| 4 মার্চ 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

ইস্টুপিড

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comদমকা কাশিতে হুপো শ্যামলের ঘুমটা রোজকার মতো সেই ভেঙেই গেলো ভোর রাতে। একটা পাতলা শ্লেষ্বার সর ওর গলায় ঘরঘর করছে ,সুর সুর করছে…। খুলে যাওয়া লুঙ্গিটা সামলাতে সামলাতে শ্যামল আস্তানার চট সরিয়ে বাইরে এলো নালার পাড়ে । এক পেট মুত আর রাখতে পারছে না… ছছ ছর করে প্রবল বেগে নেমে যেতে লাগলো নালায়, হুপোশ্যামলের মুখ দিয়ে বেশ একটা আঃ মতো স্বস্তির আওয়াজ বেরুলো। নালার পাড়ে ঠান্ডায় শুয়ে থাকা নেড়ীটা ‘ভুক’ করে ডেকে বিরক্ত হয়ে অন্যত্র সরে গেলো । শ্যামল দেখলো গোটা চাঁদটা রেজিস্ট্রি অফিসের পাশ ঘেঁসে ভেসে আছে। ঘটাং ঘট করে মালগাড়ি পেরিয়ে গেলো…। সেই কবে পাঁচথুপি থেকে কাটোয়া হয়ে এখানে, সেই থেকে আসেপাশেই কেটে গেলো বহু বছর! শ্যামলের মনে নেই। আদতে ক্যাবলা, কাজে কম্মে মাথামোটা শ্যামলের পাড়ায় নাম ‘হুপোশ্যামল’। জীবনের গড়পরতা হিসেব, পাওনা-গন্ডায় অসেচতন সোজাসাপ্টা শ্যামলকে আর কিই বা বলা যায়! পাম্পের ম্যানেজার ঘোষদা আদর করে বলেন ‘ইস্টুপিড’।

নাঃ শ্যামলের কোনো শত্রু নেই। থাকার কথাও নয়। যে যেমন পারে ওকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয় “যা তো শ্যামল বাড়ি থেকে টিফিন বক্সটা তোর বৌদি দেবে নিয়ে আয়” “যা তো শ্যামল বিন্তিকে একটু রাস্তাটা পার করে দিয়ে আয়” “ শ্যামলদা ও শ্যামলদা তাপসকে গিয়ে একটু ডেকে দেবে প্লীইইজ! দেখো আবার সবার সামনে ডেকো না …!”

শ্যামল হাঁটে, শ্যামল দাঁড়িয়ে থাকে, শ্যামল ডেকে দেয়, শ্যামল বয়ে আনে… এতে করে শ্যামলের বেশ চলে যায়। কেউ দু-পাঁচটাকা দেয়। সকালে কেউ চা-বিস্কুট।  ‘জগধাত্রী হিন্দু হোটেল’ এ দুপুরের খাওয়া জুটে যায় টেবিল মোছা ও বাসন ধোওয়ার বিনিময়ে। মাঝে মাঝে শ্যামল যে বিপদে পড়ে না এমন নয় কিন্তু! ওকে যখন ক্লাবের ছেলেরা চেপে ধরলো স্টেশনের মিনু পাগলির সঙ্গে ওর বিয়ে দেবেই দেবে! তখন ও খুব ভয় পেয়েছিলো! শেষে ক্লাবের সবাইকে পালা করে করে ম্যাসেজ দিয়ে ওর নিস্তার ।

সকাল হতে এখনও বেশ দেরী। শ্যামল আবার ঢুকে পড়ে ওর আস্তানায়, ভাঙা টিন ছেঁড়া চট ঘোষদার দেওয়া পুরানো ফ্লেক্সের প্লাস্টিক দিয়ে একটা  বানিয়েছে নিজের মতো আস্তানা। মড়া ঘাটের একটা বালিশ আর তেলচিটে তোষকও রয়েছে ওর।

সক্কাল সক্কাল ত্যারছা রোদ এসে ওর আস্তানার চটের ফাঁক দিয়ে বুকে এসে পড়ে। কুলকুল করে জেগে উঠছে স্টেশন এলাকা,পুরোপুরি আর ঘুমায় কখন এই চত্বর! সকাল হতে লোকজনের চলাফেরার শব্দ, ডিজেল শেডে থেকে ভেসে আসা সুরেলা ডিজেলইঞ্জিনের ভোঁ! ইলেক্ট্রিক ট্রেনের বিজাতীয় গন্ধ এসবই শ্যামলের রোজকার ভালো লাগা অভ্যাস। উঠে পড়ে এক ঝটকায়, লুঙ্গি বদলে বড় বড় করে ‘মালব্রো’ লেখা বারমুডাটা পরে নেয়। গায় চাপায় ওর প্রিয় হলদে গোল গলা গেঞ্জীটা।যাতে একটা ঝাঁকড়া চুলের টুপিপরা হিরো মার্কা লোকের বিড়ি মুখে ছবি। শ্যামলের বড় ভালো লাগে এই গেঞ্জীটা। হলদে রঙ ময়লা চিরকুট হয়ে গেলেও মন ভালো থাকলে ওটাই পরে ও, যেমন আজ।

হাঁ করে ফুট ব্রীজে দাঁড়িয়ে শ্যামল দেখে যেতে থাকে কেমন একের পর এক ট্রেন ওর নিচ দিয়ে হেলতে দুলতে সামনে থেকে পিছনে, পিছন থেকে সামনে যাচ্ছে…! ওর খুব মজা লাগে এটা দেখতে। সূর্য আরও কিছুটা উঠেছে, ক্যান্টিনের উনুনের ধোঁয়া স্টেশন চত্বর পেরিয়ে লোকো মাঠের উপর স্থীর দাঁড়িয়ে। শ্যামলের মন আরো ভালো হয়ে উঠলো, এমনিতেই ওর মন খারাপ খুব একটা হয়ই না। এবার শ্যামলের চায়ের নেশা পাচ্ছে! এবার শ্যামল কি করবে? শ্যামল নেমে আসে ব্রীজ থেকে, গুটি গুটি পায়ে চৌবেজীর ঠেলাগাড়ি চায়ের দোকানের পাশে এসে দাঁড়ায়, “কি বে! চা চাই? ভোঁশরিওয়ালা, বুরবাক, আ গায়া সুভে সুভে হারাম কি চায় পিনে! লেঃ …” বলে এক ভাঁড় চা বাড়িয়ে দেয় চৌবেজী। একপ্রস্থ গালাগালির পরে ওর চা বরাদ্দ এটুকু শ্যমলও বোঝে , এই গালাগালি যে আসলে ওকে ভালোবেসেই দেওয়া সেটাও। এই স্টেশন চত্বর, বাইরের বাজারে যে যতই ওকে গালাগাল দিক মাথায় চাঁটাক এরা যে ওকে একরকম অপত্য স্নেহ করে সেটা শ্যামল ভালোই বোঝে। সে যতই সে বুরবাক-ইস্টুপিড হোক না কেন! তাইতো হাজার প্রলোভনেও এই নিরাপত্তার বলয়ের বাইরে যায় না চট করে। অনেকেই ওকে নিয়ে যেতে চেয়েছে , খোরাকির বিনিময় এমন নিরলস, সৎ, বিশ্বাসী লোক কে না চায়!

আজ কদিন হলো এলাকায় টেনশান। বাঘাযতীন ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে ফ্রেন্ডস ক্লাবের লাফরা। বেদম পেটো পড়ছে এলাকায়, এক দল হৈ হৈ করে তেড়ে যাচ্ছে আর একদল তখন অলি-গলি দিয়ে পালাচ্ছে আবার পালানো দল দলভারী করে ফিরে আসছে। সবজিবাজারের বল্টু নাকি হাসপাতালে, পেটোর ঝাঁজে একটা চোখ গেছে! কিন্তু বল্টু তো সাতে পাঁচে থাকে না। তাহলে! শ্যামল সব দেখেছে কখনও রেল ব্রীজের ওপর থেকে, কখনও জগধাত্রীর চাঁচের বেড়ার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে। কান্ড-কারখানা দেখে বেশ ঘাবড়ে গেছে শ্যামল। ওপাড়ে মুচি পাড়ার পাশে যে বিরাট কলেজ আছে সেখানে নাকি ভোট। তাই লাফরা! শ্যামল ভেবে পায় না ভোট ব্যাপারটা কি বস্তু! বেশ কটা ভোট ও দেখেছে, প্রতিবারই কিছুনা কিছু কিচাইন হবেই। কি এমন জিনিস যার জন্য বল্টুর চোখ গেলো! রেলপাড়ের পার্টি অফিস পুড়লো! এরই মধ্যে কলকাতা থেকে কেসব নেতা-টেতা আসছে কাল, বাজারের মোড়ে মিটিং হবে। কদিন ও ডেরায় যেতে পারেনি, প্ল্যাটফর্মেই শুয়েছে। আজকেও চৌবেজীর দোকানের পাশের বেঞ্চে আস্তানা গেড়েছে। কোত্থেকে একটা নেড়ি এসে গুটিশুটি মেরে বেঞ্চের তলায় গুটলি পাকিয়ে শুয়েছ। নেড়িটাকে শ্যামলের বেশ চেনা চেনা ঠেকছে। এতো বাজারেই ঘোরে! এখানে কি করছে? এ ব্যাটাও উটকো ঝামেলার ভয়ে পালিয়ে এসছে নির্ঘাৎ!

ভোররাতে বিরাট হৈ চৈয়ে শ্যামলের ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের চটকা কেটে গেলো, বাইরে তুমুল গোলমাল চলছে। শ্যামল ধীরে ধীরে বাইরে আসে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে, ভয়ে ভয়ে বাইরে তাকায়। বাইরে অন্ধকার ঘুট ঘুটে, একসঙ্গে অনেক মানুষের চেঁচামিচির শব্দ যেদিক থেকে আসছে সেদিকে লক্ষ্য করে। অনেকে ছোটাছুটি করছে বালতি হাতে। নালার পাশে চারটে গুমটি জ্বলছে পর পর দাউ দাউ করে! শ্যামল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সেদিকে …

চারটে নয়, তিনটে গুমটি পুড়ে ছাই। শুধু কাঠামোর দু একটা বাঁশ আধপোড়া পড়ে আছে, ছেঁড়া  আধপোড়া প্লাস্টিক  সকালের দমকা হাওয়ায় এলোমেলো উড়ছে! চার নম্বরটা শ্যামলে ডেরা। কিছুই নেই এখন, কিছু ছিলও না। আগুনে কুঁকড়ে যাওয়া শ্যামলের প্লাস্টিকের জল খাওয়ার শ্যাওলা ধরা বোতলটা এক কোনে পড়ে আছে। শ্যামল ধ্বংসস্তুপের সামনে উবু হয়ে বসে একটা কাঠি দিয়ে ছাই সরিয়ে সরিয়ে কি যে খুঁজছে।

কম করে আটটা মাইক এলাকা কাঁপিয়ে তুলেছে। “এই আক্রমণ মেনে নেওয়া যায় না।এর একটা বিহিত করতেই হবে। বেছে বেছে আমাদের কর্মীদের আক্রমণ  করছে ওরা, ঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, দোকান জ্বালিয়ে দিচ্ছে, আমাদের কর্মী বল্টু চোখ হারিয়েছে, মিন্টু পালের দোকান ওরা জ্বালিয়ে দিয়েছে, আমাদের একনিষ্ঠ সমর্থক- কর্মী শ্যামলের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্রের উপর এই আক্রমণ আমরা মেনে নেবো না। আমরাও এর জবাব দেবো, জবাব দিতেই হবে…।”    মঞ্চের ম্যারাপের সামনে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে শুনছে,  “জবাব দিতেই হবে…” শুনে তারা চরম উল্লাসে গলা মেলালো “দিতেই হবে… দিতেই হবে …।”  

ভিড় থেকে অনেক অনেক দূরে রেল পাড়ের নালার পাঁচিলে শ্যামল উবু হয়ে বসে ছিলো পাশে এ কদিনের তার সঙ্গী নেড়িটা। ওর সঙ্গে শ্যামলের বেশ ভাব হয়েছে এখন। মাইকের দিকবিদিক বিদীর্ন করা আওয়াজ তার কানেও পৌঁছাচ্ছিলো। শূন্য দৃষ্টিতে শ্যামল তাকিয়ে ছিলো দূরে মঞ্চের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিড় বিড় করে বলে উঠলো “শালা ইস্টুপিড…” নেড়িটা ডেকে উঠলো ‘ভুক’…।  

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত