| 20 এপ্রিল 2024
Categories
চলচ্চিত্র বিনোদন সিনেমা

শুভ ১২০

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

নিজেকে তিনি –হেঁশেল বাড়ির হলুদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের কাছে যিনি ছিলেন ভারতের মরিস শিভ্যালিয়র।

১৮৯৯সালের ৩রা মার্চ কৃষ্ণনগরেরর গোয়ারীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আশুতোষ চক্রবর্তী রেলে কাজ করতেন, ফলে ছেলেবেলা তুলসী চক্রবর্তী অনেক ঘুরেছেন। পরে বাবার অকালমৃত্যুর পর তুলসী অল্প বয়সে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে জ্যাঠামশাই প্রসাদ চক্রবর্তীর কাছে কলকাতার জোড়াসাঁকোয় আশ্রয় পান। মা নিস্তারিণী দেবীকে নিয়ে কলকাতায় এসে তার প্রথম লক্ষ্যই ছিল একটা ভাল চাকরী খোঁজা। ভাল গান গাইতে পারতেন, বিশেষ করে কীর্তনাঙ্গের গান। গিরিশ পার্কের পার্বতী ঘোষ লেনের ব্যায়ামাগারে নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীরচর্চাও করতেন। জ্যাঠামশাইয়ের অর্কেষ্ট্রা পার্টির গ্রুপ ছিল। কলকাতার বড়লোক রাড়িতে নানা অনুষ্ঠানে তাঁর দল নাটক করত। তুলসী চক্রবর্তীও সে দলে যোগ দিয়ে কীর্তন ও শ্যামা সঙ্গীত গাইতেন। পরে জ্যাঠামশাই স্টার থিয়েটারে যোগ দিলে কলকাতার রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে চিৎপুরের এক মদের দোকানে বয়ের কাজ জোটালেন। জ্যাঠামশাই খবর পেলে কাজ ছাড়তে হল। এরপর কাজ নিলেন ঘড়ি সারাইয়ের দোকানে। সেখানে বেশিদিন মন টিকল না তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে বর্মা গেলেন। যে জাহাজে পালালেন সেটিতে বোসেস সার্কাস পার্টিও চলেছিল। সেখানেই চাকরি নিলেন। মাঝে মধ্যে শোয়ের ফাঁকে জোকারও সাজতেন। এভাবেই তিনি হাস্য-কৌতুকের প্রতি ঝোঁকেন।

একথা সত্য যে সারা জীবন হাস্য-কৌতুক করলেও তিনি কখনও ভাঁড়ামো করেন নি। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘পরশপাথর’ মুক্তি পায় ১৯৫৮সালে। এর আগেও তুলসী চক্রবর্তী ‘পরশপাথর’ নামে ১৯৪৯সালে আর একটি সিনেমায় ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন যার পরিচালক ছিলেন অতীনলাল ও ললিতকুমার। চরিত্র সামান্য হোক বা গুরুত্বপূর্ণ- মনপ্রাণ দিয়ে তিনি অভিনয় করতেন। তার এই অসামান্য অভিনয় প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে বলতেন,‘আমি একটু চোখ–কান খোলা রাখি, আর সব ধরনের মানুষ দেখে বেরাই। এবার চরিত্র মত তাদের তুলে ধরি। যেখানে যে লাগে আর কি!’ কেউ বাহবা দিলে বলতেন, ‘‘এই চরিত্র করার জন্য ভাল অভিনয় করার দরকার হয় না কি? তোমার চারপাশে এরা ঘুরে বেরাচ্ছে, একটাকে তুলে এনে নিজের কাঁধে ভর করাও।’’ আসলে তিনি দেখতে জানতেন, যা সকলে পারে না। কেবল ব্যক্তি নয় তিনি সমাজের কাছ থেকেও অভিনয় শিখেছিলেন, তাই তাঁর অভিনয় এত সাবলীল।

সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘একটি রাত’-তিনটি সিনেমায় কোথাও তিনি মেস মালিক, হোটেল মালিক, সরাইখানা-কাম-ধর্মশালার মালিক-সবকটি চরিত্রে তার স্বকীয়তা বজায় আছে। কখনও অভিনয় এক ছাঁচের হয়ে যায় নি। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ’-এ গ্রামের বাড়িতে গিয়ে খালি গায়ে পৈতে পরিমার্জনার দৃশ্য প্রসঙ্গে পরে বলেছিলেন,‘পরিচালক নির্মল দে আমায় বলেছিলেন-আপনি বাড়িতে যেমন করেন, তেমনই করবেন। তাই-ই করেছি।’ এই সিনেমায় মলিনা দেবীর সঙ্গে জুটি বেঁধে দারুন অভিনয় করেন। তাঁর কাঠ-ঘটির ‘‘কই, কোথায় গেলে গো!’’-ডাক যেন এখনও কানে বাজে।

উত্তমকুমার অভিনীত প্রায় তিন ডজন সিনেমায় তুলসী চক্রবর্তী অভিনয় করেছেন। উত্তমকুমার বলতেন,’‘তুলসীদা যেভাবে অভিনয় করেন, আমি তো কোন দিনই পারব না। ওঁর মতো ‘জীবন্ত’ হয়ে ওঠা আমার দ্বারা হবে না।……তুলসী চক্রবর্তীকে প্রণাম জানানোর একটাই পথ আমার কাছে। যখনই কাজ পাই, পরিচালক প্রযোজককে বলে ওঁকে ডেকে নিই। তুলসীদা থাকলে সিনটা দারুনভাবে উতরে যায়। ওঁর ঋণ শোধ তো করতে পারব না, যেটুকু পারি সাহায্য করি।’’ “তুলসী চক্রবর্তী যদি আমেরিকায় জন্মাতেন, তাহলে অস্কার সন্মানে ভূষিত হতেন”। —- সত্যজিৎ রায়।

অবর্ণনীয় অভাব অনটনে জীবন অতিবাহিত হয়েছিল এই প্রতিভাবান বরেণ্য প্রবীণ অভিনেতার শেষ জীবন । কদাচ কখনোই কারো কাছে হাত পাতেননি। প্রত্যাশা করেননি কোন পুরস্কারের । অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দাবি করেননি । ওঁকে অভিনয়ের জন্য অনেক বেশি পারিশ্রমিক দিতে চেয়েছিলেন কিংবদন্তি চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়। কিন্তু তিনি অকপটে বলেছিলেন, ‘এত টাকা আমায় দেবেন না তাহলে এরপরে আমি আর কাজ পাবো না’। সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে দৈনিক মাত্র পনের টাকা পারিশ্রমিক নিতেন। তাঁকে একশ’ টাকা করে দিতে চেয়ে ছিলেন ‘পরশপাথর’ ছবির জন্য। কিন্তু পনের টাকাই তখনকার সময়ের রেট। এর বেশি নিলে অন্যরা তাঁকে কাজ না-ও দিতে পারেন এই ভেবে উনি অতিরিক্ত টাকা নেননি। তিন দশক ধরে আমৃত্যু বাঙলা চলচ্চিত্রকে একের পর এক উপহার দিয়ে গেছেন। আটপৌরে ধুতি- সার্ট গলায় পৈতে আর চটি পায় টালিগঞ্জে স্টুডিওর পাড়া থেকে স্টার থিয়েটার পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতেন এই অসামান্য দক্ষ অভিনেতা। কখন পথেরপাঁচালী-র প্রসন্ন পন্ডিত। কখনও সাড়ে চুয়াত্তর-এর সেই মেস মালিক রজনীবাবুর কথা ভাবতেই বাঙালি মাত্র হেসে গড়িয়ে পড়ে।

একটি রাত-ছবিতে সন্দেহপ্রবণ সরাইখানার মালিক গোঁসাইজীর কথা ভোলা যায় না। এত নিখুঁত ও অনবদ্য অভিনয়ের কাছে ম্লান হয়ে যেতেন পার্শ্ব- তারকা, মহাতারকারা। সত্যজিৎবাবু স্বীকার করে গেছেন, তুলসীবাবু না থাকলে হয়তো তিনি ‘পরশপাথর’ করার কথা ভাবতেনই না। সাড়ে চুয়াত্তর-এ কে ভুলবে সেই দৃশ্য — তুলসী লন্ঠন তুলে মলিনা- র পমেটম মাখা মুখ দেখছেন ! সেদিনের দর্শকরা বলতেন, সাড়ে চুয়াওর- ছবির প্রকৃত নায়ক নায়িকা উওম-সুচিত্রা নয় তুলসী- মলিনা।

অভিনয় জীবনে সবথেকে বেশি আনন্দ পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশপাথর’-এ অভিনয় করে। দর্জি তাঁর পাঞ্জাবির মাপ নিতে আসছে নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য, তিনি আপ্লুত হয়ে বলছেন, “উফ! এ আমি কখনও ভাবতেও পারিনি!” সারাজীবনে ৩১৬ টি বাংলা ও ২৩ টি মত হিন্দী সিনেমা করলেও দারিদ্র ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে বেশ অসুস্থ হয়ে পরেন। পয়সাও ছিল না চিকিৎসার জন্য। এমনকি নিজের বাড়িও দান করেছিলেন এলাকার দরিদ্র পুরোহিতদের জন্য। তাঁর মৃত্যুর পর সরকারের তরফ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোরও কোনও বন্দোবস্ত ছিল না তখন। স্ত্রী উষারাণী দেবী দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন একমুঠো খাবারের জন্য। দারিদ্রের কারণে স্বামীর সবকটি মেডেল বিক্রী করতেও বাধ্য হয়েছিলেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত