| 18 এপ্রিল 2024
Categories
সময়ের ডায়েরি

বিশ্বশান্তি অন্বেষণে দর্শনের ভূমিকা

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের এ যুগে শান্তির ধারণা যেন এক সুদূর পরাহত তত্ত্ববিলাস! ভোগবাদিতার করাল গ্রাসে মানবতা আজ বিপর্যস্ত। উগ্র বস্তুবাদ ও যান্ত্রিক যুক্তিবাদ মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিকতার সার্বিক বিনাশ সাধন করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা ও সীমাহীন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে নতুন নতুন রোগ; ছড়িয়ে দিয়েছে হিংসা, দ্বেষ, ক্রুরতা।

যান্ত্রিক সভ্যতা মানুষে মানুষে বন্ধন শিথিল করে স্নেহ, প্রীতি, শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসার পরিবর্তে আত্মস্বার্থকে করে তুলেছে মহীয়ান। পাশ্চাত্য আধুনিকতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদের সংস্কৃতি। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর প্রচারণা ছিলঃ আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া অনগ্রসর, অসভ্য দেশগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেে প্রগতিশীল পরিবর্তনের সূচনা করবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি বললেই চলে। উপরন্তু ঔপনিবেশিক শাসকবৃন্দ চাপিয়ে দিয়েছে তাদের নিজেদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য।

এভাবেই সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের শক্তি ও সম্পদ টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বদাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজিত মানুষদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্রেে লিপ্ত। এ প্রসঙ্গে বার্ট্রান্ড রাসেল মার্কিন সামরিক তৎপরতার সঙ্গে ক্ষমতা ও অর্থনীতির সম্পর্ক নির্দেশ করে তাঁর War Crimes in Vietnam (London,1967) গ্রন্থে লিখেছিলেন, “আমরা পশ্চিমের নাগরিকরা সাম্রাজ্যবাদের সুবিধাভোগী…যারা বিশ্বের ৬০ ভাগ সম্পদের উপর মার্কিন পুঁজিবাদের দখল ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য আমাদের এই পুরো গ্রহজুড়ে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে ৩,৩০০ সামরিক ঘাঁটি, বিশাল নৌ বহর, মিসাইল, নিউক্লিয়ার মারণাস্ত্র। প্রতি ঘণ্টায় এর জন্য ব্যয় হচ্ছে ১৬ মিলিয়ন ডলার। সামরিক খাতে যে ব্যয় হচ্ছে তা দিয়ে যুক্তরাজ্যের মতো একটি স্বচ্ছল দেশেও কী কী করা যায় তার উদাহরণঃএকটি মিসাইল সমান চারটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি টি.এস. আর ২ সমান পাঁচটি আধুনিক হাসপাতাল, একটি ভূমি থেকে শূন্যে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল সমান ১০০,০০০ ট্রাক্টর।

পেন্টাগনের এখন লক্ষ লক্ষ একর ভূসম্পত্তি, দেশের ভেতর ৩২ মিলিয়ন একর এবং ৩০ লক্ষ একর দেশের বাইরে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য শত হাজার কোটি ডলার খরচ করার মাধ্যমে পেন্টাগনকে যে বিশাল ক্ষমতা দেয়া হয় তাতে প্রতিটি মার্কিন নাগরিক জীবন এবং সমগ্র মানবজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্কিন সামরিক বিভাগ কয়েকটি বৃহৎ সংস্থা যেমন- ইউএস স্টিল, মেট্রোলাইফ ইন্স্যুরেন্স, এটিএন্ডটি, জেনারেল মটরস, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ইত্যাদির সম্মিলিত সম্পত্তির চেয়েও বেশি সম্পত্তির মালিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক তৎপরতার জন্য যা খরচ হয় তার ১৫ গুণ বেশি খরচ হয় সিআইএ-র পেছনে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি দোকান, প্রতিটি পেট্রোল স্টেশনেরও পুঁজিবাদের অধীনে, দরকার সমরাস্ত্র উৎপাদনের বিস্তার। যেখানে ক্ষুধা, যেখানে নিপীড়নমূলক শাসন, যেখানে জনগণ নির্যাতিত হচ্ছে, যেখানে অনাহারে অসুস্থতায় মানুষ মারা যাচ্ছে সেখানেই ওয়াশিংটনের যোগ পাওয়া যাবে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ভালো হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে কোনো লাভ নেই।… … … ” এছাড়া ইউ.এস মেরিন কোরের অফিসার মেজর জেনারেল স্মেডলে বাটলারের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ১৯১৪ সালে আমেরিকান তেল কোম্পানিকে মেক্সিকোর ট্যামপিকো লুণ্ঠন করতে, ন্যাশনাল সিটি ব্যাংকে হাইতি ও কিউবা থেকে ভালো মুনাফা অর্জনের জন্য, ১৯০৯ থেকে ১৯১২ সময়কালে ব্রাউন ব্রাদার্সের আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং হাউজের জন্য নিকারাগুয়াকে প্রস্তুত করতে মার্কিন সৈন্যবাহিনী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। অন্যথায়, ১৯১৬ সালে আমেরিকান চিনি কোম্পানির স্বার্থে হন্ডুরাসে এবং ১৯২৭ সালে তেল কোম্পানির স্বার্থে তারা চীনে প্রবেশ করেছিল। তবে সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে নগ্নরূপটি প্রকাশ পায় ২০০৩ সালের ২০শে মার্চ জাতিসংঘ, বিশ্বজনমত উপেক্ষা করে এমনকি স্বীয় মিত্র শক্তিসমূহের মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে বৃটেনকে সাথে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ ও প্রাচীন পন্থায় দেশটি দখল করে নেয়ার মধ্য দিয়ে।

এভাবেই মানবাধিকার খর্ব করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিশ্বশান্তি লাভের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে চলেছে যা ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সম্মেলনে দেয়া মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার সুস্পষ্ট লংঘন। সদর্থক ও নঞর্থক অধিকারসমূহ ‘ পরম’ বলে সর্বজনস্বীকৃত। জাতিসংঘের ঘোষণায় নঞর্থক অধিকারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিতঃ ” নির্যাতন অথবা নিষ্ঠুর আচরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ”। এছাড়াও বলা হয়েছেঃ” কোনো মানুষকে মাদক, সংবেশন ( Hypnosis) অথবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ক্রমাগত চাপের মাধ্যমে কারও মত কিংবা পূর্ব ধারণার পরিবর্তন করে তাকে ইচ্ছেমতো নিজেদের কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। এ ধরনের অধিকারসমূহ মানুষের উচ্চতর মর্যাদার সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ, কোনো মানুষকে কোনো অবস্থাতেই’ উপায়’ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এতে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে মানুষের অধিকারকে তুলে ধরা হয়েছে যা অপরিবর্তনীয়, পরম এবং সর্বজনীন।

তাছাড়া ১৯৭৭-১৯৮২ সালে দেয়া ইউনেস্কোর মধ্যবর্তী পরিকল্পনায় একদিকে মানবাধিকার লংঘনের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে এবং অপরদিকে একে সম্পূর্ণ আইনবিরোধী বলে অভিহিত করা হয়েছে। শান্তির জন্য লড়াই করা এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা অবশ্যকর্তব্য —– এ বিষয়টিকে সামনে রেখে ইউনেস্কো যে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিল তা হলোঃ “মৌলিক মানবাধিকার লংঘন করে সত্যিকার শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, অথবা যখন অন্যায় বিরামহীনভাবে চলতে থাকে তখন সকল মানুষের অধিকারের ধারণার কোনো ভিত্তি থাকে না এবং পূর্ণাঙ্গভাবে কোনো লক্ষ্য অর্জনই সম্ভব হয় না। অপুষ্টি, চরম দারিদ্র্য এবং মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেড়ে নিলে শান্তি অপূর্ণ থেকে যায়। একমাত্র স্হায়ী শান্তি হচ্ছে সেই ন্যায্য শান্তি যা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়। তাছাড়া এই ন্যায্য শান্তি এক ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক সংহতির আহবান জানায় যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করে।”

অপরদিকে, সাম্প্রতিক বিশ্বের বাস্তবতা হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। ২০০২ সালের জুন মাসে প্রকাশিত এক লেখায় মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব ডোনাল্ড রামসফেল্ড উল্লেখ করেছেন, ১১ সেপ্টেম্বরের বহুপূর্বেই মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ৬টি লক্ষ্য পূরণের কর্মসূচি নিয়েছিল তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ “ক্ষমতা প্রদর্শন ও ক্ষমতা টেকসই রাখার বন্দোবস্ত”, “শত্রুপক্ষের সকল আশ্রয়স্হল ধ্বংস করা যাতে তারা বুঝতে পারে আমাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কোনো পর্বতই যথেষ্ট উঁচু নয়, কোনো গুহা কিংবা বাঙ্কার যথেষ্ট গভীর নয়”, “তথ্য- প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা” প্রভৃতি।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এ হতাশাজনক মানবিক বিপর্যয়ের অশান্ত বিশ্ব পরিস্থিতিতে দর্শনের কী করণীয়? একটু খতিয়ে দেখলেই উপলব্ধি করা যায়, বর্তমান বিশ্বের এ সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মূল কারণ অর্থনৈতিক নয়, বরং নৈতিক। বিপুল বৈভবে সমৃদ্ধ দর্শনের শাখাসমূহের মধ্যে রয়েছেঃ মূল্যবিদ্যা( যার অন্তর্ভুক্ত সত্য, সুন্দর ও কল্যাণ অন্বেষণে ব্রতী তিনটি শাস্ত্র যুক্তিবিদ্যা, নন্দনতত্ত্ব ও নীতিবিদ্যা), রাষ্ট্রদর্শন, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, শিক্ষাদর্শনের মতো মানবকেন্দ্রিক কিছু বিষয় যা মানবতাকে মুক্ত করতে পারে সামাজিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও পরমতসহিষ্ণুতাসহ যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত প্রত্যয় ও আচরণ জীবনের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করেছে ও মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করেছে সেগুলোর অশুভ প্রভাব থেকে।

বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, “যুক্তিবিদ্যা দর্শনের অন্তঃসার।” কারণ প্রত্যেক বিজ্ঞানের যুক্তিশৈলি নির্ভুল হতে হলে তাকে যুক্তিবিদ্যার নিয়মাবলি অনুসরণ করতে হয়। একমাত্র যুক্তিবিদ্যাই পারে আমাদের মন থেকে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কারমুক্ত মন গড়ে তুলতে যা সত্য লাভের প্রধান অবলম্বন।

সেই প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত নীতিবিদ্যা দর্শনকে তথা মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে তার গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব দিয়ে। সক্রেটিস থেকে ইমানুয়েল কান্ট, হেগেল, জন স্টুয়ার্ট মিল প্রমুখ চিরায়ত দার্শনিকবৃন্দের নীতিতত্ত্বে উচ্চারিত হয়েছে মানুষের উচ্চতর মর্যাদার স্বীকৃতি। মানবতাবাদী চেতনা থেকেই ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন, কোনো স্বার্থসিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে কখনো কোনো মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা অনৈতিক।

প্লেটো তাঁর রিপাবলিক গ্রন্থে আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা প্রদানের মাধ্যমে আদর্শনিষ্ঠ রাষ্ট্রদর্শনের আলোচনার যে সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন সমকালীন রাষ্ট্রদর্শনেও তার প্রভাব বিদ্যমান। সমকালীন রাষ্ট্রদর্শনের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আদর্শনিষ্ঠতা। আদর্শনিষ্ঠ রাষ্ট্রদর্শন রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর এক ধরনের নৈতিক ব্যাখ্যা দেয়। মানুষের সার্বিক মুক্তি, সমবণ্টন, সমতা, ন্যায়বিচার, ক্ষমতা প্রভৃতি প্রত্যয়সমূহ আদর্শগত দিক থেকে মূল্যায়ন বা বিশ্লেষণ করে আদর্শনিষ্ঠ রাষ্ট্রদর্শন। তাই সমকালীন অস্হির বিশ্ব রাজনীতিকে সুস্হির স্থিতাবস্থায় এনে সমগ্র বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আদর্শনিষ্ঠ রাষ্ট্রদর্শন রাখতে পারে অগ্রনী ভূমিকা।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব হয়ে উঠতে পারে শান্তি অন্বেষণের অন্যতম আলোকবর্তিকা। তুলনামূলক ধর্ম ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপ অতি সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। পবিত্র কুরআনেও এ ধরনের সংলাপকে উৎসাহিত করা হয়েছে সুরা আল- ইমরানের ৬৪তম আয়াতেঃ “তুমি বলো- হে গ্রন্হানুসারিগণ, আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে যে বাক্যে অভিন্নতা রয়েছে তার দিকে এসো- যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারও উপাসনা না করি ও তাঁর কোনো অংশীদার স্হির না করি এবং আল্লাহকে পরিত্যাগ করে আমরা পরস্পর কাউকে প্রভুরূপে গ্রহণ না করি… … … । ” পৃথিবীর সব ক’ টি ধর্ম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সব প্রত্যাদেশের মূল মর্ম এই একেশ্বরবাদ বা তাওহীদের বাণী। যজুর্বেদে আছেঃ “না প্রাস্তে প্রতীমা আস্তি” যার অর্থ সর্বশক্তিমান স্রষ্টার কোনো প্রতীমা নেই। একই প্রতিধ্বনি শোনা যায় সুরা ইখলাসের সর্বশেষ আয়াতেঃ “ওয়ালাম ইয়া কুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ” যার অর্থঃ” এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।”

একত্ববাদের মতো মানবতার মূলমন্ত্রেও সকল ধর্ম একইভাবে দীক্ষিত। পবিত্র কুরআনের সুরা মায়িদার ৩২তম আয়াতে উল্লেখিত হয়েছেঃ “একারণেই আমি বনী ইসরাইলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করলো। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করলো।” বাইবেলের গসপেল অফ ম্যাথিউ (৭, ১২) এবং গসপেল অফ লুক (৬,৩১) এ রয়েছেঃ” তোমার জন্য যা অমঙ্গলজনক বা ক্ষতিকর অন্যের জন্য তা করো না।” গীতায় মুক্তিলাভের জন্য চারটি পথের কথা বলা হয়েছেঃ রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ ও ভক্তিযোগ যার প্রত্যেকটির পূর্বশর্ত হলো আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি।

প্রত্যেক ধর্মমতের অনুসারীগণ তাদের প্রত্যাদেশ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে এর মূল মর্মার্থ অনুধাবন করলেই পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে মানবজাতি পৌঁছাতে পারে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে তথা সৌহার্দ্য ও ভাতৃত্বের অনুপম বন্ধনে।

শিক্ষা দর্শনের এক নতুন সংযোজন হয়ে উঠতে পারে শান্তি অন্বেষণকারী শিক্ষাব্যবস্থা। জন ডিউইর শিক্ষাদর্শনে সর্বপ্রথম এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার পূর্বাভাস পাওয়া যায়। পরবর্তীতে হেনরী জিরোক্স জন ডিউই ও নব্য মার্ক্সবাদী প্রস্তাবিত শান্তি অন্বেষণকারী শিক্ষার প্রত্যয়সমূহ যেমন, ব্যক্তির স্বশাসন ও অনিশ্চয়তা, অভিজ্ঞতা- পূর্ব মূল্যাবধারণের সম্ভাব্যতা, সত্যের সর্বজনীন মানদণ্ড এবং অবাধ আদান-প্রদান প্রভৃতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা খুবই কঠিন বলে মত প্রদান করেন। তবে এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে নানা ভাবে বিকশিত হয়েছে।

নারীবাদী চিন্তাপ্রসূত শান্তি অন্বেষণকারী শিক্ষা পরিকল্পনা পূর্ণভাবে ডিউইর দর্শন ও তাঁর ‘ মূল্য যাচাইকরণ তত্ত্বে’র উপর গুরুত্ব প্রদান করে। দেশপ্রেমের যৌক্তিকীকরণ ও ক্রমবর্ধমান অস্ত্রসম্ভারের বিনিয়োগের যথার্থতা সম্পর্কে তাদের বক্তব্য হলোঃ “শিশুরা এই পারমাণবিক যুগে শান্তির অগ্রদূত হিসেবে বেড়ে উঠতে শিখবে। তাদের জন্য এমন শিক্ষা প্রয়োজন যা তাদের জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করবে এবং সংঘাত, প্রগতি এবং শান্তি নির্মাণ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখাবে।” নারীবাদী শিক্ষাবিদরা তাই শান্তি অন্বেষণকারী শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে শিশুদের সমরবাদ ও দেশপ্রেমের মধ্যে পার্থক্য শেখানোর মধ্য দিয়ে।

আশির দশকে সমাজবাদী চিন্তাপ্রসূত শান্তি অন্বেষণকারী শিক্ষার দার্শনিক ব্যাখ্যা গণমাধ্যম পর্যেষণা ও গণযোগাযোগের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ প্রস্তাবনা সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। নব্বইয়ের দশকে এ শিক্ষাদর্শন ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে শান্তি অন্বেষণকারী শিক্ষাকে সম্ভবপর করে তোলার উদ্যোগ নেয়। সাম্প্রতিক বিচারমূলক শিক্ষা বিজ্ঞানে বিচারমূলক জ্ঞানের ইতিবাচক ধারণা ও মানবাধিকারের সারগ্রাহী ধারণার রূপরেখা প্রদান করা হয়েছে।

শান্তি অন্বেষণকারী শিক্ষা বর্তমানে একইসঙ্গে তাত্ত্বিক কাঠামো এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা উভয়দিকেই গুরুত্বারোপ করছে যা জ্ঞানালোকের আদর্শপুষ্ট আধুনিকতাবাদী, নরমপন্থী উত্তর- আধুনিকতাবাদী, নারীবাদী, বিচারবাদী চিন্তাবিদ এবং উদারপন্থী সকলের নিকটই সমাদৃত হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে জোহান গ্যালটাং বলেন, “চূড়ান্তভাবে শান্তি অন্বেষণ মানুষকে আবার ঐক্যবদ্ধ করবে, সকল সীমাবদ্ধতা ও বিভক্তিকে অতিক্রম করবে।”

এভাবেই মানুষের মৌলিক সমস্যাবলির যৌক্তিক উত্তরানুসন্ধানের মধ্য দিয়ে দর্শনের মানবকেন্দ্রিক শাখাসমূহ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে মানবসভ্যতাকে, মুক্তি দিতে পারে হতাশা, অনিশ্চয়তা আর যুদ্ধবিক্ষুব্ধ অস্থিতিশীলতা থেকে। দর্শনই পারে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের পুনরুত্থান ঘটিয়ে নিপীড়িত দংশিত মানবতাকে পুনরায় জাগ্রত করতে। বিশ্বের সামগ্রিক কল্যাণ বিধান ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় দর্শন হতে পারে কাণ্ডারীস্বরূপ। 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত