| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গদ্য সাহিত্য

গদ্য: বাজান তোমার ছেলে আজ দাঁড়িয়েছে । ইকবাল তাজওলী

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

সত্তরের দশক শেষ হতে কেবল বছর দুয়েক বাকি আছেসেই অপয়া দশকে বলা নেইকওয়া নেইহঠাৎ একদিন বাজান আমাদেরকে ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেনঅর্থাৎ মরে গেলেন । দিন দুয়েক বাদে কিশোর আমি বাজানের অভাবটা মনে হয় প্রথম টের পেলাম । সন্ধ্যারাতে যখন বাজানের লেপের নিচে শুয়ে আপার সঙ্গে টুকটাক কথাবার্তা সারছিলেপে লেপ্টে থাকা বাজানের গায়ের গন্ধ নাকে এসে লাগল। এতদিন কান্না লুকিয়ে রাখলেও এই প্রথম কান্না আর ধরে রাখতে পারলাম না । এই অবস্থায় কেউ কি কান্না ধরে রাখতে পারেহাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। আম্মাবাজানোর গতরোর গন্ধ লেফো লাগি রইছে। আপাও কেঁদে উঠল । আম্মা তো কাঁদছেন সেই প্রথম দিন থেকে । আমারে সাগরো বাসাইয়া কানো কোথায় গেলায় তুমি কানো গেলায় তুমি?

সত্যি আমরা সাগরে ভেসে গেছি। আত্মীয়স্বজন– জ্ঞাতিকুটুম কেউ বলতে গেলে এই তল্লাটে নেই। সব ওপারে। খুচরো দুচারজন যে আছেনবাজানের বদলি জনিত চাকরির কারণে বছর পঁচিশেক হয় দেখাসাক্ষাৎ না হওয়ায় অনেকটাই দূরে সরে গেছেন। বাজান সারাটা জীবন বলতে গেলে ঢাকারংপুরময়মনসিংহবগুড়ায় চাকরি করেছেন। বছর দেড়েক হয় চেষ্টাতদবির করে বদলি নিয়ে বগুড়া থেকে এখানে তাঁর পুরনো কর্মস্থলে আমাদেরকে নিয়ে এসেছেন।

এই প্রথম আমরা নদীর পাড় লাগোয়া স্টাফ কোয়াটার্সে বসবাস করতে শুরু করেছি । আমাদের বাড়িও ছিল নদীর পাড়ে । বরাকমধুরার পাড়ে । বরাক পেরিয়ে মধুরার পাড় ঘেষে শ তিনেক গজ হেঁটে গেলেই আমাদের বাড়ি । চার কিয়ারি কেদার বাড়ি । বাপ চাচাদের পুরো বাড়ি হিসেবের মধ্যে নিলে আটনয় কিয়ার হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয় আমাদের শহর লাগোয়া বাড়িটির । ছোটোমামা বড়ো সখ করে নিজ হাতে তিনশ সুপারি গাছ লাগিয়েছিলেন । ইংরেজ আমলে কী ছিল না এ বাড়িতে । হাতিঘোড়া মোটামুটি সব ছিল । দাদা ধবধবে সাদা ঘোড়ায় চড়ে হেঁটে চলতেন । বাপচাচারাও ধুতি পরে চলাচল করতেন । থাকসে সব দিনের কথা ভেবে চোখের জল আর নাকের জলে একাকার হতে চাই না । এমনিতেই বন্ধুরা বলেতোদের এখানেও কিছুই নেইওখানেও কিছু নেই । পারলে যোগ করেতোদের দোতলা পুকুর ছিলবাড়ি ভর্তি হাতিঘোড়া ছিল এই তো দিন কয়েক আগে একজন সাহিত্যিকই বলে বসলেন আপনারা সকলেই জমিদার ছিলেনযারা ওপার থেকে এসেছেন আর এপার থেকে গেছেন !

তো বাজানের মৃত্যুর সংবাদ শুনে দুলাভাই তাঁর কর্মস্থল পাবনা থেকে ছুটে এলেন । সেই সময়ে পাবনা এই তল্লাট থেকে বহুদূর ঢাকা থেকে এলেন ফুফাতো ভাইসাহেব । এই প্রথম আমরা জানতে পারলামবাংলাদেশে একজন আপন ফুফাতো ভাই আছেন আমাদের ।

আমরা চারবোন একভাই । আমি সকলের ছোটো । আমার বড়ো দুবোন ওপারে । আমরা একটি ব্রোকেন ফ্যামেলির মানুষ । ৪৭ এর দেশভাগ বাবাকে বৃন্তচ্যুত করেছিলআর ৬৫ সালের পাকভারত যুদ্ধ আমাদেরকে সপরিবারে উচ্ছেদ করেছে স্বভূমি থেকে । সে সব ম্যালা কথা । হাতে সময় থাকলে হয়ত সে সব কথা বলতে চেষ্টা করব ।

তো বাজান মরে যাওয়ায় একদম ভাসমান হয়ে গেলাম । রিফিউজির আবার ভাসমানটাসমান কী । রিফিউজিরা তো এমনিতেই ভাসমান । তারপরও বাজান আমাদেরকে বটবৃক্ষের মতো আগলে রেখেছিলেন । দু:কষ্টবেদনা কোনো কিছুই বুঝতে দেননি । একাই সামলিয়েছেন ।

এই প্রথম বুঝলামউপলব্ধিও করলাম যখন পড়াশোনা লাটে উঠল । থাকাখাওয়ারই সংস্থান নেইআর পড়াশোনা মাস দেড়েকের মধ্যে বাজান যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেনসেই কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদেরকে সরকারি বাসায় নিয়ে এলেন । পূর্বে মাস দুয়েক আগে আমরা যে সরকারি বাসা ছেড়ে গিয়েছিলাম সেই বাসায় আরকি । আজ মনে হয় কী দিয়ে যে তৎকালীন এই কর্তৃপক্ষের রিন শোধ করি । তো থাকার জায়গা একটা তো হল । আর খাওয়া বাজান ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ ইহজগত ত্যাগ করেছিলেনতাই ২১ দিনের বেতনভাতাব্যাংকলাইফ ইন্সুরেন্স মিলিয়ে চলার উপযোগী কিছু টাকা মায়ের হাতে এল ।

ভাইবোন আবার স্কুলে যেতে শুরু করলাম । সেই সময়ে প্রায় সকলেই দলবেঁধে পায়ে হেঁটে স্কুলে যেততা মাইল তিনেক দূরে হোকআর চারেক হোক । আপার সে সমস্যা ছিল না কারণনদী পার হয়ে কাছেই ওর স্কুল ছিল । আমি মাইল তিনেক দূরের স্কুলে সহপাঠী এবং বন্ধুদের সঙ্গে সঙ্গী হয়ে গেলাম । সঙ্গে মায়ের দেয়া পঁচিশ পয়সা । এই তো আমার সম্বল । নৌকায় পার হয়ে গেলে সেই সম্বলও প্রায় শেষ হয়ে যেত ।

টিফিন পিরিয়ডে ক্লাসমেটদের কেউ কেউ স্কুল পালিয়ে পাশের লালকুঠিরংমহল সিনেমা হলে ম্যাটিনি শোতেআবার কেউ কেউ সিরাজি– আলবেলা রেস্টুরেন্টে নাস্তা সারত । আমার সামর্থ তো কুল্লে পাঁচ পয়সা কিংবা তারওকিছু বেশিকাজেই কারো সঙ্গে সঙ্গী হতাম না । স্কুলে থাকতাম । বাস্কেটবল প্রাকটিস করতাম । মোটামুটি খেলতে পারতাম । সেই সময়ে বাস্কেটবলে আমাদের রাজ জিসি হাই স্কুল ছিল জেলার সেরা ।

একদিন দেখি মামা এসে হাজির হয়েছেন । মায়ের কাছে শুনেছিআমাদের তিন মামা । কিন্তু আমি আমার এই জীবনে অন্য মামাদের দেখিনি । তাইআমার কাছে বড়ো মামাই মামা । আমরা যেখানে থেকেছিবসবাস করেছিমামা এসে হাজির হয়েছেন ।

তখন পাসপোর্টছয়ফুটের তেমন বালাই ছিল না । পাসপোর্ট অপেক্ষা লোকে ছয়ফুটে যেত বেশি । মামাও ছয়ফুটে জকিগঞ্জ মানিকপুরের আয়াস আলি ব্যাটার ঘাট পেরিয়ে সোজা এসে হাজির হয়েছেন ।

মামাকে দেখে মায়ের সে কী কান্না তাকিয়ে দেখি মামাও চোখ মুচছেন । বললেনমখজিলদার চিঠি পাইয়া আইছি । হায়রে হায় কিতা অইলো ইতা ইংরেজ আমলোর গ্রামোর শিক্ষিত– ধনী– জমিদার পরিবারআইজ দেশভাগোর লাগি সর্বহারা !

মামা দম নিলেন না । পেনশন– প্রভিডেন্ট ফাণ্ডগ্র্যাচুয়িটির কাজে বাজানের বন্ধু রুহুল আমিন চাচার সঙ্গে এ অফিস– ও অফিসে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলেন ।

একদিন স্কুলে ফুলফ্রি স্টুডেন্টশিপের দরখাস্ত নিয়ে এলেন । স্যারেরা জানতেন আমাদের দীনতাতাই দ্রুত ফুলফ্রি স্টুডেন্টশিপ মঞ্জুর হয়ে গেল । কথাটা যত সুন্দর শোনাচ্ছেআদতে তা কিন্তু নয় । সোজা কথায় গরিব ফাণ্ডের টাকা মঞ্জুর হয়ে গেল । এখন স্কুলে পড়াশোনা করতে আর বেতন লাগে না । শুধু নির্দিষ্ট দিনে আমরা জনা দশেক ছাত্র গোমরা মুখে হেডস্যারের চেম্বারের সম্মুখে পায়চারি করি । হেডস্যার তাঁর খাসপিয়নের মাধ্যমে আমাদের স্লিপ নিয়ে দস্তখত দিয়ে দেনবেতন আমাদের মওকুফ হয়ে যায় । দুর্গেশ রে তোর কথা মনে আছে ভাইরে । আমি ইকবালের কথা কি স্মরণে আছে তোর ?

এখানে আমার রুহুল আমিন চাচার কথা না বললেই নয় । নোয়াখালীর ভদ্রলোক রুহুল আমিন চাচা ছিলেন আমার বাজানের পরম বন্ধু । পরম বন্ধু এই জন্যে বলছি যেতিনি বন্ধুত্বের দায় মিটিয়েছিলেন । পেনশনপ্রভিডেন্ট ফাণ্ডের কাজ ছাড়াও পরীক্ষার আগে বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই বিকেলবেলা তিনি ঘণ্টা দেড়েক আমাদের পড়াতেন । দীর্ঘদিন ধরে তিনি আমাদেরকে পড়িয়েছিলেন । বিনিময়ে শুধু এককাপ চা খেতেন । তাও আবার লাল চা এই স্থলে আরেকজনের কথা না বললেই নয় । তিনি হচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির উপাধ্যক্ষ আশফিউদ্দিন আহমেদ । আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে চলা ঝড়ঝাপটা বলতে গেলে তিনি একাই সামলিয়েছেন ।

এঁদের আত্মার শান্তি কামনা করা ছাড়া আমার কী বা করার আছে ।

আমার নিঃসঙ্গ জীবনের শুরু বলা যায় সেই সময় থেকে । তারপরকত দিবসরজনি সংগ্রাম করে পার হয়ে গেলতার কোনো ইয়ত্তা নেই । নিঃসঙ্গতা আর কাটল না । মনে হয় শৈশব– কৈশোরে প্রচণ্ড মানসিক আঘাত নিয়ে যারা বড়ো হয়দাঁড়ায়তারা নিঃসঙ্গই থেকেই যায় । আমি এখনও নিঃসঙ্গই আছি ।

বাজান তোমাকে বলছিবাজান আমি মরিনিহারিয়েও যাইনি । রিফিউজিরা মরে নাহারিয়েও যায় না । রিফিউজিরা ঢোলকলমি লতাবাজান । পুতে দিলে ঝড়ঝাপটা সহ্য করে দাঁড়িয়ে যায় ।

বাজানআমি দাঁড়িয়েছি। বাজানতোমার ছেলে আজ দাঁড়িয়েছে।

One thought on “গদ্য: বাজান তোমার ছেলে আজ দাঁড়িয়েছে । ইকবাল তাজওলী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত