আমার মন চেয়ে রয় মনে, ভ্রমণে (পর্ব -১)

 

 

 

এই লেখাটি নবনীতা দেব সেনের বেশ কয়েকটি ভ্রমণ সংকলনের ওপর। এই বিদায়বেলায় তাঁর এই সৃষ্টিগুলির মধ্যে দিয়েই আবিষ্কার করি ভ্রামণিক নবনীতা দেবসেন কে। সেটাই হোক তাঁর প্রতি আমার স্মৃতিচারণ।

আশির দশকে পড়েছিলাম নবনীতা দেব সেনের ভ্রমণকথা “হে পূর্ণ তব চরণের কাছে’ (মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স)। সেখানে  উত্তরাখন্ড ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শুরুই হয়েছিল একটি দুলাইনের কবিতা দিয়ে…

সেখানে অদ্ভূত বৃক্ষ, দেখিতে সুচারু। যাহা চাই তাহা পাই, নাম কল্পতরু। 

সত্যি নিজের শহরের বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলেই আমাদের সকলের মনের অবস্থাও বুঝি এমন হয়। প্রকৃতি যেন সত্যি সত্যি এক কল্পবৃক্ষ হয়ে প্রতিভাত হয় চোখের সামনে। মনে হয়, আহা! অমন কখনো দেখি নি। আর নবনীতাদির কলমেও যেন সেই সত্য বারে বারে চোখের সামনে প্রতিভাত হয়। ভ্রমণ তখন শুধুই ভ্রমণকাহিনী নয়…”বাচোহবাচম্‌’ অর্থাত উপনিষদের কথায় বলা, কওয়ার ঊর্দ্ধ্বে। পাঠকমনের নির্মল নির্ঝরিণীকে নাড়া দেয় তাঁর সাবলীল, সুললিত বাক্য গঠন। অহেতুক ব্যঞ্জনা নেই যেখানে। আছে কেবলমাত্র রস শব্দ চয়ন। ভ্রমণ লেখক যখন পাঠকের কাছে হয়ে ওঠেন রম্য লেখক। আর এতই  আন্তরিক লাগে সেই রচনা যে প্রেমে পড়েই গেছিলাম সেই থেকে ভ্রমণ লেখিকার বেত্তান্তের ।

এই ব‌ইখানি পড়ার অনেকদিন পর আমি উত্তরাখন্ড ভ্রমণে গেছি একাধিকবার। ঘুরেছি কেদার-বদ্রী, তুঙ্গনাথের পথে, গঙ্গোত্রীর ঠান্ডা-কন্‌কনে স্বচ্ছতোয়া জলে দাঁড়িয়েও অনুভব করেছি লেখিকার আত্ম অনুভূতি। যেখানেই ঘুরেছি সেখানেই পা দিয়ে মনে হয়েছে ওনার সেই আবেগমন্ডিত কথাগুলি…উত্তরকাশী, গুপ্তকাশী, রুদ্রপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ, দেবপ্রয়াগ, যোশীমঠ, উখীমঠ…কত জায়গা, কত সুন্দর নাম….লেখিকার মতে যেন রূপকথার শহর এক একটি। সত্যিসত্যি পৌরাণিক নদনদীরা যেন সব ঠেসাঠেসি করে নেমেছে প্রয়াগে।  হিমালয়ের প্রকৃতির কোলে দাঁড়িয়ে যিনি অনুধাবন করতে পারেন এই পর্বতমালা কে ভারতাত্মা বা দেবতাত্মা রূপে।

সারা বিশ্বভ্রমণ করে বিদেশের আল্পসের সঙ্গে  যার কোনো তুলনাই চোখে পড়েনি তাঁর। সুইস আল্পসের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আমিও ভেবেছি এই কথাগুলি। আমাদের হিমালয় তো বিশাল, রাজকীয়। আল্পস তো মানচিত্রে অবস্থিত শৈলশ্রেণীমাত্র। আর তাঁর কথায় “হাজার হাজার বছর ধরে পুরাণে, ধর্মগ্রন্থে, রসসাহিত্যে গড়ে ওঠা হিমালয়ের সঙ্গে পাল্লা দেবে কোন্‌ আল্পস?’ 

অথবা গঙ্গোত্রী পৌঁছে ঠিক যেখানটিতে ওনার  মনে হয়েছিল মহাদেবের জটা থেকে আবির্ভূতা গঙ্গার ঝিক্‌ঝিক্‌ কুলুকুলু। হ্যাঁ, এই কথাগুলির সত্যতা যাচাই করেছি আমিও। গঙ্গা সেখানে যেন একান্তে কথা বলে ওঠে পর্যটকের সঙ্গে। শুধুই গঙ্গাদর্শণ নয়। ভ্রমণের পুঙ্খ ও অণুপুঙ্খ বর্তমান সেই আলপাচারিতায়।  আর সেই উত্তরাখন্ড তথা হিমালয় যাত্রা শেষ হয় নবনীতা দির একান্ত আপনার গল্পে…

“আবার আসবো, হিমালয়, আবার দেখা হবে। যেন ভুলে না যাই-প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছি, এবারে একা আসবো, তখন আরেকটু ঘনিষ্ঠ হতে দিও, হিমালয়’     

তিনি ছিলেন এক অদ্ভূত ভ্রমণ পাগল মানুষ। নয়ত কেউ হায়দ্রাবাদের সেমিনারে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ঝটিতি কুম্ভমেলার প্ল্যান ফেঁদে ফ্যালে? যাবার পথে মা কে একটা চিঠি লিখে কি দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছিলেন বাড়ির লোকের। সেবার মৌনী অমাবস্যার পুণ্য লগ্নেই তাঁর পূর্ণ কুম্ভ দর্শন চাইই। আর সেই অমৃত কুম্ভের আস্বাদ শেষ হয় দুলাইন  পাঁচালী তে।

মহাকুম্ভযোগকথা অমৃত সমান

দীনা নবনীতা খে শুনে পুণ্যবান।।

অরুণাচল প্রদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে নবনীতা দি লিখেছিলেন অনবদ্য গ্রন্থ “ট্রাক বাহনে, ম্যাক মহনে’ । সেমিনার থেকে ট্রাকে চড়ে সোজা বিষাদে, গৌরবে, ম্যাকমহনে, রডোডেনড্রণে। ব‌ইখানি পড়েই  ছুটে যাওয়া উদীয়মান পূর্বাচলের দেশে। আর রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধ সেই বৃত্তান্ত তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছিলাম যেন। তাওয়াং এর পথে পা বাড়িয়েছিলাম। ভারতের বৃটিশ সরকার তিব্বতের দলাই লামার সরকারের সাথে ১৯১২-১৩ সালে সিমলাতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। যাতে তিব্বত ও ভারতের সীমানা নির্ধারিত হয় যা তদানীন্তন বিদেশ সচিব স্যার হেনরী ম্যাকমহনের নামে বিখ্যাত ম্যাকমহন লাইন নামে । এ রচনা শুধুই ট্র্যাভেল্গ নয়। রসরচনায় উত্তীর্ণ এক ভ্রমণ বৃত্তান্ত।

সেই ঐতিহাসিক সীমারেখা যার ওপারে চীন, এপারে ভারতের সেই বিদ্ধ্বস্ত টেরেন যার পূর্বনাম ছিল নর্থ-ইষ্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি (বর্তমানে অরুণাচল প্রদেশ)। ১৯৬২ র চীন-ভারত যুদ্ধের এই হল প্রেক্ষাপট। প্রতি পলে অনুপলে জারিত হতে হয় হাসির খোরাকে। যেন পাহাড়ে রডোডেনড্রণ খিলখিল করে হাসছে নবনীতা দেবসেনের সঙ্গে । সেখানে দাঁড়িয়ে লেখিকার সৃষ্টি এই ভ্রমণকথা। আবারো মর্মে মর্মে অনুভূত হয় । 

এরপরে পড়েছিলাম “ভ্রমণের নবনীতা’  (স্বর্ণাক্ষর প্রকাশনী) ব‌ইখানি। এই ভ্রমণ প্রিয় মানুষটি এখনো অকপটে বলেন, এখনো তাঁর কিছুই দেখা হয়নি।  ভ্রাম্যমাণ এই লেখিকা ভূগোলের সব্বোমাটি মাড়িয়ে চলার পরেও মেটাতে পারেন নি তাঁর ভ্রমণ পিপাসা। আর তাই বুঝি পাঠক মন ব‌ইয়ের মুখবন্ধেই চমকে ওঠে লেখিকার স্বীকারোক্তিতে

 “নানা মহাদেশের মাটির জলস্পর্শ আছে এখানে, আশাকরি ভ্রমণপিপাসু মন রসসঞ্চার করতে পারবে‘     

প্রতিবার নিজের অধ্যাপনার কাজে বিদেশ বিভুঁই তে গিয়েও নবনীতা ভোলেন না নিজের শিকড় কে। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে ভ্রমণ স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, আর জীবন, প্রকৃতির ছোটখাট অনুষঙ্গ গুলো লেখক মন কে একাগ্র করে দেয়। ঠিক যেমন এই ব‌ইটিতে দেখি জলের ধারে একখানি ঘরের বড় শখ ছিল লেখিকার। সেই চিরকালের ইচ্ছেটা পূরণ হয়েছে সারাজীবন ধরে, বারেবারে । মা রাধারানী দেবীর আশীর্বাদে ঈশ্বর তাঁকে জলের ধারে ঘর বাঁধবার স্বাধীনতা দিয়েছেন। কলকাতার ভালো-বাসার বারান্দা থেকে তখন দেখা যেত রবীন্দ্র সরোবর লেকের জল। দিল্লীর মডেল টাউনে এক টুকরো ভাড়াবাড়ি ছিল হ্রদের ওপরে। সামনে দ্বীপ। অজস্র পাখপাখালির কলতান শোনা যেত সেখানে। তারপরেই যখন কেম্ব্রিজ ম্যাসাচুসেটসে গেলেন, সেখানে রিভার ভিউ ফ্ল্যাটটির প্রেমে পড়ে গেলেন। রকেফেলার ফাউন্ডেশনের রেসিডেন্ট ফেলো হয়ে গিয়ে পড়লেন ইটালীর লেক কোমোর তীরে বেলাজিও গ্রামটিতে। এবার যখন কানাডার ব্রিটিশ কলোম্বিয়ার গ্রীষ্মকালীন অধ্যাপনায় গেলেন সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে,  সেখানেও সমুদ্র-পাহাড়ের নীল সবুজে মাখামাখি অঞ্চলে এক এপার্টমেন্টে জলের ধারে থাকার অনুভূতি বর্ণনা করেছেন। আবারো জলের ধারে ঘর বেঁধেছিলেন একাধিকবার, বিশ্বের মানচিত্রের অদেখা সব স্থানে। অঞ্জলি পেতে জল গ্রহণ করেছেন আঁচলা ভরে। আর বারেবারে তাঁর এই পর্বের লেখাটিতে ভ্রমণ বৃত্তান্তের অভিজ্ঞতার সঙ্গে উঠে এসেছে জল, জল আর জল, জলের সঙ্গে ঘর বাঁধবার আকুতি ।

 তারপর একে একে মানস ভ্রমণে ঘুরতে থাকি লেখিকার সঙ্গে। ইটালী থেকে ইজরায়েল, বোর্ণিওর জঙ্গল থেকে আলাস্কায়।  কি বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা আর ভ্রমণের খুঁটিনাটি আর তার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া বৈচিত্র্যময়তায় ভরা প্রাকৃতিক শোভা, খাবারদাবার, পানীয় গ্রহণের অভিজ্ঞতা।  এই “জলের ধারে’  ঘর শীর্ষক এপিসোড টি আবারো ঘুরে ফিরে আসে ব‌ইয়ের শেষ পর্যায়ে। সেখানে নিজের শহর কলকাতায় গঙ্গানদীর ধারে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন তিনি। ২০০৫ এ। গঙ্গার বুকে ভোরবেলায় নৌকার সারি দেখে যাঁর মনে হয় মিশরদেশের ফুলদানির ছবির কথা। এই যে দেশের মধ্যে বিদেশ খুঁজে পাওয়া আর বিদেশে গিয়ে দেশ কে আবিষ্কার করা, এ অনুভূতি বুঝি তাঁর মত ভ্রমণ দার্শনিকের পক্ষেই সম্ভব। আবারো জলের ধারে বসে তাঁর চিরদিনের ইচ্ছেপূরণ হয়। জলের ধারে বসেই কলম দিয়ে কালির আলপনা এঁকে চলেন তিনি যার নাম ভ্রমণ কাহিনী। 

আবারো তাঁর হাত ধরে ঘুরে আসি মধ্যপ্রদেশের পান্না টাইগার রিসার্ভ থেকে কর্ণাবতী নদীর কুলে অসামান্য রানে জলপ্রপাতে। মানস ভ্রমণে মুগ্ধতায় ভরে ওঠে খাজুরাহোর নান্দনিক মন্দিরময়তা। নিজে যখন ভ্রমণ করি তখন ভ্রমি বিস্ময়ে আর কেবলি মনে হয় কামসূত্রের বিভিন্ন ভঙ্গিমা দেখে ভ্রমণরত মানুষ কেন‌ই বা বলবে”ছিঃ’ ! এসব তো জীবনযাপনের অঙ্গ। কে বলে খাজুরাহো শুধুই ইরোটিকা? মানুষের জীবন, দৈনন্দীন চাহিদা, নারী-পুরুষের  সৃষ্টি রহস্যের মূলে মৈথুন,  জাগতিক সবকিছু..  যুদ্ধ, বিবাহ থেকে শুরু করে জীবনযাপনের অনুষঙ্গ সব নিয়ে ভাস্কররা তৈরী করেছিল মন্দিরের দেওয়াল, মন্ডপ, পোর্টিকো, তোরণ। মন্দিরের মধ্যে মন্দির ।হ্যাঁ, খাজুরাহোর স্থাপত্য আমাদের দেশের সনাতন সৃষ্টি রহস্যে মোড়া। এ এক সম্পূর্ণ শিল্পগাথা। আর তেমন করেই ভাবতে শিখিয়েছিলেন নবনীতা দেব সেন। 

আমেরিকার বার্কলেতে ছাত্রাবস্থায় স্বচ্চক্ষে দেখা সে সময়কার যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বর্ণবৈষম্যে উত্তাল আমেরিকা, কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গদের অহোর্নিশ মনোমালিন্য ছবির মত উঠে এসেছে তাঁর “আই হ্যাভ এ ড্রিম’  নামের রচনাটিতে।  সেখানে কৃষ্ণাঙ্গী শ্রীমতী রোজা পার্ক্স এর বাস বয়কট বিদ্রোহ থেকে শুরু করে মার্টিন লুথার কিং এর নোবেল শান্তি পুরষ্কার পাওয়া, এমন কি বাস বয়কট বিদ্রোহের স্মৃতিতে পিট সিগারের বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিবাদ গীতি “ইফ ইউ মিস মি, অ্যাট দ্যা ব্যাক অফ দ্যা বাস…’ ও লিখতে ভুলে যান না তিনি। সেখানেই ভ্রমণ লেখক হিসেবে তাঁর চরম সার্থকতা।  এমন কি ওয়াশিংটন পদযাত্রায় কালো মানুষদের প্রতিবাদী মিছিলে গলা মিলিয়ে তিনিও সোচ্চারে গেয়ে উঠেছিলেন সেদিন “উই শ্যাল ওভারকাম’ । 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত