাকে কলমা পড়া শিখিয়ে দিল।

‘মেজবউদি কন দেখি লা-ইলা –হা ইল্লাল্ললাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’

জ্যোৎস্না তো হেসেই খুন। ‘এর মানে কী ঠাউরপো?’

সুবল বলে ‘হাইসেন না, এইডা খুব পবিত্র কথা। ভাষাটা আরবী। এর মানে হল আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই, হজরত মুহাম্মাদ তাঁর প্রেরিত রসুল। এইডা মুখস্থ করেন, আরও পাঁচখান শিখাইব’

দ্বিতীয় কালেমাটা আরও বড়। আশহাদু আল-লা –ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু অয়াহদাহু লা- শারীকালাহু অয়া আশহাদু আল্লা মুহাম্মাদান আব্দুহ ও ইয়া রাসূলুহু। এর মানে আর জানতে চাইল না জ্যোৎস্না। সুবল নিজেই বলল – আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও প্রেরিত রাসুল’

অনেক কষ্টে প্রথম কলমাটা মনে ছিল । এই কলমার জোরেই সে যাত্রা  জ্যোৎস্না ছেলের প্রাণ বাঁচাতে পারে। বড় দুর্মূল্য সেই প্রাণ এখন সবুজ কার্ড ধরে আছে দেখল কবিতা।

মার মুখে শোনা। সেসময় তো সে আর দিদি মামাবাড়ি ময়মনসিংহে । ভাইকে নিয়ে মাকে চলে যেতে হল নলসোঁদা। ঠাকুমার বার বার ডাক আসছিল। সেখানে যাবার পর ঠাকুমা ভাইকে নিয়ে রইলেন, মাকে মুখ বুজে সংসারের কাজ করে যেতে হল। ঠাকুমা ভাইয়ের কোন কাজ মাকে করতে দিতেন না।

ভাইকে বুকে করে রেখে দিতেন। ভাইয়ের জন্যে এক ঘটি সাবু সবসময় তৈরি থাকত, কখন রাজাকাররা আসে আর পালাতে হয় । কিছুই নেওয়া যাবে না তখন, শুধু বুকে ওই দুধের শিশু আর হাতে সাবুর ঘটি। তাদের নলসোঁদা বাড়ির পেছন দিকে একটা বড় পুকুর, ওই পুকুরে নাকি বাবার ছোট ভাই, ছ বছর বয়সে জলে ডুবে মারা গেছিল। তাই ঠাকুমা একেবারেই যেত না ওই পুকুরে, পাশের একটা ছোট পুকুরে জলের কাজ সারত। সে পুকুরটা ডোবাই বলা চলে, কিন্তু আশে পাশে গাছপালা কম, সূর্জের আলো পায়, তাই জলটা ভালো। যদিও মা যেত পেছন পুকুরে, এখানে আড়াল ছিল অনেক গাছপালার কারণে। আর এই পুকুরের পর থেকেই জংগলের শুরু। লোকে বলত পাকুড়ার বন। এই পাকুড়ার বনেই লুকিয়ে থাকবে ভেবেছিল ঠাকুমা। ঠাকুমার মনে একটা ক্ষীণ আশা ছিল লৌহ জংগ নদী ওদের সুরক্ষা কবচ। ঠাকুমার মতো সবাই ভেবেছিল, যা গণ্ডগোল কেবল ঢাকাতেই, এত নদীনালা পেরিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা গ্রাম গুলোতে আসতে পারবে না। কিন্তু অচিরেই দেখা গেল সে ধারণা ভুল, দুর্গম গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে খান সেনা। নলসোঁদার মতো গ্রামও তাদের নাগালের বাইরে থাকছে না। সেদিন সকালে মুড়ি লাড়ু খাবার পর শাক বাছতে বসেছিল জ্যোৎস্না। আজ রসুন কালো জিরা দিয়ে শাক, মাসকলাইয়ের ডাল আর  গন্ধপাতার বড়া করতে বলেছেন আঙুর। মাছ এ বাড়িতে কমই হয়। হলেও ছোট মাছ। বেলার দিকে বাজার থেকে ছোট মাছ আনে শ্বশুর, অনেক সময় তার মধ্যে বেশ নরম মাছ থাকে, সেগুলো  ভালো করে ধুয়ে নুন হলুদ মাখিয়ে রান্না শেষের মরা আঁচের ওপর বসিয়ে রেখে  শুকোন আঙুর। তারপর বিশেষ বিশেষ দিনে অতিথি সমাগ মে, অথবা দীর্ঘ মাছহীন মাসের পর এক আধ দিন কৃপা করে সেগুলো বার করে চচ্চড়ি বা রসা করার নির্দেশ দেন। আজ সেরকম কিছু হবার লক্ষণ নেই। নিরামিষ তিন পদ করার নিদান দিয়ে আঙুর তমুকে উঠানে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কলা চটকে খাওয়াচ্ছেন।  জ্যোৎস্নার বুক দুধের ভারে টনটনিয়ে ঊঠলেও তমুকে দুধ খাওয়াবার উপায় নেই তার। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোও শাশুড়ির নির্দেশে। শাক বাছতে বাছতে  জ্যোৎস্না ভাবছিল তার বাকি বোনগুলোর কপালে এমন শাশুড়ি পড়েনি। তার মতো এত খাওয়া পরার কষ্টও কারো নেই। জামাইবাবুরা পরিমলের মতো ডাক্তার না হোক, সাধারণ চাকরি বা ব্যবসা করে সব, কিন্তু বাড়ির অবস্থা এত হাঘরে নয়, যে মাছ শুকিয়ে আর পুকুর ধার থেকে লতাপাতা কুড়িয়ে খেতে হবে। ময়মনসিংহতে তার বাবার বাড়িতে তারা তিন বেলাই মাছ দিয়ে ভাত খায়। তাও বড় বড় মাছ। ছোট মাছ চচ্চড়ি ছাড়া ভাবতেই পারে না। এইসব সাত পাঁচ ভেবে কান্না পাচ্ছিল তার। চোখের সামনে শাশুড়িকে ঘুরতে দেখে আরও অসহ্য লাগছিল। অন্য অন্য সময় শাশুড়ি বাচ্চা নিয়ে এর ওর বাড়ি চলে যান, পান চাবাতে চাবাতে পড়শির ঘরের খবর যেমন নেওয়া যায়, তেমনি জ্যোৎস্নার দুর্নাম গাওয়াও যায়। জ্যোৎস্না কোন কাজ পারে না, ওর স্নানের জন্যে জল তুলে দিতে হয় সুবলকে, ওর জন্যে বাড়ির পেছনে একটা আড়াল করে দিতে হয়েছে দরমা দিয়ে, পাতে মাছ না দেখলে জ্যোৎস্নার মুখ কালো হয়। কথা গুলো সবই  সত্যি, আঙ্গুরের নিরিখে। এর জন্যে বাবা ছাড়া আর কাকেই বা দায়ী করবে জ্যোৎস্না? বাবা তো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছেন, তাঁর বিচারে পরিমল একরোখা ছেলে, ও জীবনে অনেক উন্নতি করবে, তাছাড়া তাঁর কথায় ডাক্তারের কোথাও ভাতের অভাব হয় না।

বিয়ের পরদিন চলে আসার সময় তিনি জ্যোৎস্নাকে আড়ালে ডেকে বলেছিলেন ‘ মা, একটা কথা কই। শ্বশুরঘর কুন মেয়ের ভালো হয় না, ভালো কইরা নিতে হয়। যখনি কারো কথায় কষ্ট পাবা মুখ ফুইটা কিছু জবাব দিবা না। রাগ হইলে মাটির দিকে চাবা। মাটি কত সহ্য করে কও দেখি’। মাটির দিকেই তো চেয়ে থাকে জ্যোৎস্না। আর কত চাইবে? তার চোখের জলে তো মাটি ভিজে গেল , আর সেখানে এখন চাপ চাপ রক্ত। বুকটা ফাঁত ফাঁত করে উঠল। কবু সবু ভালো আছে তো? বাবা, মা ভাইবোনেরা? রোজই চারদিক থেকে খারাপ খবর আসছে। হঠাৎ একটা চিৎকার ভেসে আসে। ঠিক চিৎকার নয়, একটা রে রে আওয়াজ, মেয়ে গলার আর্তনাদ, কান ফাটানো গুলির শব্দ, কোথা থেকে দৌড়ে এল সুবল, আতঙ্কে ওর চোখ ছিটকে বেরিয়ে আসছে। এসেই বলল ‘বউদি, শাক থোও, পলাইতে হইব, তমুকে কোলে নিয়া পাকুড়ার জঙ্গলে লুকাও’  তখনো আঙুর তমুকে কোলছাড়া করতে চান না। সুবল তাঁকে এক ধাওয়া দিয়ে বলে ‘ তমুকে মারতা চাও? বউদি যত জুরে ছুটবে তুমি পারবা?’ সেই ধাওয়া খেয়ে আঙুর তমুকে জ্যোৎস্নার কোলে দিলেন, আর জ্যোৎস্না বঁটি শুইয়ে রেখে কোন দিকে না চেয়ে সোজা ছুটল পাকুড়ার জঙ্গলে। পড়ে রইল শাক, গন্ধভাদালি পাতার রাশ। পড়ে রইল উনুন হাঁড়ি পাতিলের অকিঞ্চিৎ সংসার। উঠানে বসার মাচা, চালে লতানে কুমড়ো লতা। যেন রূপকথার কোন দেশ, যেদিকে তাকাও, কেউ নেই। কুকুর বিলাই অব্দি চোখে পড়ে না রাস্তায়।

জঙ্গলে ঢুকে বুক ধড়াস করে ওঠে জ্যোৎস্নার।  দিনের বেলাতেই যেন রাত নেমে এসেছে। বড় বড় গাছ ঘিরে আছে। এখানে খুব দুঃসাহসীরাই আসে। কারো হয়তো আশনাই চলছে, কেউ গরুর জন্য ভালো ঘাস চায়, কাঠকুটো সংগ্রহ করতেও আসে কেউ কেউ। কিন্তু সেজন্য বুক কাঁপেনি জ্যোৎস্নার। তমুর সাবুর ঘটিটাই তো সে ফেলে এসেছে। এখানে কতক্ষণ আটকে থাকতে হবে কে জানে। ছেলেকে কি খাওয়াবে সে? ভাবতেই মাথা টলে যাচ্ছিল তার। গাছের গুঁড়িটায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সে দেখল পাশের পাকুড় গাছের নিচে আঙুর দাঁড়িয়ে, তাঁর হাতে সাবুর ঘটি।। কৃতজ্ঞতায় চোখে জল এল। একটু সুস্থির হল সে। কিন্তু আঙ্গুরের বাঁ হাতে পুটলি মতো ওটা কি? জ্যোৎস্নার তাকানো বুঝে আঙ্গুর ইশারায় কান গলা হাত দেখায়। ওমনি জ্যোৎস্না বুঝে যায় ওগুলো গয়না, আর তারই গয়না। বাবা সব মেয়েকেই বিয়েতে ২০ ভরি করে গয়না দিয়েছেন। জ্যোৎস্নার বেলায়ও তার অন্যথা হয়নি। সেই গয়নার প্রায় পুরোটাই এখানে এই নলসোঁদায়। তমুর মতো জ্যোৎস্নার গয়নার ওপরও দখল রাখতে চান আঙুর। তাই সবার আপত্তি সত্ত্বেও গয়নাগুলো ওঁর কাছেই থাকে এই অজ গাঁয়ে। আজ পালাবার সময় সব ফেলে এলেও গয়নার পুটুলিটি নিতে ভোলেন নি আঙুর। জঙ্গলের বাইরে ভারি বুট পরা পায়ের আওয়াজ, গুলির শব্দ আর্তনাদ এগিয়ে আসছিল। আঙুর তাড়াতাড়ি পুঁটুলিটি পাকুড় গাছের নিচে পুঁতে ফেলেন, ইশারায় জ্যোৎস্নাকে বলেন মনে রাখতে। পরে গিয়ে অনেক খুঁজেও সেই পাকুড় গাছটিকে চিনতে পারেনি, আর সেদিন ফিরে এসে শুনেছিল রাজাকাররা তাদের পাশের জ্যাঠা শ্বশুরের ভিটেয় এসে জ্যাঠা আর তার দুই ছেলেকে মেরে রেখে গেছে, জল চাইলে ওদের গলা দিয়ে খেজুরকাঁটা ঢুকিয়েছে আর বার করেছে।

আবার দাওয়ায় বসে শাক কুটছিল জ্যোৎস্না। শাক, ডাল আর উতছা ভাজি। এখন রোজই এরকম। মাছের  কোন সম্ভাবনা নেই এই চোদ্দ দিন। জ্ঞাতি মারা গেলে এইরকম  অশৌচ। শুধু খাওয়ার কষ্ট হলে এক ছিল। ঘাটে ওঠার সময় আঙুর একেবারে পাগল করে দেবেন, চাদর, মশারি, বালিশের উসার কাচতে কাচতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে।  তারপর চলবে বাড়ি ঘর ধুয়ে গোবর দিয়ে নিকোনোর পালা। ভাবলেই গায়ে জ্বর আসে। তবে ততদিন অব্দি বেঁচে থাকবে কিনা কে জানে। সারা দেশটারই তো এখন অশৌচ চলছে মনে হয় জ্যোৎস্নার। কে কার জন্যে নিয়ম মানবে? সবার ঘরই তো উজাড় হয়ে যাচ্ছে। কবু সবু যে কি করছে এখন? আর ওদিকে মির্জাপুর হসপিটালে মানুষটা যে কেমন আছে, সে খবর দীর্ঘদিন পায়নি জ্যোৎস্না। তার মনে হয় এখন সে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে যদি পরিমলের কাছে মির্জাপুর হসপিটালে থাকতে পারত? রণদাপ্রসাদ সাহার হসপিটালের মধ্যে ঢোকার সাহস আছে নাকি কারো? কত মানুষের সাহারা এই মির্জাপুর হসপিটাল। সেখানকার ডাক্তারদের কোন অভাব রাখেন না রণদা প্রসাদ। বিয়েওলা ডাক্তারদের জন্যে ফ্যামিলি কোয়ার্টার আছে। তমু হবার আগে সেখানে কিছুদিন ছিল জ্যোৎস্না। সেখানেই প্রথম সে কিছুটা নিজের মতো ঘরকন্নার স্বাদ পেয়েছিল, অন্তত প্রতিনিয়ত ঘাড়ের ওপর আঙ্গুরের নিঃশ্বাস পড়ত না। তাছাড়া পরিমল চেষ্টা করত জ্যোৎস্নার বাবার বাড়ির মতো মাছ আনার। জ্যোৎস্নারা ময়মনসিংহর বাড়িতে তিনবেলাই মাছ খেত। বড় মাছের রসা বা ঝাল, ছোট মাছের চচ্চড়ি তাদের বাঁধা ছিল। মির্জাপুরের কোয়ার্টারে অত না হোক,   অন্তত একরকম বড় মাছ  আনত পরিমল, তাছাড়া জ্যোৎস্নার সাহাজ্যের জন্যে ছিল সর্বক্ষণের কাজের বেটি, বাচ্চাদের দেখে রাখার জন্যেও ছিল আলাদা মহিলা। বলা বাহুল্য এরা সব হস্পিটালেরই স্টাফ, তাই এদের মাইনেও দিতে হত না, শুধু খাওয়া ছাড়া। সেই স্বল্পায়ু সুখের দিনের কথা ভেবে শাক কুটতে কুটতে  জ্যোৎস্না যখন কাঁদছিল, তখন আবার আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেই পরিচিত আওয়াজে তার হৃৎপিণ্ড ক্ষণিকের জন্যে যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর সে দ্রুত বঁটি শুইয়ে রেখে,ঘরে ঢুকে তোরঙ্গ খুলে বোরখা বার করে শাড়ির ওপর চাপাল, তারপর আঙ্গুরের কোল থেকে তমুকে নিয়ে আর উনুনের পাড় থেকে সাবুর ঘটি নিয়ে কারুর অপেক্ষা না করে পাকুড়ার বনের দিকে ছুট দিল।

সেদিন আর আগের দিনের মতো ভয় করছিল না ওঁর। বোরখা আর সাবুর ঘটি – এই দুই অস্ত্রে বলীয়ান জ্যোৎস্না অনেক শান্ত ভাবে প্রতীক্ষা করছিল অনিবার্জের । একটু পরেই ভারি বুটের শব্দ বাজল। শব্দটা এগিয়ে আসছিল। প্রাণ গলার কাছে নিয়ে সবাই অপেক্ষা করছিল। ওদের জানা সবচেয়ে নিরাপদ পাকুড়ার বনও আর নিরাপদ নয়- এই বিস্ময় বুঝি ভয়কেও ছাপিয়ে গেছিল। ওরা কি নল সোঁদা গ্রামের সব লোকেদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি ছিল? তা তো নয়। কিন্তু ওদের কাছে আছে আগুন ঝরানো বন্দুক। আর ছিল নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবার একটা অভ্যাস। বাংলাভাষীদের পায়ের তলায় পেষবার একটা সহজাত নেশা। জ্যোৎস্নার ক্ষীণভাবে মনে পড়ল কবু সবুর কচি মুখদুটো, মা বাবা, পরিমল সবার মুখ পরপর ঢেউয়ের মতো খেলে গেল। উদ্বেগ বা ভয় কিছুই হচ্ছিল না ওর, শুধু বোরখার আড়ালে থাকা শরীরটা কেমন অবশ অবশ লাগছিল।

একটা লম্বা চওড়া পাঞ্জাবী সেনা ওর সামনে এসে দাঁড়াল। পাকুড়ার বনের আধো অন্ধকারেও লোকটার বিশাল চেহারা আর চড়া ফরসা রঙ টের পাচ্ছিল জ্যোৎস্না। লোকটা ওর গায়ের খুব কাছে দাঁড়িয়ে ওকে জরিপ করছিল। আর সেই সময়টুকু মনে হচ্ছিল এক কল্প কাল। জ্যোৎস্নার গায়ের রঙ ধপধপা ফরসা। সেই রঙ আর বোরখা দেখে খসখসে গলায় সেই পাঞ্জাবি বলল ‘ মুসলমান হো?’ জ্যোৎস্না ঘাড় নাড়ল, তার মুখে কোন কথা বেরল না। পাশে আর একজন এসে বলল ‘ এ বাঙালি জাত বহত চুতিয়া। বুরখা তো বাজারমে বিকতা হ্যায়।   খরিদকে পেহনা কোনসি বড়ি বাত হ্যায়? বুরখা উতারকে তো দেখো। শালি উমদা চিজ মালুম হোতা হ্যায়’ বলে লোকটা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসল।

এইসব হিন্দি-মিন্দি জুবান মোটেই বোঝে না জ্যোৎস্না, কিন্তু হাসিটা বোঝে। তার এই প্রথম ভয় করল, হিম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল শিরদাঁড়া বেয়ে। আর ওমনি তার মনে পড়ে গেল কয়েকটা শব্দ, যার মানে সে জানে না। সেই দুর্বোধ্য শব্দমালাই সে আওড়ে গেল প্রাণভয়ে, তমুকে বুকে চেপে।

 লা-ইলা –হা ইল্লাল্ললাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।

শব্দগুলো ম্যাজিকের মতো কাজ করল। লোকদুটো কেমন থমকে গেল, তাদের মুখে একধরনের সমীহ আর শ্রদ্ধা ফুটে উঠল। নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় কিছু বলল তারা, তারপর প্রথম লোকটি হাল্কা করে তমুর গাল টিপে দিল। তার চোখে বিষাদ দেখল জ্যোৎস্না, তার মনে হল পশ্চিম পাকিস্তানে হয়তো সে তমুর মতো কোন বাচ্চা ফেলে এসেছে।

পরপর দুটো ক্লাস নিতে নিতেই টিফিনের ঘণ্টা পড়ে গেল। কবিতা বাড়ি থেকে চা রুটি খেয়ে আসে, টিফিন কিছু আনে না। এই স্কুলটা সরকারি না। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী মোস্তাফা কামালের দাক্ষিণ্যে চলে। তিনি মাঝে মাঝে বাচ্চাদের জন্যে কেক বিস্কিট পাঠান, টিচারদেরও জুটে যায়। টিচার অবশ্য মোটে দুজন, কবিতা আর সালেমা।  সালেমার বর আবু ধাবি থাকে। বাচ্চা কাচ্চা নেই। সময় কাটানোর জন্যে আসে সে, আর কবিতা আসে একটু বাড়তি পয়সা দিয়ে সংসারে সুরাহা করার আশায়।  বুকুনের বাবা, রাধারমণ একটা ছোট কারখানায় কাজ করে, তার একার আয়ে ভাত ডাল জুটে যায় ঠিকই, তার বেশি কিছু হয় না। বিশেষ করে এখন ছেলেমেয়েদের যা পড়ার খরচ। তাও তো দিদি মেয়েটাকে নিয়ে গেছে, নিজের কাছে রাজশাহী। জামাইবাবু রাজশাহী কলেজের অধ্যাপক। বৃষ্টিকে ওরা ডাক্তার বানাতে চায়। এত ভালো মাথা মেয়েটার। কবিতা অত স্বপ্ন দেখে না। তার চোখে ভেসে ওঠে পাকুড়ার বন, বুরখা পরা মায়ের কোলে তমু, সেদিন তার প্রায় পড়াশোনা না জানা মায়ের একটা অজানা ভাষা মনে রাখার জন্যে তমুর প্রাণ বেঁচেছিল, ডাক্তার হতে পেরেছিল সে। পড়তে পড়তেই রুনা চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ। রুনার বাবা  কার্তিক চৌধুরী নামজাদা ব্যবসায়ী, শাসক দলের  সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠতায়, তাঁর প্রাক্তন রাজাকার-পোষক ছাপ চমৎকার ঢেকে গেছে। রুনার পছন্দ তমালকে তাঁর বিচক্ষণ চোখ চিনে নিল। যার ফলে পিরপুর গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ আসতে –বেশি সময় লাগেনি তমালের। গুলশানে কার্তিক চৌধুরীর দেওয়া আলিশান ফ্ল্যাট- সেখানে জ্যোৎস্নাকে একবার নিয়ে গেছিল তমু বড় নাতিনের মুখ দেখাতে। ঘণ্টা দুই পরে গাড়ি করে ফিরিয়েও  দিয়ে গেছিল কিশোরগঞ্জের বাড়ি। নামাবার সময় জ্যোৎস্নার হাতে একগোছা রঙিন কাগজ ধরিয়ে দিয়েছিল

‘ কি এগুলা?’

‘ডায়াবেটিস মাপতা পারবা নিজে নিজেই। পেচ্ছাপে চুবাইলেই’ কিশোরগঞ্জের পেল্লায় বাড়ির সামনে খাঁখাঁ মাঠের ওপর   রক্তে চিনি মাপার রঙিন কাগজ হাতে দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্না দেখেছিল তমুর বিদেশি গাড়ি দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ততক্ষণে সে জেনে গেছে দূর মানে ঢাকাও নয় আর, কানাডা। সেখানে কার্তিক চৌধুরীর বাড়ি বহুবছরের, এক ছেলে , এক মেয়ে ওখানেই থাকে। তমুর অপ্সৃয়মান গাড়ির দিকে তাকিয়ে জ্যোৎস্না ভেবেছিল তমু যত দূরেই যাক, পাকুড়ার বন থেকে কখনওই বেশি দূরে যেতে পারবে না।

‘রাঙ্গা আলুর পিঠা খান আপা, আপনে তো কিছুও খান না নাস্তা’ সালেমা একটা ফুলকাটা প্লেটে তার নিজের হাতে বানানো মিষ্টান্ন নিয়ে সাধছে। একটা তুলে নেয় কবিতা। সালেমা বলে ‘ জানেন আপা, একটা ডায়েরি খুঁইজা পাইছি, আমার ফুফুর ডায়েরি। ঢাকা ভার্সিটিতে চাকরি করতেন। আমাদের স্বাধীন দেশের পতাকা সেলাই করতেন গোপনে গোপনে। নিজের আরদালি গোপালরে বাঁচাতে গিয়া প্রাণ দেন’

ঠিক তখনি মোস্তাফা কামালের গাড়ি এসে থামে কথাকলি কিন্টারগার্টেনের সামনে। মোস্তাফা নামেন, পেছনে তাঁর ড্রাইভায় রজব মিয়াঁ বাচ্চাদের  কেক বিস্কিটের বড় থলি নিয়ে, এবার তার হাতে সং যোজন একটা জাতীয় পতাকা। মোস্তাফা একটু অতি-উৎসাহী ধরনের মানুষ। ওখান থেকেই চেঁচিয়ে বলেন,

এই যে সালেমা, এই যে কবিতা আপা, শোনেন, এইবার বিজয় দিবস নিয়া প্ল্যান করেন। এই সীতাকুন্ডুতে নজরুল আসছিলেন, জানেন তো? ওই যে আকাশে হেলান দিয়া- অইডা আমি ফ্লেক্স কইরা সবাইরে দিমু। আর কবিতা আপা আপনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়া একটা মিউজিক্যাল লেখেন, বাচ্চাগো জানা দরকার আমরা কি আগুনের মধ্যে দিয়া আসছি’।

কথাগুলো কবিতার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে যায়। সে শুধু দেখে  রজবের হাতের ভাঁজ করা পতাকা ফুঁড়ে বেরোচ্ছে লাল রঙের একটা গোলা, আর তার চারপাশে ঘন সবুজ, ঠিক তার মায়ের মুখে শোনা পাকুড়ার বনের মতো সবুজ। আজ বুকুন যে ছবিটা দেখাল, তমুদের হাতে ধরা গ্রিন কার্ড, সে কি এই সবুজের পাশে দাঁড়াতে পারে কখনো?

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত