| 17 এপ্রিল 2024
Categories
ইরাবতীর বর্ষবরণ ১৪২৮

চলচ্চিত্র: বাংলা নববর্ষে বাংলা চলচ্চিত্র । নুসরাত জাহান 

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট
 
 
বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটি, অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ বাঙালি সাংস্কৃতিক জীবনে সবচেয়ে বড় উৎসব। একটা সময় পহেলা বৈশাখ ছিল শুধুই মেলাকেন্দ্রিক বিষয়। গ্রাম্যমেলা, বটমূল আর চারুকলার আয়োজনেই ছিল যার সীমাবদ্ধতা। তারপর ধীরে ধীরে তা নিজের রঙ ছড়িয়েছে সবখানে। এই বিশেষ দিনটিকে উপলক্ষে করে বৈচিত্র্য এসেছে পরিবারের টেবিল থেকে চলচ্চিত্রের পর্দা – সবখানেই। 
 
আগে এই ছুটির দিনটিতে দুপুরে পুরনো চলচ্চিত্রের  মাধ্যমে বিনোদনের ঘাটতি পূরণ করত দর্শক। স্যাটেলাইটযুগে এসে তারা পেলো পহেলা বৈশাখে নতুন ছবির প্রিমিয়ার। শেষ ধাপে এসে দর্শকরা দেখল বৈশাখ উপলক্ষেই ছবি মুক্তির ঘটনা। আগে কিন্তু বৈশাখে আলাদাভাবে ছবি মুক্তির কোনো চল ছিল না। এটা একেবারেই সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। পহেলা বৈশাখ ঘিরে বাঙালির উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে আস্তে করে জড়িয়ে গেল চলচ্চিত্রও। যেমন একসময় ভালোবাসা দিবসেও ছবি মুক্তির কোনো তোড়জোড় ছিল না। এখন ভালোবাসা দিবসের ছবি, পহেলা বৈশাখের ছবি – এ কথাগুলো শুনতে পাওয়া যায়।
 
২০০৯ সালের ভালোবাসা দিবসে মুক্তি পেয়েছিল গিয়াসউদ্দিন সেলিমের চলচ্চিত্র ‘মনপুরা’। ওই বছরের পহেলা বৈশাখের উৎসবকেও কাজে লাগায় ছবিটি। ‘মনপুরা’ ওই দিন দেশের ৫০টি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়। বৈশাখে দর্শকদের সিনেমা হলে যাওয়ার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয় ‘মনপুরা’। বিগত কয়েক বছর ধরেই পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ করে মুক্তি পাচ্ছে চলচ্চিত্র। কিন্তু তা একেবারেই হাতেগোনা। ঈদ উপলক্ষে যে পরিমাণ সাড়া থাকে তা পাওয়া যায় না বলেই হয়তো নির্মাতাদের অনীহা। তবে ভিন্ন ধারা বা গতানুগতিক গল্পের চলচ্চিত্রের বাইরে যারা কাজ করেন, তাঁরা এই বিশেষ দিনটিকে বেছে নিচ্ছেন তা লক্ষ্যণীয়।
 
২০১৮ সালে পহেলা বৈশাখে দেশজুড়ে তিনটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। একটি সিনেমার গল্প’, বিজলী এবং হৃদয়ছোঁয়া কথা। এখনো পর্যন্ত এটাই পহেলা বৈশাখে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সংখ্যা। কিন্তু পহেলা বৈশাখ ঘিরে ছবি মুক্তির উৎসাহে যেন ভাটা পড়ে ২০১৯-এ এসে। সে বছর মুক্তি পায়নি কোনো উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। অথচ তার কিছুদিন আগেও এমন অবস্থা ছিল না। হঠাৎ যেন উৎসবহীন ধূসর হয়ে পড়ে বাংলা চলচ্চিত্রাঙ্গণ। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেই সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে এফডিসির বিভিন্ন সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে রেষারেষি, দ্বন্দ্বে বিভক্ত। কিছু সংগঠন রয়েছে পিকনিক সর্বস্ব। বছরে একবার বনভোজন করেই শেষ। অনেকের অভিযোগ- সিনেমার উন্নয়নের জন্য সংগঠনগুলোর কোনো ভূমিকা ছিলো না সেভাবে। এসব সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতা সরকারের উচ্চর্পযায়ে সিনেমার উন্নয়নের জন্য গেলেও নিজের ব্যক্তিগত কাজের জন্য প্রথমে তদবির করে আসেন। এছাড়াও এগিয়ে আসছে না নতুন নতুন প্রযোজক। প্রযোজক না আসার অন্যরম কারণ সিনেমা থেকে প্রযোজকরা মুনাফা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। এর ফলে নতুন সিনেমা নির্মাণের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে। আর ২০২০-এ কোভিড আক্রমণের গল্প তো আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু চলচ্চিত্র নয়, বর্তমানে ধ্বস নেমে এসেছে সকল ক্ষেত্রে।
 
কিন্তু শুধু নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি দেয়াই কি বাংলা নববর্ষকে মহিমান্বিত করে? নববর্ষের উৎসবকে ঘিরে চলচ্চিত্র মুক্তি পেলেও এ উৎসবের সরব অনুপস্থিতি কিন্তু চলচ্চিত্রে দেখা যায় না তেমন। ঈদ বা পূজার উৎসব যেমন সহজেই চিত্রায়ণ হতে দেখা যায়, নববর্ষ সেভাবে উঠে আসে নি। হাতে গোনা অল্পকিছু চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে বাঙালির এই হাজার বছরের সংস্কৃতির উৎসবটি।
 
খালিদ মাহমুদ মিঠুর ছবি ‘গহীনে শব্দ’র শুরুতে দেখতে পাওয়া যায় মঙ্গল শোভাযাত্রায় নায়ক ইমন ও নায়িকা কুসুমের অংশগ্রহণ। তারও আগে চারুকলায় শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কুসুম। এরপর আর দেখা যায় উৎসবের কিছু।
 
চিত্রাভিনেত্রী মৌসুমী পরিচালিত প্রথম ছবি ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’তে বৈশাখ আসে গানের সূত্র ধরে। ‘এক বৈশাখে লেখা প্রেমের চিঠি নির্জনে পড়ে নিও’ গানটি ধরেন বৈশাখের মঞ্চে নায়ক রাজ্জাক। বশির আহমেদের গাওয়া গানটি বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের দৃশ্যে ঠোঁট মেলান রাজ্জাক।  যদিও ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ২০০৩ সালের ঈদে, বৈশাখের কিছুটা আমেজ ছিল ছবিটিতে।
 
এভাবে বৈশাখ এসেছে কিছু ছবির গানে। তবে সেই বৈশাখ বর্ষবরণের বৈশাখ নয়, তা ছিল শুধুই ঋতু বৈশাখ। শাকিলা জাফরের গাওয়া ‘বৈশাখেতে দেখা হলো জ্যৈষ্ঠ মাসে পরিচয়’ পাওয়া যায় মনোয়ার খোকনের ’গরীবের রানী’ ছবিতে। মতিন রহমানের ছবি ‘নারীর মন’-এ খালিদ হাসান মিলুর গাওয়া ‘জীবনে বসন্ত এসেছে ফুলে ফুলে ভরে গেছে মন’ যদিও বলছে বসন্তের কথা, তাতে ফুটেজ দেখা গেছে রমনা বটমূলের। ২০১৫ সালের বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রায় ‘আইসক্রিম’ ছবির শুটিং করেন রেদওয়ান রনি। পরে ওই ফুটেজ ছবিতে আর ব্যবহার করেননি।
 
তবে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বৈশাখ কতখানি গভীরে শিকড় গেড়েছে তার গভীরতা উপলব্ধি করা যায় গাজী রাকায়েতের ‘মৃত্তিকা মায়া’ দেখলে। রেকর্ডসংখ্যক ১৭টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া ছবিটির গল্প কুমার সম্প্রদায়ের সুখ-দুঃখ ঘিরে। গল্পে একটি বটগাছের ভূমিকা রয়েছে, যে গাছের নিচে প্রতিবছর বৈশাখী মেলা হয়। সেই বটগাছটি কেটে ফেলার চেষ্টা করা হয়। তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন ছবির অন্যতম চরিত্র রাইসুল ইসলাম আসাদ। তাঁর এই মেলাকে রক্ষার চেষ্টা, বটবৃক্ষটিকে বাঁচানোর চেষ্টা সংস্কৃতির শিকড় বাঁচিয়ে রাখার লড়াই বলেই ধরে নিতে হয়।
 
‘মৃত্তিকা মায়া’র মতো আরো অনেক চলচ্চিত্রেই  বৈশাখের আবহ, বৈশাখের চেতনা উঠে আসতে পারত, এমনকি চলচ্চিত্রের গল্পও হতে পারত। হয়তো আগামী দিনে হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত চলচ্চিত্র জগতের পার করে আসা পথে ফিরে তাকালে দেখা যায় পহেলা বৈশাখ নগরজীবনে, পল্লীজীবনে যেভাবে বিস্তার লাভ করে আছে, সেলুলয়েডের ফিতায় তাকে আমরা সেভাবে জড়াইনি।
 
 
 
 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত