Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

ভ্যালেন্টাইন্স ডে ও এঁচোড়ের কাটলেট

Reading Time: 10 minutes

আজ ১৯ ডিসেম্বর কথাসাহিত্যিক ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


― ওরা কথা কয় না যে, মলিনা বললে। ― কথা কয় না আবার কি? বাচ্চা বাচ্চা একজোড়া স্বামী-স্ত্রী। ভাব করে বে করেছে, কথা কবে না মানে? আলবাত ক‌ইবে। ওদের আমার কাছে একবার পাঠিয়ে দিস তো। আর শোন্‌, কাল থেকে তোর ছেলের বৌকে কাজে পাঠাবি। আর রামু যেমনটি আসে গাছে জল দিয়ে, পালা ঝেটিয়ে তোর জ্বালন নিয়ে ঘর যাবে, গম্ভীর হয়ে রেখা বললেন। ― ঠিক আছে মা, তেমনটিই বলে দেবোখন বলে মলিনা ঘর পোঁছার বালতি দড়াম করে নামিয়ে রেখে ঘোমটা টেনে বেরিয়ে গেল খিড়কীর দরজা দিয়ে।

রেখার অনেক পুরোণো লোক মলিনা। অতবড় একতলা বাড়িটায় রেখা সারাদিন একলাটি থাকেন। সন্তোষবাবু কলেজের সিনিয়র অধ্যাপক। নিয়ম করে কলেজে যেতেই হবে তাঁকে। পিএইচডি স্টুডেন্ট আছে খান চারেক। তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে পেপার লেখাতে হবে। মাঝেমাঝে রেখাদেবীকে নিয়ে বিদেশেও যান। ছেলের কাছে কাটিয়ে আসেন তাঁরা। তা অবিশ্যি গরমের ছুটির সময়। একমাত্র ছেলে আসে কোনো কোনোবার শীতে। রেখাদেবীর সর্বক্ষণের সঙ্গী তার ফুলগাছ, কিচেন গার্ডেন আর তাঁর গল্পের ব‌ই ও নানারকমের ম্যাগাজিন। কথা বলার লোক বলতে মলিনা, তার ছেলে রামু আর পাশেরবাড়ির মানুষগুলি। ক্যাম্পাসে বহুদিন আছেন ; সকলেই মোটামুটি চেনে তাদের। আর তাই আসাযাওয়া লেগেই থাকে। মলিনা মাঝবয়সী। খুব কাজের। সকাল সকাল এসে রেখাদেবীর ফাইফরমাশ খাটে। আর তার ছেলে রামুও কিছু পরে এসে যায় বাগানের কাজ করতে। রান্না তিনি নিজেই করেন। কাটা, বাটা, পোঁছাপুঁছি, মাজাঘষা সব করে দেয় মলিনা পরিপাটি করে। ছেলে বলে দিয়েছে, মা, যতদিন পারো রান্নাটা নিজের হাতে করবে। মনে করে করে সব কিছু উপকরণ একে একে নিয়ম করে মনে রেখে সুষ্ঠুভাবে রান্না করলে নাকি ডিমেনশিয়া হয়না। আর রেখার রান্না করাটা চিরদিনের প্যাশান। আর দুটি মানুষের তো রান্না। জোগাড় থাকলে কোনো ব্যাপারই নয়। পরদিন সকালবেলা ময়না কাজে এল। মলিনার ছেলে রামুর বৌ । বিয়ের পরপরই মা হয়েছে। ― কি রে বৌমা, মুখটা অমন শুকনো কেন তোর? রামু কাজে এলনা তো এখনো। লাউগাছগুলো মাচায় তুলতে হবে, বেগুণগাছে ওষুধ দেবে।কাগচিলেবুর ফুল এসেছে। গাছের গোড়া খুঁড়ে গোবরসার দিতে হবে। মেলাকাজ আছে বাগানের। ময়নাকে বললেন রেখা। ― ময়না বলল্, সে তো সাইকেলে আসবে দিদা। আমি তো হেঁইটে এলি। ― ও মাগো! এক জায়গায় দুজনে আসবি। দুমিনিট আগে পরে বেরুলে তো একসঙ্গে আসতে পাত্তি, রেখা বললেন। এইটুকুনি মেয়ে, মা হয়ে চেহারায় কালি তো তোর! হ্যাঁরে ছেলেটা বুকে খায় এখনো? আর দিবিনা। টেনে টেনে খেয়ে তোর হাড় মাস এক করে দিয়েছে। ― না, গো দিদা, বুকে না খেলে বড্ড বায়না করে যে ময়না বললে। ― তা কষ্ট করে না হেঁটে, রামুর সাইকেলেই তো আসতি। না হয় দু পাঁচমিনিট দেরি হত। রেখা বললেন। কি রে ময়নাবৌ মুখ নীচু করে আছিস, তোর শাশুড়ি বলছিল, তোর সাথে রামুর নাকি কথা নেই। ― কি কি মশলা বাটতে হবে বের করে দাও দিদা। এই শাকগুলো কুচিয়ে দি? ময়না বললে। ― কথা ঘোরাসনে ময়না। হ্যাঁরে রামুর সঙ্গে কথা কোসনা বুঝি? রেখা বললেন। ― ওই তো কথা বলেনা। আমি কি বলব? কাজের কথা ছাড়া কোনো কথা জিগেস কল্লেই তো বাড়ি মাথায় করে। ময়না বললে। –ভাবসাব করলি, বে থা কল্লি। আর একটা বাচ্চা হতে না হতেই ভালোবাসা উবে গেল তোদের? ― দিদা, বাগানের কাজ থেকে গিয়ে সে যদি বেপাড়ায় ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যে করে ঘর যায় আর তার দেরীর কথা শুধোলে রাগের কি আছে তা বাপু আমি বুঝিনা। ― আচ্ছা শোন্‌ পোস্তটা বেটে দিস্‌ ভালো করে। আর কড়াইয়ের ডালটা ধুয়ে দে। ― ঠিক আছে দিদা। ― আর শোন্‌ রামুকে ডেকে ওর চা’টা দিয়ে আয় আগে। ― ময়না কাপে চা ঢেলে নিতে রেখা মুড়ির মৌটো খুলে এককাঁসি মুড়ি আর রাতের তরকারিটুকুনি মুড়ির ওপর দিয়ে বললেন, এনে তোর চা’টাও তো নিবিরে ময়না। ― ও দিদা, এতটা মুড়ি-তরকারী ও একা খাবে? ― রেখা চীত্কার করে বললেন, জানিনা, আমি পুজোয় বসছি। রেখাদেবীর পুজোর ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে কিছুটা বাঁধানো জায়গায় পা ছড়িয়ে বসে রামু রোজ জলখাবার খায়। পুজো সেরে চায়ের কাপ আর টোষ্ট নিয়ে কর্তা-গিন্নী বসলেন টেবিলে। সামনে খোলা টিভি। ওদিকে মালী আর তার বৌ ব্যস্ত তাদের খুচরো ফষ্টিনষ্টি আর টুকরো-টাকরা ঠাট্টায়। কানে এল গিন্নীর .. একটু অসংলগ্ন হাসি কখনো বা একটু রাগের সাড়া। চা খেতে খেতে প্রোফেসর ভদ্রলোক বল্লেন ― কি গো তুমি খাচ্ছনা যে বড়! চা যে তোমার পান্তা হয়ে গেল গিন্নী! ― রেখা বললেন, জানো আজ দুটিতে মিলে খুব গপ্পো করচে শুনে এলুম। ― কর্তা বললেন কারা? রেখা বললেন ঐ যে গো সেই মালী বৌ আর তার বরটির যে ঝগড়া চলছিল তোমায় বলেছিলুম না! ― আহা থাকুক না ওরা দুটিতে মিলে, তুমি ওসবে মাথা ঘামিয়োনা। ― দ্যাখো দেখি এখন যত্ত পিরীত! কাজগুনো কে করবে বলো দিকিনি…ওদিকে বাগানের অত কাজ এদিকে আমার রান্নাঘরের মেলাকাজ। এই জন্যে মলিনাকে বলি তুমি কিছুটা সেরে রেখে যাও বাপু। ― এই তো তোমার ঘুম হচ্ছিলনা এদ্দিন ওদের দুজনায় আড়ি-আড়ি চলছিল বলে ― না, না তা ঠিক নয় ; সে তো মেয়েটা রোজ এসে আমাকে বলে ” দিদা সে তো রাতেরবেলায় বিডিও দেখতে যায় গেরামের বাজারটায়। কি সব আজেবাজে সিনিমা দেখায় সেখানে। যত্তসব পাতাখেগো লোকগুনোর ভীড় সেখানে, আমার ভয় করে বড্ড “ তা ওকে জিগালেই পারতি তো কেন রোজ সংসার ছেড়ে মাঝরাত অবধি ওসব ঠেকে যায় সে। রেখা বলেছিলেন একদিন। ময়না বলেছিল, ― সেকথা আমি জানি বলেই তার কি রাগ! আমারে একদিন সঙ্গে করে নিয়ে গেলেই তো পারো …কয়েছিলাম তাকে। বাব্বা! সে শুরু করে দিল তেঁতুলতলার বিষ্টি! থামতেই চায়না জানো দিদা? বলে কিনা মেয়েছেলেরা ওসব জায়গায় যায়না। হাঁড়িয়া আর পাতি বাংলু খাওয়া মরদের ভীড় সেই বিডিও পাল্লারে। তখন তো আর জানিনে যে আমার ঘরের,মানুষটাও আমাকে লুকিয়েচুরিয়ে পাতাও খাচ্চে ওখানে গিয়ে। ― বলিস কিরে? রামু পাতা খায় আজকাল? ― হ্যাঁগো দিদা সেদিন আমার শাউড়ির লক্ষী-ভাঁড়টা ভেঙে পালিয়েছিল। অত্তবড় বেবাহিত ছেলেটাকে ধরে মায়ের সে কি মার। মায়ের পা ধরে ক্ষেমা চেয়ে র‌ইল বেশ ক’ দিন। তারপর আবার যে কে সেই! প্রোফেসর ভদ্রলোক চায়ের কাপে শেষচুমুক দিয়ে বললেন ― তাহলে কি বিহিত করছ গিন্নী? ― দাঁড়াও আজকের বিহিতটা তো উতরোই আগে ― কর্তা বললেন আজকের বিহিত মানে? ― মানে ঐ তোমার বাজারের আস্ত এঁচোড়ের পব্বোটা আগে হতে দাও বাপু! কোথায় গেলিরে ময়নাবৌ নে, নে দুহাতে তেল মেখে গতি কর বাপু ঐ কচি এঁচোড়ের। ফাগুণ মাসে চারিদিকে বয় ভালোবাসাবাসির হাওয়া । খুশির প্রেমদিবসে মাতোয়ারা অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ। প্রোফেসর ভদ্রলোকটি কাল রাতে গিন্নিকে বলে রেখেছেন চুপিচুপি ― কাল ভ্যালেন্টাইন্স ডে বুঝলে গিন্নি! আমাকে ঐ এঁচোড়ের কাটলেট বানিয়ে দিও বরং, আমি তোমার জন্য কফি বানাবোখনে। তারপর সূর্যাস্তের পর ফাগনে হাওয়ায় বাগানের ঐ ঈশাণকোণটিতে মুখোমুখি বসে আমরা দুটিতে ভ্যালেন্টাইন্সডে মানব। তোমার কাটলেট আর আমার কফি দিয়ে। ঘন্টার পর ঘন্টা দুজনে বসে বসে চাঁদ ওঠা দেখব, তারা গুনব একটা, দুটো, তিনটে…সেই সেবারের মত তুমি চেঁচিয়ে উঠবে ঐ যে সপ্তর্ষিমন্ডল, ঐ যে লুব্ধক এই বলে আর আমি বলব দেখেছো ঐ জ্বলজ্বলে স্থির ধ্রুবতারাকে কিম্বা ঐ লালচে মতন মিটমিটে মঙ্গলকে? তুমি গান ধরবে ফাগুন হাওয়ায়, রঙেরঙে পাগলঝোরা লুকিয়ে ঝরে…আমি উঠে গিয়ে সেই কাশ্মীর থেকে কেনা প্রথম বিয়ের তারিখের গোলাপী পশমিনাটা এনে তোমার গলায় জড়িয়ে দেব …যতক্ষণ না চাঁদ ডুবে যায় মেঘের মধ্যে ― ডুমোডুমো করে কাটিস কিন্তু আর জল দিয়ে প্রেসারে বসিয়ে দে। চারটে সিটি দিয়ে নামিয়ে রাখ বুঝলি ময়না? ― দিদা আজ কি আছে যে এত রান্না করছ? কেউ আসবে বুঝি? ― এত রান্না কোথায় রে? শুধু তো এঁচোড় কাটতে বলেছি। আর ঐ নারকোলের মালাটা খুঁড়ে কুচোতে বলেছি তো। কাটলেটে দিতে হবে না? কাল একটা বিশেষ দিন। তোর দাদু খেতে চেয়েছে কাটলেট। ― কাটলেট বানাবে তুমি? সে তো হোটেলে বিক্রি হয় । তুমি বানাতি পারো বুঝি? জানো দিদা তোমার ঐ পাজি মালীটা আমাদের বে’র পর পেত্থমবার মেলায় নিয়ে গিয়ে আমায় চপ খাইয়েছিল। তখনো আমায় ভালোবসতো সে। ― এবার আমি তোকে কাটলেট দেব। দুজনে মুড়ি দিয়ে ঐ কাটলেট খাস খন। পরদিন সকালবেলা! ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র ভোর। না ঠান্ডা না গরম দিনকাল। ভোর ভোর মলিনা এসে প্রোফেসর গিন্নীর কিছুটা কাজ এগিয়ে দিয়ে গেল। তারপর কিছু পরেই এল ময়নাবৌ। মুখটা ভার ভার। থমথমে মুখ দেখে রেখা বললেন ― কিরে আজ আবার একা এয়েছিস অতটা পথ হেঁটে হেঁটে। ময়নাবৌ চুপ করে নিজের কাজ সারতে লাগল। গিন্নী বললেন, সে মুখপোড়া রামু কোথায় গেল? ― সে পরে আসবে। এখনো ঘুমোচ্ছে। কাল অনেক রাতে বাড়ি ফিরেচে দিদা। রেখাদেবীর বাগান আলো করা নানা রঙের পিটুনিয়া তখন। আরো আছে পুজোর সব ফুল। গাঁদা, জিনিয়া, দু’চারটে টগর আর ভর্তি লঙ্কা জবা। পুজোর ফুল তুলতে তুলতে গিন্নীর মাথায় বুদ্ধি এল। ময়নাবৌকে ডেকে বললেন ― শোন্‌, তাড়াতাড়ি করে পেছনের চৌবাচ্চায় মুখ হাত ধুয়ে চুলটা চূড়ো করে বাঁধ দেখি। আর “এ নে” বলে ক’টা বড় বড় জিনিয়া তুলে মেয়েটার হাতে দিয়ে বললেন এগুলো খোঁপায় আটকে নে তো। যা বলছি শোন্‌ শিগ্‌গির্‌। ময়নাবৌ অবাক হয়ে বলল ― কেন দিদা? আমাকে সাজতে বলছ কেন? ― বাড়িতে লোকজন আসবে এখুনি। তোকে না বলেছিলাম কাল। আজ হোল ভ্যালেন্টাইন্স ডে। দাদু এঁচোড়ের কাটলেট খেতে চেয়েছে। ― সেটা আবার কি দিদা। ― সব বলব পরে আগে পুজোটা তাড়াতাড়ি সেরে নি। আমার ঘরে খাটের ওপর একটা কমলা রঙের ছাপাশাড়ি রেখেছি তোর জন্যে। আমার পুরোণো শাড়ি কিন্তু এক্কেবারে নতুন আছে। ওখানা পরে নি গে যা শিগ্‌গিরি। ― ময়নাবৌ লাফাতে লাফাতে চৌবাচ্চার দিকে গেল তারপর একরাশ এলোমেলো চুলগুলোকে বশে আনতে চূড়ো করে খোঁপা বাঁধল আর দিদার কথা মতন দুটো জিনিয়া ফুল গুঁজে নিল এক সাইডে। দিদার ঘরে গিয়ে এবার কমলারঙের শাড়িটা ঠিকঠাক পরে নিল আর দিদার ড্রেসিং আয়নায় মুখটা চট করে দেখে নিল। দিদা ঘরে ঢুকেই খুঁজে পেতে পুরোণো একটা টিপের পাতা পেয়ে মহানন্দে ওকে কপালে একটা চার আনার মত কমলা টিপ পরিয়ে দিলেন। আর সিঁদুরকৌটো খুলে সিঁদুর দিলেন মেয়ের সিঁথেয় একফোঁটা। বললেন – দ্যাখতো এবার নিজেকে চিনতে পারিস কি না ময়না বৌতো আহ্লাদে আটখানা! – বললে, দিদা আজ তোমার বাপের বাড়ির লোক আসবে বুঝি? গিন্নী বললেন যা এবার ফ্রিজ খুলে দ্যাখ গিয়ে তোর দিদা এখনো কেমন কাটলেট গড়তে পারে। ট্রে খানা সাবধানে বার করবি। কড়ায় তেল বের করে রেখে এসেছি। দুটো করে কাটলেট কম আঁচে ভাজবি। দেখিস যেন পুড়ে না যায়। পুজো করতে বসেই গিন্নি শব্দ পেলেন রামুর সাইকেলের ক্যাঁচকোঁচ। তারপর পুজো সেরে রান্নাঘরে ঢুকে দ্যাখেন দিব্বি কাটলেট গুলো ভাজতে শুরু করেছে ময়না। – এবার তুই চায়ের জল চাপা দিকিনি। রামুও এসে গেছে। ময়না খুশি খুশি মনে চায়ের জল বসিয়ে মুড়ির থালা অনতে গেল। উঠোনের দিকের জানলা দিয়ে এক ঝলক বরটাকে দেখে খুব আনন্দ পেল মনে মনে। অন্যদিনের মত বিরক্তি নেই আজ বরং আজ একটু বেশি খুশিখুশি। রেখা হাঁক দিলেন – কি রে ময়না চা, মুড়ি আর দুটো কাটলেট দিয়ে আয় বরকে আর নিজেরটাও নিয়ে যা তো। আজ আমার রান্নার তাড়া নেই। কালকের সবকিছুই একটু করে পড়ে আছে ফ্রিজে। ধীরে সুস্থে খেয়ে দেয়ে এসে ঘর পুঁছে নিস। ময়না দুজনের খাবার একসাথে নিয়ে বাগানের দিকে চলে গেল। রেখা আজ সন্তোষবাবুকে চা দিয়েছেন বসার ঘরে নিজের চায়ের কাপ নিয়ে শোবার ঘরে জানলার ধারে পর্দার পাশে বসেছেন তিনি। – তুই যে আজ বড় সুন্দর সেজেছিস রে ময়না, রামু বলল। – থাম্‌, গরম গরম কাটলেট দিয়েছে দিদা খেয়েনে দিকিনি। – জানিস ময়না আজ আমার ঐ বোসেদের বাড়ির বাগানে যেতে হবেনা । আজ নাকি কি একটা দিন। বোসবাবু আর নতুন বৌদিমণি আজ ভোরবেলাতেই বেড়াতে বেরিয়ে গেছে অনেকদুরে। সেই রাতে ফিরবে। সমুদ্দুরের ধারে যাবে বলছিল। – হ্যাঁ, দিদাও বলছিল বটে , আজ যেন কি একটা দিন। – জানিস ময়না আজ তোকে নিয়ে খুব বেড়াতে যেতি ইচ্ছে কচ্চে রে! – ধুস্‌! এখন আমার মেলা কাজ পড়ে। – শোন্‌ না, কাজ শেষ হলে বাড়ি ফিরে বাচ্চাটাকে মা’র কাছে থুয়ে আজ নদীর ধারে যাবি? সেই ভসরাঘাট ? বাস যায় সেখানে। বাসের গায়ে লেখা থাকে “ভসরাঘাট যাইবে” আমি নিজে চোখে দেখেচিরে। সুবর্ণরেখা নদী পাড়ে যাবো তোতে-আমাতে ।তারপর একখান খেয়া ভাড়া করে ওপারে যাব। হাতীর দল ভাগ্যে থাকলে দেখতে পাবি। শীতের শেষে শুনেচি ওরা নাকি জল খেতে আসে নদীতে । যাবি ময়না? – তুই বাড়ি গেলেই সব ভুলে যাবি। ভাত পেটে পড়লেই তোর ঘুম আর তাপ্পর ঘুম থেকে উঠেই তুই আবার গাঁয়ের বন্ধুগুলোর পাল্লায় পড়ে সাইকেল নিয়ে শহরের বাজারে গিয়ে সেই সিনিমা দেখবি রাত অবধি আর আমি সেই একটুকু দুধের বাচ্চাটাকে কোলে করে করে সন্ধ্যে অবধি থকে গিয়ে শেষে ঘুমিয়েই পড়ব যতক্ষণা না তোর মা ডাকবে খাবার জন্যি। – না, রে ময়না, এই তিন সত্যি কচ্চি আমি। আজ আমরা যাবই সেখানে দেখিস। নদীর সাদাবালির চরে রোদের আলো পড়ে রূপোর মত চকচক করবে, নদীতে আঁচলা ভরে জল নিয়ে আমরা হাত-পা-মুখ ধুয়ে একটু জিরোবো খনে। তাপ্পর খেয়া ধরে…. – আচ্ছা ওখানে গিয়ে কি খাওয়াবি আমায়? – দেখি! বাবুরা যখন বলছে আজ একটা বিশেষ দিন। সকলে ভালোমন্দ খাচ্ছে, বেড়াতি যাচ্ছে তাহলে আমরাই বা কম কি সে? নিশ্চয়ই মেলাটেলা হবে বিশেষ দিনে। সে রোল-মোগলাই-চাউমেন ঠিক জুটে যাবে মেলাতে। – বেশ, তবে আর বসব না, কাজ সেরে নি দাঁড়া। বাড়ি গিয়ে ছেলেটাকে নাওয়াতে খাওয়াতে হবে। রেখাদেবী তো জানলার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে এতক্ষণ সব শুনেছেন ওদের বার্তালাপ। রান্নাঘরে গিয়ে দ্যাখেন ময়না বাসন ধুচ্ছে। – নে, নে আমাদের আজ একটু তাড়া আছে রে। এক জায়গায় যেতে হবে। তোর আর বিকেলে আসতে হবেনা। কাল এসে রাতের বাসন করিস বুঝলি? ময়না একগাল কান এঁটো করে হাসল। রেখাও বুঝলেন সেই হাসির অর্থ। বেলা তখন একটা হবে। প্রোফেসর সন্তোষবাবু লাঞ্চে এলেন বাড়িতে। রেখাদেবী ঠিক করে রেখেছিলেন সব। ক্যাসেরোল ভরে ভরে ফ্রায়েডরাইস, ডাল, এঁচোড়ের কাটলেট, চিলি চিকেন নিয়েছেন গুছিয়ে। কর্তা আসতেই তাঁকে বললেন গাড়ি বার করতে। সন্তোষবাবু বললেন – এখন গাড়ি করে আবার কোথায় যাবে? আজ দুপুরে তো আমি অফ নিয়েছি। বিকেলে দুজনে সেই কফি আর কাটলেট খাব যে! তোমার মনে নেই? – রেখাদেবী বললেন সেইজন্যেই তো গাড়ি বের করতে বলছি। সেই সেবার আমরা যেমন নদীর ধারে গিয়েছিলাম। সেই ভসরাঘাট! ক্যাম্পাস থেকে তো ঘন্টা দেড়েক লাগে যেতে । চল বেরিয়ে পড়ি। নদীর ধারে সজনে গাছের ছায়া খুঁজে নিয়ে লাঞ্চ সারবো আমরা। আমি সব বানিয়ে নিয়েছি। – চলো তাহলে, বলে গ্যারাজের দিকে এগুলেন সন্তোষবাবু। – রেখাদেবী বাড়ি বন্ধছন্দ করে খাবারের ব্যাগ-পুঁটুলি নিয়ে চললেন পিছুপিছু। ক্যাম্পাস থেকে গাড়ি সোজা হিজলি ফরেষ্টের মধ্যে দিয়ে ল্যাটেরাইটের সিঁদুর মাটি, ধূধূ ধানজমির সবুজ আর রোদ ঝলমলে শেষ শীতের রেশ নিয়ে কেশিয়াড়ির পথে। কিছুপরেই ভসরাঘাট, সুবর্ণরেখা নদীর চরে। যাত্রীবোঝাই বাস নামাচ্ছে যাত্রীদের। কোনো স্থায়ী সেতু হয়নি এখনো। অর্ধসমাপ্ত, অস্থায়ী ব্রিজের কাছাকাছি গাড়ি রেখে হেঁটে নদীকে দেখতে গেলেন ওরা। কিছু কষ্ট করে সেই বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে মানুষ জন পারাপার হয় এখানে প্রতিদিন। মাল বওয়ার জন্য ঢুলি পাওয়া যায়। – সুবর্ণরেখা শীতে অনেকটাই রুক্ষ না গো? রেখা বললেন। – আরে এতো বরফগলা জলে পুষ্ট নদী নয় গিন্নী। – সে বাপু যাই বল, নদী তো নদীই আর কি সুন্দর শান্ত জায়গাটা গো! চলো আমরা একটু ছায়া খুঁজে বসি গিয়ে। -নদীর সাদা ও মসৃণ বালির চরে রোদ পড়েছে আর চকচক করছে বালিকণা। সুবর্ণরেখা বয়ে চলেছে আপনমনে । জল বড় কম নদীতে। মাঝিমল্লারা নৌকা নিয়ে আসাযাওয়া করছে, মাছ ধরতে যাচ্ছে কেউ । কেউ পারাপার করছে। -একটা বড়সড় গাছ দেখে নদীর ধারে বালির চরে শতরঞ্চি পাতলেন রেখা। সন্তোষবাবু জুতো খুলে বসে পড়লেন। ১৪ই ফেব্রুয়ারি। বেশ ওয়েদার। রোদের তাপ কষ্টের নয়। আবার ফাগনে হাওয়াও দিচ্ছে মাঝে মাঝে। রেখা একে একে খাবার দাবার বের করলেন লাঞ্চবক্স খুলে। কর্তাটিকে পরিবেশন করতে করতে বললেন -হোল তো ভ্যালেন্টাইন্সডেতে বৌয়ের হাতে এঁচোড়ের কাটলেট খাওয়া? -আচ্ছা তোমার ঐ বাগানের মালী আর তার বৌয়ের কি খবর? -আরাম করে খাও তো আগে। ওদের কথা পরে হবে আবার। সারাক্ষণই তো ওদের কথা হচ্ছে। আজ আমরা নিরিবিলিতে কেমন ভ্যালেন্টাইন্সডে বানাতে এসেছি বলো দিকিনি? -সন্তোষবাবু পরম তৃপ্তিতে তখন ভাত মেখেছেন ডাল দিয়ে আর কাটলেটে কামড় বসাতে বসাতে বললেন ” আচ্ছা ঐ ছেলেমেয়েদুটোর হাতে দুটো কাটলেট দিয়েছিলে তো? – এদ্দিনে তোমার বৌকে তুমি এই চিনলে গো? সকালেই দিয়েছি ওদের। মেয়েটা কেটে না দিলে কে বানাতো তোমার এই কাটলেট? একথা সেকথা বলতে বলতে খাওয়া শেষ হল। এবার ওরা জিনিষপত্র গাড়ির মধ্যে রেখে নদীকে ছুঁয়ে দেখতে গেলেন। ছোট বড় খেয়া পারাপার হচ্ছে। ওপারে নয়াগ্রাম। – সজনে ফুলের গন্ধ তখন বাতাসে। হাওয়ায় তখন বসন্ত এসেছে। একটা দুটো কোকিলও ডাকছে। তখন প্রায় বিকেল হয়ে আসছে। মাঘের রোদটায় বেশ আরাম লাগছে প্রৌঢ-প্রৌঢ়ার। রেখা এগিয়ে গেলেন একটা ডিঙি নৌকোর দিকে। -তোরা এখানে কি করতে? -তোমারা এখানে যে দিদা? ময়না বললে। -পরণে সেই তাঁর দেওয়া কমলা রঙের ছাপা শাড়ি আর মাথায় জিনিয়া ফুলদুটো তেমনি রয়েছে।কপালে সেই কমলা টিপ পরা যেমনটি রেখা পরিয়ে দিয়েছিলেন সকালবেলায়। আর রামু তার পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। – রেখা সন্তোষবাবুকে ডেকে বললেন – দেখো কারা এয়েচে আমাদের মত। তোদের খাওয়া হয়েচে? কিছু খাবার বেঁচেছে, রামু গাড়িটা খুলে গিয়ে খেয়ে নে তোরা। ময়না একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে রামুর সাথে গাড়ির দিকে গেল। খেয়ে দেয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে বাসনগুলো ধুয়ে আনল। সন্তোষবাবু বললেন – শোনো এবার সন্ধ্যে হয়ে আসছে। এবার কিন্তু আমাদের ফিরতে হবে । তোরা গাড়িতে উঠে পড়। ফিরবি তো? ময়না আর রামু গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসল। সামনে রেখাদেবী আর পাশে তাঁর চালক স্বামীটি। গাড়িতে উঠে বসে কিছুটা পথ চলার পর রামু বললে – দিদা আজ কি আছে গো? – কি মানে? – না এই বড়দিন বা নেতাজীর জন্মদিনের মত কিছু আছে না কি গো? সকলে বেড়াতে যাচ্ছে। রেখা দেবী বললেন – আজ হোল বৌকে ভালোবাসার দিন বুঝলি? আজ বৌকে ছেড়ে কোত্থাও যেতে নেই। বৌকে নিয়ে আজকের দিনটায় অন্তত: বেরুলে কোনোদিনও তার সাথে ঝগড়াঝাটি বিচ্ছেদ হয়না বুঝলি? দেখছিস না তোর দাদু আজ দুপুরে আর আপিস গেলেন না। ছুটি নিয়ে আমাকে বেরিয়েছেন সঙ্গ দিতে। গাড়ি চলেছে দিঘীকে পাশে ফেলে। নারকোল আর খেজুরগাছের ছায়া সুনিবিড় সবুজ জল। চওড়া পিচের রাস্তার পর শুরু হল সরু রাস্তা। এত সরু যে একটি গাড়ি চললে আর উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি এলে নেমে যেতে হবে মাটিতে। আবার জঙ্গল। এবার বাঁশঝাড়ের পর বাঁশঝাড়। মন দিয়ে গাড়ি চালানোয় ব্যস্ত সন্তোষবাবু। আর রেখাদেবীর কান পড়ে র‌ইল পেছনের সিটে। কখনো উসখুশ্, কখনো বা খিলখিল হাসি। আবার নিশ্চুপ। আবার বকবক। কর্তার পাশের রেয়ার ভিউ মিরর দিয়ে যতটা চোখ যায় দেখছেন তিনি। ভাগ্যি তাদের গাড়ির সামনে বাকেট সিট নয়! রেখা সরে এসেছেন তাঁর কর্তার পাশটিতে আর পেছনের সিটে রামু জাপটে ধরে অনর্গল চুমু খেয়ে চলেছে ময়নাকে। আহা! এমনটিই তো চেয়েছিলেন রেখা। আকাশে বাতাসে বসন্ত ম ম করছে তবু এদুই জুটির প্রেম উবে গিয়েছিল বাষ্পের মত। ওদের গ্রামের পথ দিয়ে আসার সময় নামিয়ে দিলেন ছেলেমেয়েদুটোকে। এরপর আবার সেই একঘেয়ে কাজের দিন, বসন্ত গিয়ে গরমের অসহ্য দিন। মাঝে দু’একটা কালবোশেখি। মলিনার সাথে ময়নার কাজে আসা, রামুর বাগান দেখা, সময়ের ফুল সময়ে ফোটানো, গাছের পাতায় জল ছেটানো সব ঠিকমত চলতে লেগেছে এ পর্যন্ত। অঞ্চলে চাল দিলে সাইকেল নিয়ে রামুর দৌড়ে গিয়ে চাল নিয়ে আসা,সংসারের প্রতি অনেক দায়িত্ত্ব বেড়ে গেছে। রামুর ছেলেটাকে পঞ্চায়েতের ইস্কুলে দিয়েছে। ছুটির দিনে মায়ের সাথে রেখাদেবীর কাছে এসে ছড়া বলে সে। শেলেট-পেনসিলে গিন্নী তাকে লেখা শেখান। মলিনার স্বামীটা আর খাটতে পারেনা । রামুকে আরো পাঁচ-ছ’টা বাগানের কাজ নিতে হয়েছে। রেখা রামুকে কথা দিতে বলেছেন। যদি সে পাতা না খায় তবে প্রতিমাসে গাড়ি করে তাদের বৌ বাচ্চাকাচাদের নিয়ে তিনি নদীর ধারে বেড়াতে নিয়ে যাবেন । রামুও অনেক পরিণত এখন। রেখাদেবী আর সন্তোষবাবুর বয়স বেড়েছে। হঠাৎ একদিন কাজে এসে ময়না বসে পড়ে দিদাকে বলেছে জোরে পাখাটা চালিয়ে দিতে। তার শরীরটা কেমন জানি করছে। হয়ত মাথা ঘুরছিল সাথে একটু গা বমি বমি। দিদা মুখটা ধরে ওপর দিকে তুলেছেন। ময়না লজ্জা লজ্জা মুখে দিদাকে একটা ঢিপ করে পেন্নাম ঠুকেছে।

আজ যাবার সময় বলেছে…. – দিদা, তোমার সেই লঙ্কা-তেঁতুলের আচারটা একটু দিও তো, ভাত মোটে ছুঁতে পারছিনা। আবার এঁচোড়ের কাটলেটটা বানিয়ে দাওনা গো সেই গতবারে যেমন বানিয়েছিলে। এই অরুচির মুখে বেশ লাগবে খেতে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>