আমার এই রিক্ত ডালি

অনেক দিন পর, না না, বোধহয় অনেক যুগ পর আজ বৈষ্ণবী গান গেয়ে মাধুকরী করতে এসেছিল। আর সকালের হিমেল রোদ গায়ে মেখে এক কাপ কফির মৌতাতকে নিমেষে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলল তিন দিক পুকুরওয়ালা ঐ বাড়িটায়, যেখানে শবরীর প্রতীক্ষায় ছিল গাঢ় অন্ধকার সন্ধ‍্যে, যা তুমি কখনো দেখোনি। ছিল সাপুড়ের বীণ বাজা এলোমেলো হাওয়ার ঘুঘু ডাকা দুপুর, যা তুমি কক্ষনো শোনোনি। ছিল একথালা ভাতের সঙ্গে গরম মাছভাজা আর দুধভাতে নলেন গুড়ের টাকনা। রাত বাড়লে নারকেল গাছের দোলায় চেপে ভেসে আসা আশ্চর্য সব রূপকথারা, যা তুমি কখনো শুনতেই পারোনা।

দাদুর নরম ভুঁড়িতে বসে দোল খেতে খেতে কেটে গেল একটা গোটা জন্ম। জন্মই তো। তারপর যা কিছু নটরাজের তালে দুলিয়ে নাড়িয়ে নয়ছয় করে গেল, সেসব অন্য কোনো জন্মকথা।
দাদুর বুকে উপুড় হয়ে স্লেটের ওপর লিখি , ছায়ার ঘোমটা মুখে টানি আছে আমাদের পাড়াখানি… উপুড় হয়ে শোয়া দাদুর পিঠের ওপর হাঁটা হাঁটি করি, সন্ধ‍্যেবেলা দাদু হাতপাখা হাতে পায়চারি করে, পিছনে আমি তিড়িং বিড়িং, — দাদু, সা এর পর রে তারপর গা? ওপরের সা থেকে আবার নিচে নামতে হবে? দাদু, মশা কামড়াচ্ছে। দাদু অমনি হাতপাখার ডাঁটি দিয়ে পিঠ চুলকে দেয়।

বেঁটে কালো কাঠের আলমারিটার এক কোণে হোমিওপ্যাথির বাক্সের পাশে খুচরো পয়সা চূড়ো করে রাখা। সকাল থেকে কত দুঃখী মানুষের আনাগোনা, বাবু, কিছু দাও।
আমার ওপর দায়িত্ব। ঐ চূড়ো পয়সা থেকে নিয়ে সকলের হাতে দেবে। কেউ যেন ফিরে না যায়। হাঁক পেলেই ছুটে আসি। লিখতে লিখতে পেনসিল ফেলে, খেতে খেতে ভাতের থালা ফেলে উঠে আসি। পরিচয় হয়ে যায় নতুন নতুন মুখের সঙ্গে।

একবার এক আশ্চর্য লোক এসে কিছু চাইল না, হাঁকও দিল না । সোজা গান শুরু করে দিল। অদ্ভুত পোশাক, অন্য রকম গান। রাধাকৃষ্ণের নাম ধরে কেমন করে আকাশের দিকে মুখ তুলে ডাকছে। হাতে কী একটা বাজনা টুংটুং করে বাজাচ্ছে।

সদ‍্য স্কুলে ভর্তি হয়েই এক মাথা উকুন জুটেছে। পিসি একেবারে নড়া ধরে নাপিতের দোকানে চেয়ারের ওপর তক্তা পেতে বসিয়ে মাথা মুড়িয়ে এনেছে। উঠোনে উবু হয়ে বসে নেড়া খড়খড়ে মুন্ডুতে হাত বোলাই আর আশ্চর্য ঝিম ধরানো গান শুনি। গানটা যে খুব ভালো লাগছে তাও নয় আবার পাও সরছে না। কেমন একটা মায়া টেনে ধরছে।

শীত কাল গিয়ে হালকা গরম। পরে শুনেছি ঐ সময়টাকে বসন্ত বলে। সকাল বেলার শিরশিরে হাওয়ায় আম, নারকেল, সুপুরি, বেল গাছগুলো দুলছে। নীল আকাশে ছিটেফোঁটা মেঘ নেই। উঠোন থেকে রান্নাঘর আর কত দূর। তাও কেন মনে হল, মাকে কতদিন দেখিনি।

… ওদের বাউল বলে রে। ওরা গান গায়।
শুধু এইটুকু বলল বড়রা।
আর আমি বুঝলাম আমার মত করে, ওরা বাউল। ওরা গান গায়। ওদের গান শুনে কান্না পায়…।

কোনটা বাউল গান কোনটা কীর্তন অতশত বুঝিনি। শুধু বুঝতাম ওই গানগুলো শুনলে খুব কান্না পায়, সব্বার মধ‍্যিখানে বসেও খুব কষ্ট হয়। কী কষ্ট, কেমন কষ্ট বলতে পারব না। দোলের সময় এক মাস বাজারে কীর্তন হত। ছবিটা খুব স্পষ্ট। স্কুলে যাব। মা ব‍্যাগে টিফিন ভরে দিচ্ছে, জুতোর ফিতে বেঁধে দিচ্ছে। আর আমার বুক ফেটে কান্না বের হতে চাইছে। খালি খালি মনে হচ্ছে, বাড়ি থেকে বের হবনা। স্কুল থেকে ফিরে এসে মাকে আর দেখতে পাবো না।

দাদুকে যখন নিচের ঘরে রেখে আমাদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, সেদিনও মার্চ মাস, বসন্ত কাল। সকাল বিকেল ফাঁকফোকর দিয়ে দেখি, দাদু শুয়ে। কোনো সাড় নেই। বড়দের কী ব‍্যস্ততা। ডাক্তার আসছেন ঘনঘন। আমাদের ঘুমন্ত রেখে দাদুকে নিয়ে চলে গেল। ডাক্তাররা আর বাড়িতে রাখতে সাহস পেলেন না অমন সেরিব্রাল অ্যাটাকের রোগীকে। সকালে ঘরে গিয়ে দেখি সব ফাঁকা। তখনও ঐ শিরশিরে হাওয়া বইছে আর চৈত্র পার্বনের গগনবিদারী নামগান।

একান্নবর্তী সংসারে মায়ের সঙ্গে তেমন দেখা সাক্ষাৎ হয় না। বুকে করে আগলে রাখা পিসি কবেই নিজের সংসার করতে চলে গেছে। সকলকে নাইয়ে খাইয়ে গৃহদেবতা সামলাতে ঠাকুমা অনেকটা দূরের মানুষ। দাদুর নরম ভুঁড়িটাও চলে গেল। জীবনে প্রথম মৃত্যু দেখলাম বসন্তে। শিরশিরে এলোমেলো হাওয়ার দিনে বুক পেতে দিল রবীন্দ্রনাথ। দাড়ি দিয়ে, গাল দিয়ে, হাসি দিয়ে, বুকের ওম দিয়ে কখন শুষে নিল সেই আশ্চর্য রকমের কষ্টটা।

কিন্তু কষ্টটা ছিল। কষ্টটা থেকে যায়। কষ্টটা আসলে কখনও ছেড়ে চলে যায় নি। তখন সরস্বতী পুজোয় আর মাথা নেড়া নয়। পাড়ায় নতুন গজিয়ে ওঠা বিউটি পার্লারে কায়দা করে চুল কেটেছি, মায়ের শাড়ি পরে কেমন কেমন একটা ভাব। সারাদিন টোটো ঘুরে আবার সেই শিরশিরে হাওয়ার কবলে। প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় পঞ্চম কোনো বসন্তেই তো মনে ধরলো না কেউ। এলোও না কেউ পক্ষীরাজে চড়ে। গাঁটছড়ায় আটকে আছি আজন্মকাল। বাকি সব অন্য কোন জন্মের কথা। আমার নয় কিছুতেই।

বাউলের সঙ্গে দেখা হল আবার। মাথার ওপর দুই হাত তুলে একতারা ধরে নৃত্যরত পুরুষোত্তম। গেরুয়া রঙের মাটি আর গেরুয়া আলখাল্লা। ঐ মাটির পথ ধরে কে জানে কোথায় ডেকে নিয়ে যায়, গেরুয়া রঙের সূর্যের কাছে। সূর্যের হাত ধরে অস্ত যাব বলে?

আসলে কিছু নেই, কিছুই নেই, কোথাও নেই। ঐ চলাটা ছাড়া। এক জন্ম থেকে আরেক জন্ম। আর সত্য বসন্তের শিরশিরানি। এলোমেলো হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে ভেসে আসা আকুল নিবেদনের সুর। চাওয়া এমন রিক্ত হতে পারে? চাওয়াই বুঝি এত শূন্য এত রিক্ত হতে পারে। বসন্তের মতো।

সাপুড়ের বীণ আর ঘুঘুর নৈঃশব্দ্যভেদী ডাকের আনমনা দুপুর। গেরুয়া আলোর বসন্তের ফিসফিস, তোর কেউ কোনোদিন থাকবে না। চোখ ছুটে বেড়াবে এ পাঁচিল ও পাঁচিল, আরেকটু এগিয়ে বড়রাস্তা, গঙ্গার ধার, আরো আরো, শষ্যক্ষেত, পাহাড়, সমুদ্র, মরুভূমি, গেরুয়া মাটির রাস্তা ধরে গেরুয়া সূর্যের কাছাকাছি।
কোলে খোলা বইয়ের অনিচ্ছা। আজও বসন্ত খড়খড়ে নেড়া মাথায় হাত বোলায় আর ভাবে, মায়ের কাজ কি এখনো শেষ হল না…।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত