| 2 মার্চ 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

নেপালী সাহিত্যের সূচনাপর্ব ও ভানুভক্ত আচার্য

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

জয়ন্ত ভট্টাচার্য

 

 

নেপালী ভাষা পাহাড়ী বর্গের একটি নবীন ইন্দো-আর্য ভাষা। নেপাল ছাড়াও ভুটান ও ভারতের সিকিম, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের বহুসংখ্যক অধিবাসীর ভাষা নেপালী। বর্তমান নেপালে অবশ্য নেপালী ছাড়াও মৈথিলী, ভোজপুরী, থারু, তামাং ও নেওয়ারি ভাষাও প্রচলিত। সাধারণাব্দের ত্রয়োদশ শতক থেকে পশ্চিম নেপালের শিলালেখ ও তাম্রশাসনে বর্তমান নেপালী ভাষার প্রাচীনতর রূপ ‘পর্বতিয়া’ (বা ‘খসকুরা’) ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায়। পশ্চিম নেপালের খসবংশীয় রাজা পৃথ্বী মল্লের ১৩৫৬ সাধারণাব্দের জুমলার নিকটবর্তী গ্রাম থেকে প্রাপ্ত স্বর্ণশাসন ও ১৩৫৮ সাধারণাব্দের তাম্রশাসনের একাংশ সংস্কৃতে ও বাকি অংশ ‘পর্বতিয়া’ অর্থাৎ প্রাচীন নেপালী ভাষায় রচিত। কান্তিপুরের মল্লবংশীয় রাজা লক্ষ্মীনরসিংহমল্ল (রাজত্বকাল ১৬২০-১৬৪১) এবং প্রতাপমল্লের (রাজত্বকাল ১৬৪১-১৬৭৪) কয়েকটি লেখে দেবনাগরী লিপিতে ‘পর্বতিয়া’ ভাষার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত নেপালের সরকারী ভাষা ছিল নেওয়ারি বা নেপালভাষা। এই ভাষা দেশভাষা নামেও পরিচিত ছিল। নেওয়ারি বা নেপালভাষা ভোট-বর্মী ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত একটি ভাষা। এই ভাষা অধিকতর রঞ্জনা লিপিতে লেখা হয়েছে। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে নেওয়ারি ভাষায় সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থ থেকে অনুবাদ, রাজাদের জীবনকাহিনী ও আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থ রচনা শুরু হয়ে যায়। এই সময় থেকে নেওয়ারি ভাষায় ‘পর্বতিয়া’ ভাষায় ব্যবহৃত সংস্কৃত ও অন্য নবীন ইন্দো-আর্য ভাষার শব্দভাণ্ডারের বহুলাংশে আত্মীকরণ শুরু হয়। অবশ্য, এই নেওয়ারি ভাষার রচনাগুলির সাহিত্যিক মূল্য সম্ভবতঃ খুব বেশি ছিল না।
১৭৬৯ সালে গোর্খারাজ পৃথ্বীনারায়ণ শাহের (রাজত্বকাল ১৭৬৮-১৭৭৫) সম্পূর্ণ কাঠমাণ্ডু উপত্যকা জয়ের পর নেওয়ারি ভাষার পরিবর্তে ‘পর্বতিয়া’ ভাষার বিবর্তিত রূপ গোর্খালী ভাষা নেপালের সরকারী ভাষা হিসাবে স্বীকৃত হয়। এই গোর্খালী ভাষাই পরবর্তী কালে নেপালী ভাষা নামে পরিচিত হয়। দেবনাগরী লিপিতে এই ভাষা লেখা হয়।
গোর্খালী বা নেপালী ভাষায় প্রথম উল্লেখনীয় সাহিত্যকৃতি সম্ভবতঃ অষ্টাদশ শতকের কবি সুবানন্দ দাসের লেখা পৃথ্বীনারায়ণ শাহের প্রশস্তিমূলক কবিতা, ‘পৃথ্বীনারায়ণ’ (বা ‘বীরবন্দনা’)। অষ্টাদশ শতকে নেপালী ভাষায় সাহিত্য রচনার আরও কিছু নিদর্শন পাওয়া গেলেও, প্রকৃত অর্থে নেপালী ভাষায় সাহিত্য রচনার সূত্রপাত ঊনবিংশ শতকে এবং ভানুভক্ত আচার্যের (১৮১৪-১৮৬৮) সাহিত্য কৃতি এই সূচনাপর্বের উজ্জ্বলতম সৃষ্টি।
নেপালী সাহিত্যসৃষ্টির আদিপর্বে ভানুভক্তের পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মধ্যে উল্লেখনীয় ব্যক্তিত্ব শক্তিবল্লভ অর্যাল, উদয়ানন্দ অর্যাল, গুমানী পন্ত (১৭৯০-১৮৪৭), বিদ্যারণ্যকেশরী অর্যাল (১৮০৬-১৮৫৫), বসন্ত শর্মা লুইটেল (১৮০৩-১৮৯০), যদুনাথ পোখর্য়াল, রঘুনাথ পোখর্য়াল (১৮১১-১৮৬১), পতঞ্জলী গজুর্য়াল (১৮৩৭-১৮৮৭), ইন্দিরস ও বীরশালী পন্ত। পৃথ্বীনারায়ণ শাহের রাজপুরোহিত শক্তিবল্লভ অর্যাল ১৭৭০ সালে মহাভারতের বিরাটপর্বের অনুবাদ করেন। তিনি ১৭৯৮ সালে সংস্কৃত ‘হাস্যকদম্ব’ নাটকের অনুবাদ করেন। তাঁর রচিত ‘তনহুঁ ভকুণ্ডো’ কবিতাও প্রসিদ্ধ। শক্তিবল্লভ অর্যালের ভ্রাতুষ্পুত্র উদয়ানন্দ অর্যাল রচনা করেন ‘পৃথ্বীচন্দ্রোদয় কাব্য’। রঘুনাথ পোখর্য়াল বাল্মীকি রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডের অনুবাদ করেন। ইন্দিরস, তাঁর লেখা ‘গোপিকাস্তুতি’ (বা ‘গোপীরক্ষা’) কবিতার জন্য খ্যাত। বিদ্যারণ্যকেশরী অর্যালের লিখিত কবিতার মধ্যে ‘যুগলগীত’, ‘দ্রৌপদীবিলাপ’ ও ‘বংশীচরিত্র’ উল্লেখ্য। বসন্ত শর্মা দুটি খণ্ডকাব্য রচনা করেন – ‘কৃষ্ণচরিত্র’ ও ‘সমুদ্রলহরী’।
ভানুভক্ত আচার্য নেপালী ভাষার ‘আদিকবি’ অভিধায় সম্মানিত। নেপালী ভাষার প্রসিদ্ধ কবি মোতীরাম ভট্ট (১৮৬৬-১৮৯৬) তাঁকে প্রথম ‘আদিকবি’ বলে অভিহিত করেন। বর্তমান গণ্ডকী প্রদেশের অন্তর্গত তনহুঁ জিল্লার রম্ঘা গ্রামে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে ভানুভক্তের জন্ম। তাঁর পিতা ধনঞ্জয় আচার্য নেপালের রাজকর্মচারী ছিলেন। ভানুভক্ত, তাঁর শৈশব ও কৈশোরে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁর প্রধান কৃতি ‘ভানুভক্তকো রামায়ণ’ নামে পরিচিত বাল্মীকি রামায়ণের সংস্কৃত থেকে নেপালী ভাষায় কাব্যানুবাদ।
১৮১৪ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে গোর্খা রাজবংশের শাসনাধীন নেপালের যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পর, ২ ডিসেম্বর, ১৮১৫ সালে নেপালের রাজা সুগৌলীর সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। ৪ মার্চ ১৮১৬ সালে এই চুক্তি কার্যকর হয়। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নেপালকে পূর্ব ও পশ্চিমের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূভাগ (বর্তমান সিকিম ও উত্তরাখণ্ড) ব্রিটিশদের হস্তান্তর করতে হয়। এই অবমাননাকর চুক্তি নেপালের শিক্ষিত জনমানসে আত্মগ্লানির সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে, ভানুভক্ত আচার্য তাঁর কাব্যের মাধ্যমে নেপালের অধিবাসীদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ পুনর্জাগরিত করার প্রয়াস শুরু করেন। ১৮৩৬ সালে ভানুভক্ত তাঁর প্রথম দুটি কবিতা রচনা করেন। ১৮৪১ সালে তিনি রামায়ণের বালকাণ্ডের অনুবাদ সম্পূর্ণ করেন। ১৮৫২ সালের মধ্যে তিনি আরও চারটি কাণ্ড- অযোধ্যাকাণ্ড, অরণ্যকাণ্ড, কিষ্কিন্ধাকাণ্ড ও সুন্দরকাণ্ডের অনুবাদ করেন। ১৮৫৩ সালে, তাঁর যুদ্ধকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ডের অনুবাদ সম্পন্ন হয়। ভানুভক্তের রামায়ণ অনুবাদকর্মের সূচনার প্রায় চার দশক পর মোতীরাম ভট্টের প্রয়াসে ১৮৮৭ সালে তাঁর অনুদিত রামায়ণ কাব্য প্রকাশিত হয়। ভানুভক্তের রামায়ণের ভাষা, কাহিনীবিন্যাস ও ভাবপ্রকাশের রীতির নেপালী সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ তাঁর এই কাব্যকে নেপালী সাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান প্রদান করেছে। তাঁর অন্যান্য রচনার মধ্যে উল্লেখনীয় ‘প্রশ্নোত্তরমালা’ (১৮৫৩), ‘ভক্তমালা’ (১৮৫৩), ‘বধূশিক্ষা’ (১৮৬২) ও ‘রামগীতা’ (১৮৬৮)।
আজও নেপালী ভাষাভাষীদের মধ্যে ভানুভক্তের রচিত রামায়ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে নিয়মিতভাবে পাঠের ধারা বহমান এবং এই কারণেই নেপালী জনমানসে তিনি এখনও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তথ্যসূত্র:
১. আচার্য, ভানুভক্ত (২০০৭).ভানুভক্তকো রামায়ণ (অন্য কৃতি তথা ফুটকর রচনাসমেত), পাঁচৌ সংস্করণ. ললিতপুর: সাঝা প্রকাশন.
২. Hutt, M.J. (1991). Himalayan Voices: An Introduction to Modern Nepali Literature. Berkeley: University of California Press. pp. 5-6.
৩. Maitra, K.S. (1982). “The First Poet of Nepali Literature” in Indian Literature, Vol. 25, No.5 (September-October 1982), New Delhi: Sahitya Akademi. Pp.63-71.
৪. Regmi, D.R. (1965). Medieval Nepal, Part I. Calcutta: Firma K.L. Mukhopadhyay. p.713.
৫. Regmi, D.R. (1966). Medieval Nepal, Part II. Calcutta: Firma K.L. Mukhopadhyay. p.826

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত