| 29 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ইরাবতীর বর্ষবরণ ১৪২৮

ইরাবতীর বর্ষবরণ গল্প: সরদার খাজাঞ্চি । তন্ময় সরকার

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

ভোর থেকে সরদারপাড়ায় মৃদু চাঞ্চল্য, চাপা উত্তেজনা। কে করল এই কাজ? কীই-বা তার উদ্দেশ্য? এবং, আর কতক্ষণে পুরো এলাকাটা উড়ে যাবে!

এমনিতেই গত একমাস হল সরদারপাড়া বিপর্যস্ত। সারা দুনিয়ায় কোথায় কী হচ্ছে জেনে লাভ নেই, সর্দরপাড়া একটি নতুন দুর্ভিক্ষের নাম জেনেছে, লকডাউন। পাড়ার কিছু শিক্ষিত ছেলে রতন সরদারকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ‘‘লকডাউন’ কোনও দুর্ভিক্ষের নাম নয়। আসল রোগের নাম ‘কোভিড-উনিশ’। যে ভাইরাস এই রোগ সৃষ্টি করে তার নাম ‘নোবেল করোনাভাইরাস’। এই করোনা খুব সংক্রামক। মানে দ্রুত একজন মানুষ থেকে বহুজন মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ছড়িয়ে পড়া আটকাতেই এই লকডাউন করা হয়েছে।’

রতন সরদার শুনে গেছে, কিন্তু তার মাথায় অতশত ঢোকেনি। সে শুধু নিজের জঠরের অভিজ্ঞতা থেকে এইটুকু উপলব্ধি করেছে যে এই লকডাউন তার ভাত কেড়েছে। রতনের সাইকেলের ফুটিফাটা সারানোর গ্যারাজ। রাস্তায় কেউ বেরোলে তবে না তার সাইকেল পাঙচার হবে! ভ্যানওয়ালা ওভারলোড চাপিয়ে দু’ পা গেলেই না তার চেনটা ঘ্যাচাং করে কেটে যাবে, অথবা বাঁদিকের চাকাটা বোমা ফাটার শব্দে বার্স্ট করবে! আর সেই সঙ্গে রতনের দু’পয়সা ইনকামের রাস্তা প্রশস্ত হবে। কিন্তু রাস্তায় কি এসবের কোনও বালাই আছে! রাস্তা তো নয়, রতনের মনে হয় চোখের সামনে লম্বা ইট-রঙের শ্মশান শুয়ে আছে। এ-রকম চলতে থাকলে কিছুদিন পরে সপরিবারে তাকেও ওখানে গিয়ে শুয়ে পড়তে হবে। লকডাউন নামে কি যে এক রাক্ষুসে মন্বন্তর এল!

তারক সরদারের অবস্থা তথৈবচ। সে লোকাল ট্রেনে বাদাম বিক্রি করত। ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাইকেলের ক্যারিয়ারে ক’রে মনোহরিসামগ্রী বেচতে বেরিয়েছিল গ্রামে। কাচের ঢাকনাওয়ালা বড় টিনের বাক্স। নাকের নোলক, কানের দুল, বাহারি কাঁচের চুড়ি, রঙ-বেরঙের টিপ। একদিন যুদ্ধফেরত বিধ্বস্ত আর পরাজিত সৈনিকের মতো সে পাড়ায় ফিরল। লাল্টু জিজ্ঞেস করল, “এমন দেখাচ্ছে কেন তোমাকে? কী হয়েছে? কত বেচলে আজ?”

তারক চিনচিনে স্বরে উত্তর দিল, “বিক্রিবাটা কিছু হয়নি, এক্সট্রা পাওনা হয়েছে পুলিশের ঠ্যাঙানি। এই দ্যাখ্সেই সঙ্গে ফ্রিতে হারামিগুলো কাঁচের ঢাকনাটা ডাণ্ডা মেরে ভেঙে চৌচির করে দিল।”

মিহির সরদারের তিনটে গোরুর উপর সংসার। সকাল সকাল গোরু দুইয়ে বড় ক্যানে দুধ ভরে সে স্টেশনে যায়। সেখান থেকে ভেন্ডারস’ কম্পার্টমেন্টে চড়ে কলকাতা। খবরে দেখেছিল মিহির, ভিন রাজ্যের গোয়ালারা রাস্তায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ করছে। এরকম প্রতিবাদে মিহিরের সায় নেই। বুধি, শ্যামা আর কালী যে দুধ দেয় তা যেন দুধ নয়, পাঁচ-পাঁচটি মানুষের সংসারে জীবনদায়ী অমৃত। সেই দুধ রাস্তায় ফেলতে মিহির পারবে না। কিন্তু এত দুধ কী করবে? দুধ বিক্রি না হলে সংসারও বা চলবে কী করে? কেউ কেউ মিষ্টির দোকানে দুধ বেচার সুযোগ পাচ্ছে এখন, কিন্ত মিহিরের কপালে সে সুযোগ জোটেনি। কারণ মিহির তাদের রোজের ধরা গোয়ালা নয়। পাড়ার বেকারদের নেতা কালু একদিন এসে খবর দিল, “ও মিহির কাকা, শজিনা গ্রামে দুধের ফ্যাক্টরি হয়েছে, জানওই যে কী যেন কোম্পানিটার নাম, আরে যারা গরীবের পাশে দাঁড়ানোর আ্যাড দেয়। গুঁড়োদুধের কোম্পানি। রা দুধ কিনছে।”

মিহির ছুটল সেই শজিনা নামের অজগাঁয়ে। চারভাগের একভাগ দাম। অগত্যা কোম্পানিতে দশটাকা কিলো দরে দুধ বেচে রোজ রোজ খুব ঠকে আসছে মিহির। তাও গরীবের বন্ধু কোম্পানির দয়ায় মিহিরের দিন গুজরান হয়ে যাচ্ছে কোনওমতে। কিন্তু ওর ভাই শচীন! সে তো প্যারালাইজড। মাঠে কাজ করতে করতে হঠাৎ একদিন বাঁ দিকের অঙ্গ অসাড় হয়ে চোখ-মুখ বেঁকে গেল। আর সোজা হল না। ওর বউ গীতা দশটা বাড়িতে ঘর মোছে, বাসন মাজে। মিহির শুনেছে, গীতার সব বাড়ির কাজ চলে গিয়েছে। ‘তুমি বাপু এখন এসো না। কোথা থেকে কী বাঁধিয়ে নিয়ে বাড়িতে ঢুকবে! তার চেয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক, তারপর এসো,’ সবাই বলেছে এই কথা। ঠিকমতো কাগজপত্র জমা দিতে পারেনি বলে ডিজিটাল রেশনকার্ড পায়নি ওরা। তিনটে ছেলেমেয়ে আর পঙ্গু স্বামী নিয়ে গীতা কী ভাবে বেঁচে আছে, মিহির তা জানার চেষ্টা করে না।

এহেন সংকটসংকুল সরদারপাড়ায় সকাল থেকে আতঙ্কের আবহাওয়া। ভীতু গুঞ্জন। এখন রতন সরদার বলছে, “খুলেই দেখা যাক ভিতরে কী আছে।”

ট্রেনের হকার তারক বাইরে চলাফেরা করে। অনেক খোঁজ খবর রাখে। সে নমিতার সঙ্গে একমত। বলল, “তোর মাথা খারাপ রতন! কী না কী আছে তার ঠিক নেই। হয়ত তুই খুলতে গেলি আর পাড়া সুদ্ধ সবাই ভস্ম হয়ে গেলাম। পুলিশ ডাকাই ভাল।”

ঘটনা নজরে এসেছে ভোরবেলা। রতন কাকভোরে তার ঢেউটিনের ঝুপড়ির দরজা খুলেই দেখে ইটের পোঠের উপর একটা ঢাউস নীল ব্যাগ। বেশ বড়। সে খুলে দেখতে চেয়েছিল কী আছে ভিতরে। কিন্তু বাধা দিল রতনের বউ নমিতা। সে শুনেছে এরকম অপরিচিত ব্যাগেই উগ্রপন্থীরা বোমা রেখে যায়। আর নমিতাকে এখন জোরাল সমর্থন দিচ্ছে তারক। একটু পরে খবর এল আরও পাঁচ-ছ’টা বাড়ির সামনে ভোরের আলো ফোটার আগেই কেউ এরকম ব্যাগ ফেলে গিয়েছে।

শেষমেশ পুলিশ ডাকা হয়নি। ডাকা হবে, তেমনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু তার আর দরকার পড়েনি। সরদারপাড়ার হাবা-ক্যাবলাদের মধ্যে যে এক-নম্বর মাথামোটা, সেই পটা তেড়ে এল, “নিকুচি করেছে বোমার। জোয়ান মদ্দ হয়েছে সব! ছ্যাঃ সামান্য একটা ব্যাগ খুলতে সবার এত ভয়! সরো সরো, আমি দেখছি।”

সব্বাই দে-ছুট। উইসেন বোল্টও বুঝি এত ক্ষিপ্রতায় ছোটেন না, কারণ তাঁর পেছনে বোমা ফাটার ভয় নেই। প্রত্যেকে সাধ্যাতীত বেগে দৌড়ে দূরে সরে গেল। মিহিরের বউটা বেশ স্থুল। মিহির বলে, ‘হেঁটে এত কষ্ট করো কেন? যেদিকে যাওয়ার হবে আমাকে বলবে, আমি তোমাকে সেদিকে গড়িয়ে দেব।’ সেই মিহিরের বউ সবিতা, যে বহু যুগ আগে শৈশবে কী কৈশোরে একবার মাত্র কুকুরের তাড়া খেয়ে দৌড়েছিল, সে অনভ্যাসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল খোয়ার রাস্তায়। মিহির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।

পটা এক হ্যাচকা টানে ব্যাগের মুখ খুলে ফেলল। আর ব্যাগ থেকে বের হল— চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, পাতিলেবু, স্যানিটাইজার, মাস্ক এবং একশ’ টাকা। বিভিন্ন বাড়ির সামনে পড়ে থাকা ব্যাগ থেকে এই একই জিনিস আবিষ্কৃত হল।

তাজ্জব বনে গিয়েছে গোটা সরদারপাড়া। কে করল এই কাজ? কী উদ্দেশ্যেই বা করল? দেবেই যখন, তখন এত লুকিয়ে দেওয়ার কী আছে? আর ঠিক বেছে বেছে সেই-সেই বাড়িতেই ত্রাণ পড়েছে যাদের সব সম্বল এই লকডাউনে শেষ হয়ে গিয়েছে।

পাড়ার মোড়ে প্রাচীন বটগাছের তলায় ছোট্ট শীতলা মন্দির। তার পাশে প্রশস্ত চাত্বাল। সেখানে চর্চা জমে উঠল। পাড়ার বেকার কমিটির সেক্রেটারি কালু বলল, “এ শিওর কারও নেতা হওয়ার ফন্দি। নিশ্চয়ই সামনের পঞ্চায়েত ভোটে টিকিট নেবে। হঠাৎ একদিন দেখিস সামনে এসে দাঁড়াবে। বলবে, ‘এত্ত দিলাম! আসছে ইলেকশনে ভোট যেন পাই।’ শালা! একটা বেকারের চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নেই, শুধু পঞ্চায়েতের ঘুঘুর বাসায় বসে মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতানোর ধান্দা।”

কথাটা লাল্টুর পছন্দ হল না। সে নির্বিবাদী ছেলে। কোনও বিষয়ে কখনও বাদ-প্রতিবাদে জড়ায় না। কিন্তু আজ সে স্বভাবের বাইরে গিয়ে বলল, “তুই এরকম কেন ভাবছিস? হয়তো এত জটিল নয় ব্যাপারটা। আমার তো মনে হয় যে-ই করুক, সে হল মানুষের মতো মানুষ।”

পটা লাল্টুকে সমর্থন করল, “ঠিক বলেছিস, লাল্টু।”

যদিও এ-পাড়ায় পটার মতামতের এক আনা মূল্য নেই। তবু সে-ই সাহস করে ব্যাগ খুলেছে বলে আজ তার কথার কিছু সাময়িক মূল্য উৎপন্ন হয়েছে। কালু তাই বেশি তর্কে গেল না।

পাড়ার বয়ঃজেষ্ঠ্য সুনীল সরদার অনতিদূরে বসে বিড়ি টানছিল। সে বলল, “কোনও নেতাফেতা নয়। কোনও মানুষের কাজ নয় এটা। আজ সাতটা বাড়িতে মাল পড়েছে। এর পরে একে একে সব বাড়িতেই পড়বে।”

কালু সুনীলের দিকে এগিয়ে গেল, “মানুষের কাজ না, মানেটা কী? তুমি কি বলতে চাইছ ভূতে যোগাচ্ছে চাল-ডাল?”

শীতলা মায়ের মন্দিরের দিকে ইশারা করল সুনীল, “কালই পুজো দিয়েছি। বলেছি, ‘মা, এই অমঙ্গল তুমি কাটিয়ে দাও। দুটো অন্নের ব্যবস্থা করো।’ আর আজ সকাল সকাল তার ফল ফলেছে। এ হল মায়ের দান। পাড়ার মেয়ে-বউদের বল যেন একটু তেল-সিঁদুর দিয়ে যায়। সব মায়ের করুণা। মা… মাগো… রক্ষা করো…” চোখ বুজে কপালে দু’হাত তুলে প্রণাম ঠুকল সুনীল। কালু-লাল্টুরা হাসি চেপে কেটে পড়ল শীতলাতলা থেকে।

দুই

বেশ কিছুদিন ভালই খেয়ে-পরে ছিল সরদারপাড়া। এই অদ্ভুত কাজ কে করছে সেটা নিয়ে কেউ বিশেষ ঘাঁটেনি। ঘাঁটতে গিয়ে যদি চাল-ডাল-আলুর সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায়! পাড়ার অধিকাংশ লোকের গীতার মতো নতুন রেশনকার্ড নেই। যাদের আছে তারাও সরকারে নতুন ক’রে বেঁধে দেওয়া পরিমাণে চাল-আট পায় না, পুরনো হিসেবে পায়। এর মধ্যে পটা একদিন ঝামেলা বাঁধিয়েছিল রেশন-দোকানে। পটা বল, “চাল মাপে কম আছে।”

রেশন-দোকানের কর্মচারী নিতাই তেড়ে এল, “সবার সামনে মেপে দিলাম, তাও এত বড় কথা বলিস! ভাগ এখান থেকে! বেশি ঝামেলা করবি তো পুলিশ ডেকে একদম শ্রীঘরে পুরে দেব।”

বাকিরা চুপ ছিল। হাজতে ঢোকার রিস্ক নিয়ে এত ঝামেলা করার কোনও অর্থ হয় না। তারচেয়ে যে গোপনে চাল-ডাল দিয়ে যাচ্ছে, সে-ই দিক না! আপত্তির তো কিছু নেই।

কিন্তু বিপত্তি বাঁধল ক’দিন পরেই। রহস্যময় ত্রাণের সরবরাহ হঠাৎ একদিন বন্ধ হয়ে গেল। আবার পাড়াময় সর্বব্যাপক অনাহার।

আবার শীতলা মন্দিরের চাত্বালে বসল জটলা। আজ আরও অনেকে আছে। কালু, লাল্টু, পটা ছাড়াও রতন, মিহির, তারক। বৃদ্ধ সুনীলও। কালু বলল, “আমি যা সন্দেহ করেছিলাম, ঠিক তাই। দুটো দিন শুধু অপেক্ষা করো। এই লকডাউন উঠতে দাও। কেউ যদি হঠাৎ একদিন নেতা সেজে খেলার মাঠে ইলেকশনের মাঁচা না বেঁধেছে, আমার কান কেটে কুত্তা দিয়ে খাওয়াব।”

তারক বিজ্ঞের মতো মতামত দিল, “আমার মনে হয়, কেউ বিখ্যাত হওয়ার ধান্দা করেছিল। কিন্তু আমরা বিশেষ পাত্তা দিইনি বলে চেপে গেছে। চাল ডাল পয়সা কে দিচ্ছে, তা ধরার জন্যে আমরা কি কেউ ভোররাতে উঠে দাওয়ায় বসে থেকেছি? আমরা মানুষ চরিয়ে খাই। হুঁহ্! আমাদেরকে বোকা বানানো এত সোজা!”

লাল্টু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল, “যেটুকু হোক দিয়েছে তো…”

সুনীল বিড়িতে শেষ টান দিয়ে চোখ বুজে ছিল। হঠাৎ উচ্চগ্রামে বলে উঠল, “শীতলার মায়ের কোপ! অবিশ্বাসীদের সাজা।”

ইয়াং ছেলেগুলো মুখ টিপে গোঁফের নিচে হাসল। মিহির বলল, “আমার কাছে কিন্তু ব্যাপারটা গোলমেলে লাগছে। হিসেব মিলছে না। হঠাৎ একদিন চাল ডাল আলু পেঁয়াজ দেওয়া শুরু করল। সঙ্গে নগদ টাকা। তাও আবার গোপনে। তারপর একদিন হঠাৎ দেওয়া বন্ধ করে দিল! কেনই-বা দিল, কেনই-বা দেওয়া বন্ধ করল! অদ্ভুত!”

রতন এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার সে অতি বিরক্তির সঙ্গে বলে উঠল, “দু’দিনের জন্যে কে খাওয়াতে বলেছিল? মোটে না-খেয়ে না-হয় গলায় কলসি বেঁধে বউ-ছেলেপুলে নিয়ে সেনদের পুকুরে ডুবে মরতাম। চালাতে যখন পারবি না, তা’লে দু’দিনের জন্যে দাতা কর্ণ হওয়ার কী দরকার ছিল?”

কথাটা শুনেই পটা তড়াক করে দাঁড়িয়ে পড়ল, “চোপ! আর একটাও কথা বলবে না তোমরা! একদম চোপ!” পটা আচমকা ভয়ংকর রেগে গিয়েছে।

কালু বলল, “তোর আবার হঠাৎ মাথায় কারেন্ট লেগে গেল কেন? কী কেস?”

সবাইকে অবাক করে পটা ভেউভেউ করে কেঁদে উঠল, “তোমরা সবক’টা অকৃতজ্ঞ। যে মানুষটা সর্বস্ব দিয়ে তোমাদেরকে খাওয়া, তাকেই সবাইমিলে এমন গালাগাল দিচ্ছ! আর সে নিজের খাওয়া জোটাতে পারছে না এখন…”

তিন

গুপ্ত ত্রাণের রহস্য ফাঁস হয়ে গিয়েছে। পরদিন নামী নিউজ পেপারের জেলার পাতায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে খবর। ছবি সহ। “প্রতিবন্ধী যুবকের অভূতপূর্ব দান। ছেলেবেলায় মাতৃহারা, পোলিওতে দুটো পা অচল। ক্রাচ সম্বল করে মানুষের কাছে সাহায্য নিয়ে লেখাপড়া শিখেছেন। টিউশন পড়িয়ে সারাজীবনে যা সঞ্চয় করেছিলেন, লকডাউনে সবটাই এলাকার গরীব-দুঃখীদের অন্নসংস্থানে দান করে দিয়েছেন। এখন নিঃস্ব। নিজেরই অন্নের জোগাড় করা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদ মাধ্যমকে সুজিত সরদার বলেছেন, ‘মানুষের সাহায্যে বড় হয়েছি। মানুষ পাশে না-থাকলে হয়তো এতদিন বেঁচেই থাকতাম না। তাই বিপদের দিনে সেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু খবরটা এভাবে জানাজানি হয়ে যাবে আমি বুঝতে পারিনি। খুবই সংকোচ বোধ হচ্ছে।’ ‘আপনারই নাকি খাওয়া জুটছে না এখন?’ প্রশ্ন শুনে অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন সুজিত। জড়তা নিয়ে বলেন, ‘সে কোনওভাবে দিন চলে যাবে।’”

খবরটা ভাইরাসের মতোই অতিদ্রুত সংক্রামিত হল। এলাকার লোক কেউ বিশ্বাস করছে না ওই অনাথ ল্যাংড়া গরীব মাস্টারটা এমন কাজ করতে পারে। দিয়েছে, ভাল কথা। তাই বলে, সব! এক নয়া পয়সাও নিজের জন্যে রাখল না! পাড়ার এক কোনায় পড়ে থাকে। কেউ বিশেষ গুরুত্ব দেয় না। লেখাপড়া কিছু শিখলেও, চাকরিবাকরি পায়নি। পয়সাকড়িও বিশেষ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, এই ক’বছর আগেও পাড়ার লোকদের ফেলে দেওয়া ভাতের ফ্যান, আলুর খোসা খেয়ে ওর দিন কেটেছে। সুতরাং তাকে পাত্তা দেওয়ার কোনও মানে কেউ কখনও খুঁজে পায়নি। আজ সেই সুজিত সরদারের মেটে বাড়ির উঠোনে সকাল-সকাল ভিড় জমে গিয়েছে।

হঠাৎ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন পঞ্চায়েত প্রধান তথা রেশন ডিলার— লোকনাথ ঘোষ। হাতে ফুলের তোড়া। সঙ্গে একঝাক সাংবাদিক। “এই ক্যামেরা এ-দিকে… এই পজিশনে… ঠিক আছে… কী জানেন তো, খবর শুনে আমি আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। আমাদের এলাকার গর্ব, এই তরুণ মহামানবকে আমি তাই প্রণাম জানাতে এসেছি,” লোকনাথ ফুলের তোড়া সুজিতে হাতে তুলে দিয়ে বক্তৃতা জারি রাখলেন, “শুনেছি আপনি প্রচারবিমুখ মানুষ। আমিও তাই। চুপিচুপি এসে আপনাকে আমার শ্রদ্ধা জানিয়ে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু কী করে যে এঁরা, মানে এই সাংবাদিকরা খবর পেয়ে গিয়েছেন! আসলে আমার তো পাঁচজনকে নিয়ে কাজ। কে কোথায় খবর ফাঁস করে দেয়, জানতেও পারি না। সে যাই হোক, শুনেছি আপনার খুব অসুবিধে এখন। নিজেকে নিঃস্ব করে আর্ত মানবতার সেবায় সব দান করে দিয়েছেন। অথচ কী অদ্ভুত, দিয়েছেন অতি গোপনে। কেউ কিচ্ছুটি টের পায়নি। মানুষের জন্যে এত যিনি করলেন, তিনি কষ্টে থাকবেন, তা আমরা চোখের সামনে দেখতে পারি না। তাই আমার ক্ষুদ্র সামর্থে সামান্য দক্ষিণা নিয়ে এসেছি। দয়া করে গ্রহণ করবেন। এই নিতাই, ওগুলো স্যারের বারান্দায় তুলে দে।”

নিতাইয়ের নেতৃত্বে দু’জন মুটে ভিড়ের পেছন থেকে এসে চার বস্তা চাল-গম সুজিতে বারান্দায় ধুপধাপ ফেলল। লোকনাথ বিনয়ের সঙ্গে সুজিতকে বললেন, “দেশের এই দুর্বিপাকে মানুষের উদ্দেশ্যে আপনার যদি কিছু বলার থেকে, বিশেষ করে আমাদের পঞ্চায়েতের সেবামূলক উদ্যোগগুলো সম্পর্কে… হে হে… লোক-দেখাতে আমি পছন্দ করি না, কিন্তু সবসময় আমরা যে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করি— সে-সত্য তো সকলের জানা উচিত… হে হে…”

সুজিত খুব নিচু স্বরে লোকনাথকে বলল, “আমি জানি আপনি খুব মুখচোরা স্বভাবের উপকারী মানুষ। লোক-দেখানো কাজ আপনি মোটেই পছন্দ করেন না। কিন্তু আজ যখন সাংবাদিকরা এসেই পড়েছেন, আপনার একটা জিনিস তাঁদেরকে দেখিয়ে দেওয়ার খুব ইচ্ছে আমার। যদি অনুমতি করেন…”

লোকনাথ উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই। কী দেখাতে চান বলুন?”

“আপনার রেশন দোকানের বাটখারাগুলো। মানে ওগুলোর প্রত্যেকটার তালায় যে বড় খোরল মতো ছ্যাদা আছে, সেগুলো এঁরা ফোটো তুলে নিয়ে গেলে, কাল কাগজে ছাপতে পারতেন।”

হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন লোকনাথ। চাপা গলায় বললেন, “আপনি হয়ত জানেন না, এই সব অপপ্রচার বন্ধ করার জন্যে গত সপ্তাহ থেকে সব বাটখারা আমি তুলে দিয়েছি। এখন ডিজিটাল মেশিন বসানো হয়েছে আমার রেশন-দোকানে।”

“জানি। বলছিলাম, যে ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে আপনি ডিজিটাল মেশিনে ওজন ফাঁকি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, ওই ছোকরা আমার পূর্ব পরিচিত। একটা ফোন করলে এখুনি চলে আসবে।”

মুহূর্তে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন লোকনাথ, “এই নিতাই, স্যারের বারান্দায় আরও পাঁচ বস্তা মাল ফেলে দে তাড়াতাড়ি। আমি আসি, হ্যাঁ! একটা জরুরি মিটিং আছে, একদম ভুলে গেছিলাম।”

কালু, লাল্টু, রতন, মিহির, তারক— কারও মাথায় ব্যাপারটা ঠিক ধরছে না। কী হচ্ছে, সব কেমন যেন গুলিয়ে গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। তারা মাথা চুলকোতে-চুলকোতে আনমনা হয়ে এদিক-সেদিক চলে গেল। ধীরে ধীরে ভিড় পাতলা হতে-হতে একসময় জনশূন্য হয়ে গেল সুজিতের উঠোন। সুজিত ডাক দিল, “পটা…”

ঘরের ভিতর থেকে জবাব এল, “এই তো দাদা! রেডি।”

পরদিন পাশের বিধানসভার তাঁতি কলোনিতে সকাল সকাল চাপা গুঞ্জন, “এ-কাজ কে করল?…”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত