| 24 জুলাই 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

ইন্দু বিন্দু (পর্ব -৮)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

শ্রীচৈতন্যের জীবনী নিয়ে মধ্যযুগেই কয়েকটি গ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তবে বাংলা সাহিত্য-আসরে আত্মজীবনী সাহিত্য এসেছিল বেশ চমক দিয়ে। চমক এ জন্য যে, আধুনিক যুগ ইংরেজ এবং ইংরেজি সাহিত্যনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতরাই সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতিতে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু বাংলায় ‘আত্মজীবনী’ লেখার ইতিহাস একেবারেই ভিন্নভাবে এসেছে। কোনো ইংরেজ প্রভাবিত বা কোনো শিক্ষিত লোক আত্মজীবনী লেখেননি। লিখেছেন অজপাড়াগাঁয়ের প্রায় অশিক্ষিত এক মেয়ে। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কেউ তাঁকে পড়তে বা লিখতে শেখাননি। লেখাপড়া অর্জন করেছিলেন তিনি নিজে, সম্পূর্ণ একাকী। তাই সাহিত্যের আঙ্গিনায় তিনি একটি বিস্ময়। তাঁর নাম রাসসুন্দরী। তাঁর বইয়ের নাম ‘আমার জীবন’। তারপরে আত্মজীবনী অনেক পেয়েছে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের পাঠক।

আরও একটি আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দু’র সাক্ষী হতে যাচ্ছেন আপনি। আদরের নৌকা,শব্দের মিছিল-এ বিক্ষিপ্তভাবে নিজের জীবন নিয়ে লিখেছেন, ইরাবতীর পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিজের জন্মতিথিতে নিজের আত্মজীবনী লেখা শুরু করলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আজ রইলো আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দুর অষ্টম পর্ব।


বেথুন-জার্নাল

আমরা একপাল লক্ষ্মী মেয়ের দল জড়ো হয়েছিলাম ১৯৮২ সালে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা পাসের পর । কিন্তু ডানা গজিয়েও সুখ হলনা আমাদের। এই কলেজ স্বানামধন্য তায় আবার মেয়েদের কলেজ। সকলের মধ্যে দুটি বিষয় অন্ততঃপক্ষে কমন ছিল । এক হল সকলের কেমিস্ট্রি অনার্স আর দুই সকলেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বেশ কনফিডেন্ট ।  আমাদের অনেকের আবার আরো একটা জিনিস কমন ছিল সেটা হল কেমিস্ট্রি অনার্সের সঙ্গে  ম্যাথস আর ফিজিক্স পাস সাবজেক্ট।

সেই ছাব্বিশ নম্বর ঘরটা! কাঁচের সার্শি সরিয়ে, পুরণো গন্ধ আগলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের ওয়েলকাম করবে বলে।  খড়খড়ির দরজা ঠেলে অন্ধকার ঘরে ঢুকেছিলাম হুড়মুড় করে ।  কিছুটা উচ্চাশা নিয়ে আর কিছুটা  দুরুদুরু বুকে । ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই পচাডিমের হাইড্রোজেন সালফাইডের সেই চেনা উচ্চমাধ্যমিক গন্ধটা অবশ করে দিল সুষুম্না স্নায়ুগুলোকে ।

ব্যাক্তিত্ত্বময়ী জ্যোত্স্নাদি এসেছিলেন। অনেকটা সেই মূর্তিমতী করুণায় শ্রদ্ধা উপছে উঠেছিল । তারপর রেডক্স ইক্যুয়েশান ব্যালেন্সিংয়ের দাপটে কেমন যেন সব ওলটপালট ! আবার হাতীবাগানের ড্রেসের ঝুলে সব যেন উথালপাথাল… কিছুটা অনাস্বাদিত মুক্তির আস্বাদে, কিছুটা শেষ উনিশ-কুড়ির ভালোলাগায়, ফুচকার তেঁতুলগোলা জলে  …বাঁধা গরু ছাড়া পেয়েও পেলনা কিন্তু।

মনের মধ্যে একটু আধটু  খচখচানি সেই ছাব্বিশ নম্বরের । আমি অ-পাঙক্তেয় নই তো সেখানে? আমার জীবন রসায়নের সঙ্গে রসায়নের দোস্তি সত্যি হবে তো?  
বরানগর থেকে প্রথম একা বেরুলাম বেথুন কলেজে ভর্তি হয়ে । বাবা কলেজে ভর্তি করে চেনালেন পথঘাট, দোকানপাট ।  ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর । ১৭ বছরের আমি ।  মফস্বলী শহর থেকে নিয়মিত শুরু হল আমার কলকাতা অভিযান ।   ছোটবেলায় শ্যামবাজার যেতে হবে শুনলেই বাবা বলতেন “কোলকাতা” যেতে হবে ।  আমি ভাবতাম অনেক দূর বুঝি! কোলকাতা যাওয়া মনেই এটা ওটা সেটা । এখন সেটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হল ।
 স্টেবল বিল্ডিংয়ে নাচারে ক্লাস নিতেন কোন কোন দিন দিদিরা। নাম শুনে প্রথমবার ঘরে ঢুকেই মনে হয়েছিল ইতিহাস। ঘোড়ার আস্তাবলে পড়াশুনো?এর নাম আভিজাত্য। এর নাম সাহেবিয়ানা।  সেদিন ক্লাসে মন বসেনি একটুও । কেবল যেন নাকে আসছিল ঘোড়ার গায়ের গন্ধ।  
প্রথম অনার্সের মান্ডে টেস্ট দু-পিরিয়ড ধরে। মঞ্জু দি অসাধারণ পড়াচ্ছেন রেজোনেন্স। খুব ইন্টারেস্টিং । কিন্তু নিজে নিজে লিখতে গেলেই সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। রেজোন্যান্স এর ক্লাস টেস্টে মাস স্কেলে সবাই ৫ থেকে ১০ পেলাম। ২৫ এর মধ্যে। আবার ছোট ছোট সবাইমিলে মঞ্জুদির কাছে। পরম স্নেহে বোঝালেন। রিটেস্ট হল। এবার একলাফে কুড়ি।  
প্র্যাক্টিকাল রোজ রোজ। কোনো ভাল শাড়ি পরলেই অ্যাসিড ফেলে  ফুটো করছি আর বকুনি জুটছে মায়ের। এদিকে মঞ্জুদি কি সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে আসেন কলেজে! আমাদের বিউটি আইকন। কি রুচিশীল তাঁর ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। প্রিয় রং গোলাপী। ওনার ক্লাসে সবাই একদিন পিংক পরে আসব ঠিক হল। আমরা পড়া শুনব কি শুধু লক্ষ্য করতাম কি পরেছেন, কেমন সেজেছেন দিদি।    
সেকেন্ড হাফে প্র্যাক্টিকাল ক্লাস কেটে রূপবাণী সিনেমায় আমরা কয়েকজন পথে হল দেরী দেখতে গেছি  ।  সোমবার কলেজে এসে ডাঃ রমা শূরের প্রচণ্ড বকুনি। এই হল  বিবেকানন্দের সিমলে স্ট্রীটের পাশে বিডন স্ট্রীটের ওপর জন ডিঙ্কওয়াটার বেথুন সাহেবের কলেজের কেতা । এ কলেজ ইশকুলের বাবা। । উল্টোদিকে হেদুয়ার সরোবর আর স্কটিশচার্চ কলেজ । বৈকুন্ঠ বুক হাউসে অনার্সের প্রথম বই কেনা আর সিমলেপাড়ার বিখ্যাত আইসক্রিম সন্দেশের প্রলোভন কিন্তু এ কলেজ কাটা যায় না, সবার চোখ ঘোরে এখানে।

জন ইলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুনের প্রতিষ্ঠিত ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা কলেজ বলে কথা । নারীশিক্ষা প্রসার মানেও কি রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপ? আমরা বলতাম।  সেখানে নো বেলেল্লাপনা।  আমাদের সময় কলেজের প্রিন্সিপাল শ্রীমতী দীপ্তি ত্রিপাঠী । এছাড়া  আরও মহিয়সীদের যুবতী পায়ের ধূলিতে ধন্য।

সুখলতা রাও মানে আমাদের বাংলাভাষায় হাতেখড়ি হবার সঙ্গে  যাঁর অ, আ ক, খ’র ছড়ার বই পড়ে আমাদের স্কুল যাবার ভিত তৈরী হয়েছিল । কামিনী রায় যাঁর কবিতা স্কুলে আমাদের একাধিকবার সিলেবাসের মধ্যে ছিল । স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রীতিলতা ওয়ারদেদার তিনিও আর সে যুগের রাজনৈতিক এবং সমাজসংস্কারক লীলা রায় যিনি সে যুগে বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজীতে প্রথম হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোল্ড-মেডেল পেয়েছিলেন । তারপর আছেন আরও । পদ্মাবতী স্মর্ণপদক প্রাপ্তা সরলা দেবীচৌধুরাণী , শ্রীমতী সীতাদেবী, ডাঃ দীপ্তি ত্রিপাঠী, থিয়েটার ব্যাক্তিত্ত্ব শোভা সেন, সঙ্গীতজ্ঞা পূরবী মুখোপাধ্যায়, নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী চাকী, বাচিকশিল্পী ব্রততী বন্দোপাধ্যায়।  বেথুন কলেজের দুজন প্রথম গ্র্যাজুয়েট  ডাঃ কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এবং শিক্ষাবিদ চন্দ্রমুখী বসু ।  ভাগ্যি ১৮৮৩ সালে এঁরা বেথুন কলেজ থেকে পাশ করেছিলেন ।  তাই না আমি আমার ১৯৮৩ সালের সেকেন্ড ইয়ারে তাঁদের গ্র্যাজুয়েশানের শতবছর উদ্‌যাপন আড়ম্বরে যোগ দিতে পেরেছিলাম। নানারকম বর্ণময় অনুষ্ঠান এবং খাওয়াদাওয়ার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়েছিল সেই সেন্টিনারি । এইসব দেখেশুনে কেবল মনে হত আমার দ্বারা হবে তো?  

ছুটির পরে আমাদের হাঁটার রাস্তা পথগল্পের মুচমুচে গসিপ আর রূপবাণী সিনেমা হলের উল্টোদিকের ভুজিয়াওয়ালার কুড়মুড়ে সাড়ে বত্রিশভাজায় মুঠোবন্দী হত। তখন সেলফোন নেই অতএব দুহাত খালি। একহাতে ঠোঙ্গা আরেক হাতে খাবার। অনার্সের পড়ার চাপে আর কলেজ যাতায়াতের ক্লান্তি যেন শনিবারের নিয়মিত পথচলায় এক দমকা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আনত ।
সেই আড্ডার পরে কেমিষ্ট্রির লেকচারগুলো অনায়াস মনসিঁড়ি বেয়ে গেঁথে যেত মাথায় ।
১৯৮৪ এ ইন্দিরা গান্ধী যখন নিহত হলেন সারা কলকাতা জুড়ে কি অবস্থা । পথরোখো, বাস বন্ধ । আমাদের  ফিজিক্স প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষা ছিল । মনে আছে বাস টবিন রোড অবধি গিয়ে বলল আর যাবেনা । পরীক্ষা দিতে হবে বলে পায়ে হেঁটে টবিন রোড থেকে বিডন স্ট্রীট পৌঁছেছিলাম । ফেরার সময় শিয়ালদহ অবধি হেঁটে তারপর লোকাল ট্রেনে দক্ষিণেশ্বর ফিরে মনে হয়েছিল রাজ্য জয় করেছি ।

আরেকবার ৫ই জুন ১৯৮৪ । কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ট ওয়ান শুরু । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অনার্সের পরীক্ষা । সংস্কৃত কলেজে সিট পড়েছিল আমাদের । ৪ঠা জুন থেকে অবিরাম বর্ষণে শহর কলকাতা বিপর্যস্ত । আমাদের মফঃস্বলও জলমগ্ন ।
সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বেরুলাম । একটি বাস শ্যামবাজার পাঁচমাথা মোড়ে নামিয়ে দিল । বিধানসরণীতে হাঁটু জল । সেন্ট্রাল এভিনিউ আর সার্কুলার রোডও তথৈবচ । একটি টানা রিক্সা ৫০টাকায় কলেজ স্ট্রীট পোঁছে দিতে রাজী হল । বাবার সাথে রিক্সায় চড়ে বসলাম । রিক্সার পাদানীতে থৈ থৈ জল । তখন না আছে সেলফোন না আছে ইন্টারনেট ।  দশটা থেকে  বারোটা বেজে গেল কোনো খবর এলনা । প্রশ্নপত্র পৌঁছায়নি তখনো আর আমরা ব্ইপত্র  উল্টে চলেছি । বারাসাত, বসিরহাট থেকে যারা এসেছে তারা তখন ফিরে যাবার তোড়জোড় করছে । অশনি সঙ্কেতের মত  প্রশ্নপত্র হাজির হল । বলা হল বেলা দুটোয় পরীক্ষা শুরু হবে ।  আমরা সেই না খাওয়া দাওয়া স্টেজে ম্লান মুখে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে দেখি কোনো বিজলীবাতি নেই । অতিবৃষ্টিতে ইলেকট্রিক কেবল জলের নীচে । মোমের আলোয় জীবনের প্রথম এবং কঠিন অনার্সের পরীক্ষা দিতে দিতে  চার ঘন্টা পার করে বাইরে এলাম । বাড়ি ফিরে এসে দূরদর্শনের সংবাদে ঘোষণা হল সেদিনের পরীক্ষা বাতিলের কথা ।  এত কাঠখড় পোড়ানো সেই পার্ট ওয়ান পরীক্ষা হয়েছিল আমাদের।

কলেজগেটের পাশে রোজ সকাল দশটা থেকে বিকেল সাতটা অবধি দাঁড়িয়ে থাকত মতিদা  ।
এ পাড়ার বিখ্যাত ফুচকাওয়ালা । তার ফুচকা যেমন বড়বড়, গোল্লা গোল্লা, ও মুচমুচে আর তেমনি সুস্বাদু তার যাবতীয় অনুপান। একদম ঠিকঠাক টক, ঝাল ও নুনের কম্বিনেশন । আমাদের অনেক গবেষণা হত সেই তেঁতুল জলের রসায়ন নিয়ে । বাড়িতে অনেক বকুনিও খেতাম রোজ রোজ ফুচকাখাওয়া নিয়ে । কিন্তু এক  মতিদা  মানুষটা আর দুই তার ফুচকার টানকে কিছুতেই এড়াতে পারতাম না । মতিদার ছিল একটাই শ্লোগান “ইয়ে ফুচকা খাইয়ো তো  মতিদাকা গুণ গাইও ” “আমার ফুচকায় অসুখ করবে না । কলেজের ফিল্টারের জলে তৈরী এই তেঁতুলজল” । এক্কেবারে পার্ফেক্ট টক-ঝাল-নুনের কম্বিনেশন !

আমরা তখন বেথুন কলেজ, আমি তখন শাড়ি
কেমিষ্ট্রিল্যাব, লেকচার হল, আর মিনিবাসে বাড়ি ।।
কেমন যেন দিনগুলো সব হঠাত ফুরিয়ে এল
হেদোর ধারে ফুচকা-আচার সায়েন্স কলেজ গেল !!!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত