| 15 এপ্রিল 2024
Categories
সময়ের ডায়েরি

চিন কি ভাইরাসের আড়ত

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

অমিতাভ প্রামাণিক 

 

কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা দাদা, যত আপদ সব ঐ চিন থেকে আমদানি হয় কেন? এই আপনার বার্ড ফ্লু বলুন বা সোয়াইন ফ্লু, সার্স বা এই নভেল করোনাভাইরাস, সব কেন ওখান থেকে আসে? চিন কি ভাইরাসের আড়ত? কেসটা কী? – তখন উত্তর তো একটা দেওয়ার চেষ্টা করতেই হয়।

প্রথমেই বলে দিই, না, চিনে ভাইরাসের গোডাউন থেকে এক এক করে এইসব ভাইরাস বেরোয়নি সম্ভবত। এখন একটা ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ঘুরছে বাজারে, সেটা কতটা সত্যি তা বলা সহজ নয়। তবে সেটা সত্যি-মিথ্যে যাই হোক, তা দিয়ে পুরো স্টোরিটা ব্যাখ্যা করা যায় না।

কেন যায় না? কারণ এই ভাইরাসগুলো সব অন্য প্রাণীতে প্রথম বাসা বেঁধেছিল। ভাইরাস হচ্ছে এমন এক ‘বস্তু’ যা কেবলমাত্র তার ‘হোস্টের’ শরীরেই বেঁচে থাকে অর্থাৎ বংশবৃদ্ধি করে। এক এক ভাইরাসের এক এক হোস্ট। সাধারণভাবে অন্য প্রাণীর শরীরে সে বেঁচে থাকে না। সেই হিসাবে আদিতে বার্ড ফ্লু পাখির, সোয়াইন ফ্লু শুয়োরের, সার্স বাদুড়ের ভাইরাস। মানুষের শরীরে তার বাসা বাঁধার কথা নয়।

তাহলে বাঁধছে কেন? আর কেনই বা তা মহামারী বা অতিমারী হয়ে দেখা দিচ্ছে?

এর কারণ লুকিয়ে আছে আমাদের অভিযোজনের মধ্যে। কিছুদিন আগেই লিখেছিলাম, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরে ছয় ট্রিলিয়ন মনুষ্যকোষ, ষাট ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়ার কোষ এবং তিনশো আশি ট্রিলিয়ন ভাইরাস থাকে। আমি যতটা-না আমি, তার চেয়ে অনেক বেশি আমার শরীরের ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাস। এ সবই অভিযোজনের ফল। এরা আমার কোনো ক্ষতি করে না, বরং আমার শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় কার্যকলাপ এমনকি আমার চিন্তাধারাকেও এরা প্রভাবিত করে। এদের সংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধি এমনকি এদের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির তুলনামূলক অনুপাতের হেরফের ঘটলে তার প্রভাব পড়ে আমার স্বাস্থ্যে, এমনকি মনেও।

এগুলো সবই আমাদের উপকারী ব্যাকটেরিয়া এবং মনুষ্য-ভাইরাস। সুদূর অতীতে হয়ত কোনো এক সময়ে এরাও প্রাণঘাতী ছিল, কিন্তু এই যেমন গতকাল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও সেরে ওঠা মানুষের সংখ্যা এক লক্ষ ছুঁল, তেমনি এদের কবল থেকে সে-আমলে বেঁচে-যাওয়া মানুষদের উত্তরসূরীদের মধ্যে অভিযোজিত হতে হতে এখন পারস্পরিক হৃদ্যতার সম্পর্কে দাঁড়িয়েছে।

তাহলে এই নতুন ভাইরাসগুলো প্রাণী থেকে মানুষকে অ্যাটাক করছে কেন? তাদের তো বেঁচে থাকারই কথা নয়, কেননা মানুষ তাদের ‘হোস্ট’ নয়।

এর উত্তরের জন্যে দুটো আলাদা সময়কালের ইতিহাস জানতে হবে আপনাকে। এক হচ্ছে বিশ্বত্রাস মোঙ্গোল চেঙ্গিস খাঁর ইতিহাস। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু থেকে পরবর্তী দেড় শতকে তার উত্তরসূরীরা পৃথিবীর এক বিশাল এলাকা শাসন করেছে। প্রকৃতিতে যাযাবর এরা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর, প্রবল যুদ্ধবাজ এবং তীব্রভাবে সুশৃঙ্খল। সারা পৃথিবীকে এরাই শিখিয়েছে কেন্দ্রীয় শাসন ও আইন। চিনের সম্পূর্ণ ভূখণ্ড এরা গ্রাস করে নেওয়ার পর চিনাদের খাদ্যাভ্যাসে প্রবল পরিবর্তন ঘটে। সুরুয়াপ্রিয় এই জাতির চিনামাটির পাত্রে তার উপকরণ হিসাবে সংযোজিত হল যাযাবরদের খাদ্যের অংশবিশেষও – সাপ, ব্যাং, টিকটিকি, ইঁদুর, আরশোলা, কীটপতঙ্গ। এদের শরীরের কোনো অংশই, পা-লেজ-কান-জিভ হোক বা নাড়িভুঁড়ি কিছুই ফেলে দিত না যাযাবররা, চিনারাই বা ফেলবে কেন?

ফাস্ট ফরোয়ার্ড টু নাইন্টিন সেভেন্টি সিক্স। দীর্ঘ দশ বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে কোটি চারেক দেশবাসীকে কচুকাটা করে আধুনিক চিনের স্থপতি মাও-সে-তুং-এর নেতৃত্বে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি। চাষিদের ধরে ধরে কারখানার শ্রমিক বানানো হয়, তাতে দেশে শুরু হয় অভূতপূর্ব খাদ্যসংকট। মাওয়ের মৃত্যুতে সেই কালচারাল রেভোলিউশনের পরিসমাপ্তি ঘটলেও খাবারের জোগান প্রবল সমস্যা হয়ে দেখা দেয় জন-অধ্যুষিত চিনে। এত লোকের খাবারের জোগান আসবে কোত্থেকে?

দুটো প্রধান কর্মসূচি গ্রহণ করে চিন। এক, যা আপনারা সবাই জানেন – ওয়ান চাইল্ড পলিসি। কারও দুটো বাচ্চা হলেই হয় বাচ্চাটাকে মেরে ফেলতে হবে নয়ত এমন বেশি ট্যাক্স দিতে হবে যে জীবন দুর্বিষহ হয়ে যাবে। জনবিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণে এলে খাদ্য জোগানো সহজতর। আর দুই, নিষিদ্ধ খাদ্য বলে কিছু নেই, সরকারি আদেশবলে যে যা-পার খাও, সরকার তাতে মাথা গলাবে না। এর ফলে বন্যপ্রাণী খাঁচায় ভরে পোষা ও তাদের নির্বিচারে হত্যা করে খাওয়া শুরু হয়ে গেল গোটা চিনে।

কী সেই বন্যপ্রাণী? এনিথিং ইউ মে থিংক অফ। বাঁদর, গরিলা, শিম্পাঞ্জি, বাদুড়, বনবেড়াল, শিয়াল, বুনো কুকুর, গোসাপ, কুমির, চিতাবাঘ, জলহস্তী, সমস্ত রকমের পাখি, সমস্ত সরীসৃপ, স-অ-ব। নির্বিচারে এদের ধরে খেতে শুরু করল চিনারা। প্রতি শহরে গজিয়ে উঠল এইসব ‘এগজোটিক প্রাণীর’ মিট শপ। সাধারণভাবে নোংরা অস্বাস্থ্যকর ঘিঞ্জি এলাকায়। এখনও এ রকম বাজারে – এই মনে করুন ইউহান শহরের মিট মার্কেটে – গেলে দেখতে পাবেন বিশাল এলাকা জুটে খাঁচায় রাখা আছে কুকুর বেড়াল শেয়াল সাপ ইত্যাদি। হাজারখানেক খাঁচায় বন্দী কয়েক হাজার বেড়াল ভীতচকিত চোখে মিউমিউ করছে, অপেক্ষা করছে কখন কে এসে কোনটাকে পছন্দ করবে। করলেই একটা চিমটে দিয়ে তাকে তুলে কুচুৎ করে গলার নলিটা কেটে অক্সি-অ্যাসিটিলিন টর্চের মত একটা গ্যাস বার্নার দিয়ে তার লোম পুড়িয়ে কচাকচ পিস করে ক্রেতাকে ধরিয়ে দেবে। বাজারের এক সাইডে লাট করা আছে শ’ পাঁচেক কুকুরের লাশ, তাদের হাঁ-করা বিস্ফারিত-চোখ মুন্ডুগুলো সাজানো আছে, যদি কেউ স্যুপের মধ্যে কুকুরের মাথার ঘিলু দিয়ে খাওয়ার জন্যে কিনে নিয়ে যায়। তার পাশেই হয়ত হাজারখানেক কালো-কালো কুৎকুতে-চোখো বাদুড়!

এতে সমস্যা কী? সমস্যা হচ্ছে এই যে এই নতুন প্রাণীগুলো তো মানুষের খাদ্যের লিস্টিতে ছিল না। আমাদের শরীর যেমন ব্যাক্টেরিয়া-ভাইরাসের খনি, সমস্ত প্রাণীদেরই তাই। তবে আলাদা আলাদা প্রাণীদেরহে আলাদা আলাদা প্রজাতির ব্যাক্টেরিয়া-ভাইরাস। এই নতুন প্রাণীদের খাওয়ার ফলে তাদের শরীরের ঐ নতুন ব্যাক্টেরিয়া-ভাইরাসের সরাসরি সংস্পর্শে আসতে লাগল মানুষ। রান্না করে খেলে এদের কিছুই বাঁচে না, কিন্তু যতক্ষণ-না রান্না হচ্ছে ততক্ষণ তো তারা সক্রিয়।

এই পশুদের শরীরের ভাইরাস এক এক সময় মিউটেট করে মানুষের দেহে বাসা বাঁধার উপায় বের করে নিতে লাগলেই শুরু হল সমস্যা। এরা যেহেতু মানুষের শরীরের অজানা বস্তু, আমাদের ইমিউন সিস্টেম এদের শত্রু জ্ঞান করে। ফলে শুরু হয় লড়াই। এরাও নিজেদের বংশবিস্তারে ঘন ঘন মিউটেট করে মানুষের শরীরে বাসা বেঁধে থাকার লড়াই চালিয়ে যায়। এই যুদ্ধই মানুষের পক্ষে প্রাণঘাতী। এইভাবে এক এক ভাইরাস এক এক সময় মহামারী বা অতিমারী হয়ে দাঁড়ায়।

এই যে নভেল করোনাভাইরাস, এটা আদিতে ছিল বন্য বাদুড়ের শরীরে, ঐ যে সার্স ভাইরাস হিসাবে। সেখান থেকে মিউটেট করে সে বাসা বাঁধে প্যাঙ্গোলিন নামে এক ধরণের বন্য প্রাণীর শরীরে। প্যাঙ্গোলিন এক নিরীহ ল্যাজওয়ালা অদ্ভুতদর্শন প্রাণী, তাদের গায়ে শক্ত বড় বড় আঁশ, চিনারা তাদের খেয়ে খেয়ে লুপ্তপ্রায় করে ফেলেছে। মাংস খাওয়া ছাড়াও ঐ শক্ত আঁশ ছাড়িয়ে সেগুলো দিয়ে তারা কী-সব ওষুধ বানায়, কোরিয়ান জিনসেং বা হিমালয়ান শিলাজিতের মতো যা নাকি যৌনতৃপ্তিবর্ধক! মানুষের বিভিন্ন খিদের দাম চুকাতে গিয়ে প্যাঙ্গোলিন আর পৃথিবীতে বেশি নেই।

প্যাঙ্গোলিন থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে মানুষে। প্রথমে চিনের উহানের এক মিট মার্কেট থেকে সেখানকার শহরবাসীদের মধ্যে। তাদের থেকে চিনের অন্যত্র। তাদের থেকে সারা পৃথিবীতে।

এখন আমরা তার দাম চুকাচ্ছি।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত