| 5 মার্চ 2024
Categories
ইরাবতীর বর্ষবরণ ১৪২৮

ইরাবতীর বর্ষবরণ গল্প: বিবাগী সুখ । সাদিয়া সুলতানা

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

১.

এমনই এক বিরান দুপুরে গ্রামের লোকজন ধবল নদীর পাড় ধরে বিবাগী নেয়ামতকে জোর কদমে হেঁটে আসতে দেখেছিল। এই লোকজনের মধ্যে পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষ আর মা-বোনেরই সংখ্যা বেশি ছিল কারণ খাসতালুক গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির শক্ত-সামর্থ্য জোয়ান পুরুষ মানুষই ‘বিদেশ করে,’ যাদের যৌবনকাল সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়াতে কাটে। কেউ কেউ দেশে ফিরে পুরনো ঘরদোর ঠিক করে নতুন করে ঘরসংসার সাজিয়ে বসতে না বসতেই দম আর সঞ্চিত টাকা-পয়সা ফুরিয়ে ফেলে। কেউ আবার পরপুরুষের সঙ্গে ভেগে যাওয়া বউয়ের খোঁজ-খবর করতে করতে উদাসী হয়ে নতুন করে বিয়ের পিঁড়িতে বসে আর আগের বউয়ের গর্ভজাত সন্তানের দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়। তারপর একদিন নতুন বউয়ের গর্ভে নতুন বীজ দিয়ে ফের নিশ্চিন্তে বিদেশ করে।

বিবাগী নেয়ামত এক অদ্ভুত পুরুষ, তার বাবা হেকমত শত চেষ্টা করেও তাকে ‘বিদেশ করা’তে পারেনি। নেয়ামত বাড়িতে থাকে না, সংসারীও হয় না। মাঝেমাঝে বিবাগী নেয়ামত লম্বা সময়ের জন্য বিবাগী হয়। সেইবার দীর্ঘ আট মাসের জন্য সে বিবাগী থাকায় সবাই ভেবেছিল, ‘অয় তলে তলে বিদেশই করতাছে।’ কিন্তু সকলকে নিরাশ করে দীর্ঘ আট মাস পর চৈত্রের ঝাঁঝালো এক দুপুরে নেয়ামত ফিরে এসেছিল। পরনের ঘামে জবজব সাদা পাঞ্জাবি আর মাথায় পাগড়ি বাঁধা নেয়ামতকে দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল-কোনো মহাপুরুষ গ্রামে পা দিয়েছে। নেয়ামতের নতুন বেশভুষা দেখে কেউ কেউ কানাঘুষা করেছিল, নেয়ামত মস্ত বড় সুফি হয়েছে। জামাইপাড়ার জহিরের কাছে নাকি পাক্কা খবর আছে, নেয়ামত টেকেরহাটের পাঁচ গাট্টি পীরের বায়াত গ্রহণ করে ফিরেছে। সেই খবর শুনে হেকমতের বুকের ভেতরে আশার নদীতে পানি থৈ থৈ করেছে; সে ভেবেছে, এইবার ছেলের মতি ফিরবে, ঘর আলো করে একখান নাতি আসবে আর সে নিশ্চিন্তে ঘর-গেরস্তি ছেলের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে ধর্মকর্মে মন দিবে।

কিন্তু সবার শিশুকৌতূহলে পানি ঢেলে সেবারও বাড়ি ফেরার একদিন পরেই বিবাগী নেয়ামত হরির দোকানে তাড়ি খেয়ে এমন মাতলামি জুড়েছিল যে হরিকে দোকান ফেলে ওকে পাঁজকোলে করে বাড়ি পৌঁছে দিতে হয়েছিল। ছেলেকে সেদিন বউয়ের সামনেই কয়েক ঘা চড়-থাপ্পড় লাগিয়েছিল হেকমত। পরদিন সকালে যেই সেই। আবার নেয়ামত বিবাগী হয়েছিল। দীর্ঘ সাত মাস পার হয়ে গেছে, এখনো সে বাড়ি ফেরেনি।  এবারই যে নেয়ামত দীর্ঘদিন ধরে বিবাগী হয়েছে তা কিন্তু নয়। বছরে দুতিনবার বিবাগী হয় বলে নেয়ামতের নামের সঙ্গে বিবাগী তকমা জুড়ে গেছে। এখন ওর বাড়ির লোকজনেরও এ গা সওয়া হয়ে গেছে। বরং বাড়ি ফিরে কদিন চুপচাপ খাওয়া-দাওয়া করলে হেকমতের উসখুস করে। রোজ সকালে নেয়ামতের বউকে জিজ্ঞাসা করে, ‘ব্যাটা আমার আছে? না গেছে?’ কাঙ্ক্ষিত উত্তর পেলে হেকমত পুত্রবধূর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে উঠানে বসে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে যায়। 

বিবাগী নেয়ামতের স্ত্রীর নাম নয়নতারা। শ্বশুরকে কাঁদতে দেখে নয়নতারা শোকে বিহ্বল হতে গিয়েও পারে না। কয়েকদিনের ঝড়ো সুখের বিপর্যস্ত ভাব কাটিয়ে উঠে বৃদ্ধ মানুষটিকে অবলম্বন করে সে দিন কাটায় আর বিবাগী সুখের আশায় বহু দূর পর্যন্ত দৃষ্টি মেলে রাখে।

     ২.

নয়নতারা এই খাঁ খাঁ রোদ্দুরে ধবল নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বালুচরে আলোর খেলা দেখছে। চরের বুকে জেগে ওঠা নলখাগড়ার ঝোঁপের পাশাপাশি কাশফুল সাদা মেঘের মতো ছড়িয়ে আছে। কাশফুলে লুটিয়ে পড়া রোদের আলোর ঝলকে মাঝেমাঝে চোখে ধাঁধাঁ লাগলেও নয়নতারা হাল ছাড়ে না। ঐ সুদূরে তাকিয়ে থাকে কাউকে দেখার আশায়। কিন্তু সে আসে না। রোদের তেজ কমতে থাকলে অপেক্ষার তেজও থিতিয়ে আসে। নয়নতারা বাড়ির পথে পা বাড়ায়। নদী তীর থেকে ওর বাড়ি মাইল তিনেকের পথ। হেঁটেই বাড়ি ফিরতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে নয়নতারা আজ হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। পায়ে কাঁটা ফুটলো কি? মুখে মৃদু আওয়াজ করে নয়নতারা মাটিতে বসে পড়ে।

‘কী গো ভাবী, দুক্ষু পাইলা?’ দুঃখের কথা শুনে নয়নতারার বুকের ভেতরে ধড়াস ধড়াস শব্দ হতে থাকে। মনে হয় কে যেন খুব যত্ন করে বুকের ঠিক কেন্দ্র বিন্দুতে হাতুড়িপেটা করছে। এর পরে যা ঘটে তার জন্য নয়নতারা মোটেও প্রস্তুত না থাকায় প্রচন্ড ভূমিকম্পে ওর আপাদমস্তক কেঁপে ওঠে। একটা পুরুষালী সবল হাত ওর পা স্পর্শ করতেই নয়নতারার শরীরজুড়ে অচেনা এক অনুভূতি ছোটাছুটি করতে থাকে। নাহ্ ঠিক অচেনা নয়, নেয়ামত বাড়িতে থাকলে যখন রাতে দরজার ছিটকানি তোলে তখন ঠিক একই অনুভূতির সাড়া জাগে শরীরে। নয়নতারা সে কথা মনে করে থরথর করে কেঁপে ওঠে। ওর নিঃশ্বাসের খুব কাছাকাছি কোনো পুরুষালি শরীরের ঘ্রাণ পায়।

নয়নতারার মনে দিশেহারা ভাব জাগে। ছটফট করতে করতে ও ধবল নদীর ধবল পানিতে কোনোরকমে মাথা জাগিয়ে রেখে শ্বাস নেয়। ও জানে, নারী-পুুরুষের শরীর বড়ো রহস্যময়। দাদী বলতো, ‘রসের নাগর রসে মজায়, শুধায় না তো কেউ; শরীল জুইরা তুফান লাগে, জাগে নয়া ঢেউ।’ কিন্তু ওর জীবনে পুরুষের স্পর্শে জোয়ারের দিন কোথায়? নেয়ামত বাড়িতে থাকলে অনাহুতের মতো কয়েকটা রাত আসে। যেসব রাতে স্বামী সোহাগে নিজেকে নিবেদন করতে করতে ওর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে বিবাগী ঢেউ জাগে, আবার সেই ঢেউ জাগানিয়া মানুষটাই যখন ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যায় তখন নয়নতারার শরীরে চর পড়ে। কখনো কখনো পুরুষ স্পর্শ বিবর্জিতা নয়নতারার এই পোড় খাওয়া শরীর বর্ষার মাতাল নদীর মতোই ঢেউ মুখর হয়ে ওঠে। তখন জোছনাগলা হু হু রাত্তিরে একাকী নয়নতারা সারা রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে আর নিজের শুকনো খটখটে শরীরকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে আর টের পায় ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে নদীর ঢেউ ফুরিয়ে শরীরে চর জেগেছে।

আজ অনেকদিন পর সেই চরের জমিনে উষ্ণ জলের ঢেউ তরঙ্গায়িত হতে দেখে নয়নতারা ঘাবড়ে যায়। ও ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ায়। বলে, ‘উস্টা খাইছি। দুক্কু পাই নাই।’ সামনে দাঁড়ানো লম্বা-চওড়া সুঠামদেহী যুবকটি ব্যস্ত গলায় বলে, ‘রক্ত বাইর হইছে তো!’

‘একটা বরইডালে ঘাই খাইছি, কিছু হইব না। আমি যাই।’

একদল চঞ্চল পাখি উড়ে যায় ধবল নদীর দিকে। নয়নতারা পিছু ফিরে পাখিদের দলবাজি দেখে নিয়ে যাই বলে পা চালায়।

‘একটু দাঁড়াইলে হয় না।’

নয়নতারার পায়ের গতি শ্লথ হয়ে আসে। তা দেখে মিলন নামের যুবকটি হাসে। সেই হাসি দেখে নয়নতারার মনে কাঁটা ফোটে। দুঃসহ যন্ত্রণায় ও চোখ থেকে চোখ সরায়। মিলনের দিকে তাকালে সর্বাগ্রে ওর নাকের ডগায় কাজল কালো টিপের মতো জন্মদাগে চোখ যায়। মিলনের বাড়ি এই গাঁয়েই। বিয়ের পর নয়নতারা যেদিন এই গ্রামে পা রেখেছিল তার দশদিন বাদেই মালয়েশিয়া ফেরত মিলন হাতে কয়খানা বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে ওদের বাড়ি এসেছিল। নয়নতারার এখনো সেই দিনের কথা মনে আছে, কারণ বিয়ের পর সেদিন বিকালেই নেয়ামত প্রথমবার বিবাগী হয়েছিল। সেদিনের পর পাঁচ বছর চলে গেছে। নয়নতারার হৃৎপাখি ধড়ফড় করে। কোনো রকমে বলে, ‘আপনে কবে আইছেন ঢাকারথন? আপনের না বিদেশ যাওনের কথা?’

মিলন লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘এইবার ধরা খাইছি, বন্ধু বেইমানি করছে। টাকা মাইরা দিছে।’

নয়নতারার হাসি পায়। মাথার ঘোমটা টেনে সে মুখ আড়াল করে।

‘তয় অহন কী করবেন? বিবাগী হইবেন?’

মিলনও হাসে। সেই হাসির শব্দে সুখের আলো ঠিকরে পড়ে।

‘সেই সাধ নাই গো ভাবী। যে বিবাগী, সে অভাগী। আমি এইবার সংসারী হমু, খেত-খামারি করুম, হাঁস মুরগি পালুম, লাউয়ের মাচা দিমু। এই যে হাটে যাইতাছি। হাটেরথন সব কিন্যা ফিরুম।’

‘তাইলে তো বিয়া করন লাগে। সংসারী হইলে তো বিয়া করন দস্তুর।’

‘করুম তো।’

নয়নতারার ভেতরের অতৃপ্ত আত্মা হাহাকার করে ওঠে। সংসারী মানুষও তো বিবাগী হয়!

‘মাইয়া পাইছেন?’

‘না ভাবী, এই দেবরের লাইগা আপনার লাহান একটা মাইয়া দেহেন তো’ বলে মিলন রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসে। মিলনের নাকের ডগার জন্মদাগে সেই হাসি আছড়ে পড়ে ওর মুখ জ্বলজ্বল করে। নয়নতারা কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতর পাড় ভাঙার শব্দে ও অদ্ভুত দোটানায় পড়ে যায়। কথার পিঠে কথা না বলে মিলনকে পিছনে রেখে চপল পায়ে নয়নতারা বাড়ির পথ ধরে।

৩.

গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে নয়নতারার চোখের সামনে। ওর বুকের ফাঁপা অংশে আজব সেই অন্ধকার সেঁধিয়ে যায়। ঘাই মারে মস্তিষ্কের চর্তুকোণে। হাত-পা নিস্তেজ হয়ে যায়। নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে। মিলন ওর ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলার সময় যেমনটা হতো ঠিক তেমন অনুভব ওর শরীরের কোণে কোণে নীল বিষ ছড়িয়ে যায়। নয়নতারা টের পায় ওর চামড়ার ছিদ্রপথে সরসর করে বৈশাখের বখাটে বাতাস ঢুকে পড়ছে। ওর শরীর কাঁপে। নয়নতারা মিলনের সুখে কাতরায়। বাতাসের বেতাল স্পর্শ মিলনের হাতের স্পর্শ হয়ে ধীরে ধীরে কাবু করে ফেলে ওকে। শরীরী ভালোবাসায় উন্মুখ নয়নতারা হাসে, ওর গোলাপি ঠোঁটের ভাঁজে সে হাসি অস্পর্শী মেঘের মতো দোল খায়। ‘পুরুষ মানুষের হাত এত কোমল হয়!’ এবার একটা অজগর ওকে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। কানের কাছে হিসহিস করে। ফিসফিস করে, ‘এমন আগুন থুইয়া বিবাগী হয় কোন বলদে!’ সাপের আলিঙ্গনে নয়নতারার শরীর দুমড়ে-মুচড়ে যায়। একসময় আনন্দের ভারে ওর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে।

‘কে রে, বিবাগী নেয়ামতের বউ না?’ ডাক শুনে নয়নতারা চমকে ওঠে।

‘বিবাগী ফিরছে?’

‘না, কাকী।’

‘আহারে, এইবার বুঝি বচ্ছর পুরাইব পাগলাটা। অমন সোনার বরন বউ থুইয়া মানুষ ক্যামনে যে বিবাগী হয়!’

নয়নতারার শরীর এখন অসাড়। মুখে শব্দ নেই।

‘তুমি একলা দাঁড়াইয়া কী করো বউ, যাও, ভিতরে যাও। কাজে-কামে হাত লাগাও। এই বাড়ির প্রথম বিয়া। মন মাতাইয়া আনন্দ-ফুর্তি করা চাই।’

‘যাই কাকী’ বলে দাঁতে জিহ্বা কেটে নিজেকে সাবধান করে, কী করতে এসে কী করছে সে! আজ এই বাড়িতে বিয়ে। বরকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বাড়িঘর অতিথিদের কলরবে মুখর। বাড়ির উঠানে ‘বিজলি ডেকোরেটর’ থেকে আনা চেয়ার টেবিল পেতে অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চারদিকে বাঁশের খুঁটি গেড়ে রঙিন কাগজের শেকল দিয়ে সাজানো হয়েছে। বাড়ির প্রবেশ পথে রঙিন কাপড়ের বাহারি গেটও বানানো হয়েছে। বাড়ির সদস্যসহ আগত অতিথিরা অহেতুক কলহাস্যে চারদিক মুখর করে রেখেছে। মুরুব্বিগোছের একজন হাঁক দেয়, ‘বিয়া বাড়িতে গান-বাজনা নাই! নাচানাচি নাই! কেমুন কথা!’ ছেলে-ছোকরার একটা দল তার কথা শুনে বিপুল উৎসাহে হৈ হৈ করে ওঠে। মিনিটখানেকের মধ্যে বিকট শব্দে ‘মুন্নী বদনাম হুয়ে’ গানের তালে তালে তাদের উদ্দাম নাচ শুরু হয়। হৈ-হুল্লোড় দেখে নয়নতারা চুপসে যায়। বুঝে যায়, ও কতটা নিঃস্ব-রিক্ত। নিজের প্রবঞ্চিত শরীরকে এবার ভীষণ ঘেন্না লাগে নয়নতারার। বাতাস বিদীর্ণ করে বিরতিহীন কাঁদতে ইচ্ছে করে ওর।

বাড়ি থেকে বের হয়ে যখন এই বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করেছিল নয়নতারা তখন ওর মনে ভেতরে একটা পাগলা ঘোড়া ছুটছিল। ভেবেছিল এই বাড়িতে ঢুকে সব লন্ডভন্ড করে ফেলবে। প্রচণ্ড সংঘর্ষে কাঁপিয়ে তুলবে চারপাশ। কিন্তু এতক্ষণের বুনো দাপট শেষে ঘোড়াটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অবসন্ন নয়নতারাকে অগ্রাহ্য করে ধীরে ধীরে সেজে উঠেছে চারপাশ। খাবারের সুঘ্রাণ আর সুখের সৌরভে বাড়িঘর ম ম করছে। নয়নতারা দ্বিধাভরা দৃষ্টিতে চারদিকে তাকায়। তাকে কি দেখা যায়? দেখা যায় কি তার নাকের ডগার জন্মদাগ খানা? যেখানে অনাহুত কারো হাতের উত্তাপ লেগে আছে। হঠাৎ নয়নতারার উদভ্রান্ত দৃষ্টি কারো শরীরে আটকে যায়। ঐ তো সে।

উঠানে পাতা চেয়ারে বিয়ের সাজে মিলন বসে আছে। চোখে চোখে বিদ্যুৎ জ্বলে উঠতেই মানুষটা নতমুখী হয়ে বসে। নয়নতারা আর তাকাতে পারে না। দড়িতে ঝোলানো রঙিন কাগজগুলো বাতাসের নাচনে পতপত করে উড়ছে। উড়তে উড়তে উপহাস করছে ওকে। নয়নতারাও উড়তে শুরু করে। উড়তে উড়তে ধবল নদীর ধারে এসে ওর ডানাদুটি শান্ত হয়। অবসন্ন চোখে ও তাকায় নদীর বুকে। নদীর কাছে সব বলা যায়। নদী বুক পেতে সব কথা টেনে নেয়। বড় বিশ্বস্ত সে। যেচে কারো কোনো ক্ষতি করে না, কাউকে বলে না গোপন কথা। নয়নতারাও ধবল নদীকে ওর সব কথা বলে। গোপন কথার বুদবুদ হারিয়ে যায় ভরা নদীর ঢেউয়ের নাচনে।

ধবল নদীর বুকে আজ অগুণন ঘূর্ণি। সমুদ্রের ঢেউ, কথার নাচন। অসংখ্য স্বচ্ছ হীরা রাজকীয় ভঙ্গিতে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসে। রোদ ছাড়াই ঢেউগুলো ঝলমল করে। নদী তীর ঘেঁষা পানিতে দুটো পানকৌড়ি গ্রীবা উঁচিয়ে হাঁটে। একটা লেজঝোলা পাখি শীষ দিতে দিতে নয়নতারার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। ফুল শুকানো কাশবনে কার্তিকের বাতাস চুপচুপ করে দোলা দেয়। সেই কাশবনের ধারে শিশির ভেজা মাটিতে চুপচাপ বসে থাকে নয়নতারা। জোয়ারের টানে বালি ভিজে উঠতে শুরু করেছে। সেই ভেজা বালিতে পায়ের ছাপ ফেলতে ফেলতে আচমকা হাঁটতে শুরু করে ও।

জলজ জমিনে হাঁটতে হাঁটতে একসময় সবাইকে অবাক করে দিয়ে নয়নতারা একটা বিশাল পিচ্ছিল মাছ হয়ে যায়, তারপর ধবল নদীর বুকের ঠিক মাঝখানে ঝপ করে লাফ দিয়ে ডুবসাঁতার কাটতে শুরু করে।

3 thoughts on “ইরাবতীর বর্ষবরণ গল্প: বিবাগী সুখ । সাদিয়া সুলতানা

  1. খুব ভালো একটা গল্প পড়লাম। লেখাটা টান টান আর আগ্রহে ভরা। নর নারীর চিরন্তন মুক কথাগুলো কতটা কৌঁসুলি আলাপে বললেন! দারুণ গল্প! অভিনন্দন!

  2. অভিভূত বরাবর আমি তোমার রচনায়! অসাধারণ অলংকরণ সাধারণ গল্পের মাত্রাকে উত্তাল ঢেউ এর মতো টেনে নিয়ে গেলো যেনো!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত