মৈত্রী এক্সপ্রেস

আজ ০৬ নভেম্বর কবি, কথাসাহিত্যিক ইশরাত তানিয়ার শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comকিছু ট্রেন আছে। জীবনে কখনও ধোঁয়া উড়িয়ে এমন ট্রেন এলে, চোখ মুছতে হয়। গন্তব্য মোহাম্মদপুর থেকে কৃষ্ণপুর ভায়া নিঝুমপুর। নিঝুমপুরের গল্পবলা গাঁওবুড়ো উঠে পড়েছিল সে ট্রেনে। মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলে তুমি। হাতে লাল-নীল বেলুন। দুপাশে মাসকলাইয়ের ক্ষেতে সামান্য হাওয়া এলেই শিহরণ। সেদিন আর মটরশুঁটি গাছের তলে শুয়ে চিকন পাতার ফাঁকে আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে না। শুধু বিকেলের দিগন্তে অপসৃয়মাণ ট্রেন জানিয়ে দিয়েছিল কত সহজ চলে যাওয়া।

অনাড়ম্বর অথচ গম্ভীর। একটু কেশে ধীরে ধীরে ট্রেন একপা দুপা ফেলে এগিয়ে যায়। এই ক্রমশ অস্তিত্ব মুছে যাওয়া, ছোট্ট দুটি হাতে কি করে থামাবে তুমি? কি বিশাল লোহার শরীর! তুমি তো আটকাতে পারোনি ওই সূর্য ডুবে যাওয়াও। তাই এত অ-সুখের হিম ঝরে সন্ধ্যের ঘাটে। আর অসুখ এলেই তোমার মনে পড়ে এক ওষুধের নাম।

হুইটম্যান পড়ছিল হিমিকা, বলল- “অল দিজ সেপারেশান্স এন্ড গ্যাপস শ্যাল বি টেকেন আপ এন্ড হুকড এন্ড লিঙ্কড টুগেদার।”

“সুরভী আছে গাড়িতে। কল কেটে দিচ্ছি। প্লিজ।” টেক্সট পাঠিয়ে ফোনটা চিবুকে চেপে সুরভীর দিকে তাকিয়ে হাসলে তুমি।

সুরভী কানের দুলের পুশ ঠিক করছে। কেমন এঁটে বসেছে সোনার ঝুমকো। কোনো রিপ্লাই আসে না। গাড়ীর কাঁচ নামানো। বেলীকুঁড়ির মালা হাতে এক ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে। গন্ধটুকু স্নায়ুতে পৌঁছতেই হিমিকার কাছে তুমি। মেয়েটা বাঁ হাতে বেলীকুঁড়ির মালা জড়িয়ে রাখতে ভালোবাসে। কিছুক্ষণ পর পর নাক ডোবাবে ফুলে আর সুগন্ধ ভরে নেবে ফুসফুস। ওর হাতেই একটু একটু শাদা পাপড়ি মেলে বেলী। হিমিকা মুগ্ধ তাকিয়ে থাকে। কুড়ি টাকার ফুল কিনলে তুমি। হয়তো সুরভীর জন্য। দেখেই সুরভী বিরক্ত- “নাটক করতে হবে না, যত সব।”

“হিমি, হিমিইইই…” কে যেন ডাকে। এই যে ফাগুনস্পর্শ, মুকুলের গন্ধ নিয়ে হঠাৎ হাওয়া হিমিকার চোখমুখ ছুঁয়ে দিল, এক পুকুর জলে গলা অব্দি দাঁড়িয়ে সে টের পায়, কিছু বদলে গেছে। এই অন্যরকমটা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। জলের তলে যথাসম্ভব স্থির থাকার চেষ্টা। ঢেউগুলোর মৃদু দোলা, অনুভবে হাড় মাংসের গভীরে এই যে ছন্দময় ছলাৎ, এসব যদি স্থিরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, কী তার উত্তর দেয়া যায়? অন্যরকমই তো। নইলে এত ছাতিমগন্ধ, এত মুকুল মাদকতা কেনো, যখন হিমি আঁকড়ে ধরে তোমাকে নাকি নাকি তুমিই হিমিকে? কে যে আসলে কাকে, এই বোমাবারুদের জগতে ধুলোধোঁয়ায় দুজন ঘোরগ্রস্ত অস্পষ্ট হয়ে মিশে যায়, বোঝা যায় না।

ভাসা ভাসা চোখের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বর দেখে হিমিকা। অথচ তোমার দুটো চোখ স্থির হয় না ওর চোখে। তীব্র চাহনীতে তোমার দিকে তাকিয়ে সে বলেছিল- “এ কথাগুলোই চোখের দিকে তাকিয়ে বলো না!” চোখে চোখ পড়তেই কথা বন্ধ হয়ে যায়। নইলে এদিক ওদিক উড়ে যায় উঠোন ছাপিয়ে পায়রাদের সাথে দালানের কার্নিশে। চাপ চাপ অন্ধকার মাটির আড়াল থেকে, হিমিকার মনে হয়, এই মাত্র যে কচি পুঁই ডগা আকাশের দিকে চাইল, ওমনি ঈশ্বর নরম আলোয় চোখ ছুঁয়ে দিল। জল মুছে হিমিকা বোঝে, কেউ থাকে আড়ালেই।

রাতভর নীল বেলুন বুকে চেপে কেঁদেছিলে। যত না ট্রেনের জন্য তার চেয়ে বেশি গল্পের জন্য। মনে মনে কত যে ডেকেছ তুমি। ট্রেন ফিরেও তাকায়নি। গল্পবলা বুড়োও। গাঁওবুড়োর বুক ভরা অফুরান গল্প কথা। এর কোনো শেষ নেই। কত কি যে গল্প! ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতে থাকে। স্কুলের পরীক্ষা শেষ। বারান্দায় পাটি পেতে বসে গল্প শোনে ছোটরা। বড় ছেলেরা তখন তাস খেলে লুকিয়ে আর বুড়োর বুকের ঝাঁপি থেকে একের পর এক গল্প বেরোয়। ধীরে ধীরে গল্প জমাট বাঁধে আর বুঁদ হয়ে শুনতে থাকে ছেলেমেয়ের দল। আলো অন্ধকারে শেহেরজাদের রূপ খুলে যায়, বন্দী কঙ্কাবতীর জন্য মন খারাপ হয়। সেবার বলছিল বুড়ো- “রাত্রি আর দিন যখন মিশে যায়, পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে সুবিশাল এক টুকরো উল্কাপিণ্ড। এবার পৃথিবী ধ্বংস হবে।” রাতে হিম বাড়ে। আর ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে তোমার। মা কই? ঐ তো ডালে ফোঁড়ন দিচ্ছে নয়তো সারা দিনের রোদতপ্ত লেপ বিছিয়ে দিচ্ছে খাটে। পৃথিবীকে বাঁচাবে ডালিম কুমার। নইলে সোহরাব- রুস্তম। গল্পের শেষটুকু তোমার শোনা হলো না। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলে। মা এসে কোলে তুলে নিয়ে গেছে।

“দুধ আর ডিম আনতে বললাম,” সুরভীর গলায় ঝাঁঝ। তুমি আনমনা- “ডিম এনেছি তো।”

এতদিন পর হুইসেল কানের কাছে গুনগুন করে। দূরে দাঁড়িয়ে শব্দ তরঙ্গ টের পাও। বুঝি বা জাতিস্মর তুমি। এ কোথায় এসে পড়লে? কিছু মনে পড়ে কি পড়ে না। সাময়িক বিভ্রান্তি নয়, কোনো স্বপ্ন দেখছ না। সত্যি সত্যি এপারের ইঞ্জিন টেনে আনে ওপারের অপেক্ষারত বগি। মায়ের হাত ছেড়ে ছুটতে ছুটতে প্ল্যাটফর্মে তুমি। সমস্ত কামরা ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়াও গাঁওবুড়োকে। সেই না ফুরনো গল্পকে। স্বপ্নমায়ার হিমিকে। কামরা জুড়ে নটে গাছের পাতা হাওয়ায় কাঁপছে মৃদু। কারো খোলাচুলের মেহেদী খুশবু, কাঠ পোড়া গন্ধ। জল থেকে উঠে আসছ তুমি, ডুবে যাচ্ছো। এত রণ, রক্ত, বিফলতার পরও গল্প খুঁজতে থাকো ট্রেন জুড়ে। ঠিকঠাক মতো কিছুই পাওয়া যায় না আর পেলেও যেন স্বস্তি নেই। আজকাল ফোন বাজলেই মনে হয়- হিমি। বিকেলের আলো পড়ে আসে। আলো কেন পড়ে যায়? শুধু চাঁদ আসবে বলে?

এই বয়সেও হিমিকার বালিকাভাব প্রবল। তার শুকনো ডাঙায় যমুনার ঢল বইছে। কবেকার নৌকো দুলছে নীল জলে। তবুও বই খুলে সে শিখে নিচ্ছে- “নেচার এন্ড ম্যান শ্যাল বি ডিসজয়েন্ড এন্ড ডিফিউজড নো মোর।” তুমি ওকে বলে দিও- সমস্ত জগৎ, এই অনুভূতিশূন্য, হিমশীতল, নির্বাক পৃথিবী- একদিন সমর্থন পাবে। যেদিন মানুষ বিভেদহীন হবে, মানুষে প্রকৃতিতে সব অপূর্ব মিলেমিশে যাবে, জগৎ সার্থক হবে! ডায়ারিতে হিমিকা লিখে রাখছে তোমার বলা কী সব কথা। পাতা উল্টালেই সেখানে দুটো চিঠি, শুকনো বেলী আর লেবু পাতার সুবাস। তুমি চিঠি লেখ এক সবুজ পাতায়। সে পাতা বিশাল ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া দেয়। সে পথ ধরে কিছুদূর গেলেই অরণ্যে অরণ্যে তোমার যে প্রিয়তা লেখা রইল, হিমিকা পাতা কুড়িয়ে সে চিঠি পড়ে রাতের হু হু হাওয়ায়। সকালে ই-মেইল রোদে ভাসিয়ে চিঠি আসে, হোয়াটস এ্যাপের চিলেকোঠায় চিরকুট ওড়ে নরম বিকেলে। তুমি আসলে কিছুই চাইতে পারনি। একটু অবসর খুঁজে তোমার ইচ্ছে করত হিমির সুগন্ধি বিভাজিকায় মুখ গুঁজে কাঁদতে। কাঁদতে পারনি।

নিঝুমপুর স্টেশানে সন্ধ্যা নামে। যাত্রীদের ভিড় নেই। কয়লা ইঞ্জিনের ধোঁয়া উড়িয়ে কু ঝিক ঝিক সদ্য প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে গিয়েছে। বিষণ্ণতা দাঁড়িয়ে থাকে সে দিকে তাকিয়ে। ঠিক তক্ষুনি ছুটে আসছে সুবিশাল এক টুকরো গ্রহাণু তোমার দিকে। উজ্জ্বল আলো ঠিকরে পড়ে যার মুখ থেকে। উল্কাপিণ্ড নয়, হুশ্‌ করে সেই গল্পটি এসে পড়েছে। গত চল্লিশ বছরে এতটা কাছে কেউ আসেনি, আগামীতে হয়তো আর আসবেও না।

 

 

 

 

 

 

One thought on “মৈত্রী এক্সপ্রেস

  1. এতো বিস্মিত শেষ কবে হয়েছি মনে পড়ে না। জন্মদিনে হঠাৎ পাওয়া এই উপহার দিনের আলো বাড়িয়ে দিল। আপ্লুত আমি৷ ইরাবতী পরিবারকে আন্তরিক ভালোবাসা জানাই।

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত