ছৌ নাচের ইতিকথা

 
 
 
 
 
মৃন্ময় চন্দ
 
 

পায়ে পায়ে ছৌ পেরিয়েছে মেলা পথ। হারিয়েছে তার আগের জৌলুস। ঐতিহ্যবাহী এই নাচের ইতিহাস ঘেঁটে উঠে এল ছোট ছোট গল্পকথা।


 
সিঁদুরের বিন্দু বিন্দু মূষিক বাহন/ নমঃ নারায়ণ/ গণেশদেব হর গৌরীর নন্দন…।
তাক ধিন দা ধিন—বেজে উঠল ঢোল-ধামসা। সূত্রধর সানাইয়ে একতালে ঝুমুরে শুরু করেছে গণেশ বন্দনা। হেলতে দুলতে শুঁড় নাড়াতে নাড়াতে, নাচের তালে পা ফেলে আসরে আগমন গণেশ বাবাজির। জল ছিটিয়ে খানিক আগেই গ্রামের মাঝের বিশাল ঝাঁকরা মাথা জইড় গাছটার নীচের মাটির ধুলো মারা হয়েছে। এবার শুরু ‘ছৌ’। এই নাচে ঢোল-ধামসা-সানাই-শিঙে-চড়াচড়ি-মাহুরী-করতালের রংমিলান্তিতে অনুপস্থিত কেবল মাদল। দর্শকের আসনে প্রায় উলঙ্গ একরাশ শিশু-বালক-কিশোর। আর অর্ধাসনে ক্লিষ্ট, মলিন কাপড় পরা কিছু আদিবাসী মহিলা-পুরুষ। অপুষ্টি অনাহারের ছাপ সর্বাঙ্গে। কিন্তু চোখেমুখে ঝিলিক দিচ্ছে অনাবিল সারল্যের সাতরঙা রামধনু। ঝকঝকে দাঁতের ফাঁকে ‘ছৌ’ নাচ চেটেপুটে খাওয়ার বাসনা!
 
ছোটনাগপুর মালভূমির অন্ত্যজ শবর-সাঁওতালদের একমাত্র বিনোদনই যে ছৌ। গ্রামের ধোপা-নাপিত-তাঁতি—পাথরকোদা শ্রাবস্তীর কারুকাজ শোভিত শরীরে নাচিয়ে কিন্তু সকলেই। মুসলিমরা সেজেগুজে ঢোল ধামসার তালে তালে মুখোশ পরে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে মারীচ বধে উদ্যত। দর্শকদের চেঁচামেচিতে কে বলবে মাঝরাত! একতাল, ঝাঁপতাল—মারীচ বধ শেষ। রাত সবে বারোটা, এর মধ্যেই কি সাঙ্গ পালা? জনতা উসখুস। ঢোলের বোল বদলাচ্ছে, আছে ধামসার সঙ্গত। সানাইয়ের সুরে ঝুমুরের পালাবদল। দর্শকরাই হঠাৎ সরে সরে বসে আসরটাকে আরও প্রশস্ত করে দিল। নেই চাঁদের আলো। তাই দু’তিনজন ধরে আছেন ‘হুলা’(শাল-কাঠের মশাল)। আলোয় আলোকময় চারিদিক। ভেরেন্ডার ডাল বা জাড়ার বীজ জ্বালিয়েও আলোর বিকল্প বন্দোবস্ত মজুত।
 
 
 
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই ছৌ মজলিসে দলে দলে গ্রামের যুবক বৃদ্ধরা কাঁধে ঢোল ধামসা নিয়ে হাজির। বাদ যাননি বাড়ির মেয়েরাও। দলমা পাহাড়ের নীচে গোরখুসার লচাই ডুংরির উপত্যকার গাঁওতা ফতে শবরের বাড়ির পাশের মাঠে বসেছে ছৌয়ের আসর। খেড়িয়া মেয়ে-পুরুষে শুরু করলেন নাচ। প্রতি সারিতে ছ’জন নাচিয়ে, দু’সারিতে সমাগত। ‘ছ’ জন নাচিয়ে, তাই নাচটির নাম নাকি ‘ছ’। ইংরেজিতে শহুরে কেতায় ‘ছ’ হল ছৌ। ছয়-এর গুণিতকে নাচের সদস্য-সংখ্যা বাড়তে পারে। দশ মাত্রার মেলতালে তারস্বরে বাজছে ঢোল। অতিথি অভ্যাগত মনের সুখে টান মারছেন চুটিতে, দর্শক ডুবে হাঁড়িয়ায়। মহুয়ার বীজ থেকে তৈরি ‘মহুলে’ (জোরালো মদ) মজেছেন নর্তক-নর্তকীরা। রাত পেরিয়ে আলো ফুটলেও নেশার ঘোরে তাঁরা নাচেন অবিরাম। মাথার উপর হয়তো সুয্যিদেব গা গতর পুড়িয়ে দিয়েছেন ততক্ষণে। থোড়াই কেয়ার!
সুবর্ণরেখার তীরে বুরহাতু গ্রাম, বা টটকর তীরে জিতান বা চান্ডিল থানার নিমাচি গ্রাম—ছবিটা সর্বত্রই এক। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর শুরু আসর। নাচিয়েরা বড় কোনও গাছের আড়ালে মুখোশ পরিধানে ব্যস্ত, চলছে মেক আপ পর্ব। একতাল-ঝাঁপতাল-মেলতাল বা চৌতালেই বাঁধা ছৌয়ের তার। মেলতাল ছাড়া অন্য সব তালে দরকার মুখোশ। ঢোল দশ মাত্রার মেলতালে বাজছে, নাচিয়েরা মুখোশহীন। নেই তাদের অঙ্গাভরণ। কোমর থেকে হাঁটু অবধি মালকোঁচা মারা ধুতি। মেয়েদের পরনে গাছকোমর শাড়ি। পায়ে ওজনদার ঘুঙুর। গোড়ালি থেকে ভ্রূভঙ্গি, মাটিতে সশব্দে পদাঘাত থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ‘ঝাড়ন-কম্পন-সঞ্চারণ-সঞ্চালন’ বা মাথা ঘোরানো, অপাঙ্গে দৃষ্টিপাত—ছ’জনের হতে হবে হুবহু এক। কোথাও এক তিল ছন্দপতন হলেই পাকা দর্শক ধরে ফেলবেন। ঘুঙুরের শব্দের এদিক ওদিক বেচাল হলেও নেই রেহাই।
ষোলো মাত্রায় নাচ প্রায় শেষ অঙ্কে। ধ্রুবতারা পাটে বসেছে। পাখিরা আড়মোড়া ভাঙছে। পুবের আকাশ রাঙা। বিশাল ঢোল-ধামসা বাজিয়ে ক্লান্ত বাজনদাররা। নাচিয়েরা নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পরে হবু নাচিয়েরা সাইডলাইনের ধারে বসে পা নাচিয়ে মক-শো করার চেষ্টা করছে। কবে তাদের সময় আসবে? নাচের তালিম তাদের অনেকদিনই চলছে। কিন্তু শরাবন জ্যাঠার হুঁশিয়ারি, পা নাকি এখনও ব্যাটাদের যথেষ্ট সড়গড় নয়। সময় লাগবে, চলবে কঠোর অনুশীলন। হবু নাচিয়েরা তাই খানিক মনমরা। ঝরে পড়া ঘাম মুছছেন মেলতালের পেশাদার নর্তকরা। আখড়ায় চলছে নতুন পালার আগমনি প্রস্তুতি। হঠাৎ হাজির শরাবন জ্যাঠা। সন্ত্রস্ত সকলে। ভুল কিছু হয়েছে নিশ্চয়। প্রমাদ গোনার শুরু। শরাবন তাঁর দাদার নাতি মনসাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুরু করলেন, ‘শালা নাইচতে জানিস নাই ত মেলতালে নাইচতে যাস কেনে? শালার কুনো মাত্রাজ্ঞান নাই, নাইচটাকে বেতাল কইরে দিলি!’ ততক্ষণে ঢুলি হাজির। তিনিই নাচ শেখান। ‘ছৌ’ নাচের মূল অনুষঙ্গ ঢোল। ঢুলি শরাবনের রাগ কমাতে মিনমিন করে বলেন, ‘একবারই মনসার পা মাটিতে ঠেকে গেছিল। তাতেই গোলমাল।’ ষোলো মাত্রার মেলতালে হাঁপিয়ে পড়লেই মুশকিল। মনসার সামান্য ভুল, গুরুর গুরু শরাবন জ্যাঠার চোখ এড়ায়নি। ঢুলি যে মুহূর্তে বুঝতে পারেন মেলতাল মিলছে না, কোনও একজন বেতালা চলছে, সে ঢোলের বোল পাল্টে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। আপৎকালীন এই মেরামতি ‘রং’ নামে পরিচিত। ‘ছৌ’ নাচের মূল শক্তি ছ’জনের নিখুঁত যুগলবন্দি। মেলতালের এক ছটাক গরমিলেই পণ্ড সব।
চড়িদার গম্ভীর সিং মুড়া
ভারতে সরাইকেলা (ঝাড়খণ্ড), পুরুলিয়া ও ময়ুরভঞ্জই (ওড়িশা) ছৌ নৃত্যের জন্মদাতা। সরাইকেলা ও পুরুলিয়ায় ছৌয়ে মুখোশ লাগবেই। ময়ুরভঞ্জের ছৌয়ে মুখোশ নেই। পুরুলিয়ায় মুখোশ তৈরির সেরা জায়গা বাগমুন্ডি থানার চড়িদা গ্রাম। পদ্মশ্রী, ছৌ শিল্পী গম্ভীর সিং মুড়ার সৌজন্যেও বিখ্যাত এই চড়িদা। দু’বছর বয়সে বাবা জীপা সিং মুড়াকে হারান গম্ভীর। ছৌয়ের শিক্ষা বাবারই সুযোগ্য ছাত্র মধুভাট রায়ের কাছে। সাজগোজে সামান্য দেরি হওয়ায় রাজা মদনমোহনের রাজদরবার থেকে নির্বাসিত হতে হয়েছিল জীপাকে। বহু ঘাটের জল খেতে খেতে আগমন বাগমুন্ডির চড়িদায়, জঙ্গল কেটে শুরু করেন বসত। গোলাম মহম্মদ খান, বাগমুন্ডির রাজা ক্ষেত্রমোহনের শাগরেদ একদিন জীপা সিং মুড়ার ১৫ বছরের ছেলে বাবু সিংয়ের বিস্ময়কর প্রতিভার ফিরিস্তি দিলেন রাজাকে। চৈত্র সংক্রান্তির গাজনে রাজদরবারে ডাক পড়ল বাবু সিং ওরফে গম্ভীর সিং মুড়ার। শোনা যায় একলপ্তে ১০০টি ডিগবাজি খেয়ে রাজমহিষীকে নাকি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন গম্ভীর। অ্যাক্রোব্যাটিক্স ছৌ নাচের অঙ্গ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অ্যাক্রোব্যাটিক্সে কুশলী ছিলেন গম্ভীর। কখনও সেজেছেন মহিষাসুর, কখনও কিরাত। তাঁর মহিষাসুর বা অভিমন্যু বধ বা কিরাত অর্জুন পালা, হরধনু ভঙ্গ, মহিরাবণ বধ দেশ-বিদেশের অগুনতি দর্শককে মুগ্ধ করেছে। রাবণ ছিল গম্ভীর সিং মুড়ার সবথেকে প্রিয় চরিত্র।
 
জীর্ণ-শীর্ণ চেহারায় বিশাল গোঁফ আর বীররসের নিপুণ মঞ্চায়নে আরও অনেকের সঙ্গেই মন মজেছিল চিন্তামণির। ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর, কলকাতা থেকে ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার পথে ট্রেনে গম্ভীরের আকস্মিক মৃত্যু পর্যন্ত ছায়াসঙ্গী ছিলেন স্ত্রী চিন্তামণি। ছৌয়ের আমন্ত্রণে গম্ভীর চষে ফেলেছিলেন প্রায় অর্ধেক পৃথিবী। স্বদেশে-বিদেশে সম্মান, টাকাকড়ি মিলেছিল যথেষ্টই। কিন্তু আজ চড়িদায় শ্রীহীন পলেস্তারা খসা গম্ভীর সিং মুড়ার টালির বাড়িতে দারিদ্রের ছাপ সবদিকে। তাঁর নাগরিকত্ব নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। পিচরাস্তা থেকে ডানদিকে ঘুরলেই চোখে পড়বে অযত্নে দাঁড়ানো গম্ভীর সিং মুড়ার মর্মরমূর্তি। পিছনে তাঁর তৈরি ‘আদিবাসী ছৌ নৃত্য দলের’ কার্যালয়, সমান শ্রীহীন। গম্ভীর সিংয়ের বাড়ির লাল মাটির রাস্তার শেষে দিগন্তবিস্তৃত ধানখেতের মাথা টপকে দূরে দেখা যায় অযোধ্যা পাহাড়। ছোটনাগপুর মালভূমির ভূমিপুত্র গম্ভীর সিং। তাঁর বাড়ি বা নর্দমার জল উপচানো রাস্তার হতশ্রী দশায় বোঝার উপায় নেই ছোটখাট চেহারার মানুষটির বীরবিক্রমে পৃথিবীর মানচিত্রে একদা জ্বলজ্বল করত চড়িদা নামটি। আজ সেখানে শুধুই শূন্যতা।
 
 
মুখোশের দিন গিয়াছে
ছৌ মূলত দলগত নৃত্যনাট্য। রামায়ণ-মহাভারত, শ্রীকৃষ্ণ বা পুরাণ কাহিনী নির্ভর। দেহের ভঙ্গি, অঙ্গ সঞ্চালন, চলন-গতি, হাত নাড়াচাড়া—সবেতেই বীর-রসের দাপট। মুখোশগুলোও বীররসের ধারায় তৈরি হয়। প্রায় দেড়শো বছর আগে বাগমুন্ডির রাজা মদনমোহন সিং দেও-র পৃষ্ঠপোষকতায় চড়িদার মুখোশ নির্মাণ শিল্প শুরু হয়েছিল। এখানকার ১১৫টি ঘরে এই মাগ্গিগন্ডার বাজারেও ৩০৮ জন শিল্পী মুখোশ তৈরি করেন। তার মধ্যে ১০০ জন মহিলা। মুখোশ তৈরির মূল উপকরণ দোঁয়াশ মাটি, জল, কাগজের মণ্ড, পুরনো সুতির কাপড়, তেঁতুল বীজের গুঁড়ো, কয়লার মিহি ছাই, কাগজ, ময়দার আঠা, হলুদ, খড়িমাটির রঙ, বার্নিশ, পুঁতি, জরি আর নানারকম শোভাবর্ধক প্লাস্টিকের গয়না বা পালক। আগে ময়ূর বা পায়রার পালক ব্যবহৃত হলেও এখন সে সব নিষিদ্ধ। বালি-কাঁকড় বেছে থেপেথুপে কাদার মণ্ডকে প্রথমে ছাঁচে ঢালা হয়। ভিজে অবস্থাতেই মাখানো হয় ছাই। ঠা ঠা সূর্যের রোদে শুকনো হয় মুখোশকে। ছাঁচ থেকে বের করা ছাইমাখা মুখোশে আবার লেপা হয় ভিজে কাগজের মণ্ড। সেই মুখোশের ওপর মাটির প্রলেপ চড়ানো হয়। মানানসই ফ্যাব্রিকের টুকরোটাকরা জোড়া হয়। কাগজের মণ্ড শক্ত হওয়ার পর মাটি খুঁচিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। মোটামুটি রাম-রাবণ-মারীচ-শ্রীকৃষ্ণ-হনুমান-মা দুর্গা-গণেশ-ভীম-হিড়িম্বা-কার্তিক-বাঘ-সিংহ-বকাসুরের আদলে তৈরি কাগজের মণ্ডের মুখোশকে সাদা রঙে যতটা সম্ভব শ্রীমান/শ্রীময়ী করে তোলা হয়। তারপর বিভিন্ন চকমকি ঝুটো গয়না আর তুলির টানে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় মুখোশের। তবে এখন কালের নিয়মে ছৌ নাচের নাভিশ্বাস। সনাতন মুখোশ তৈরিরও সেই দিন নেই। পেটের টানে ঘর সাজানোর মেকি মুখোশ তৈরিতে ব্যস্ত চড়িদার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুখোশ শিল্পীরাও।
ধ্রুপদী নাকি লোকনৃত্য
ময়ূরভঞ্জের ছৌ নাচে নায়ক মহাভারতের ‘শকুনি’; শ্রীকৃষ্ণ বা অর্জুন নয়। সেখানে চোখ-মুখ-গ্রীবাভঙ্গিতেই ফুটে ওঠে শকুনি চরিত্রের জটিল-কুটিল খেলা। মুখ বা ভ্রূ-ভঙ্গির সূক্ষ্ম আলাপ ঢেকে দিত মুখোশ। ময়ূরভঞ্জ ছৌয়ে তাই মুখোশ পরার চল নেই। নাচের শুরুতে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলির’ মাধ্যমে রাজা বা রাজপরিবারকে অভিবাদন জানানো রীতি। রাজানুগ্রহেই তো ছৌ নাচের প্রসার ও বিস্তার। সরাইকেলা ছৌয়ে ঋকবেদের ‘রাত্রি-সুক্ত’ অনুসৃত, রাত্রিকে দেবী হিসেবে পুজো করা হয়। নন্দনতাত্ত্বিক সৌকর্যও সরাইকেলা ছৌয়ের অভিজ্ঞান। পুরুলিয়া ছৌ আপাদমস্তক বীররসের জয়গাথা। জুলিয়া হলান্ডার (ইন্ডিয়ান ফোক থিয়েটারস,২০০৭) বা জন আর্ডেন বা শ্রদ্ধেয় আশুতোষ ভট্টাচার্যরা সোঁদা মাটির গন্ধমাখা ছৌ নাচের গায়ে ‘ধ্রুপদী’ বিশেষণের ধবধবে চাদর জড়াতে ব্যস্ত। ধ্রুপদী তকমা না জুড়লে ছৌ নাচিয়েদের বোধহয় ‘সঙ সাজিয়ে’ বিদেশি দর্শকদের কাছে বেচতে অসুবিধা! ঘামে ভেজা, মহুলের গন্ধমাখা লোকনৃত্য ছৌ যে মূলধারার সংস্কৃতিতে আজও ব্রাত্য, তা তো সত্যজিতের ‘আগন্তুকে’ও স্পষ্ট।
মহিলা ও ছৌ
ছৌ নাচে ভাটার টান তো বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। মহাভারত-রামায়ণ-মহিষাসুর মানুষকে আর টানছে না। আরও বিরক্তিকর বিশালবপু, চওড়া গোঁফের পুরুষ অনন্তকাল ধরে অভিনয় করছেন মহিলাদের ভূমিকায়। যে যুগে মানুষ চাঁদে বা মঙ্গলে পাড়ি জমাচ্ছে, সেই যুগে মা দুর্গা আর সরস্বতীর ভূমিকায় অভিনয়ে রোমশ পুরুষ শরীর! বিসদৃশ, বেমানান তো বটেই, নিতান্ত দৃষ্টিকটুও। এদিকে মহিলারা শ্বশুর-ভাসুর, গাদাগুচ্ছের পুরুষ দর্শকের সামনে রাতের বেলা লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে তাতা থৈথৈ করবে সেটা পুরুলিয়ার অন্ত্যজ সমাজেও যথেষ্ট নিন্দার ছিল। তবে সময় বদলাল। পেটের তাগিদেও পুরুষরা টের পেলেন, মহিলারা থাকলে রোজগারে কিঞ্চিত সুবিধাই। যেমন ভাবা তেমন কাজ। পথ দেখালেন জামবাদের ছৌ দলের নেতা সদানন্দ মাহাত। বউমা অপর্ণা মাহাত, ঝুমুরের তালিম নিচ্ছেন বহুকাল। নাচেনও ভাল। রাত বারোটায় গোপনে শুরু তালিম। কিন্তু আশেপাশের বাড়ি থেকে ঢোল-ধামসার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ব্যস উঁকিঝুকি শুরু। তারপর কানাকানি। ভ্রূ কোঁচকানো। ‘মেয়েরা শেষে ছৌ নাইচবেক! ছ্যা, ছ্যা, গোল্লায় গেল দেশটা।’ কেউ বলল, ‘উঁয়াদের দ্বারা বীরজারা হবেক লাই গো!’ মেয়েরা ঘরকন্না করবে; তা না রাতবিরেতে মাঠেঘাটে লম্ফঝম্ফ করে অর্জুন-কীরাত-রাবণের ভূমিকায় অভিনয়! এ কেমন রঙ্গ জাদু।
লোক জানাজানি হতেই ঢিঢি পড়ে গেল। গ্রামেগঞ্জে যার বহর একটু বেশিই। সদানন্দ দেখলেন লুকনোর দিন শেষ, হেস্তনেস্ত হয়েই যাক। ঢ্যারা পিটিয়ে গ্রামে-গঞ্জে প্রচার হল, অমুক দিন মহিলাদের ছৌ নাচের আসর বসবে জামবাদে। দূরদূরান্ত থেকে ঝেঁটিয়ে সেদিনের নাচে লোক ভেঙে পড়ল। বিখ্যাত ছৌ নাচিয়েদের আসরে ইদানীং লোকসমাগম হচ্ছিল না! অথচ ২০১৮ সালের সেদিনের সেই মহিলা ছৌ নৃত্য ভিড়ে ঠাসাঠাসি। সদানন্দের পুত্রবধূ অপর্ণা মাহাতর নেতৃত্বে রাতারাতি তৈরি হল ‘জামবাদ পঞ্চমুখী মহিলা ছৌ নৃত্য পার্টি’। বায়নাও আসতে লাগল দেদার। রোজগার বাড়ল পাল্লা দিয়ে। জামবাদের দলটির সাফল্যে তৈরি হল আরও কয়েকটি মহিলা ছৌ নাচের দল, যেমন শীতলপুর বা বোঙ্গাবাড়ির সুনীতা মাহাতর নেতৃত্বে ‘মাতঙ্গিনী হাজরা মহিলা ছৌ নৃত্য পার্টি’।
মহিলাদের কল্যাণে ছৌয়ের মরা গাঙে বান আসতেই পুরুষেরা আর পর্দানসীন করে রাখতে পারলেন না তাঁদের। ছুঁতমার্গ ঝেড়ে ফেললেও বাজনদার (নাকি পাহারাদার!) হিসেবে সঙ্গে রইল ঘরের পুরুষটি। মহিষাসুর বধ পালায় স্বর্গের অপ্সরা সেজে আধুনিক পোশাকে, কোনওসময় হাতকাটা ব্লাউজেও আসরে অবতীর্ণ হলেন সুবেশা তরুণী ও গৃহবধূরা। ব্রহ্মার মনোরঞ্জন পালা আধুনিক নারীরা সফলভাবেই উতরে দিলেন। তারপরে আগমন কার্তিক-গণেশের। তাঁরাও মহিলা। এমনকী কার্তিকের বাহন ময়ূরও মহিলা। ময়ূরের লম্বা পেখমের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে চুড়িদারের নিম্নাংশ। কার্তিক ময়ূরের পিঠে আসীন। গলার বদলে কার্তিক ধরে ফেললেন ময়ূর মহিলার চুল। আর যায় কোথা! আর্তনাদে ময়ূর পিঠ থেকে ফেলে দিল কার্তিককে! অতঃপর আগমন মা দুর্গার, রণরঙ্গিনী তিনি সমুদ্যত মহিষাসুর বধে। কিন্তু ঢোল বাজাচ্ছেন যে তাঁরই স্বামী। তাই বারেবারে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে স্বামীর ঢোলের আশপাশে বেমানান ঘুরঘুর। স্বামী কুপিত হলে মহিষাসুরের পরিবর্তে হয়তো বা দুর্গাবধ পালাটা বাড়ির ভিতরেই শুরু হয়ে যাবে!
অনেক সময় দুই মহিলার ‘তুই বেড়াল না মুই বেড়ালের’ ঝগড়াও পুরুষ ছৌ নাচের আসরে মুখরোচক খবর। তাতে হয়তো সদ্য তৈরি হওয়া দলটিই ভেঙে গিয়েছে। পুরুষদের ছৌ দলে ইগোর লড়াই মহিলাদের তুলনায় বহুগুণ বেশি হলেও মহিলাদের দল ভাঙার মুচমুচে খবর সবসময়ই শিরোনামে। তবু যাই হোক, নিজ যোগ্যতায় অচলায়তন ভেঙে আজ ছৌয়ের রঙ্গমঞ্চে খ্যাতকীর্ত মহিলারা। আপন ভাগ্য জয় করতে পুরুষদের কাছ থেকে অধিকার ছিনিয়ে নিতে পেরেছেন জামবাদ-শীতলপুর-বোঙ্গাবাড়ির পিছড়ে বর্গের মুখে ঘোমটা ঢাকা মহিলারাই। সেটাই বা কম কী?
……………………………………..
 ঋণস্বীকার: মানভূম তথা পুরুলিয়ার ‘ছ’ নাচ, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত এবং পিনাকী গাঙ্গুলী, চড়িদা।
 সহযোগিতায় : স্বাগত মুখোপাধ্যায়
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত