নব্বই দশকের বিশিষ্ট কবি যশোধরা রায় চৌধুরীর কবিতার পাঠ অভিজ্ঞতা  

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comনব্বই দশকে যারা লিখতে এসেছেন, কবিতার সঙ্গে তাদের বহুবছর জীবন যাপন করা হয়ে গেল।তাই এবারে তাদের কথা আলোচনার মধ্যে আসা উচিত। আমি নিজেও নব্বই দশকের দ্বিতীয়ার্ধে লেখা শুরু করেছি। বাংলা কবিতা জগতে একটা প্রথা আছে নিজের দশকের কবির লেখা নিয়ে কথা না বলা। তাতে নাকি নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হয়। কিন্তু কেউ যদি পক্ষপাতিত্ব করতে চান তাহলে অন্য দশকের কবিদের নিয়েও করতে পারেন। অনুজ কবিদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু কবির প্রতি পক্ষপাত দেখাতে পারেন, আবার অগ্রজ কবিকে  ব্যক্তিগত অপছন্দ করার প্রভাব তার কাব্য নিয়ে আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। যাই হোক,এটা না হয় একটা প্রথা বহির্ভূত লেখাই হল। কবিই তো প্রথা ভাঙে।

যশোধরা রায় চৌধুরী লিখতে এসেছেন নব্বই দশকের দ্বিতীয়ার্ধে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থপ্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। কৃত্তিবাস পুরস্কারের স্বীকৃতি ১৯৯৮ সালে। তার মানে, তিনি যখন প্রথম তার কবিতাগুলি ছাপার জন্য পাঠাতে শুরু করেছেন তখন প্রবাদপ্রতিম কবিরা সৃষ্টির মধ্য গগনে। মাথার ওপর ঝকঝক করছে আশির তরুণ তরুণীরা। মল্লিকা, চৈতালী, জয়দেব,রাহুল, সুতপা, ঈশিতা, ভাস্কর, সংযুক্তা। স্মার্ট তাদের কাব্যভাষা, অনুসন্ধিৎসু তাদের জীবন জিজ্ঞাসা, পরিশীলিত তাদেরকবিতা বোধ। সেই সময়ে তিনি নিয়ে আসছেন তার কবিতার ঝুলি। নিজেকে সিরিয়াস কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং কবিতাতে থাকতে এসেছেন তা প্রমান করাই তখন একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ।বিশেষত তিনি আবার নারী।নবীন কিশোরকে অগ্রজরা ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ দিয়ে যেতে উৎসুক। নবীন কিশোরীকে নয়।তার জন্য তেল মাখানো লাঠি বেয়ে ওঠার বাঁদরের অঙ্কের পাটিগানিতিক চ্যালেঞ্জ, যা ঠিক ফেসবুকের চ্যালেঞ্জ নেবার খেলার মত মজার নয়। এই কথা যে কত সত্য তা বোঝা যায় কিছুদিন আগে এক অগ্রজ কবির স্নেহময় অভিভাবক সুলভ বক্তব্য দেখে, যেখানে তিনি বলছেন কবিতা মেয়েদের বিষয় নয়। কারণ, তার পথটি অধিক দুর্গম, বিপদসংকুল,তার স্থিতি টলে যায়।তাকে সমর্থন জানিয়ে আবার এই সময়েরই এক কবি বলেছেন যে প্রতি দশকে গুরুত্বপূর্ণ মহিলা কবি থাকলেও কেউই প্রধান কবি হয়ে উঠতে পারেন নি। যশোধরা এই চ্যানেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করেছেন কোন চালাকি দিয়ে নয়। নিজস্ব বোধ, চেতনা দিয়ে যা শুধুমাত্র সেই কম বয়েসের আবেগ সঞ্জাত নয়। কঠোর পরিশ্রম দিয়ে। বোঝা যায়, কবিতা ছাপতে পাঠানোর অনেক আগে থেকে ছিল তার প্রস্তুতি পর্ব।বাংলা কবিতা পার্বণের প্রতি অগ্রজ কবিকে গভীর নিষ্ঠায় পাঠ করেছেন নিজস্ব মেধার আলোতে।তারই ফসল ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘পণ্যসংহিতা’।

‘পণ্যসংহিতা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার নাম “বিজ্ঞাপন’।বিজ্ঞাপন কথাটা উচ্চারণ করলেই সমস্ত কবিতা পাঠকের মনে পড়বে “মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে”।অর্থাৎ, বিজ্ঞাপন নিয়ে ভাবনার প্রভাব বাংলা কবিতায় এসে গেছে ১৯৮৪ সালে।আশির দশকে চৈতালী লিখেছেন ‘বিজ্ঞাপনের মেয়ে’। সেখানে দাঁড়িয়ে এই মেয়ে কাব্যগ্রন্থের নামই দিয়ে বসলেন “পণ্যসংহিতা”। গোটা জগতটাই পণ্য এবং সেটা একটা পৃথক শাস্ত্র এবং ক্রমে ক্রমে সবকিছুই পণ্যায়ণের শিকার হবে –এই চিন্তার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন পাঠককে। তিনি উৎসর্গ পত্রে লিখলেন-

“ ওঁ

পণ্য এই ঊর্ধ্বদেশ পণ্য এই অধোদেশ পণ্য হতে পণ্য জন্ম লয়

পণ্য হতে পণ্য নিলে, রহে তবু পণ্যই পরম, মহাশয়।“

তাই এই নতুন কবিকে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করা ছাড়া উপায় ছিল না অগ্রজ কবি এবং কবিতা পাঠকের। ব্যক্তিগত প্রেমের কবিতার স্বতঃস্ফূর্ত   উচ্চারণ হয় যে বয়েসে, সেই বয়েসে কবি এই সাংঘাতিক দর্শন উচ্চারণ করে ফেললেন। ওই উচ্চারণ যে কত সুদূর দৃষ্টির প্রকাশ তা আজকের এই পণ্যায়িত দুনিয়ায় পৌঁছে সকলেই বুঝতে পারছি। এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটির দুটি পংক্তি তুলে দিচ্ছি।

“এ বড় অনন্য ঠ্যাং বড় বেশি মোহময় ঠ্যাং

এ  বড় নির্লোম বড় চেয়েচিন্তে ধার করা ঠ্যাং” (বিজ্ঞাপন)

বক্তব্য আর শব্দ দুই চমকে দেওয়া। আরো একটি কবিতার একটি পংক্তি উল্লেখ করব।

“জানালার  দুদিকের কোনো পুতুলেরই ক্রয়ক্ষমতা নেই”(উইন্ডোশপিং)

এই উচ্চারণটিকে আলাদা করে মনে রাখা দরকার। কারণ, এই ক্ষণিকের মৃদু অনুভব ওউচ্চারণ ভবিষ্যতে একটু পরিণত বয়েসে কবির অন্তঃকরণে আরো বিশদে প্রবেশ করবে। কবির দর্শনের দিক নির্দেশিকা হবে।এর পরের কাব্যগ্রন্থ “পিশাচিনী কাব্য”। নামটা দেখেই তরুণী কবির সাহসকে কুর্ণিশ করতে হয়। পিশাচিনী একটি নেগেটিভ ধারণা। পিশাচিনী বলতে খারাপ কিছুকেই নির্দেশ করে। সেখানে একটি নতুন কবির কাব্যগ্রন্থের নামই এটি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এটি মূলত প্রেমের কাব্য এবং পিশাচিনী ধারণাটিকে গ্লোরিফাই করেও কিছু লেখা হয় নি। মানবী মন এবং যাপনের পিশাচিনী অংশকে তার স্বাভাবিকত্ব সমেত মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।কয়েকটি পংক্তি তুলে দিচ্ছি-

কত যে হৃদয় আমি পান করি,মিক্সিতে ঘুঁটে ও ছেঁকে তুলে

সম্ভাব্য প্রেমিকদের চাউনিগুলি,চটচটে কাদা হাসিগুলি

গলা দিয়ে নেমে যায় সবই, অনায়াসে

#

শুধু একজনের ওই তাকানো,সরিয়ে নেওয়া চোখ

নখের আঁশের মত খক করে গলায় লেগেছে”(পিশাচিনীর  হেলথ ড্রিংক)

আরেকটি পঙক্তি-

“এত কালো হৃদয় যে অন্ত;করণকেও সাদা মনে হয়।” ( পিশাচিনী-৬)

এই কাব্যগ্রন্থের আরেকটি কবিতা লিখে আমি অন্য কাব্যগ্রন্থে চলে যাব ।

“এবারেও ভেবেছি যে এইই শেষ। আর না, বহুত

হয়ে গেছে।এটা যদি ভুলও হয়, তাহলেও, শেষ ভুল হোক।

তালবাদ্য, ঝাঁপানো রোদ্দুর, মিঠে নাচ, চড়া গান 

যা যা দিয়ে আমাদের ভুলগুলি রান্না হয়, সবই তো এখানে।

খুব স্বাদ।

সুতরাং ভয় করে।খুব।

যদি ফের এই ভুল থেকে উঠে পড়তে হয়? যদি ফের উঠে

নিজেকে হিঁচড়িয়ে, টেনে,অপর প্রেমের মধ্যে নিয়ে যেতে হয়?

আর তো পারব না, গুরু, যত কড়া রোদওয়ালা শুকনো

                                                                     আকাশ

দেওয়ার রয়েছে, দিও, মেনে নিচ্ছি,কিন্তু ছেড়ে যেও না কখনো ( ভুল ২)

প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ ধরে আলোচনা করব না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কবির কাব্যভাষা, বিষয় খুব স্রোতময়ী, বদলে বদলে যাচ্ছে,যা শক্তিশালী ও সৃষ্টিশীল কবিরই লক্ষ্মণ।

‘রেডিওবিতান’ কাব্যগ্রন্থে রয়েছে চাওয়ালা, ট্যাক্সিওয়ালাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের নিয়ে লেখা কবিতা, তাদের জন্য সংবেদনা।

“এক্ষুনি দমদম থেকে ফিরীসে শুকনো ছোলা খেয়ে

আবার দমদম যেতে ভালো লাগে কারুর, বলুন?” ( ট্যাক্সিওয়ালা )

এই বইয়েরই আরেকটি কবিতার কিছু পংক্তি-

“সেবারের পিকনিকে মায়াদিও ছিল না রে? ডিসেম্বর মাসে

কাপড়ে আগুন লেগেছিল, ও-ও শেষসময়ে ভুল বুঝতে পেরে

নেভানোর ইচ্ছে নিয়ে বিছানায় এসে গড়াচ্ছিল

বেডকভারে…বেডকভারে…এটা তবে সেই বেডকভার?

আমরা সকলে মিলে মজা মারছি যেটার ওপরে …(পিকনিক)  

“আবার প্রথম থেকে পড়ো “কাব্যগ্রন্থের ‘টেঁপি ও মনখারাপ” কবিতাটিতে কী অনায়াস দক্ষতায় এক শিশুকন্যার মনের জটিলতাকে তুলে ধরেন।কয়েকটি পংক্তি তুলে দিলাম-

“আচমকা সরিয়ে দেয় রোদ থেকে ভাইয়ের বালিশ।

ছোট্ট চেয়ারটাকে টেনে বসে। আর পা-জোড়া মাদুরে

ছড়ানো লেপের মধ্যে ঘষতে ঘষতে অপেক্ষায় থাকে

মা এসে কখন তাকে চড় মেরে সরাবে আবার।“

ছোট্ট মনের বিবিধ ক্রিয়া বিক্রিয়া ধরতে পারা এবং কবিতায় প্রকাশ করা খুব সহজ কর্ম নয়।

এই কাব্যগ্রন্থেই তার সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে নিয়ে রয়েছে প্রচুর কবিতা। প্রত্যেকটিই আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে। কিন্তু এখানে একটি কবিতা তুলে ধরছি-

“টাল হয়ে আছে বিছানায় তারা দুজনে

ঘুমিয়ে পড়েছে একে অন্যের ভিতরে

লেপের গরম ভিতরে বালিশ যেরকম

একজন শুধু দুহাতে রয়েছে আগলে

অন্যজনের চোখে মুখে খুব স্বস্তি

ঘন রস টেনে ঠোঁটদুটি ফুলো, রসালো

সারারাত ধরে মুখ রেখেছিল সেখানে

যেখানে জীবের সুখের উৎস, জীবনের

মুখ দিয়ে রাখা সঠিক বৃন্তে, উৎসের …

না হে, কোনো রতিক্রীড়া বলছি না, শিশুরা!  

মা এবং তার সদ্যোজাতের কাহিনী।“ (সংলাপ-২)

এই কবিতাটি বেছে নেওয়ার কারণ হল কবির চরম রসবোধের পরিচয়, পাঠককে নিয়ে একটু কৌতুক করে নেবার সুযোগ ছাড়লেন না। এই কবিতার প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে আগের প্রজন্মের কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের কিছু কবিতার কথা। তাঁরও একটি কবিতার উল্লেখ করব।আসলে যে কোন কবিই যখন নতুন কোন কবিতা লেখেন, তার ভেতরে থেকেই যায় পুরনোর চলাচল। এমন কী নিজের পুরনো কবিতাও। অতীত বাদ দিয়ে বর্তমান হয় না, আবার বর্তমান চলে যায় ভবিষ্যতের দিকে। আর, সন্তান জন্মের মত চির নতুন চির পুরাতন বিষয় নিয়ে কোন কবিই বা লেখেন নি? তাই আমি দুজন পরবর্তী যুগের কবির কবিতাও উল্লেখ করব।

‘একটি স্বস্তিক চিহ্ন শুয়ে আছে আমার শয্যায়

সে আমার সব কিছু কেড়ে নিতে চায়।

সে চায় আমার ত্বক, গন্ধ ও যৌবন

সে চায় আমার হাসি, সমাজ, সংসার

বন্ধ করে দিতে চায় কাজ ও প্রণয়

কারণ সে আষ্টেপিষ্ঠে আমাকেই চায়।

স্বস্তিক মঙ্গল, নাকি বিপদসংকেত!

অবচেতনের রং কেন নড়ে ওঠে ! 

সমস্ত অভ্যেস ছেড়ে এত দিনকার

আমিও ঝাঁপিয়ে কেন স্পর্শ নিতে চাই!

আমার বিছানা তাকে দিতে চাই কেন?

হাত ভাঁজ করে তোলা মাথার ওপরে

হাঁটু ভাঁজ, শুয়ে আছে সম্পূর্ণ স্বস্তিক

নবজাত শিশুপুত্র, রোহিতাশ্ব নাম।“ (রোহিতাশ্ব/ মল্লিকা সেনগুপ্ত)

“এবার সে চুপিচুপি চটি গলিয়ে নেমে গেল বারান্দা থেকে

গাছের পাড়ায়।

মেয়েকে সে আজ পশমে ঢেকেছে শীতের ভয়ে

তুলতুলে লক্ষ্মীর পাটুকু কেবল বেরিয়ে আছে আনমনে।

তার ঘরে এখন ধানিরঙের রোদ-দুধভরা মঙ্গলঘট

প্রতি ভোরে আজানের সময় মেয়ে জাগে

আর সে বকুল ফুল কুড়িয়ে রাখে মেয়ের খেলায়

কেবল বিকেলে সে নেমে যায় চুপিচুপি

নাম রাখে।

ডাকে –আরশিনগর।“ (আরশিনগর/ অদিতি বসু রায়)

“এই ন্যাড়া গ্রহে আজ মানুষ এসেছে। এতকাল

পড়ে ছিল রুক্ষ মাটি, পাথুরে প্রান্তর, কাঁটাগাছ,

বুকে হাঁটা জীব কিছু, কয়েকটি নিঃসঙ্গ জলচর,

আঁশে ভর্তি ল্যাপটপ, প্রাগৈতিহাসিক খাতা-বই

মানুষ এসেছে আজ।কাঁথা-মোড়া, ছোট্ট, গুটিশুটি

জরতী পৃথিবী তাকে পোশাকের  গ্রন্থি খুলে খুলে

চেনাচ্ছে দুধের উৎস, উষ্ণ প্রস্রবন। “(জায়মান/ রাকা দাশগুপ্ত)

এবারে আবার নবজাতকদের নিয়ে কবিদের লেখা থেকে ফিরে যাই অন্য কথায়। “পণ্যসংহিতা “কাব্যগ্রন্থের  “উইন্ডোশপিং” কবিতাটির একটি পংক্তি মনে রাখার কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, এই ক্ষণিক  উচ্চারণ কিন্তু কবির ভবিষ্যৎ দর্শন নির্দেশ করছে। সেটা একদম স্পস্ট ভাবে প্রকাশিত হল “মেয়েদের প্রজাতন্ত্র” কাব্যগ্রন্থে।

সেখান থেকে একটু তুলে দিই-

“ ‘সবকিছু কথনযোগ্য’ ‘সবকিছু তোমার সঙ্গে ভাগ করে নেব’

চেষ্টা তো করেছি- কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার আগে পরে

কোলবালিশ আঁকড়ে ধরে তোমার নিবিড় একা থাকা

খাবার পরের একটি অতি ব্যক্তিগত সিগারেট

একা একা বই পড়া, একা চিন্তা করা

আর যা যা উপভোগঃ তা কি

শেয়ার করেছ তুমি? কোনোদিন ভাগ দিতে পারো?

একা একা কবিতা লেখার এই আত্মরতিঃ যা আমার একমাত্র ত্রাণ

তাকে শুধু হিংসা করতে পারো “( পুরুষকে তিনটি ১)

এই কাব্যগ্রন্থের প্রতি কবিতায় সমাজে মেয়েদের অবস্থান উন্মোচিত হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই উন্মোচন আলো ফেলে।

“মাতৃভূমি বাম্পার “এমন অনেক বিষয়ে নিঃসংকোচে কথা বলে যা সমাজ ঢেকে রাখতে চায়, চাপা দিতে চায়, অস্বীকার করতে চায়। অথচ যা অনিবার্য ভাবেই আছে, থাকবে। একটি কবিতার কিছু পংক্তি-

“তবুও এ নিষিদ্ধ কহানি জুড়ে কেবল দীনতা লেখা নেই

তবুও এ নিষিদ্ধ কহানি জুড়ে কেবল শোষণ নয়, আরো

নরম কিছুই আছে। ট্রেনে বসে, সতীসাধ্বী আমাকে দেখাল সেই ছবি

মানিব্যাগ টেনে… দু বুকের মধ্যবর্তী কোমলতা থেকে

প্রসিদ্ধ আলোয় তার মুখ দেখে বোঝা গেল, কিছু কিহু অসতিত্ব অনিবার্য,

আকুলস্বভাবী,

নিষ্পাপ

অসভ্যতাময়। “( বউদিবাজিবিষয়ক )

“ক্ষত “কাব্যগ্রন্থে আবার বদলে যায় গতিপথ। মানুষের অন্তর্জগতের জটিলতা, অন্ধিসন্ধিগুলিই হয়ে ওঠে বিচরণক্ষেত্র।

“ যত নীচে চলে যাচ্ছে দড়ি

বালতি তত বেদনা তুলেছে” (ক্ষত)

“সূচের গমনপথ, ঝাঁপ দিয়ে পড়া

দেখে তুমি হও দিশাহারা

দেখো না দেখো না তার ফণা তুলে উঠে দাঁড়ানোটি

দেখো না সুতোর সেই চলে যাওয়া যথাসাধ্য দূরত্ব অবধি? “( সেলাই মুক্তি )

মধ্যবয়সের অনিবার্যতার উচ্চারণ –

“দ্বিপ্রহর গতপ্রায়। দ্বিপ্রহরে কটা হল ভুল

এই মাঝদরিয়ায় দেখা যায় না একূল ওকূল …

এতদূর এসেছিলে জীবনের নিজস্ব নিয়মে, পথ কেটে গেল হাওয়ায় উদবেল, রংচঙে

এখানে থেমেছে নৌকো, চলবে না স্রোতে, আহা, চলবে না স্বতঃস্ফূর্ত ঢঙে

এবারে বাইতে হবে। খাটতে হবে। পরিশ্রান্ত হতে হবে খুব

এখন যা পারো করো, এর পরে জীবনের নিজস্ব বক্তব্য নাই।

                                                                                     জীবন নিশ্চুপ। “( এখন)

“ফিরে আসা” কবিতাটির উল্লেখ করতেই হবে। এ তো যে কোন কবিরই একেবারে গহনতম আর্তির অনুবাদ।

“লেখার কাছে ফিরে আসতে হবে।টুকরো লেখা, আবিল লেখা, মারাত্মক লেখা,

ভালোবাসার লেখা।

লেখার কাছে নিজেকে জোর করে ফেরাতে হয়। 

বিগত বইমেলায় হাতে এল কবির এখনও পর্যন্ত সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ “জ্বরপরবর্তী”। কাব্যগ্রন্থটির নাম দেখে মনে হয়েছিল এ বুঝি ব্যক্তিমানুষের জ্বরই শুধু। কিন্তু এর প্রতি পরতে পরতে উঠে এসেছে ব্যক্তি মানুষের জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে সমসময়ের জ্বর, সমাজজীবনের জ্বর।

“প্রেমে পড়া সত্য নয়, আত্মদীপ সত্য নয় আর

সত্য শুধু অসততা, ভাও নেওয়া, নিজের প্রকৃতি

নির্জনে লুকিয়ে রেখে ক্রমাগত ছুড়ে দেওয়া বিষ

বিক্ষত অন্যকে করা, তাহলেই ভালো থাকা যাবে “ ( দাম)

আছে আত্মপরিচয়ের গল্প। তা একই সঙ্গে উন্মোচন এবং পুনর্নির্মাণ। বিভিন্ন কবিতায় তা বিভিন্ন ভাবে এসেছে।

‘ ভুলে যাওয়া প্র্যাকটিস করেছি।

দিন যায় দর্পণ প্রেক্ষণে।

আজো ভাবি, অমানিশা নয়

পূর্ণিমাই আমার মুকুল। “( রূপদক্ষ ২)

প্রেমের মত মানুষের জীবনে আরো অনেক মানসিক পরিস্থিতি থাকে।তবে, সচরাচর তা কাব্যভাষায় অনুবাদ করা হয় না। সেই অনুভূতিগুলিরও কেমন স্বচ্ছন্দ অনুবাদ দেখি –

“এলাকার সবক’টি পার্কে বসে আমাদের ঝগড়া করা হয়ে গেছে,

এইভাবে ভেবে দেখলেই, পার্কগুলো তৈরিই হয়েছিল আমাদের ঝগড়া

করবার জন্য

ঝগড়া ফেলে যাই আমরা ঘাসে।“ (চুর চুর কবিতা ৩)

প্রকৃত কবি দিনযাপনের প্রতিটি মুহূর্তেই কবি। প্রতি মুহূর্ত প্রতি অনুভব যিনি স্বচ্ছন্দে অনুবাদ করেন কবিতায় তিনিই কবি। এমন কোন বিষয়ই নেই যার মধ্যে কবিতা হয়ে ওঠার যোগ্যতা নেই। যোগ্যতা লাগে কলমের আর কবজির।

“অন্যদের ঈর্ষা আছে, তারা তোমাকে করুণা করার ছুতো খোঁজে।

কেউ চায় না তোমাকে নিজস্ব আনন্দ দিয়ে আপন করতে। তুমি জানো

জীবন এখনো তোমারই।

কেউ কেড়ে নিচ্ছে না তা।

তবু কেন এত ভয়! এত অন্ধ ভয় পাওয়া।“ (কষ্টসমূহ ৩ )

অসামান্য লাগল একটি কবিতার ভাবনা-

“আমাদের জন্য কোনো স্মৃতিফলক বানানো হয় না।

যারা বানান ভুল করে না, অন্যকে দুঃখ দেয় না,

মাতাল হয় না, স্ত্রীর সঙ্গে তঞ্চকতা করে না

তাদের কেউ কবি বলে না।

তারা যে মহৎ ও সুন্দর, এ কথা জন্যই এই কবিতা।

সুন্দর গানের মতো

সুন্দর ছবির মতো

সুন্দর জীবনযাপন, বুদ্ধি করে চলা,

নিজেকে চেপেচুপে রেখে দু’দিক সামলে রাস্তা পার হওয়ায়

চরম সৌন্দর্য আছে। তা একদিনের নয়, বহুদিনের সাধনা।“ (স্বাভাবিকদের জন্য একটি এলিজি)

শুধু এটুকু বলতে পারার জন্যও এই কবিকে প্রিয় তালিকায় রাখা যায়।

আরেকটি কবিতা হয়ত পাঠকদের অন্যভাবে ভাবতে শেখাবে। ভাবতে শেখাবে ভালো না লাগা গুলিকে পার হয়ে পৌঁছতে হয় ক্ষণিকের সুন্দর মুহূর্তে।

“সারাজীবনে কত ঘণ্টা ভাল লাগল না? ভাল না-লাগার এই

সময়গুলোকে যোগ দিতে দিতে আমরা পাহাড় বানাই

আমরা আলমারি বানাই, বুকশেলফ বানাই

একজন মানুষের জীবনেই তো জমে যায়

কত শ’, কত হাজার, কত লক্ষ ঘন্টার ভাল না লাগা

যেন ফিক্সড ডিপোজিট, যেন হাড়গোড়ের স্তূপ, যেন না –ভাঙা পাথরের চাঁই

তাহলে সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ জীবনের

সমস্তভাল না-লাগা ঘন্টাগুলো যোগ দিলে

কতখানি সময় দাঁড়াবে?

ততখানি সময়ের সমুদ্র পেরিয়ে আমি পাই

তোমার সঙ্গে একটা ফুলকি ঝরা মুহূর্ত (চিলতে)

আরেকটি কবিতার উল্লেখ করে এই আলোচনায় এতি টানব।একে হয়ত সব কবিরই প্রতিনিধিত্বমূলক স্বীকারোক্তি বলা চলে।

“ডিপ্রেশন অতীত হলে বাঃএকটা কবিতা আমি লিখে ফেলেছি বাঃ

বাঃ আমার কত না

ক্যালি আহা আহা, একটা লেখা আমার কী সুন্দর মোচড় দিলাম শেষটা

ডিপ্রেশন অতীত হলে আমি নিজের ঘাড়ে নিজেই চাপড় মারি আর

বলি বাঃ

আমার কষ্টের কী চমৎকার প্রতিফলন আহারে এই লাইনগুলো কেমন

হলুদ আর কাঁচা

ডিপ্রেশন অতীত হলে আমি নিজেই নিজের ডিপ্রেশন অতীত করেছি

এই লেখায়

কত না রঙ আমার কত কত রঙ আমার আহা আহা

ডিপ্রেশন থাকাকালীন এসব কিছু না

কেবল অন্ধকার

আর লেখা না হওয়া

কাল কালো কালো

আর

লেখা

না

হওয়া “ ( রঙ )

আলোচনার ইতি এখানে হলেও কবি তো এখন সৃষ্টির চরম লগ্নে। তার কলমে উদ্ভাসিত হোক আরো অনেক জীবন সত্য, সমাজ চিত্র, নিজস্ব যাপন এবং মানবমনের অন্ধ চোরাগোপ্তা গলিঘুঁজি। আমরা পাঠকেরা রইলাম তার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের অপেক্ষায়।

                                      

                

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত