বিষ্ণুর চিহ্ন

অনুবাদক: অনীশ দাস অপু


‘এটা কালনাগের জন্য,’ একটা প্লেটে দুধ ঢালতে ঢালতে বলল গঙ্গারাম। প্রতি রাতে দেয়ালের কাছের গর্তের সামনে আমি দুধটা রেখে আসি। সকাল বেলায় দেখি পিরিচে দুধ নেই।’

‘বোধ হয় বেড়ালে খেয়ে যায়, কিশোররা বলি।‘বেড়াল! মুখ বাঁকায় গঙ্গারাম। কোনও বেড়ালের গর্তের ধারে যাবার সাহস নেই । কালনাগ থাকে ওখানে। ওকে যতদিন দুধ খাওয়াব ও ততদিন কাউকে কামড়াবে না। খালি পায়ে তোমরা ওখানে যেতে পারো, খেলতে পারো।’

তুমি একটা বোকা ব্রাহ্মণ,’ বলি আমি। জানো না সাপ দুধ খায় না ? বিশেষ করে প্রতিদিন তো এক প্লেট করে দুধ খাওয়ার প্রশ্নই নেই। স্যার বলেছেন সাপ অনেক দিন না খেয়ে থাকতে পারে। সেদিন একটা টোড়া সাপকে ব্যাঙ খেতে দেখেছি। গিলতে পারেনি। গলার কাছ ঠেকে ছিল। কয়েকদিন সময় লেগেছে গিলতে। মেথিলেটেড স্পিরিটের মধ্যে, ল্যাবে আমরা এরকম সাপ ডুবিয়ে রাখি। গতমাসে স্যার এক সাপুড়ের কাছ থেকে দু’মুখো একটা সাপ কিনে এনে আমাদের দেখিয়েছেন। ল্যাবের একটা বোতলও খালি ছিল না বলে রাসেলস ভাইপারের জারে ওটা রাখেন তিনি। তারপর যা মজা হলো! জারের মধ্যে যেন ঝড় বয়ে যেতে লাগল। বড় সাপটা টুকরো টুকরো করে ফেলল রাসেলস ভাইপারটাকে।।

গঙ্গারাম আঁতকে উঠে বুজে ফেলল চোখ। এ জন্য তোমাদেরকে একদিন ভুগতে হবে। অবশ্যই ভুগবে। গঙ্গারামের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। সে অনেক হিন্দুর মত ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিবের পরম ভক্ত। এদের মধ্যে বিষ্ণুর প্রতি তার ভক্তি সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন সকালে সে চন্দন কাঠ জলে গুলে কপালে ইংরেজি ভি’ অক্ষরের মত তিলক কাটে। ব্রাহ্মণ হলেও সে অশিক্ষিত, কুসংস্কারে ভরা মন। তার কাছে সকলের জীবন পবিত্র। সে সাপ, বিছে আর কেন্নোই হোক। আমরা এগুলো দেখতে পেলেই মেরে ফেলি। অথচ গঙ্গারাম ও গুলোর কোনটাকে রাস্তায় বা মাঠে পড়ে থাকতে দেখলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখে যাতে আমাদের চোখে না পড়ে। ব্যাডমিন্টন রেকেটের বাড়ি মেরে আমরা সোৎসাহে ভিমরুল কিংবা বোলতা আহত করি। আর গঙ্গারাম আহত বোলতার পাখা জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে গিয়ে হুলের দংশন খায় । তবু তার বিশ্বাস বিন্দুমাত্র টলে না। যে প্রাণী যত বেশি বিপজ্জনক, তার প্রতি গঙ্গরামের শ্রদ্ধা তত বেশি। আর সাপের মধ্যে সে সবচেয়ে বেশি ভক্তি করে গোখরা অর্থাৎ তার কালনাগকে। ‘তোমার কালনাগকে দেখতে পেলেই মেরে ফেলব,’ বলি আমরা।

‘তোমাদেরকে অমন কাজ করতেই দেব না। ও শখানেক ডিম পেড়েছে। কালনাগকে মেরে ফেললে সবগুলো ডিম ফুটে গোখরা বেরিয়ে এসে ভরিয়ে ফেলবে বাড়িঘর। তখন কী করবে ?

‘ওগুলোকে জ্যান্ত ধরে বোম্বে পাঠিয়ে দেব। ওগুলোকে দুধ দুইয়ে ওরা সাপে কাটার ওষুধ বানাবে । একটা জ্যান্ত গোখরা সাপের জন্য ওরা দুই রূপী দেয়। তার মানে দুশো রূপী পাব আমরা।’‘আমি কোনদিন শুনিনি সাপের দুধ হয় । দেখিওনি। তবে সাবধান এটার গায়ে হাত দিতে যেয়ো না। এটা ফণিহার-ফণা আছে। আমি দেখেছি। তিন হাত লম্বা। লেজ থেকে মস্ত ফণা পর্যন্ত। হাতের তালু মেলে ফণার আকার দেখায় গঙ্গারাম। মাঠে ওকে রোদ পোহাতে দেখবে।

তুমি আমাদের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলছ। পুরুষ সাপের ফণা থাকে না। কাজেই একশো ডিম পাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। তুমিই নির্ঘাত ডিমগুলো পেড়েছ।

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ি আমরা। ‘ওগুলো অবশ্যই গঙ্গারামের পাড়া ডিম। আমরা শীঘ্রি একশো গঙ্গারাম পেতে চলেছি।’

গঙ্গারামকে নিয়ে তামাশা শুরু করে দিলাম। চাকরবাকরদের নিয়ে তামাশা করতে মজাই লাগে। তবে আমাদের ঠাট্টা-মশকরা তেমন গায়ে মাখে না গঙ্গারাম। সে আছে নিজের প্রবল বিশ্বাস নিয়ে। সাপ মাটির পৃথিবীতে ঈশ্বরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী বলেই সে তাদেরকে খেতে দেয়, রক্ষা করে। তার মতে, সাপকে হত্যা না করে ভালবাসতে পারলে সাপও তোমাকে ভালবাসবে। তাই সে প্রতি রাতে গর্তের সামনে দুধের পিরিচ রেখে আসে। পরদিন সকালে দেখে পিরিচ থেকে দুধ অদৃশ্য ।।

একদিন আমরা কালনাগকে দেখতে পেলাম। বর্ষা শুরু হয়েছে। অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি। সারারাত ধরে বৃষ্টি। সূর্য তাপে ফেটে যাওয়া মাটি যেন জীবন ফিরে পেল। ছোট ছোট ডোবায় মনের সুখে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ কোরাস শুরু করে দিল ব্যাঙের দল। কর্দমাক্ত মাটিতে কিলবিল করে হেঁটে বেড়াতে লাগল কেঁচো আর কেন্নো। সবুজ ঘাসে ছেয়ে গেল মাঠ, চকচক করতে লাগল কলাগাছের সবুজ পাতা। বৃষ্টির জলে ভরে গেল কালনাগের আস্তানা। গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল সে। ভালো মাঠে চলে এল। রোদ পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে তার কালো ফণা। বেশ বড় সে-লম্বায় প্রায় ছয় ফুট, আমার কব্জির সমান মোটা । রাজ গোক্ষুরের মত দেখাচ্ছে ওটাকে। চলো সাপটাকে ধরি। কালনাগ

ছুটে পালাবার সুযোগ পেল না। মাটি পিচ্ছিল, তা ছাড়া ইঁদুরের গর্তগুলো বৃষ্টির জলে সব ভরাট হয়ে আছে। গঙ্গারামের কাছ থেকে কোন সাহায্য পেল না কালনাগ। বাড়িতে নেই সে।

উঠোন ভর্তি কাদা। কালনাগ গড়িয়ে গড়িয়ে চলল। তবে পাঁচ হাত দূরেও যেতে পারেনি, দড়াম করে একটা লাঠি আছড়ে পড়ল তার শরীরের মাঝখানে, ভেঙে দিল পিঠ। তারপর একের পর এক লাঠির বাড়িতে অল্পক্ষণের মধ্যে সাদা-কালো জেলির একটা পিন্ডে পরিণত হলো সে, রক্তাক্ত এবং কর্দমাক্ত। তবে মাথাটা এখন ও অক্ষত। ‘ফণায় মেরো না,’ আমাদের একজন চেঁচিয়ে উঠল। কালনাগকে স্কুলে নিয়ে যাব। | সাপটার পেটের মধ্যে একটা লাঠি ঢুকিয়ে মাটি থেকে তুলে ফেললাম। বড় একটা বিস্কিটের টিনের মধ্যে ঢোকালাম, টিন বেঁধে ফেললাম রশি দিয়ে । বিছানার নীচে লুকিয়ে রাখলাম।

রাতের বেলা গঙ্গারামের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন সে কালনাগের জন্য দুধ নিয়ে যায় দেখতে। আজ কালনাগের জন্য দুধ নেবে না ?

হ্যা, ‘ বিরক্ত গলায় জবাব দিল গঙ্গরাম। তুমি ঘুমাতে যাও।’ওর আর দুধ খাওয়ার দরকার হবে না।’ভুরু কুঁচকে গেল গঙ্গারামের। কেন ?

না, এমনি বললাম। পুকুরে এত ব্যাঙ। কালনাগ দুধের চেয়ে ওগুলো বেশি পছন্দ করবে।’

পরদিন গঙ্গারাম দুধের পিরিচ নিয়ে এল । পিরিচ ভর্তি দুধ। গঙ্গারামকে বিমর্ষ লাগল। একই সঙ্গে সন্দেহ ঝিলিক দিচ্ছে চোখে।

তোমাকে তো বললামই সাপ দুধের চেয়ে ব্যাঙ খেতে বেশি ভালবাসে।

আমরা জামা-কাপড় পরলাম, নাস্তা খেলাম। সারাক্ষণ গঙ্গারাম আমাদের পাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। স্কুল বাস এলে বিস্কিটের টিন নিয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে । ছেড়ে দিল বাস। গঙ্গরামকে বিস্কিটের টিন দেখালাম।

‘এই যে তোমার কালনাগ। বাক্সের মধ্যে নিরাপদে আছে। ওকে স্পিরিটের মধ্যে চুবিয়ে রাখব।

নির্বাক গঙ্গারাম। তাকিয়ে রইল চলে যাওয়া বাসের দিকে।

স্কুলে দারুণ উত্তেজনার সৃষ্টি হলো। আমরা চার ভাই। সবাই জানে আমরা বদের হাড়ি। ব্যাপারটা আবার প্রমাণ করলাম।

‘রাজ গোক্ষুর।’ ছয় ফুট লম্বা।’ ফণিহার। বিস্কিটের টিন বিজ্ঞান স্যারের কাছে দেয়া হলো।

টিনটা স্যারের টেবিলে । অপেক্ষা করছি উনি কখন ওটা খুলবেন এবং আমাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠবেন। সার ব্যস্ততার ভান করে টিনের দিকে তাকালেন না । তারপর অনেকটা অন্যমনস্কতার ভঙ্গিতে একজোড়া ফরসেপ আর একটা কাঁচের জার টেবিলে রাখলেন। ওটার ভেতরে একটা কেউটে, মেথিলেটেড স্পিরিটে ডোবানো।বিজ্ঞান স্যার গুনগুন করতে করতে টিনের বাক্সের রশি খুলতে লাগলেন। রশি আলগা হয়ে যেতেই শূন্যে ছিটকে গেল ঢাকনা, একটুর জন্য বিজ্ঞান সারের নাকে বাড়ি খেল না। কালনাগ! অঙ্গারের মত জ্বলছে চোখ। অক্ষত ফণা মেলে ধরা। হিসহিস করে উঠল সে, ছোবল দিল সারের মুখ লক্ষ্য করে। স্যার চট করে মাথা সরিয়ে নিলেন এবং তাল সামলাতে না পেরে চেয়ার উল্টে পড়ে গেলেন। মেঝেতে শুয়ে রইলেন তিনি, আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সাপটার দিকে, নড়তে ভুলে গেছেন। ছাত্ররা ডেস্কের উপর দাঁড়িয়ে তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল।

কালনাগ রক্ত লাল চোখ মেলে দৃশ্যটা দেখল। চেরা জিভ মুখ থেকে ঘন ঘন বেরোচ্ছে আর ভেতরে ঢুকছে। থুথু ছিটাল সে। তারপর পালাবার চেষ্টা করল। টিন থেকে মেঝেতে নেমে পড়ল কালনাগ শব্দ করে। পিঠের কয়েক জায়গা ভেঙে গেছে, যন্ত্রণাকাতর শরীরটাকে মেঝের উপর দিয়ে টেনে টেনে নিয়ে চলল। দোরগোড়ায় পৌঁছে আবার ফণা তুলল নতুন কোন বিপদের মোকাবেলা করার জন্য। ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে গঙ্গারাম। হাতে একটা পিরিচ আর জগভর্তি দুধ। কালনাগকে দেখে হাঁটু গেড়ে বসল সে। পিরিচে দুধ ঢেলে ওটা দোরগোড়ায় রাখল। প্রণামের ভঙ্গিতে হাত জড়ো করে মাথা ঠেকাল মাটিতে। মানুষের নিষ্ঠুরতার জন্য ক্ষমা চাইছে। প্রচন্ড ক্রোধে হিসিয়ে উঠল গোক্ষুর, থুতু ছিটাল। তারপর প্রবল আক্রোশে কয়েকবার ছোবল মারল গঙ্গারামকে। শেষে একটা গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ল, চলে গেল দৃষ্টিসীমার বাইরে।

গঙ্গারাম হাত দিয়ে মুখ ঢেকে পড়ে আছে মাটিতে। গোঙাচ্ছে। বিষ তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অন্ধ করে দিয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে তার শরীর নীল হয়ে গেল, ফেনা বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে। ওর কপালে রক্তের ফোঁটা। শিক্ষক রুমাল দিয়ে মুছে দিলেন রক্ত। কালনাগ কপালের যেখানটাতে ছোবল মেরেছে সেখানে ইংরেজি ভি অক্ষরের মত দাগ ফুটে উঠেছে-বিষ্ণুর চিহ্ন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত