Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,indian classical music irabotee-gitaranga-special

গীতরঙ্গ: মার্গ সঙ্গীতের ধারা । ফয়সাল আহমেদ

Reading Time: 3 minutes

অতি প্রাচীনকালে মুনি-ঋষিরা যখন বুঝিয়েছিলেন যে, চিত্তকে একাগ্র করার সর্বাপেক্ষা শক্তি সঙ্গীত, তখন থেকে তারা সঙ্গীতকে ঈশ্বর আরাধনার বা ঈশ্বর প্রাপ্তির একমাত্র সহজতম পথ হিসাবে গ্রহণ করেন। প্রাচীনকালের পণ্ডিতগণের মতে, “ঔঁ’’ শব্দের মধ্যে নাদ ব্রহ্ম নিহিত। সঙ্গীতের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করার জন্য সঙ্গীতজ্ঞরা একে কঠোর নিয়মে বাঁধার চেষ্টা করেন। এ রকম শৃঙ্খলাবদ্ধ সঙ্গীত যা, ঈশ্বর প্রাপ্তির বা ঈশ্বর আরাধনার সহজতম পথ বলে বিবেচিত হয়। মহর্ষি ভরত একে মার্গী বা মার্গ সঙ্গীত নামে আখ্যা দেন। সুতরাং প্রাচীন শাস্ত্রসম্মত ১০টি লক্ষণযুক্ত পদ, তাল ও স্বর সমন্বয়ে শাস্ত্রীয় ধারার অনুসরণকারী গীতিধারাকে ‘মার্গ’ সঙ্গীত বলা যেতে পারে।

বাংলার ‘মার্গ’ শব্দের অর্থ ‘অন্বেষণ’ এই অর্থ সঙ্গীতে দেখা যায় যে, পৌরাণিককালে ব্রহ্ম চতুর্বেদ অন্বেষণ বৈদিক সঙ্গীতের শুদ্ধ রীতি পরিমার্জিত করে যে সঙ্গীতের সৃষ্টি করেন তাই মার্গ বা গান্ধর্ব্য সঙ্গীত নামে পরিচিতি লাভ করে। ‘মার্গ’ সঙ্গীত বলতে ঠিক কোন প্রকার সঙ্গীতকে বোঝায় তা নিয়ে আজও বিদ্বানদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে পৌরাণিক শাস্ত্র-গ্রন্থ থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালের আদিম ‘গান্ধর্ব্যদেব দেশে’ যে সঙ্গীতরীতি প্রচলিত ছিল তা অনুসরণে এই মার্গ অথবা গান্ধব্য সঙ্গীতের সৃষ্টি। পৌরাণিক যুগ হতে শিবকে সঙ্গীতের গুরুরূপে কল্পনা করার রীতি প্রচলিত। এজন্য পৌরাণিক যুগের শিবমতকে গান্ধর্ব্য সঙ্গীত বলা হতো।

আজকাল মার্গ সঙ্গীত বলতে শান্ত্রীয় সঙ্গীত তথা রাগ সঙ্গীতকে বোঝায়। প্রাচীনকালে মার্গ সঙ্গীত বলতে বৈদিক সঙ্গীতকে বোঝাত। মার্গ অর্থে পথ, অন্বেষা বা আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের পথ। সঙ্গীত রত্নাকারে চারবেদ থেকে সংগৃহীত সঙ্গীতকে মার্গসঙ্গীত বলা হয়েছে। পরবর্তীকালে এই অর্থের পরিবর্তন হয়। ধ্রুপদ, খেয়াল প্রভৃতি মার্গ সঙ্গীতরূপে অভিহিত হয়ে থাকে।

মার্গ সঙ্গীত দুই প্রকার। ১. নিবদ্ধ ২. অনিবদ্ধ। মার্গ সঙ্গীতে আলপাদি নিবদ্ধে (অর্থাৎ যাহাতে আলাপ, মূর্চ্ছনা, তাল, লয়, অলংকার প্রভৃতির সমাবেশ থাকে) প্রযুক্ত হয়।

প্রাচীনকালে আমাদের দেশে সাধক-গায়করা নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতি বা আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে যে বিশেষ ধরনের গান করতেন তাকে মার্গসঙ্গীত বলা হতো। মার্গসঙ্গীত বিশেষভাবে নিয়ম-কানুন মেনে পরিবেশন হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে, কণ্ঠ বা যন্ত্র সঙ্গীতের সঙ্গে তবলা, মৃদঙ্গ প্রভৃতি আনন্দ যন্ত্রে তাল নির্দেশমূলক বাদনকে সঙ্গীত বলা হয়।

বর্তমান যুগে গানকে সঙ্গীত বলা হয়। যেমন: রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, লোকসঙ্গীত প্রভৃতি। আবার যেকোনো বাদ্যযন্ত্র বাদনকলাকেও সঙ্গীত বলে। অধিমিশ্র সুরকলা এবং কথা ও সুরের মিশ্রকলার নাম যথাক্রমে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও লঘু সঙ্গীত। চৌদ্দ শতকের প্রথমভাগে ও মধ্যভাগে এক প্রকার গীতধারা রচিত হয় এর নামও ছিল সঙ্গীত। বর্তমানে লক্ষণগীতির বন্দিশে যেমন রাগের পরিচয়মূলক কথা থাকে তেমনি তদানীন্তন সঙ্গীত নামক গানের বন্দিশে শ্রুতি, নাদ, স্বর, রাগ প্রভৃতি বর্ণনা থাকত। এই গানের তুক্ ছিল পাঁচটি। যথা: স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, ভোগ ও আভোগ। আবার প্রাচীন শাস্ত্রে সঙ্গীতের আলোচনায় বলা হয়েছে “গীতং, বাদ্যং, তথা, নৃত্যং এবং সঙ্গীত মুচ্যতে”। আজকাল অধিকাংশ গ্রন্থাকার এই বাক্যটিকে অর্থ করেছেন- গীত, বাদ্য ও নৃত্য, এই তিনটি কলার সৃষ্টিকে সঙ্গীত বলে। কেউ কেউ এই সংজ্ঞা একেবারেই মানেন না। নৃত্য হচ্ছে সঙ্গীতের বহির্ভূত একটি কলা। তবে এর সঙ্গে তাল কথাটি জুড়ে দিতে হবে, তাহলেই সঙ্গীতের প্রাচীন উক্তিটি পূর্ণাঙ্গ হবে।

আবার অন্য জায়গায় বলা হয়েছে গীত, নৃত্য, বাদ্য এই তিনটি আলাদা আলাদা কলা। একটির সঙ্গে অন্যটির মিল থাকতে পারে। সংস্পর্শ থাকতে পারে এমনকি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকতে পারে কিন্তু তাই বলেই ওই তিনটি কলা অভিন্ন বা সমষ্ঠিগত মিলিত বস্তু, এমন কথা বোঝায় না। যেমন- পদার্থ, রসায়ন, উদ্ভিদ, জীব, ‍মৃত্তিকা এই বিদ্যাগুলোর সমষ্টিগত নাম বিজ্ঞান। শাস্ত্রে বর্ণিত ‘সঙ্গীত’ শব্দটি আসলে একটি অনুষদ এবং গীত, বাদ্য ও নৃত্য এগুলো ওই অনুষদের অন্তর্গত তিনটি পৃথক শিক্ষণীয় বিষয় বা বিদ্যা বা বিভাগ।

সঙ্গীতকে ইংরেজীতে ‘Music’ বলে । আমরা যদি ‘সঙ্গীত’ শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ সম্+গৈ+ত এবং তৌর্যত্রিক শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ তৌর্য+ত্রিক। বর্তমানে তবলা লহরা একক বাদনকলা হিসাবে সঙ্গীতের অন্তর্গত চতুর্থ বিষয়রূপে স্বীকৃত।

অতএব গীত, বাদ্য, নৃত্য ও তাল এই চারটি পৃথক শিক্ষণীয় বিষয় বলে এখন সঙ্গীত অনুষদের অন্তর্গত। গীত মানে কণ্ঠসঙ্গীত, বাদ্য মানে যন্ত্রসঙ্গীত। নৃত্য মানে অঙ্গক্রিয়া তথা মুদ্রা ও অভিনয় এবং তাল মানে লহরা। গীত, বাদ্য , নৃত্য ও তাল এই চারটি পৃথক বিভাগ বা শিক্ষণীয় বিষয়ক অনুষদ হচ্ছে সঙ্গীত।

উক্ত বিষয়গুলো সঙ্গীত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এবং সঙ্গীত স্রোতাদের উপকারে আসলেই আমার শ্রম স্বার্থক হবে।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>