ইরাবতীর কথা (পর্ব-১৫)

নারীর নিজের মুক্তির জন্য, নিজের স্বাধীনতার জন্য নিজের উপর নিজেকে আস্থা রাখতে হবে, লড়াইটা নিজেকেই করতে হবে। নারীবাদ বলি কী নারী স্বাধীনতা বা নারী মুক্তি- অর্জন না করলে পাওয়া যাবে না। নরওয়ে নারী-পুরুষের সমতার জন্য একটি পারফেক্ট দেশ বলা চলে। তারপরও এই দেশেও তেমন নারীর সাক্ষাৎ মেলে যে নিজে ডাক্তার হয়েও ডাক্তার স্বামীর ভয়ে তটস্ত থাকে।স্বামী শুধু স্যান্ডউইচ দিয়ে লাঞ্চ করতে চায় না বলে স্ত্রীকে সাথে স্যুপও বানাতে হয়। আর এই স্যুপ বানানোটা ভালোবেসে বানানো না রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে বানানো। এর জন্য নিজের অফিসিয়াল কাজ শেষ কোথাও বসে দু’দণ্ড জিরায় না, পাছে বাসার কাজে দেরী হয়ে যায়। অথচ নরওয়ের সমাজে স্বামী-স্ত্রী সপ্তাহের দিনগুলো ভাগাভাগি করে রান্নাসহ ঘরের যাবতীয় কাজ করার নিয়ম। দেখা যাচ্ছে, আইন থাকলেও সব নারী তা যথাযথ নিতে পারছে না। এমন শিক্ষিত নারীকে কে নারী-স্বাধীনতা এনে দেবে বা তার কাছে নারী স্বাধীনতা বা নারীমুক্তির সংজ্ঞা কী কে জানে! ’ইরাবতীর কথা’ ধারাবাহিকে ইরাবতীকে নারীর অনেক না বলতে পারা কথায় ও রূপে সাজিয়েছেন বিতস্তা ঘোষাল আজ থাকছে ইরাবতীর কথা ধারাবাহিকটির ১৫ পর্ব।


 

ঘরে ফিরে ইরাবতী জামা কাপড় পরিবর্তন না করেই বিছানায় শুয়ে পড়ল। সারাদিন তার আজ খুব ধকল গেছে। শরীরের থেকেও মাথার উপর বেশ চাপ পড়েছে। আজকাল একটানা কাজ করতে গেলেই তার মাথা ঘোরে। তার উপর একভাবে কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের দৃষ্টিটাও ঝাপসা হয়ে আসে। মাঝেমাঝে মনের মধ্যে একটা অজানা আতংক দোলা দিয়ে যায়। তবে কী শেষের সে দিন আর বেশি দূরে নয়! পরমুহুর্তে সামলে নেয় নিজেকে। কী সব ভুলভাল চিন্তা করছে।এখনো অনেক কাজ করার আছে। একটা কাজও যদি নাও বা থাকে প্রান্তির জন্যই তাকে বেঁচে থাকতে হবে। মেয়েটা বড় ছোটো। আর একটু বড় করতে হবে। তারপরেই হাসি পায় তার। প্রান্তির বয়সে সে বিয়ে করে নিয়েছে। পুরো একা হাতে সব সামলেছে।

কিন্তু তা বলে প্রান্তির বিয়ে দেওয়া যাবে না এখনি। আগে নিজে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী করে তবেই বিয়ের চিন্তা।দিন কাল ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। এখন আর কারোর ভরসায় মেয়েকে দিয়ে দেওয়া যায় না।  চোখ বন্ধ করে নিজের মনেই বিড়বিড় করছিল সে।

মা, শরীর খারাপ লাগছে? আলোটা নিভিয়ে দেব? প্রান্তি এসে মাথার কাছে কখন বসেছে টের পায়নি ইরাবতী।

সে মেয়ের হাতদুটো বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলল, একটু ক্লান্ত লাগছিল। এখন ঠিক আছি।

কিছু ঠিক নেই মা। তুমি এভাবে নইলে ড্রেস চেঞ্জ না করে, স্নান না করে শুয়ে পড়তে না মা।

ইরাবতী মেয়ের হাত দুটো আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে বলল, অযথা চিন্তা করিস না। পড়া শেষ হল? বিকেল থেকে খেয়েছিস কিছু?

হুম। তুমি চা খাবে?

করবি? তাহলে দে। বলে উঠে বসল।

আর একটু শোও মা। চা করে আনি, তখন উঠো।

নারে। উঠে পড়ি। রাত তো হল। খাবার কী আছে দেখি।

মা, একটা কথা বলব? তুমি রাগ করবে নাতো!

কী বল

আজ বাবা আমাকে ছোটো বেলার মত মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছিল।হাত- পা টিপে দিল। আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। বাবা এত বদলে গেল কী করে?

কিছুই বদলায়নি সোনা। সব এক আছে। শুধু সময়ের বয়স বেড়েছে। তাতে সম্পর্ক কিছুটা টালমাটাল হলেও একেবারে ছেড়ে যায় না। বাবা তোমাকে ভালবাসবে না এটা হতে পারে!

তুমি কী করে এত মনের জোর পাও মা? আমাকে শিখিয়ে দেবে?

ইরাবতী মেয়ের মাথাটা ধরে নিচু করে কপালে চুমু খেল। তুমি এমনিই স্ট্রং ওম্যান। একটু ধ্যান করো, তাহলে বাকিটাও হয়ে যাবে। তারপর বলল, চা’ টা কী পাব?

দিচ্ছি মা। বলে প্রান্তি উঠে গেল।

ইরাবতী বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। মোবাইলটায় চার্জ ছিল না। সেটা চার্জে বসিয়ে স্নান সেরে এল।

প্রান্তি চা দিয়ে গেছে। পর্দা সরিয়ে উঁকি মেরে ইরাবতী দেখল, সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাচ করছে। মেয়েটার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। তারপর নিজের মনেই বলল, থুঃ, নজর না লাগে!

বেশ কিছদিন হল ইরাবতী ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তার সংগঠন নিয়ে। তারা যে অঞ্চলটার বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করে বিশ্বস্ত সূত্রে  এক খবরী জানিয়েছে রাতের অন্ধকারে গত কয়েক মাস ধরে নির্দিষ্ট সময়ের গ্যাপে একের পর এক বাচ্ছা হারিয়ে যাচ্ছে। এদের প্রত্যেকের বয়সই এক মাস থেকে খুব বেশি হলে দুই বছর, যারা এখনো কথা বলতে ভালো করে শেখেনি।

ইরাবতী শোনার পর থেকে ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠল। সে ক’দিন ধরে লাগাতার ফুটপাথের ওই অঞ্চলটায় পাহারা দেবে বলে ঠিক করল।

কিন্তু এই জায়গাটার লোকজন তাকে ভালোভাবেই চেনে দীর্ঘদিন এদের সঙ্গে কাজ করার জন্য। যেকোনো মুহূর্তে সে যে রাতে এখানেই থাকছে সেটা জানাজানি হয়ে যাবে। সে ছদ্মবেশ নিল, ঝুপড়ির বাসিন্দাদের মতো ছেঁড়া শাড়ি আর আর সারা শরীর কালো রঙে ঠেকে নিয়ে সে ঠিক করল রাতে তাদের পাশেই শোবে।

এসব ক্ষেত্রে একজন পুরুষকে দরকার তার সঙ্গী হিসেবে। নইলে তাকে নিয়েও টানাটানি শুরু হয়ে যাবে। অভিজ্ঞতায় দেখেছে এখানকার বাচ্চাদের মা নির্দিষ্ট হলেও সেই মহিলা নিজেও জানেনা তার বাচ্চার বাবা কে! আর তাই নিয়ে এদের কোনো মাথাব্যথাও নেই।

একদম শুরুতে কাজ করতে গিয়ে ইরাবতী লক্ষ করেছিল সক্রিয় যৌন কর্মী না হলেও এরা নিয়মিত ধর্ষিত হয় নানা স্তরের পুরুষদের থেকে। এমনকি এখানে সমকামীর সংখ্যাও অসংখ্য। এ যেন তার প্রতিদিনের দেখা সমাজের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক জগত। যেখানে কারোর কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই। কেউ কারোর আত্মীয় নয়। শুধু একটা চট পাতার জায়গা বরাদ্দ, তাও কেবল রাতের জন্য। সেই সময়টুকুতেই তাদের যাবতীয় তৃষ্ণা মেটায় এখানে আশ্রয় নেওয়া মেয়েদের শরীরের মধ্যে দিয়ে। পরদিন সকালে সেই পুরুষ বা মেয়েটি কেউই জানে না কে ছিল রাতে তার শরীরে।

ইরাবতীর প্রথমদিকে কান্না পেত এদের অবস্থা দেখে। ক্রমশ ধাতস্ত হয়েছে। তাদের বাচ্চাগুলোকে নিয়ে অল্প অল্প করে কাজ শুরু করেছে সে। বাচ্চাগুলোও তাকে ভালোবাসে।

অথচ এই বাচ্চারাই হারিয়ে যাচ্ছে তার প্রতিদিনের দেখভালের পরেও, এটা সে মেনে নিতে পারছে না কিছুতেই।

সমস্যা হচ্ছে এদের কোনো স্থায়ী জায়গা না থাকায়, কচুরিপানার মতো ভেসে বেরানো এইসব বাচ্চাদের মধ্যে কারা অন্য জায়গায় চলে গেছে এটা বোঝা বেশ জটিল। যখনি সে জানতে চেয়েছে ওই বাচ্চাটা কোথায় গেল, তখনি কেউ না কেউ বলেছে, ওর মা ওকে নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু কোথায় গেল তার এর কোনো উত্তর কেউই দিতে পারেনি।

অনেক ভেবে ইরাবতী নীলের সাহায্য নেবে ঠিক করেছিল। সব শুনে নীল প্রথমেই তাকে বারণ করে দিল এমন বোকামির কাজ না করতে। সে খুব ঠান্ডা মাথায় বোঝালো, এগুলোর জন্য তুমি নও। এটার দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে পুলিসের। তাদের কাজ করতে দাও।

পুলিস আদৌ কিছু করে না নীল। আমি নিজে দেখেছি অধিকাংশ মহিলা, বাচ্চারা রাতে পুলিসের দ্বারাই বেশি আক্রান্ত

নীল ততধিক নির্লিপ্ত অথচ কঠিন স্বরে বলেছিল, ইরাবতী আমি তোমাকে বারন করছি, রাতের বেলা এমন আজগুবি কাজ না করতে। মনে করো এটা আমার নির্দেশ। তুমি এখন ওই অঞ্চলে যাবে না। তারপরেই  বলেছে, আমি দেখছি কী করা যায়! ভরসা রেখো। কিন্তু তুমি নিজে কোনো বাহাদুরি দেখাবে না।

ইরাবতী মাথা নেড়ে নীলের ওখান থেকে বেরিয়ে এলেও সে ঠিক বুঝতে পারলো না নীলের এই নির্লিপ্ততার পিছনের কারন। তবে কী এর শিকড় অনেক দূর অবধি প্রবাহিত! যেমন সে সিনেমায় দেখে, গল্পে পড়ে। উঁচু থেকে নিচু স্তরের সবাই জড়িত এর সঙ্গে! তা কী করে সম্ভব! সে নিজের মনেই বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করল। এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলো সে রাতে ওইভাবেই সেখানে থাকবে ওখানকারই কাউকে সঙ্গে নিয়ে।

স্থানীয় ওষুধের দোকানের অসীম নামের ছেলেটি তাকে খুব ভালোবাসে। দিদি বলে ডাকে। ইরাবতী তাকেই অফিসে ডেকে পাঠালো। এই কাজে অমলকে জড়ানো যাবে না। অমলের মাথা খুব অল্পতেই গরম হয়ে যায়। তাছাড়া এমন প্রস্তাব তার কল্পনারও অতীত। খানিকটা শুনেই সে বলে দিল, ম্যাডাম, দিনের বেলা আপনি ওখানে যা যা কাজ করতে বলেন সেগুলো করি, আপনার মুখ চেয়ে। কিন্তু এই কাজ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। ওই নোংরা লোক জনের সঙ্গে রাতে থাকা, তাও ফুটপাতে, কুকুর বেড়ালের পাশে শুয়ে থাকা- আমার পক্ষে অসম্ভব। বেশ ধমকের সুরে সে বলল, দিন দিন আপনার মাথাটা একবারেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাদের জন্য ত্রিপল, বেবি ফুড, ভ্যাকসিন, ওষুধ, ডিম, কলা সেদ্ধ, সোয়েটার, কম্বল, জামা, এগুলো তাও ঠিক আছে। কিন্তু তারা কোথায় নিখোঁজ হচ্ছে, তাদের উদ্ধারের বা দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। ওটা পুলিসের আর প্রশাসনের কাজ।

ইরাবতী অমলকে এই নিয়ে আর কোনো কথা বলল না। সে কী করে বুঝবে মায়েদের মন কতটা ছটপট করে এসব শুনলে।

অনেক ভেবেই অসীমকে ডেকে সব বলার পর সে এক কথায় রাজী হয়ে গেল ইরাবতীর প্রস্তাবে।

 বলল, দিদি আমি ন্যাড়া হয়ে যাই তাহলে। ন্যাড়া হলে আমার মুখটা চেঞ্জ হয়ে যায়। আর গোঁফটাও কেটে নেব।

প্রান্তি আর ঐহিককে ইরাবতী কিছু জানালো না এই বিষয়ে। শুধু জানালো এই ক’দিন সে একটা জরুরী কাজে রাতেও বাইরে থাকবে।

ঐহিক ‘কোথায় থাকবে’ এই প্রশ্ন করলেও ইরাবতীর থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল।

প্রান্তি শুধু বলল, মা দাদানকে জানিয়েছ? আর যেখানেই থাকো সাবধানে। তারপর জড়িয়ে ধরে বলল, মেক আপ টা ঠিক করে নিও। আমি জানি তুমি কোথায় থাকবে।

ইরাবতী মেয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকালো।

মা, আমি কাল তোমার ল্যাপটপে দেখেছি তুমি মেক আপের কিছু টিপস নিয়েছ, আর ওয়ার্ড ফাইলে একটা প্ল্যানের নকশা করে রেখেছ।

তুমি আমার ল্যাপটপে হাত দিয়েছিলে কেন?

কাল আমারটা ঠিক ভাবে কাজ করছিল না, তাই বাধ্য হয়ে। তবে আমি আর কিছু দেখিনি মা। ওটা খোলা ছিল বলে নজরে এসে গেল।

ইরাবতী নিজের এই অন্যমনস্কতায় বিরক্ত হল। প্রান্তিকে আর কিছু বলল না। 

পরপর সাত দিন রাতে কোনো নজর করার মতো ঘটনা ঘটল না। ইরাবতী বুঝতে পারছিল না খবরটা আদৌ ঠিক ছিল কিনা!

তারা ঠিক করল আর একদিন দেখে আবার কিছুদিন বিরতি দেবে।

রাতের বেলা এই সহর কেমন নিঝুম হয়ে যায়। গাড়ি, ট্রাক, লড়িগুলো হুশ করে চলে যায় দুর্দার বেগে। কুকুরগুলো কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে তাদেরই পাশে পরম নিশ্চিন্তে। যেন সেও এদেরই মতো ভবঘুরে। রাতে ঠেক খুঁজে নিয়ে শুয়ে পড়েছে। অথচ আকাশটা কেমন তারার মালা পরে সেজে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ইরাবতীর হঠাৎই মনে পড়ে গেল ছিনিয়ে খাইনি কেন বলে একটা অসাধারণ গল্পের কথা। সেই গল্পের চরিত্রগুলো যেন সহসা সাদা পাতা থেকে উঠে এসে তার সামনে এসে মুখের উপর ঝুঁকে পড়ল। ইরাবতী একটা অজানা আশংকায় গায়ের ছেঁড়া চাদরটা মুখের উপর টেনে নিল। আর তখনি শুনতে পেল, একটা গাড়ি এসে দাঁড়ানোর আওয়াজ। ইরাবতী অল্প একটু ফাঁক করে বোঝার চেষ্টা করল কী ঘটতে চলেছে।তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলল, এখনি কিছু ঘটবে। সে তড়াক করে উঠতে যেতেই মাথার উপর ভারি কিছু পরতে চলেছে টের পেল। সে শুনতে পেল কেউ বলছে, খুব নজর দারী করছিল মাগী। যা, এখন উপরে গিয়ে দেখ। পরমুহূর্তেই কিছু চিৎকার আর ধাক্কা মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিল কেউ। মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে পড়ে গেল সে। তার চোখের সামনে এখন ঘন অন্ধকার।

বিতস্তা ঘোষালের এই ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলো ও অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত