Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Jai Shri Ram

যারা রামকে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ বলে মনে করেন

Reading Time: 27 minutes

রামচন্দ্র, এই নামটি হিন্দু সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তা কোনো হালআমলের ব্যাপারও নয়, হাজার হাজার বছর ধরেই রামকে ঘিরে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়েছে, গড়ে উঠেছে অসংখ্য সম্প্রদায়। কিন্তু বর্তমানে রাম ধর্ম থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। রাম নিয়ে ভারতের রাজনীতি বেশ সরগরম। এমন মানুষের সংখ্যাও নেহাতই কম নয় যারা রামকে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ বলে মনে করেন। অসংখ্য লোক আবার রীতিমত ‘রামরাজ্যের’ দাবী করে বসেছেন। তাদের কাছে ‘রাজরাজ্যই’ হল আদর্শ রাষ্ট্রের স্বরূপ। তাই তারা রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। ভারতে যদি কোনো সময় রামরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তাতে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্ঠান, পারসী, নাস্তিক ইত্যাদি সম্প্রদায়ভুক্ত সকল ভারতবাসীরই বাস করতে হবে। তাই রাম সত্য হোক বা নেহাতই ‘কবির কল্পনা’  রাম নামক চরিত্রটি আসলে কি ধরণের চরিত্র তা আমাদের বোঝার দরকার পড়ে। রামরাজ্য ঠিক  কেমন  হতে পারে তাও বিবেচনার দরকার পড়ে।

তাই চলুন রামায়ণের গভীরে প্রবেশ করি। বর্তমানের আতশ কাচে দেখবার চেষ্টা করি রাম চরিত্রটি কতটা ভালো বা মন্দ; তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা যাক,  রাম কি সত্যিই ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’?রামের প্রতিষ্ঠিত রামরাজ্য সত্যিই কি কোন আদর্শ সমাজ  ব্যবস্থা?

সীতার সাথে দুর্ব্যবহারকারী

রামের খারাপ দিক সম্বন্ধে ভাবতে গেলে সবার প্রথমে যে ব্যাপারটি মাথায় আসে তা হল স্ত্রী সীতার সাথে রামের বিরূপ আচরণ। এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলা যাক।

রামায়ণের কাহিনী যাদের মোটামুটি জানা আছে তারা জানেন, কিভাবে বিমাতা কৈকেয়ীর ষড়যন্ত্রে সীতা এবং লক্ষ্মণ সহ রাম বনে গমন করেন, কিভাবেই বা রাক্ষসদের রাজা রাবণ সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যান। পাঠকেরা এসব জানেন, তা আমি ধরে নিচ্ছি; তাই আমি আর এসবের বিবরণে যাচ্ছি না। সরাসরি মূল আলোচনায় চলে যাচ্ছি।

রাবণ সীতার প্রতি আকৃষ্ট ছিল, তাই বন্দি সীতার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য তাকে রাবণ নানাভাবে প্রলোভন দিয়েছিল কিন্তু  সীতা কোনোমতেই রাবণের কোনো প্রস্তাবে সম্মত হননি। সীতা রামকে ভালোবাসতেন, তাকে পূজনীয় মনে করতেন। [1] এছাড়া,  রামকে বনবাসে পাঠানো হলে সীতাও রামের সাথে বনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন;  রামকে সীতা কতটা ভালোবাসতেন এই ঘটনা থেকে তার পরিচয় পাওয়া যায়। [2] কিন্ত এমন সীতাকে উদ্ধার করার পর রাম তাকে যথেচ্ছভাবে অপমান করেন। রাম সীতার সাথে যে ব্যবহার করেন তাতে রাম নারী জাতিকে ঠিক কিভাবে দেখেন তা ফুটে ওঠে।

সীতাকে উদ্ধার করার পর প্রথম সাক্ষাতেই রাম তাকে বলেন, রাম কেবল তার পৌরুষ দেখানোর জন্য, সীতার অপহরণের কলঙ্ক মোচন করার জন্য তাকে উদ্ধার করেছেন। ঋষি অগস্ত্য যেমন দুর্জয় দক্ষিণদিক জয় করেছিলেন রামও তেমনি সীতাকে কেবলই জয় করেছেন। রাম সীতাকে বলেন, “ ভদ্রে! তুমি জেনো আমি সুহৃদগণের বীর্য বলে যে দারুণ রণপরিশ্রম করেছি তা তোমার জন্য নয়।তোমার হরণ জনিত অপবাদ দুর করার জন্য এবং বিখ্যাত বংশের মর্যাদা রক্ষা করার জন্যই আমি এই কাজটি করেছি।” রাম সীতাকে আরও বলেন, “ সীতা! তোমার চরিত্রে আমার সন্দেহ জন্মেছে, তুমি আমার সামনে থেকে নেত্ররোগগ্রস্থ ব্যক্তির সম্মুখে অবস্থিত দীপশিখার মত আমাকে ভীষণভাবে কষ্ট দিচ্ছ। অতএব সীতা এই যে দশদিক দেখছো, এর যে দিকে ইচ্ছা হয় তুমি চলে যাও। আমার তোমাকে আর দরকার নেই। যে স্ত্রী দীর্ঘদিন অন্যের ঘরে বসবাস করেছে, কোন ভালো বংশের তেজস্বী পুরুষ, ভালো জ্ঞান করে সেই স্ত্রীকে আবার গ্রহণ করতে পারে? রাবণ তোমাকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখেছে, কোলে নিয়েছে, সুতরাং আমি তোমাকে পুনরায় গ্রহণ করে আমার সমহান কুল কলঙ্কিত করতে পারি না। যে কারণে তোমাকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলাম,  আমার সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। সুতরাং তোমাকে আমার আর প্রয়োজন নেই, যেখানে ইচ্ছে হয় চলে যাও। সীতা! বিচার বিবেচনার করে যা বলার তা আমি তা বললাম। এখন লক্ষ্মণ, ভরত বা শত্রুঘ্ন যার কাছে তোমার থাকতে ইচ্ছা হয় তুমি থাকতে পারো, এমনকি চাইলে বিভীষণকেও আত্মসমর্পণ করতে পারো। ”

রামের এই বিষম দুর্ব্যবহারের কারণেই সীতা অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে তার সতীত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য হন। অগ্নিপরীক্ষার পর রাম যখন সীতার সতীত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হন,  তখন তিনি সীতাকে গ্রহণ করেন। একজন নারী যদি কারো দ্বারা অপহৃতা হয়ে থাকেন,  তবে তাতে তার দোষ ঠিক কি? রামের মত এমন পুরুষ বর্তমান সময়েও দেখা যায়। কোনো নারী ধর্ষিতা হলে তারা সেই নারীকেই দোষারোপ করে। এই স্বভাবের পুরুষদের আমরা কখনোই উৎকৃষ্ট বলে বিবেচনা করি না বরং নিকৃষ্ট বলেই বিবেচনা করে থাকি। এই ধরণের কোনো পুরুষ যদি সমাজের আদর্শ হয়ে ওঠে, তবে নারীদের অবস্থার অবনতি ছাড়া আর কিছু হবে না। তাই এমন পুরুষ কখনোই কোনো সমাজের আদর্শ হতে পারে না।

যাইহোক, রাম সীতাকে পবিত্র বুঝতে পেরে গ্রহণ করার পর, রামরাজ্যে সীতার সতীত্ব নিয়ে কানাঘুষো শুরু হয়। রামরাজ্যবাসীদের মনে প্রশ্ন ওঠে, “ রাবণ সীতাকে জোর করে অপহরণ করে লঙ্কাপুরীতে নিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও রামের মনে সীতাসম্ভোগের সুখ কিভাবে হচ্ছে? সীতা রাক্ষসদের অশোক কাননে বন্দি ছিলেন, তারপরেও কেন রাম সীতাকে ঘৃণা করেন না?রাজা যা করেন, প্রজারা তারই অনুসরণ করে থাকেন, সুতরাং আমাদেরও স্ত্রীদের এ দোষ সইতে হবে।”

এই হচ্ছে রামরাজ্যের বাসিন্দা। রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কি এমন অধঃপতিত জনগণ তৈরি করাই আমাদের অভিপ্রেত? একজন নারী একটি অপরাধের শিকার হয়েছেন, এতে তার কি দোষ আছে? যারা নারীদের এমন দৃষ্টিতে দেখেন তারা নারীদের ভোগ্যপণ্য ছাড়া অন্য কিছু ভাবেন না।

রাম এই অধঃপতিত প্রজাদের কথা শুনে তার স্ত্রীকে আবার ত্যাগ করেন। রাম সীতাকে আবারো বনবাসে পাঠান। রাম তার ভাই লক্ষ্মণকে বাধ্য করেন সীতাকে বনে দিয়ে আসতে। রামের একান্ত অনুগত ভাই লক্ষ্মণও একসময় বুঝতে পারেন, রাম যে কাজটি করছেন তা কোনোমতেই ঠিক নয়। লক্ষ্মণ রামের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্ষেপ করে সীতাকে বলেছিলেন, “ বৈদেহী! ধীমান আর্য আমাকে লোকনিন্দিত নিদারুণ এই নিষ্ঠুর কাজে নিযুক্ত করে লোকসমাজে আমাকে নিন্দাভাজন করেছেন। সুতরাং আমার হৃদয়ে শূল বিদ্ধ হচ্ছে। এখন এই অবস্থায় আমার মূর্ছা বা মৃত্যুই শ্রেয়ঃ এরপরেও এমন লোকনিন্দিত কাজে নিযুক্ত থাকা আমার উচিত নয়।” লক্ষ্মণ আরও বলেন, “পূর্বে পিতার নির্দেশে দণ্ড নামক ঘোর অরণ্যে ১৪ বছর বাস করে রাম যে দুঃখ ভোগ করেছিলেন, তা তার উচিতই হয়েছিল, কারণ তাতে পিতার আদেশ পালন করা হয়েছিল। কিন্তু পুরবাসীদের কথায় রামচন্দ্র যে, সীতাদেবীকে পুনরায় নির্বাসিত করলেন এটা অত্যন্ত নৃশংস কাজ বলে আমি মনে করছি।… পৌরগণের অন্যায় কথায় সীতাকে পরিত্যাগ করে রাম কোন ধর্ম রক্ষা করিলেন?”

আমার মনেও  খুব স্বাভাবিকভাবেই একই প্রশ্নেরই উদয় হয়, রাম সীতার সাথে বারংবার যে দুর্ব্যবহার করেছেন; এর মাধ্যমে রাম কোন ধর্ম রক্ষা করলেন?

বনবাসের সময় সীতা বাল্মীকির আশ্রমে ছিলেন। সেই সময় সীতা লব ও কুশ নামে দুই সন্তানকে প্রসব করেন।

এরপর অনেক বছর কেটে গিয়েছে। রাম অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করছেন। এই সময় ঘটনাক্রমে রাম জানতে পারেন লব ও কুশ তারই সন্তান। একথা জানতে পেরে রাম সীতাকে পুনরায় গ্রহণ করতে চান। কিন্তু এবারও রাম সর্বসমক্ষে সীতার  সতীত্বের পরীক্ষা চাইলেন। বারবার এত অপমান সহ্য করতে না পেরে একসময় সীতা পাতালে প্রবেশ করলেন।

একজন নারীকে বারবার অপমান করা  রামের মত এমন পুরুষ যদি পুরুষোত্তম হয়ে থাকেন, তবে পুরুষাধম কাকে বলা হবে?

 

জাতিবাদী

রামের সবচাইতে বিবাদিত কর্মকাণ্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম হল শূদ্র তপস্বী শম্বুকের হত্যা। তপস্যা করার অপরাধেই রাম শম্বুককে হত্যা করেছিলেন। রামের দরবারে একবার এক ব্রাহ্মণ তার মৃত পুত্রকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। সেই ব্রাহ্মণ বলছিল এর আগে কখনো ব্রাহ্মণবালকের অকাল মৃত্যু দেখা যায়নি, নিশ্চয় রাম কোনো পাপ কাজ করছেন অথবা রামের রাজ্যে কোনো পাপ কাজ হয়ে চলেছে এবং রাম তার কোনো প্রতিকার করছেন না; এর ফলেই তার পুত্র মারা গেল। সেই ব্রাহ্মণ রামকে অভিশাপ দেওয়ার ভয়ও দেখায়। এমন পরিস্থিতিতে রাম চিন্তিতে হয়ে পড়েন ; ঋষিদের এবং তার সভাসদদের পরামর্শের জন্য ডাকেন। তখন নারদ রামকে বলেন, সত্যযুগে কেবল ব্রাহ্মণেরা তপস্যা করতে পারে, ত্রেতায় ক্ষত্রিয়েরা তপস্যার অধিকার লাভ করে,দ্বাপরে বৈশ্যেরা তপস্যা করতে পারে আর কলিতে শূদ্রেরা তপস্যা করতে পারে। যেখানে অধর্মপূর্ণ কলিযুগে শূদ্রের তপস্যা করার কথা সেখানে ত্রেতাযুগেই রামের রাজত্বে কোনো শূদ্র তপস্যা করার মত অধর্ম করে চলেছে; আর এই কারণেই ব্রাহ্মণের পুত্র অকালে মারা গিয়েছে।

নারদের এই কথা শুনে রাম হাতে খড়্গ নিয়ে সেই দুরাচারী শূদ্রকে খুঁজতে থাকেন। খুঁজতে খুঁজতে রাম একস্থানে এক তপস্বীকে কঠোর তপস্যা করতে দেখতে পান। সামনে অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে, পা বৃক্ষে ঝুলিয়ে এক তপস্বী ঘোর তপস্যা করছিলেন। সেই তপস্বীর কঠোর তপস্যা দেখে রাম মুগ্ধ হয়ে যান। রাম ধন্য ধন্য করতে করতে তার কাছে যান। রাম সেই তপস্বীর কাছে তার পরিচয় জানতে চান। তপস্বী বলেন, তার নাম শম্বুক এবং তিনি জাতিতে শূদ্র। একথা শোনার পর রাম আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করেন না, হাতের খড়্গ দিয়ে সাথে সাথেই এককোপে সেই তপস্বীর মুণ্ডু কেটে ফেলেন।

রামের এই কাজে খুশি হয়ে দেবতারা তার উপর পুষ্পবৃষ্টি করতে থাকেন। দেবতারা বলেন, এই শূদ্র যে স্বর্গ লাভ করতে পারলো না তাতে তারা ভীষণ খুশি হয়েছেন। আর সেই শূদ্রের মৃত্যুর সাথে সাথেই ব্রাহ্মণের পুত্র নিজে নিজেই বেঁচে উঠেছিল।

জাতিভেদ হল হিন্দুসমাজের সবচাইতে বড় কলঙ্ক। হাজার হাজার বছর ধরে জাতপাতের নামে মানুষের উপর অত্যাচার করা হয়েছে, করা হয়েছে শোষণ। ধর্মকে মানুষ আলোর দিশারী বলে মনে করে, মনে করে ধর্মই মানুষের মনের সব কালিমা দূর করে, ধর্ম মানুষের মধ্যকার বিভেদকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। কিন্তু অনেকসময় বাস্তবে দেখা যায়, ধর্ম, ধর্মের নীতি নির্ধারক এবং মহাপুরুষেরা শোষণের কারিগর হয়ে দাঁড়ায়, তারাই হয়ে ওঠে অন্যায়ের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি। বিনা অপরাধে এক শূদ্রের এমন নির্মম হত্যা করে ভ্রষ্ট সমাজের চোখে একসময় রাম মহাপুরুষ বলে প্রতিপন্ন হলেও, বর্তমান মানবিক সমাজ এমন জঘন্য কাজ করা ব্যক্তিকে কখনোই ভালো চোখে দেখতে পারে না।

শূর্পণখাকে অত্যাচারকারী

রাক্ষসরাজ রাবণের শূর্পনখা নামে এক বোন ছিল। রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা যখন বনবাসে ছিলেন তখন  তাদের  শূর্পনখার সাথে দেখা হয়েছিল। শূর্পনখা রামকে দেখে কামার্ত হয়ে পড়েছিল। রামের সাথে এই রাক্ষসীর রূপের তুলনা করে বাল্মীকি বলেছেন, “রাম সুমুখ, সে দুর্মুখী, রামের কটিদেশ সূক্ষ্ম, তার স্থূল, রাম বিশাললোচন, সে বিরূপাক্ষী, রাম সুকেশ, তার কেশজাল তামার মত পিঙ্গল, রাম সুরূপ, সে বিরূপা, রাম সুস্বর, তার কন্ঠস্বর অতি ভীষণ, রাম যুবা, সে বৃদ্ধা, রাম সুশীল, সে দুর্বৃত্তা, রাম প্রিয়বাদী, সে প্রতিকূলভাষিণী।” বিজাতির প্রতি কেউ যদি এমন বিরূপ মনোভাব পোষণ করে, তাহলে আজকাল সোজাভাষায় আমরা তাকে ‘রেসিস্ট’ বলে অভিহিত করে থাকি। কিন্তু প্রাচীন ভারতে এই জাতিবিদ্বেষ খুব সাধারণ ব্যাপার ছিল বলেই মনে হয়। যাইহোক, মূল কথায় ফেরা যাক।   শূর্পনখা কামার্ত হয়ে রামকে বলেছিল, “ রাম তোমার হাতে শর ও শরাসন, মাথায় জটাজুট। এখন বল তুমি কি কারণে তপস্বীর বেশে স্ত্রী সহকারে এই রাক্ষসদের অধিকৃত দেশে এসেছ?” শূর্পনখার প্রশ্ন শুনে রাম তার পরিচয় দেন। এরপর রাম শূর্পনখার কাছে  জিজ্ঞাসা করেন সে কেন ঐ স্থানে এসেছে। শূর্পনখা বলে, “ আমি শূর্পনখা, কামরূপিনী রাক্ষসী। এই বনের মধ্যে সকলের মনে ত্রাস উৎপাদন করে একাকী বিচরণ করে থাকি । তুমি রাক্ষসরাজ রাবণের নাম শুনে থাকবে , তিনি আমার দাদা। কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ, খর, দূষণ এনারাও আমার দাদা। আমি নিজের শক্তিতে তাদের অতিক্রম করেছি। রাম! তুমি সুন্দর পুরুষ। আমি তোমাকে দেখামাত্র কামের বশবর্তী হয়ে উপস্থিত হয়েছি । আমার প্রভাব অতি আশ্চর্য। আমি স্বেচ্ছাক্রমে অপ্রতিহতবলে সকল লোকে যাওয়া আসা করি । এখন চিরদিনের জন্য তুমি আমার স্বামী হও। এরপর সীতাকে দিয়ে আর কি করবে? সীতা বিকৃতা ও বিরূপা, আসলে সীতা কোনোভাবেই তোমার যোগ্য নয়। আমিই তোমার যোগ্য, তুমি আমাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ কর। এই মানুষী সীতা করালদর্শনা , কৃশোদরী ও অসতী , আমি এক্ষুণি লক্ষ্মণ আর তাকে খেয়ে ফেলবো। তাহলে তুমি কামী হয়ে আমার সাথে গিরিশৃঙ্গ ও বন দেখতে দেখতে দণ্ডকারণ্যে বিচরণ করতে পারবে।” (৩/১৭)

তখন রাম পরিহাসের সাথে শূর্পনখাকে বলেন, “ আমার স্ত্রী রয়েছে। আমি সীতাকে বিয়ে করেছি। ইনি সবসময়ই আমার সাথে থাকেন। তোমার মত নারীর সতীনের সাথে থাকা ভীষণ কষ্টের হবে। ইনি হলেন আমার ছোটোভাই, মহাবীর লক্ষ্মণ। লক্ষ্মণ সুশীল ও সুদর্শন। লক্ষ্মণ এখনো অবিবাহিত আছেন। দাম্পত্যসুখ যে কি তা লক্ষ্মণ জানেন না, এখন তিনি স্ত্রীলাভ করতে চান। তোমার যেমন রূপ, যুবক লক্ষ্মণেরও তেমনই রূপ; এতে কোনো সন্দেহ নেই। সূর্যপ্রভা যেমন সুমেরুকে গ্রহণ করে, তেমনি তুমি এখন তাকে পতি হিসাবে গ্রহণ করো। লক্ষ্মণকে বিয়ে করলে তোমাকে আর সতীনের ঘর করতে হবে না।”

রামের এই কথা শুনে শূর্পনখা তখন লক্ষ্মণের কাছে উপস্থিত হয়।

তখন হাসতে হাসতে লক্ষ্মণ তাকে বলেন, “ দেখ, আমি হলাম দাস। তুমি কি আমার পত্নী হয়ে দাসীর মত থাকবে? আমি আর্য রামেরই অধীন। রাম সুসম্পন্ন, এখন তুমি তার কনিষ্ঠা পত্নী হও , তাহলে পূর্ণকাম হয়ে পরমসুখে কালযাপন করবে। ইনি এই বিরূপা, অসতী, করালদর্শনা , কৃশোদরী বৃদ্ধাকে পরিত্যাগ করে তোমাকেই গ্রহণ করবেন। কোন বিচক্ষণ লোক এমন শ্রেষ্ঠ রূপ ত্যাগ করে মানবীতে আসক্ত হতে পারে!”

এভাবে রাম-লক্ষ্মণ দুজনেই অনেকক্ষণ শূর্পনখার সাথে উপহাস করেন। এই অবস্থায় রাক্ষসী শূর্পনখা নাকি সীতাকে খেয়ে ফেলতে যাচ্ছিল। তখন রাম লক্ষ্মণকে বলেন, “ তুমি আর কখনো ইতর স্ত্রীলোকের সাথে পরিহাস করো না ; দেখ জানকী যেন কথঞ্চিৎ জীবিত আছেন। এখন তুমি শীঘ্রই বিকৃতা, উন্মত্তা, অসতীকে বিরূপ করে দাও।” (৩/১৮)

এরপর লক্ষ্মণ তার খড়্গের মাধ্যমে শূর্পনখার নাক কান কেটে দেন।

রাম লক্ষ্মণ যে এভাবে একজন নারীর নাক-কান কেটে দেন, এই বিষয়টির সমালোচনা হলে  কিছু কথা বলে রাম-লক্ষ্মণের এই দোষ ঢাকার চেষ্টা করা হয়। অনেকে বলেন, শূর্পনখা এতটাই কুৎসিত ছিল যে তার নাক-কান কাঁটা উচিত হয়েছে। এই যুক্তিটি কখনোই আমার মাথায় ঢোকে নি। কেউ যদি কুৎসিত হয় তাহলে তার নাক-কান কাটা কিভাবে যুক্তিযুক্ত হতে পারে? যারা এই ধরণের কথা বলেন, তাদের এইসব কথার মাধ্যমে তাদের রেসিস্ট মেন্টালিটিই কেবল প্রকাশিত হয়। আবার অনেকে বলে থাকেন, যেহেতু শূর্পনখা সীতাকে খেয়ে ফেলতে যাচ্ছিল তাই তার নাক কান কেটে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন জাগে, কেউ যদি কাউকে হত্যা করতে যায়, তাহলে তার নাক, কান কেটে কি হত্যাকারীকে প্রতিহত করা যায়? এখানে উদ্দেশ্য আত্মরক্ষা হতে পারে না।শূর্পনখাকে বিরূপ করার উদ্দেশ্য ঠিক কি ছিল রামের কথায় তা পরিষ্কার হয়ে যায়।রাম স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, “ তুমি শীঘ্রই বিকৃতা, উন্মত্তা, অসতীকে বিরূপ করে দাও।” সুতরাং বোঝা গেল, এখানে উদ্দেশ্য আত্মরক্ষা নয়, বরং উদ্দেশ্য হল শূর্পনখাকে বিরূপ করে দেওয়া।

রামায়ণের এই ধরণের আরেকটি ঘটনা দেখা যায়।  লক্ষ্মণ অয়োমুখী নামের আরেক রাক্ষসীরও নাক কান কেটে দিয়েছিলেন তাকে প্রেম নিবেদনের অপরাধে। এই বিষয়টি বাল্মীকি রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডের ৬৯ তম অধ্যায়ে আছে। এখানে বলা হয়েছে , “ ঐ ঘৃণিত নিশাচরী ভীষণ, মৃগ ভক্ষণ করতে করতে তাদের কাছে এল এবং লক্ষ্মণকে ‘এসো, আমরা উভয়ে বিহার করি’ এই বলে গ্রহণ ও আলিঙ্গন করলো। সে বললো, ‘আমার নাম অয়োমুখী। তুমি আমার প্রিয়তম পতি, আমিও তোমার রত্নের মত হলাম। নাথ! এখন তুমি আমার সাথে সারাজীবন গিরিদুর্গ ও নদীতীরে সুখে ক্রীড়া করবে।  বীর লক্ষ্মণ রাক্ষসীর এই কথায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং খড়্গ উত্তোলন করে তার নাক-কান ও স্তন ছেদন করে দিলেন। তখন ঐ ঘোর নিশাচরী বিকৃতস্বরে চিৎকার করতে লাগলো এবং দ্রুতপদে নিজের জায়গায় পালিয়ে গেল।”

এই ঘটনায় লক্ষ্মণীয় ব্যাপার হল অয়োমুখী এখানে লক্ষ্মণকে, রামকে বা সীতাকে খেয়ে ফেলতে চাননি। এরপরেও শূর্পনখার মতোই অয়োমুখীর  নাক-কান-স্তন কেটে দেন লক্ষ্মণ । একাজ নিশ্চয় আত্মরক্ষার জন্য করা হয়নি। রাক্ষসজাতির প্রতি বিদ্বেষবশতই কি তারা এই কাজ বারংবার করছিলেন?

সিংহাসনের দ্বন্দ্ব

আপনি যদি রামায়ণ পড়ে থাকেন, তাহলে আপনার প্রতি আমার একটি প্রশ্ন থাকবে। রামের যখন যৌবরাজ্যে অভিষেক হচ্ছিল তখন তার ভাই ভরত ঠিক কোথায় ছিল? উত্তর হচ্ছে, ভরত তখন অযোধ্যায় ছিল না।এখানে একটি জটিল প্রশ্নের উদয় হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক,  এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হতে চলেছিল অযোধ্যায়, কিন্তু ভরতকে কেন সেই অনুষ্ঠানে রাখা হল না?

আসলে ভরতকে তার মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কে পাঠিয়েছিল মামার বাড়িতে? দশরথ। হ্যাঁ, ভরতকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে ভরতের অগোচরেই রামকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে চেয়েছিলেন পিতা দশরথ।ভরত যে মামার বাড়িতে ছিলেন এই প্রসঙ্গে বাল্মীকি রামায়ণের বালকাণ্ডের ৭৭ তম সর্গে বলা হয়েছে, “এর কয়েকদিন পরে  মহারাজ দশরথ কৈকেয়ীতনয় ভরতকে ডেকে বললেন,  বৎস! তোমার মামা কেকয়রাজকুমার মহাবীর যুধাজিৎ তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছেন। অতএব তুমি তার সাথে যাও।তখন রাজকুমার ভরত পিতার আদেশে শত্রুঘ্নের সাথে মাতামহের আবাসে যেতে অভিলাষী হলেন এবং পিতা, মাতা ও প্রিয়কারী রামকে জানিয়ে শত্রুঘ্নের সাথে মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। মহাবীর যুধাজিৎও তাদের নিয়ে আনন্দিত মনে নিজ নগরে উপস্থিত হলেন। তখন ভরত আর শত্রুঘ্নকে দেখে তার পিতার আনন্দের আর সীমা রইলো না।”

 অযোধ্যাকাণ্ডের ১ম সর্গেও ভরতের মামার বাড়িতে থাকার কথা পাওয়া যায়। এখানে বলা হয়েছে, “ রাজকুমার ভরত যখন মামার বাড়িতে যান তখন প্রেমাস্পদ শত্রুঘ্নকেও সাথে নিয়ে যান। ওই দুই ভাই সেখানে মাতুল যুধাজিতের প্রযত্নে অপত্য-নির্বিশেষে আদৃত ও প্রতিপালিত হয়েও বৃদ্ধ পিতাকে এক মুহূর্তের জন্যও ভোলেননি । রাজা দশরথও তাদের ভোলেন নি । তিনি নিজের দেহ থেকে নির্গত চার হাতের মত  চার পুত্রকেই যথেষ্ট স্নেহ করতেন ; তবে তিনি রামকেই অপেক্ষাকৃত বেশি ভালোবাসতেন।“[3] রামের যৌবরাজ্যে অবিষেকের সময়ে ভরতকে যেমন ডাকানো হয় নি, তেমনি ভরতের মাতামহ কেকয়রাজকেও  দশরথ আমন্ত্রণ জানান নি। [4] এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রামকে যুবরাজ করতে চেয়েছিলেন দশরথ। আমরা জানি,  প্রাচীন ভারতে  জ্যেষ্ঠ পুত্রই সিংহাসন পেতেন; এই ব্যাপারটি দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার ছিল । তাহলে কেন রাজা দশরথের এমন লুকোচুরি করার দরকার পড়লো। আসলে  দশরথ জানতেন যে ভরতই সিংহাসনের প্রকৃত দাবীদার  ছিলেন। ভরত কিভাবে রাজ্যের প্রকৃত দাবীদার হলেন? চলুন এই বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা যাক।  অযোধ্যাকাণ্ডের চতুর্থ সর্গে দশরথ রামকে বলেন, “ আগামীকালই আমি তোমাকে যৌবরাজ্যে অভিষেক করবো। তুমি আজ রাতে বধূ সীতার সাথে নিয়ম অবলম্বন ও উপবাস করে কুশশয্যায় শয়ন করে থাক। বৎস! শুভকাজে প্রায়ই বিঘ্ন ঘটে থাকে, এই কারণে আজ তোমার সুহৃদেরা সাবধান হয়ে তোমাকে রক্ষা করুন। এখন বৎস ভরত প্রবাসে কালযাপন করছেন, এই অবসরে তোমার অভিষেক সুসম্পন্ন হয়,এটাই আমার প্রার্থনীয়। যথার্থই তোমার ভ্রাতা ভরত ভ্রাতৃবৎসল ও অতিশয় সজ্জন। ঈর্ষা তার মনকে কখনোই কলুষিত করবে না এবং তিনি তোমার একান্ত অনুগত। কিন্তু আমার এই একটি স্থির বিশ্বাস আছে যে কারণ উপস্থিত হলে মানুষের চিত্ত অবশ্যই বিকৃত হয়ে থাকে।  যারা ধর্মপরায়ণ ও সাধু , তাদের মনও রাগ-দ্বেষ প্রভৃতি দ্বারা আকুল হয়ে ওঠে । অতএব বৎস, এখন তুমি যাও, কালই তোমাকে রাজ্যের ভার গ্রহণ করতে হবে।”

দশরথের উপরের কথা থেকে বোঝা গেল, ভরত যে রাজ্য দাবী করতে পারেন এই বিষয়ে তার মনে আশঙ্কা ছিল এবং দশরথ চেয়েছিলেন ভরতের অনুপস্থিতিতেই রামের রাজ্যাভিষেক হোক; এই কারণেই ভরতকে এবং ভরতের পিতামহকে খবর দেননি দশরথ। ভরত রাজ্য দাবী করতে পারে- দশরথের এই আশঙ্কা অমূলক ছিল না। এই আশঙ্কার পেছনে একটি বড় কারণ ছিল। কারণটি হল দশরথ কৈকেয়ীকে বিয়ে করার সময়ই কৈকেয়ীর পিতার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, কৈকেয়ীর পুত্রকেই তিনি রাজা করবেন। এই কথাটি স্বয়ং রাম নিজমুখে স্বীকার করেছেন বাল্মীকি রামায়ণে। পরবর্তীতে রামকে বনবাসে পাঠানো হলে এবং রামের শোকে দশরথের মৃত্যু হলে ভরত মামার বাড়ি থেকে ফিরে আসেন। ভরতের মনে রাজ্যের লোভ ছিল না। তাই ভরত রামকে ফিরিয়ে আনার জন্য বনে গমন করেন, রামকে বনবাস ত্যাগ করে রাজ্য গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করেন;  কিন্তু ফিরে গিয়ে রাজ্য গ্রহণ করতে অসম্মত হন রাম। অসম্মতির কারণ হিসাবে রাম ভরতকে  বলেন, “ তুমি রাজা দশরথ হতে জন্মগ্রহণ করেছ, এখন যেমনটা বললে তা  তোমার সমুচিত হচ্ছে। কিন্তু দেখ পূর্বে পিতা তোমার মাকে বিয়ে করার সময়  কেকয়রাজকে প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন, রাজন! তোমার এই কন্যা যে পুত্রের জন্ম দেবে আমি তাকেই সমস্ত সাম্রাজ্য অর্পণ করবো। এরপর দেবাসুর সংগ্রাম উপস্থিত হলে তিনি তোমার জননীর শুশ্রূষায় সন্তুষ্ট হয়ে দুটি বর অঙ্গীকার করেন। সেই অনুসারে তোমার জননী তোমার রাজ্য ও আমার বনবাস এই দুটি বর প্রার্থনা করেছিলেন। মহারাজও অগত্যা সেই বিষয়ে সম্মত হন এবং আমাকে চৌদ্দ বছরের জন্য  বনবাসে নিয়োগ করেন।” (২/১০৭)

সুতরাং স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে , দশরথ ভরতের মাতা কৈকেয়ীকে বিয়ে করার আগেই ভরতের মাতামহের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে,  তার পৌত্রকেই রাজা করবেন তিনি। কিন্তু পরবর্তীতে দশরথের মনে রামের প্রতি পক্ষপাতের সৃষ্টি হয়। প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে গিয়ে দশরথ রামকেই রাজা করার কথা চিন্তা করতে থাকেন।সম্ভবত এই অভিপ্রায়েই দশরথ নিজেই রামের রাজ্যাভিষেকের আগে  ভরতকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং রাজ্যাভিষেকের সময় তাকে ডাকিয়ে আনেন নি। রামের প্রতি দশরথের এমনই পক্ষপাত ছিল যে  এক পর্যায়ে দশরথ রামকে বলেছিলেন, “ বৎস! আমি কৈকেয়ীকে বরদান করে যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছি, অতএব আজ তুমি আমাকে বন্ধন করে নিজেই অযোধ্যা রাজ্য গ্রহণ কর।(২/৩৪)

রাম যে  জানতেন,  দশরথের ভরতকে রাজা করার প্রতিজ্ঞা ছিল, তা আগেই বলেছি। পিতৃসত্য পালনকারী হিসাবে রামকে বেশ মহিমান্বিত করা হয়ে থাকে।কিন্তু সত্যিই কি রাম পুরোপুরি পিতৃসত্য পালন করেছিলেন?  রাম যদি পুরোপুরি পিতৃসত্য পালন করতেন তাহলে তিনি কখনোই  যুবরাজ হওয়ার প্রস্তাবে সম্মত হতে পারতেন না। রামের এই কর্ম তার পরবর্তীকালের পিতৃসত্যরক্ষার ইমেজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে একেবারেই মনে হয় না!

দশরথের প্রতি রামের দৃষ্টিভঙ্গি

রামায়ণের কাহিনীর একটি প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হল রামের পিতৃসত্যপালন। পিতার আজ্ঞা পালন করার জন্য রাম ১৪ বছরের জন্য বনে বাস করেছিলেন। কিন্তু  এখানেই কাহিনীর ইতি হয়নি। এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে রামের মনেও একপ্রকার টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছিল। রাম তার পিতা দশরথের সম্বন্ধে এমন অনেক মন্তব্যও করেছেন যা রামের পিতৃভক্তির ছবির সম্পূর্ণ বিপরীতে যায়। যেমনঃ বনবাসকালে রাম তার পিতা দশরথের সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন, “ পিতার বয়স হয়েছে এবং আমিও তাকে পরিত্যাগ করে এসেছি। সুতরাং তিনি এখন অনাথ, জানি না এরপর কামের অনুরোধে তিনি কৈকেয়ীর বশবর্তী হয়ে কি করবেন? রাজার মতিভ্রম এবং এই বিপদ উপস্থিত দেখে আমার নিশ্চিতভাবে মনে হচ্ছে যে ধর্ম ও অর্থ থেকে কামই অধিক শক্তিশালী।” (২/৫৩)

এখানে রামের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি দশরথকে কামান্ধ বলে মনে করেন এবং মনে করেন দশরথের মতিভ্রম হয়েছে।

অবশ্য কোনো প্রকার সমালোচনার উদ্দেশ্যে আমি রামের এই মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিই নি। আমি নিজেও মনে করি রাম এক্ষেত্রে ঠিক কথাই বলছেন! দশরথ সত্যই কামের বশবর্তী হয়েই রামের বনবাসে গমনের মত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন। দশরথ কৈকেয়ীকে আগেভাগেই দুটি বর দিয়েছিলেন যা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। দশরথের এই কাজ কাউকে সইসমেত ব্ল্যাংকচেক দেওয়ারই মত। ব্ল্যাংকচেকের ক্ষেত্রে যেমন কেউ তার ইচ্ছামতই ammount বসিয়ে নিতে পারে, তেমনি কৈকেয়ী পরবর্তীকালে দশরথের আগাম দুটি বরের অসদ্ব্যবহার করেছিলেন।

যাইহোক,  রামের এই বক্তব্য তার পিতৃভক্ত স্বরূপের অনেকটা বিপরীতে যায় বলেই মনে হয়। এই বিষয়টি অনেক রক্ষণশীল রামভক্তদের ব্যথিত করতে পারে। এর ফলে হয়তো তাদের মনেও প্রশ্নের সৃষ্টি হবে, সত্যিই কি রাম ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’?

পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্রের ধ্বজাধারী

রাম পিতৃতান্ত্রিক বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একজন আদর্শ প্রতিনিধি ছিলেন। রামের করা বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে  ক্ষণে ক্ষণে তার সেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। একজন নারী অপহরণের শিকার হলেন। তাকে উদ্ধার করার পর তার ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করার পরিবর্তে রাম তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, একের পর এক কটূ কথা বলতে থাকেন এবং সেই নারীকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বাধ্য করেন। আজকের দিনেও কিছু নিকৃষ্ট লোকেদের দেখা যায় যারা কোনো নারী নির্যাতিত, ধর্ষিত হওয়ার পর সর্বপ্রথম তার চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তোলেন-  “সেই নারীটির চরিত্র কেমন ছিল? সেই নারীটি কি পোষাক পড়েছিল? সর্বোপরি সেই নারীটি কেন ঘর থেকে বেরিয়েছিল? ঘর থেকে না বেরোলে তো এমন ঘটনা ঘটার কথা নয়।অসময়ে ঘোরাঘুরি করলে এমন ঘটনা তো ঘটতেই পারে। সেই নারীটিরই আসলে শাস্তি হওয়া উচিত।” এই নিকৃষ্ট মানুষগুলোর সাথে এই বিষয়ে রামের তেমন কোনো পার্থক্য আমার চোখে পড়ে না।

সীতা অগ্নি পরীক্ষা দিলেন, শুদ্ধ বলে প্রমাণিত হলেন। এরপর কি হল? এবার রামরাজ্যের প্রজারা সীতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললো- “ সীতা এতদিন পরপুরুষের অধীনে ছিলেন, এরপরও রাম কিভাবে তাকে গ্রহণ করলেন? এরপরও কেন রাম সীতাকে ঘৃণা করেন না?” রাম একজন তথাকথিত প্রজারঞ্জক রাজা। তিনি দুষ্ট প্রজাদের অন্যায় আবদার মেনে নিলেন, সীতাকে নির্বাসিত করলেন। এরপর যখন সীতাকে গ্রহণ করার তার ইচ্ছে হল তখন তিনি সীতার কাছে আবার সতীত্বের পরীক্ষা চাইলেন! এত অপমান বঞ্চনা সহ্য করতে না পেরে অবশেষে সীতা পাতালে প্রবেশ করলেন।

এ থেকে রামরাজ্যবাসীরা ঠিক কি শিক্ষা পেল? এই শিক্ষাই পেল যে- কোনো নারী কোনো অপরাধের শিকার হলে সর্বপ্রথম তাকে দোষারোপ করতে হবে। সুযোগ পেলেই তাকে নির্যাতন করতে হবে। এই রকম শিক্ষাই কি সমাজে নারীদের অবস্থা খারাপ থেকে খারাপতর করবে না?

এছাড়া রামের অনেক কথা থেকে মনে হয় রাম সীতাকে একটি বস্তু হিসাবেই দেখতেন। সুযোগ পেলেই রাম সীতাকে দান করে দেওয়ার কথা বলেছেন। বাল্মীকি রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডের ১৯ তম সর্গে রাম তার সৎ মা  কৈকেয়ীকে বলেছেন, “ দেবী! রাজাজ্ঞার অপেক্ষা কি আপনার অনুমতি পেলে ভ্রাতা ভরতকে নিজেই রাজ্য-ধন-প্রাণ ও প্রফুল্লমনে সীতা পর্যন্ত প্রদান করে প্রতিজ্ঞাপালন ও আপনার হিতসাধন করব।”

এখানে রাম বলছেন, রাম ভরতকে সীতা পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারেন।সীতা কি কোনো দান করে দেওয়ার বস্তু, যে চাইলেই তা ভরতকে বা অন্য কাউকে দান করে দেওয়া যায়?

এছাড়া এমন অনেক কথা বলেছেন রাম যার মাধ্যমে তার পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা ফুটে উঠেছে। রাম বলেছেন, “ জমদগ্নিনন্দন মহাবীর রামও পিতার আদেশে কুঠারের মাধ্যেমে মায়ের মাথা কেটে ফেলেছিলেন।দেবী! এই সমস্ত দেবতুল্য মহাত্মা এবং অন্যান্য অনেকেই পিতার আদেশ পালন করেছিলেন, অতএব যাতে পিতার মঙ্গল হয়, আমি তাই করবো।” (২/২১)

অর্থাৎ রামের কথায় বোঝা গেল, তার কাছে পিতার আজ্ঞাই সবচেয়ে বড়, পিতার আজ্ঞায় যদি কেউ মায়ের মুণ্ডুপাত করেন তবে রামের তাতেও কোনো আপত্তি নেই; বরং এই ধরণের মানুষেরা তার কাছে দেবতার সমান।

রামের সাথে তার মা কৌশল্যাও বনে যেতে চাইলে  রাম তার মাকে নিরুৎসাহিত করে বলেছিলেন, “ মাতা, কৈকেয়ী বঞ্চনা করে মহারাজকে যৎপরোনাস্তি দুঃখিত করেছেন; এখন আমি বনে গমন করছি, আবার আপনিও যদি আমার অনুসরণ করেন, তাহলে তিনি (দশরথ) নিশ্চয়ই প্রাণ বিসর্জন করবেন। নারীদের স্বামী পরিত্যাগের অপেক্ষা নিষ্ঠুরতা আর কিছুতেই নেই, সেই জঘন্য বিষয় আপনি মনেও স্থান দেবেন না। জগতের পতি পিতা যতদিন জীবিত থাকবেন, আপনি কায়মনোবাক্যে তার সেবা করুন, এটাই আপনার ধর্ম। “ (২/২৪)

এই সর্গেই রাম তার মা কৌশল্যাকে আরও বলেন, “মাতা, মহারাজ আপনার স্বামী এবং আমার পরম গুরু পিতা , বিশেষত তিনি সকলের অধীশ্বর এবং প্রভু। তার আজ্ঞা পালন করা আমাদের উভয়েরই কর্তব্য। … মাতা, কায়মনে সেই বৃদ্ধ রাজার হিতসাধন করা আপনার বিধেয়। যে নারী ব্রতোপবাসশীল হয়ে স্বামীর সেবা না করে তার অধোগতি লাভ হয়, স্বামীর সেবা করলে স্বর্গপ্রাপ্তি হয়ে থাকে। দেবতাকে পূজা ও নমস্কার করতে যার শ্রদ্ধা নেই তার স্বামীসেবা করাই শ্রেয়। দেবী! বেদ ও স্মৃতিশাস্ত্রে স্ত্রীজাতির এমন ধর্মই নির্দিষ্ট আছে। এখন আপনি স্বামীসেবায় মনোনিবেশ করে তার সংযমপূর্বক আমারই শুভোদ্দেশে অগ্নিকার্যে দেবগণের অর্চনা এবং ব্রতশীল বিপ্রগণের পূজা করবেন।” (২/২৪)

অযোধ্যাকাণ্ডের ১০১ তম সর্গে  রাম বলেছেন, “ ইহলোকে সাধুরা স্ত্রী, পুত্র এবং শিষ্যদের যেমন স্বৈরনিয়োগের পাত্র বলে জানেন, মহারাজের পক্ষে আমরাও তেমন।”

এই কাণ্ডের ২১ তম সর্গে রাম তার মা কৌশল্যাকে বলেছেন, “মহারাজ আমাদের পিতা, আমাদের উপর তার সর্বাঙ্গীণ প্রভুত্ব আছে। বিশেষতঃ দেবীর তিনি স্বামী, তিনিই গতি ও তিনিই ধর্ম। এর বেশি আর কি বলব, তিনি জীবিত আছেন, বিশেষত পুত্র পরিত্যাগ করেও ধর্ম রক্ষায় প্রস্তুত হয়েছেন, এমন অবস্থায় তার আজ্ঞাক্রমে দেবীও অন্য অনাথা স্ত্রীলোকের মত আমার সাথে এই স্থান হতে বহিষ্কৃত হতে পারেন।”

রামায়ণের একটি মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ই হচ্ছে পিতৃসত্যপালন। পিতার কথা পালন করার জন্য যদি ১৪ বছর বনেও থাকতে হয়, তবে তাও বেশ ভালো একটি বিষয়, এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে মহাকাব্য জুড়ে। একজন সন্তানের জন্য মা-বাবা সত্যিই অনেক কিছু করে থাকেন।পৃথিবীতে যখন একজন শিশুর জন্ম হয়, তখন সে ভীষণ অসহায় থাকে। ছোটো বড় সকল বিপদ থেকে মা-বাবাই আমাদের আগলে রাখেন।সন্তানের জন্য মাতা-পিতার এই ভালোবাসার ঋণ হয়তো সম্পূর্ণ জীবনেও শোধ করা সম্ভব নয়। তাই সন্তানেরও কর্তব্য মা বাবাকে ভালোবাসা, তাদের দুঃখ না দেওয়া, সুসময়ে, দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকা। কিন্তু অন্ধভাবে মা বা বাবার সকল কথা পালন করা কোনো ভালো বিষয় হতে পারে না। একজন ডাকাত তার ছেলেকে ডাকাতি করতে বলতে পারে, এক্ষেত্রে যদি কেউ পিতৃআজ্ঞা পালন না করে ডাকাতি থেকে বিরত থাকতে চায়, তবে তার এই সিদ্ধান্তকে কখনোই খারাপ বলা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবার কথা পালন না করাই ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। পিতার আজ্ঞায় পরশুরাম মায়ের মাথা কেটে ফেলেছিলেন, এই বিষয়টিকে রামচন্দ্র ভালো চোখেই দেখতেন। পিতার এই ধরণের আজ্ঞা পালন করাকে কোনোমতেই আমরা অনেকে ভালো বলে মনে করতে পারি না। আমাদের বর্তমান বিবেকবোধ আমাদের এমন পিতৃ বা মাতৃ আজ্ঞা পালন করতে বাঁধা দিয়ে থাকে। তাহলে রামচন্দ্র কেন এই বিষয়টিকে ভালো বলে মনে করতেন? এর উত্তর আছে তৎকালীন সমাজ এবং সেই সমাজ গঠনের ইতিহাসের মধ্যেই। পৃথিবীতে সবসময় পিতৃতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত ছিল না, এর স্থলে একসময় মাতৃতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। কালের বিবর্তনে যখন মাতৃতন্ত্র ক্ষয়ে পিতৃতন্ত্রের সূত্রপাত হল, তখন ক্ষমতা পুরুষ পিতার হাতে কেন্দ্রীভূত হল। মায়ের চেয়ে পিতাকেই উপরে তুলে ধরা হল। পিতাকেই সবচাইতে বেশি মহিমান্বিত করা  হল। আর পিতাই যে সবচাইতে শ্রেষ্ঠ, পিতার সকল আজ্ঞা পালনীয় এবং এটাই ধর্ম- প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ধরণের শিক্ষাই সবাইকে দেওয়া হল। কঠোর এক পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করার সুবাদে রামও নিশ্চিতভাবে এই শিক্ষাই পেয়েছেন। এই আদর্শের বশীভূত হয়েই পিতার ভালো বা মন্দ সকল কথাকেই রাম পালনীয় বলে মনে করেছিলেন। পরিবার মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। একটি সুন্দর পরিবার পারস্পরিক ভালোবাসার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। কর্তৃত্বের মানসিকতা নিয়ে কেবল মগডালে বসে ছড়ি ঘোরানো যায়, পরিবারে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা যায়, ভালোবাসার পরিবেশ গড়ে তোলা যায় না। এর মাধ্যমে পরিবারের মধ্যে কেবলই ফাটল ধরে থাকে। তাই সমাজের পিতৃতন্ত্র  মাতৃতন্ত্র প্রভৃতি নয়, বরং মানবের তন্ত্র চাই, ভালোবাসার তন্ত্র চাই।

কামাতুর রাম  

কাম-ক্রোধ-লোভ প্রভৃতি রিপুকে দমন করার উপদেশই হিন্দুশাস্ত্রের নানাস্থানে দেওয়া হয়ে থাকে। তবে তথাকথিত ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ সর্বদা নিজের কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিলেন না। স্বয়ং বাল্মীকিই তার রামায়ণে রামকে ‘কামার্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। অরণ্যকাণ্ডের ৭৫ তম সর্গে  বলা হয়েছে, “ জানিনা সীতার বিরহে কিভাবে বেঁচে থাকবো। কামার্ত রাম সীতাসংক্রান্ত মনে লক্ষ্মণকে এই বলে শোক করতে করতে রমণীয় পম্পা দেখতে  লাগলেন।“

এরপর কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডের ১ম সর্গে বলা হয়েছে, “রাম লক্ষ্মণের সাথে সেই মৎস্য এবং  পদ্মপূর্ণ পম্পায় গিয়ে ব্যাকুল মনে বিলাপ করতে লাগলেন। ঐ নদীতে দৃষ্টিপাত করা মাত্র তার মনে আনন্দের সৃষ্টি হল এবং ইন্দ্রিয়ও বিকৃত হল। তিনি  কামের  বশবর্তী হয়ে লক্ষ্মণকে বললেন, বৎস! এই পম্পার জল বৈদূর্যের [5] মত নির্মল … এখন কামোদ্দীপক বসন্ত উপস্থিত হয়েছে , সুখস্পর্শ বায়ু বইছে … আমি জানকি বিহীন , এখন বসন্ত আমার দুঃখ বাড়িয়ে চলেছে এবং কামও যারপরনাই সন্তপ্ত করছে। ঐ শোনো কোকিল হর্ষভরে কুহুরব করে যেন আমায় ডাকছে। আমি কামার্ত, ঐ সুরম্য প্রস্রবণে  পাখিরা মধুর স্বরে ডেকে আমাকে শোকাকুল করে তুলছে। … এই সমস্ত বৃক্ষ দাত্যূহের রতিরবে এবং পুরুষ কোকিলের রবে যেন স্বয়ং শব্দ করে আমার চিত্তকে বিকৃত করে দিচ্ছে।  এখন এই বসন্তের আগুন আমায় পুড়িয়ে দিচ্ছে। অশোকস্তবক তার অঙ্গার , ভৃঙ্গরব শব্দ এবং পল্লবই আরক্ত শিখা । লক্ষ্মণ! আমি সেই সূক্ষ্মপক্ষ্মযুক্ত নয়না সুকেশী মৃদুভাষিণী সীতাকে আর দেখছি না, এখন আমার বেঁচে থাকার কি দরকার? এই বসন্ত সীতার অত্যন্ত প্রীতিকর। তার কামপীড়ায় বর্ধিত এই শোকানল বোধহয় শীঘ্রই আমাকে দগ্ধ করবে।জনকীর আর দেখা নেই, চারপাশে সুন্দর বৃক্ষগুলো দেখছি , সুতরাং এ সময় কাম অত্যন্তই প্রবল হবে। অদৃশ্যা সীতা ও স্বেদনাশক  বসন্ত  উভয়ই আমার শোক প্রদীপ্ত করে তুলল। আমি জানকীর শোক ও চিন্তায় নিপীড়িত হচ্ছিলাম , এখন আবার এই নিষ্ঠুর বাসন্তী বায়ুও আমাকে পরিতপ্ত করল।

লক্ষ্মণ! এই সমস্ত উন্মত্ত ময়ূর ময়ূরী সহিত স্ফাটিক গবাক্ষতুল্য পবন কম্পিত পক্ষ বিস্তার করে  ইতস্তত নাচতে শুরু করেছে । আমি কামার্ত, এদের দেখে   আমার আরও চিত্তবিকার উপস্থিত হইতেছে। ঐ দেখ ময়ূরী ময়ূরকে পাহাড়ের চূড়োয় নৃত্য করতে দেখে কাম-আবেগে সঙ্গে সঙ্গে নাচছে । ময়ূরও সুরুচির পক্ষ প্রাবৃত করে কেকারবে পরিহাস করেই যেন অনন্য মনে তার কাছে  যাচ্ছে । বৎস! বোধহয় এই ময়ূরের বনে রাক্ষস আমার জানকীরে হরণ করে আনে নি,এইজন্যই তারা সুরম্য কাননে নৃত্য করছে। যাইহোক , এখন সীতা ব্যতিত বাস করা  ভীষণ কঠিন বলে মনে হচ্ছে। দেখ পক্ষীজাতিতেও অনুরাগ দৃষ্ট হয় । ঐ ময়ূরী কামবশে ময়ূরের অনুসরণ করছে। যদি বিশাললোচনা জানকীরে কেহ অপহরণ না করত , তাহলে তিনিও কামের বশবর্তী হতেন।

লক্ষ্মণ এই বসন্তকালে বনকুসুম আমার পক্ষে নিতান্ত নিস্ফল হল। বৃক্ষের যে সকল পুষ্প অত্যন্তই সুন্দর , ঐ দেখ, সেগুলো ভ্রমরদের সাথে নিরর্থক ভূতলে পড়ছে। আমার কামোদ্দীপক বিহঙ্গেরা দলবদ্ধ হয়ে হৃষ্ট মনে পরস্পরকে আহবান পূর্বকই যেন মধুর রবে কোলাহল করিতেছে। যে স্থানে পরবশা জানকী আছেন, বসন্ত যদি সেখানেও এসে থাকে , তাহলে তাকেও আমার মত শোক করতে হবে। …

লক্ষ্মণ আমি সেই পদ্মচক্ষু পদ্মপ্রিয় জানকিকে না দেখে  আর বাঁচতে পারছি না। কামের কি কুটিলতা , এখন আমার জানকি নেই, তাকে যে তাড়াতাড়ি পাবো , তার সম্ভাবনাও দেখছি না, এ সময় কামের প্রভাবেই সেই মধুরভাষিণী আমার স্মৃতিপথে উদিত হচ্ছেন। যদি এই বৃক্ষশোভী বসন্ত আমাকে অধিক নিপীড়িত না করত , তাহলে আমি উপস্থিত কামবিকার অনায়াসে সংবরণ করতে পারতাম। … এসকল পদ্মপত্র সীতার নেত্রকোষ সদৃশ এবং পদ্মপরাগবাহী বৃক্ষান্তর নিঃসৃত মনোহর বায়ু সীতারই নিঃশ্বাসের মতোই,  সন্দেহ নেই।

… গাছেদের শাখাগুলো বায়ুবেগে বিক্ষিপ্ত হচ্ছে এবং লতাগুলো মধুপানে মত্ত রমনীর মত এদের আলিঙ্গন করছে।

… ঐ দেখ একটি হংস পম্পার স্বচ্ছ জলে আমার মনোবিকার বাড়িয়ে দিয়ে হংসীর সাথে বিহার করছে। … এখন যদি আমি সাধ্বী সীতাকে দেখতে পাই , যদি এই পম্পাতটে তার সহবাসে কালক্ষেপ করি , তাহলে ইন্দ্রত্ব কি অযোধ্যা কিছুই চাহি না। এই রমণীয় তৃণশ্যামল প্রদেশে সীতার সহিত বিহার করলে নিশ্চয়ই নিশ্চিন্ত ও নিঃস্পৃহ হই।

রামের এসব কথা শুনে লক্ষ্মণ রামকে উপদেশ দেন,  আপনি শোক দূরে ফেলুন এবং কামুকতাও পরিত্যাগ করুন।  (৪/১)

এছাড়া কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডের ৩০ তম সর্গে বলা হয়েছে, “ এদিকে রাম একান্ত কামার্ত; শরতের পান্ডুবর্ণ আকাশ, নির্মল চন্দ্রমন্ডল ও জ্যোৎস্নাধবল রজনী দেখলেন; সুগ্রীবের সুখভোগে আসক্তি এবং জানকীর অপহরণের কথা চিন্তা করলেন; বুঝলেন, সৈন্যের উদযোগকাল পার হয়ে গিয়েছে। তিনি যারপর নাই কাতর হয়ে মোহিত হলেন এবং কিছুক্ষণ পরে সংজ্ঞালাভ করে হৃদয়বাসিনী সীতাকে ভাবতে লাগলেন।” [6]

এখানেও লক্ষ্মণ রামকে তার কাম সংবরণ করতে উপদেশ দেন-

“ ঐ সময় শ্রীমান লক্ষ্মণ ফল সংগ্রহের জন্য গিরিশৃঙ্গ পর্যটন করে ফিরে এসে দেখলেন, রাম নির্জনে দুর্বিষহ চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে শূণ্য মনে রয়েছেন। তা দেখে তিনি যারপরনাই বিষন্ন হলেন, বললেন, আর্য! কামের অধীনতায় কি হবে, পৌরুষই বা কেন পরাভূত হয়, এখন কর্মযোগে মনঃসমাধান করুন।” (৪/৩০)   [7]

যৌনতাকে আমি বিরূপ দৃষ্টিতে দেখি না, মনে কামের উদয় হওয়াও কোনো অপরাধ নয়। কাম মানুষের খুব স্বাভাবিক একটি প্রবৃত্তি। কিন্তু অনেক রক্ষণশীল ধর্মবাজেরা যুগ যুগ ধরে কামকে খারাপ দৃষ্টিতেই দেখেছে। মানুষের এমন স্বাভাবিক এবং সহজাত প্রবৃত্তিকে তারা পাপ বলে ঘোষণা করেছিল। বর্তমানেও এই রক্ষণশীলদের অনেক অনুসারীদের দেখা যায়। এদের অনেকে আবার রামকে পুরুষোত্তম বলেও মনে করেন।  অন্যান্য অনেক মন্দ কাজের কারণে আমি রামকে ‘পুরুষোত্তম’ বলে মনে করি না, তবে রামের কামার্ত হওয়াকে আমি খারাপ দৃষ্টিতে দেখি না। কিন্তু কামকে যারা খারাপ দৃষ্টিতে দেখে সেইসব রক্ষণশীলদের মাপকাঠিতেও রামকে ‘পুরুষোত্তম’ বলে প্রমাণিত করা সম্ভব নয় বলেই , রামের এই দিকটি তুলে ধরা হয়েছে।

বীর নয় কাপুরুষ

বনবাসে থাকাকালীন  লঙ্কার রাজা রাবণ রামের স্ত্রী সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। সীতা উদ্ধারের জন্য রাম সুগ্রীবের সাথে মিত্রতা করেন। পূর্বেই শর্ত স্থির হয়, রাম সুগ্রীবের ভাই বালীকে হত্যা করবেন এবং তার বিনিময়ে সুগ্রীব সীতা সন্ধানে ও সীতা উদ্ধারে রামকে সহায়তা করবে। ঘটনাক্রমে সুগ্রীব ও বালী এই দুই বানর ভাইদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হয়েছিল। তাই ভাই বালীকে হত্যা করায় সুগ্রীবের অভিলাষ ছিল।

যাইহোক, সুগ্রীবের সুবিধার্থে রাম বানররাজ বালীকে হত্যা করেন। এক্ষেত্রে আমাদের আলোচ্য বিষয় হল রাম ঠিক কিভাবে সুগ্রীবকে হত্যা করেন।যদি সম্মুখযুদ্ধে রাম বালীকে পরাজিত করতেন, তাহলে তাতে কোনো আপত্তি থাকতো না। কিন্তু বালী ও সুগ্রীবের মুষ্টিযুদ্ধ চলাকালে রাম তার তীরধনুক নিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন, যাতে আড়াল থেকে তীর দ্বারা বিদ্ধ করে তিনি বালীকে হত্যা করতে পারেন। এ সম্বন্ধে বাল্মীকি রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডের দ্বাদশ সর্গে আছে, “এরপর রাম প্রিয়দর্শন সুগ্রীবকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘সখা! চল আমরা এই ঋষ্যমুখ হতে কিষ্কিন্ধ্যায় যাত্রা করি । তুমি সবার আগে যাও , গিয়ে সেই ভ্রাতৃগন্ধী বালীকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান কর।’ তখন সকলে কিষ্কিন্ধ্যায় উপস্থিত হলেন এবং কোনো এক নিবিড় বনে প্রবেশ করে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলেন। এই অবসরে সুগ্রীব বস্ত্র দ্বারা কটিতট দৃঢ়তরভাবে বন্ধন করে গগণতল ভেদ করেই যেন ঘোর রবে বালীকে আহ্বান করতে লাগলেন। তখন মহাবীর বালী সুগ্রীবের সিংহনাদ শুনে ভীষণ রেগে গেলেন এবং সূর্য যেমনি অস্তাচল হইতে উদয়াচলে গমন করে, তেমনি শীঘ্রই বাইরে বেরিয়ে এলেন। এরপর আকাশে  যেমন বুধ ও শুক্রের যুদ্ধ হয় তেমনি দুজনে ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হল । তারা ক্রোধে অধীর হয়ে পরস্পর পরস্পরকে কখনো বজ্রতুল্য মুষ্টি এবং কখনো বা তলপ্রহার করতে লাগিলেন। ঐ সময় রাম ধনুর্ধারণ করে বৃক্ষের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। তিনি তাদের অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের মত একইরকম দেখতে পেলেন । তখন তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য তিনি দেখতে পেলেন না এবং তিনি প্রাণনাশক শর ত্যাগেও বিরত রইলেন।”

এই বার রাম বালীকে হত্যা করলেন না। কিন্তু এরপরের বার সুগ্রীবের গলায় একটি মালা পড়িয়ে দেওয়া হল, যাতে যুদ্ধের সময় তাকে চেনা যায় এবং বালিকে সহজেই তীরবিদ্ধ করা যায়। এই পদ্ধতি অবলম্বন করে এবার রাম বালীকে হত্যা করেন। কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডের ১৬ তম সর্গে আছে-

“ এই অবসরে মহাবীর বালীর বৃদ্ধি এবং সুগ্রীবের হীনতা দৃষ্ট হইল। তার দর্প চূর্ণ হয়ে গেল। তিনি বালীর প্রতি যৎপরোনাস্তি ক্রোধাবিষ্ট হলেন এবং ইঙ্গিতে রামকে নিজের হীনতা দেখাতে লাগলেন। সুগ্রীব হীনবল হয়ে মুহুর্মুহু চারদিকে দৃষ্টিপাত করছেন, মহাবীর রাম তা দেখতে পেলেন এবং তাকে অতিশয় কাতর বোধ করে বালীবধের জন্য সাপের মত ভীষণ শর লক্ষ্য করলেন । পরে তিনি তা শরাসনে সন্ধান করে যম যেমন কালচক্র আকর্ষণ করেন , তেমনি তা আকর্ষণ করলেন । তখন পাখিরা রামের জ্যা শব্দে একান্ত ভীত হল এবং প্রলয় মোহে মোহিত হয়েই যেন পলায়ন করতে লাগল । ঐ প্রদীপ্ত বজ্রতুল্য শর বজ্রের মত ভীষণ শব্দ করে বের হয়েই বালীর বুকে গিয়ে পড়ল।”

সুতরাং দেখা যাচ্ছে রাম সুগ্রীবের সাথে যুদ্ধরত বালীকে আড়াল থেকে তীর ছুড়েই হত্যা করেন। রামের কেন আড়াল থেকেই বালীকে হত্যা করার প্রয়োজন হল? রামের এহেন কাপুরুষতার কারণ কি? রাম কি নিজেকে বীরত্বে বালীর সমকক্ষ বলে মনে করতেন না?মনে হয় রাম নিজেকে কাপুরুষ বলেই মনে করতেন, রামের এই কাজের মধ্যে কাপুরুষতা, ভিরুতা ছাড়া অন্য কিছুর পরিচয় পাওয়া যায় না।

বালীকে চোরের মত হত্যা করার পর রাম নানাভাবে তার এই অপকর্মকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছেন এবং বেশ কিছু কুযুক্তিও দিয়েছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আমার  ‘ রামচন্দ্রের বালীহত্যা- রাম ধর্মের অনুসারী নাকি অধর্মের?’ এই লেখাটি পড়তে পারেন। এই লেখাটি এই বিষয়ে সকল তথ্যসূত্র দেওয়া হয়েছে।

মাংসভক্ষণকারী

হিন্দু সমাজে এমন লোকের সংখ্যাও নেহাতই কম নয় যারা মাংসভক্ষণকে গর্হিত কাজ বলে মনে করেন, মাংসভক্ষণ তাদের চোখে পাপের সামিল। কিন্তু রামায়ণ হতে দেখা যায়, রামচন্দ্র সচরাচর মাংস ভক্ষণ করতেন। একথা জানার পর নিরামিষাশী হিন্দুরা রামকে কোন চোখে দেখবে? তারা কি রামের পুনর্মূল্যায়ণে প্রবৃত্ত হবে, নাকি অন্ধত্বের কাছে নিজের নৈতিকতাকে বিসর্জন দেবে? নাকি তারা তাদের নৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন করবে?

রামচন্দ্র মাংসভক্ষণ করতেন, এই দাবী যেহেতু করেছি; এই বিষয়ে রামায়ণ হতেই কিছু প্রমাণ দেওয়া যাকঃ

অযোধ্যাকাণ্ডের ৫২ তম সর্গে আছে, “এরপর রাম সুসমৃদ্ধ শস্যবহুল বৎস্যদেশে উপস্থিত হয়ে লক্ষ্মণের সাথে বরাহ, ঋষ্য, পৃষৎ ও মহারুরু এই চাররকমের মৃগ বধ করলেন এবং তাদের পবিত্র মাংস গ্রহণ করে সন্ধ্যায় অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হয়ে বনের মধ্যে প্রবেশ করলেন ।“ [8]

রাবণ যখন তপস্বীর বেশ ধরে সীতাকে হরণ করতে এসেছিলেন, তখন সীতা রাবণকে বলেছিলেন অপেক্ষা করতে, তার স্বামী রাম শীঘ্রই নানা রকমের পশু শিকার করে নিয়ে আসবে। অরণ্যকাণ্ডের ৪৭ তম সর্গে সীতা রাবণকে বলেছেন, “ আপনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম  করুন, এখানে থাকতে পারবেন। আমার স্বামী এখনই বনজাত বিভিন্ন খাদ্য এবং অনেক রুরু, গোধা ও বরাহ বধ করে প্রচুর মাংস নিয়ে আসবেন।“

 অরণ্যকাণ্ডের ৫৫ তম সর্গে রাম ও লক্ষ্মণের পশুহত্যার বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, “এরপর রাম ও লক্ষ্মণ সেখান থেকে ক্রোশ মাত্র গিয়ে অনেক পবিত্র মৃগ হত্যা করে বনের মধ্যে ভোজন করলেন এবং মাতঙ্গসঙকুল বানরবহুল বিপিনে সুখে বিচরণ করে রাতে নদীর তীরে আশ্রয় নিলেন।“

অযোধ্যাকাণ্ডের ৫৬ তম সর্গে রাম লক্ষ্মণকে বলেছিলেন, “  বৎস্য, এখন আমাদের মৃগমাংস আহরণ করে গৃহযাগ করতে হবে। যারা অনেকদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছা করেন, তাদের বাস্তুশান্তি করা আবশ্যক। অতএব তুমি অবিলম্বে মৃগবধ করে আন। শাস্ত্রনির্দিষ্ট বিধি পালন করা সর্বতোভাবেই শ্রেয় হচ্ছে।

তখন লক্ষ্মণ বন হতে মৃগ বধ করে আনলেন। তা দেখে রাম পুনরায় তাকে বললেন , বৎস্য, তুমি  এই মৃগের মাংস পাক কর ; আমি নিজেই বাস্তুশান্তি করব। দেখ, আজকের দিনের  নাম ধ্রুব এবং এই মুহূর্তও সৌম্য , অতএব তুমি এই কাজে  যত্নবান হও। তখন লক্ষ্মণ জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে পবিত্র মৃগমাংস নিক্ষেপ করলেন এবং তা রক্ততশূণ্য ও উত্তপ্ত হয়েছে দেখে রামকে বললেন, আর্য, আমি এই সর্বাঙ্গ সুন্দর কৃষ্ণ বর্ণ মৃগ আগুনে পাক করে আনলাম, আপনি এখন গৃহযাগ আরম্ভ করুন।“

আমার দৃষ্টিতে মাংসভক্ষণ কোনো অপরাধ নয়, তবে যারা মাংসভক্ষণকে পাপজনক বলে মনে করেন, তারা এই রামচন্দ্র বিষয়ক এই তথ্যগুলো একবার ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন এই আশা রাখি।

গোমাংসভক্ষক

বর্তমানে অধিকাংশ হিন্দুরাই গোমাংস খাওয়াকে খারাপ চোখে দেখে থাকেন। গোমাংস খাওয়ার অপরাধে অনেককে হত্যাও করা হয়ে থাকে কিন্তু একটু অবাক করার মত বিষয় হলেও সত্যি যে রাম নিজে গোমাংস খেতেন।

বাল্মীকি রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডের ৫৪ তম সর্গে রয়েছে, “ মহর্ষি ভরদ্বাজ রামের এমন কথা শুনে তাকে স্বাগত প্রশ্ন পূর্বক অর্ঘ্য, বৃষ, নানাপ্রকার বন্য ফল-মূল ও জল প্রদান করলেন এবং তার অবস্থিতির নিমিত্ত স্থান নিরূপন করে অন্যান্য মুনিদের সাথে তাকে বেষ্টন করে উপবিষ্ট হলেন।“

ব্যক্তিগতভাবে গোমাংস খাওয়াকে কোনো খারাপ কাজ বলে আমি মনে করিনা। তবে যারা গোমাংস খাওয়ার বিরোধী তারা রামকে কোন চোখে দেখবেন?  যারা রামকে ‘পুরুষোত্তম’ বলে মনে করেন তারা কি রামের গোমাংস ভক্ষণকেও উত্তম কার্য বলে মনে করেন? গোমাংস খাওয়াকে তারা যদি ‘অধম’ কাজ বলেই মনে করেন তাহলে গোমাংসভক্ষণকারী কিভাবে  তাদের চোখে উত্তম বলে  বিবেচিত হতে পারে?

মিথ্যাবাদী

কথায় আছে, মিথ্যা বলা মহাপাপ। মিথ্যা বলা যদি সত্যিই মহাপাপ হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হয় শ্রীরামচন্দ্র এমন মহাপাপের সাথে জড়িত ছিলেন। রাম সময়ে সময়ে অনেক মিথ্যা কথা বলেছেন, যদিও  কিষ্কিন্ধ্যাকান্ডের ১৪ তম সর্গে রাম সুগ্রীবকে বলেছিলেন, “ আমি প্রাণসঙ্কটেও মিথ্যা বলিনি এবং ধর্মলাভের লোভেও কখনো বলবো না।” আসলে রামের  এই কথাটাও একটা মিথ্যা ছিল। কেন?  কারণ রাম ইতিপূর্বেই অনেক মিথ্যা  বলেছিলেন। আর পূর্বে মিথ্যা কথা বলার পর যদি কেউ বলে, সে কোনোদিনো কোনো মিথ্যা বলেনি, তাহলে তার চাইতে বড় মিথ্যাবাদী আর কে হতে পারে?

রাম কি কি মিথ্যা বলেছিলেন তা জানা যাক।

রামের বনবাসকালে শূর্পনখা রামকে প্রেম নিবেদন করতে এলে রাম নিজেকে বিবাহিত বলে দাবী করেন এবং ভাই লক্ষ্মণকে অবিবাহিত বলে দাবী করেন। একথা বলে রাম শূর্পনখাকে লক্ষ্মণের কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বাল্মীকি রামায়ণ পড়লে দেখা যাবে  লক্ষ্মণের আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। এই বিষয়ে বাল্মীকি রামায়ণ হতে যেসকল তথ্য পাওয়া যায় তার উল্লেখ পর পর করছিঃ

বালকাণ্ডের ৭১ সর্গ হতে জনকের বক্তব্য জানা যায়। এস্থানে জনক দশরথকে বলেছেন, “ এক্ষণে আমি প্রীতমনে দুই কন্যাই দান করব। দেবকন্যার মত সুরূপা বীর্যশুল্কা জানকীকে রামের হাতে এবং ঊর্মিলাকে লক্ষ্মণের হাতে দেব। ত্রিসত্য বলছি, আমি প্রীতমনে অবশ্যই এই কাজ  করবো। এখন আপনি রাম ও লক্ষ্মণের বিবাহোদ্দেশে গোদানবিধি ও পিতৃকৃত্য নির্বাহ করে দিন। আজ মঘানক্ষত্র। আগামী তৃতীয় দিনে প্রশস্ত উত্তরফল্গুনি নক্ষত্রে বিবাহসংস্কার সুসম্পন্ন হতে পারবে।”

বালকাণ্ডের ৭২ সর্গে বলা আছে, “ ফলত সীতা ও ঊর্মিলার সাথে রাম ও লক্ষ্মণের এই যৌন সম্বন্ধ সম্যক উপযুক্তই হল এবং এদের যে প্রকার রূপ, এরা তারও অনুরূপ হল।”

বালকাণ্ডের ৭৩ সর্গে আছে, “ রাজা জনক মন্ত্রোচ্চারণ ও উদক প্রক্ষেপ করে রামচন্দ্রকে সীতা সম্প্রদান করে আনন্দিত মনে লক্ষ্মণকে বললেন, লক্ষ্মণ! এখন তুমি এই স্থানে আগমন কর। তোমার মঙ্গল হোক। আমি ঊর্মিলাকে সম্প্রদান করি, তুমি অবিলম্বে তার পাণিগ্রহণ কর। জনক লক্ষ্মণকে এমন বলে ভরতকে বললেন ভরত তুমি মাণ্ডবীকে গ্রহণ কর। শত্রুঘ্নকে বললেন, শত্রুঘ্ন, তুমিও শ্রুতকীর্তিকে গ্রহণ কর। তোমরা সকলেই সুশীল ও চরিতব্রত। এখন আর দেরি না করে পত্নীদের সাথে সমাগত হও। এরপর কুমার চতুষ্টয় বশিষ্ঠের মতানুসারে ঐ চারটি কুমারীর পাণিগ্রহণ করলেন।এরপরে তারা অগ্নি, বেদি, রাজা জনক ও মহাত্মা ঋষিদের প্রদক্ষিণ করে শাস্ত্রোক্ত প্রণালী অনুসারে বিবাহ করলেন। অন্তরিক্ষ হতে পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল।”

 বাল্মীকি রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডের ১১৮ তম সর্গে সীতা বলেছেন, “ ঊর্মিলা নামে আমার এক সুন্দরী বোন আছেন, পিতা তাহরও লক্ষ্মণের সাথে বিবাহ দিলেন। দেবী! সেই অবধি আমি ধর্মতঃ স্বামীর প্রতি অনুরক্তই রয়েছি।”

প্রমাণিত হল যে লক্ষ্মণ ইতিমধ্যেই বিয়ে করেছিলেন। সুতরাং  রাম যে লক্ষ্মণকে অবিবাহিত বলেছিলেন, তা মিথ্যাকথা ছাড়া আর অন্য কিছু ছিল না।

এছাড়া বনে গমনের সময় রামের গুহ নামে এক নিষাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল।  নিষাদ গুহকে রাম বলেছিলেন যে বনবাসকালে তিনি নিরামিষ ভক্ষণ করবেন কিন্তু পরবর্তীতে রাম এর বিপরীত কাজ করেছিলেন। রাম তার বনবাসের সময় অনেকবার পশু শিকার করেছেন এবং মাংস ভক্ষণ করেছেন।

রামের মাংসভক্ষণ বিষয়টি নিয়ে আগেই আলোচনা করা হয়েছে, তাই এই একই বিষয় নিয়ে আর কিছু বলছি না।

দাসপ্রথার সমর্থক

বর্তমান সময় আমরা কল্পনাও করতে পারিনা যে কোনো মানুষ আরেকজন মানুষের দাস হতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বিশ্বের নানা স্থানের মত প্রাচীনকালে ভারতেও এই প্রথা প্রচলিত ছিল। স্বয়ং রামচন্দ্রের বিয়েতে   বেশ কিছু দাস দাসীও উপহার হিসাবে দেওয়া হয়েছিল। বালকাণ্ডের ৭৪ তম সর্গে বলা আছে, “ পরদিন সকালে মহর্ষি বিশ্বামিত্র রাজা দশরথ ও জনককে সম্ভাষণ করে হিমাচলে প্রস্থান করলেন। দশরথও রাজধানী অযোধ্যায় যাওয়ার আয়োজন করতে লাগলেন। তখন জনক প্রফুল্লমনে কন্যাদের লক্ষ গরু, অনেক উৎকৃষ্ট কম্বল, কৌশেয় বস্ত্র, কোটি বস্ত্র, সুসজ্জিত হস্তি অশ্ব রথ ও পদাতি এবং সুবর্ণ রজত মুক্তা ও প্রবাল কন্যাধনস্বরূপ দান করলেন। প্রত্যেক কন্যার শত সংখ্যক সখী, দাসী এবং দাসও সাথে দিলেন।“

জনক অবশ্য তার মেয়েদেরই এই দাস-দাসী উপহার দিয়েছিলেন। এসব  রামচন্দ্রকে সরাসরি দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হয় না কিন্তু এসব যখন দেওয়া হচ্ছিল তখন রামচন্দ্র নিঃসন্দেহে সেই স্থলে উপস্থিত ছিলেন। রামায়ণের সময়ে যে মানুষকে দাস-দাসী হিসাবে রাখা হত তার প্রমাণ এই স্থান হতে পাওয়া যায়। আজকের দিনে কোন মানুষকে দাস হিসাবে দেখার কল্পনা আমরা করতে পারি না। কিন্তু রামচন্দ্রের চোখে দাসপ্রথা গর্হিত ছিল বলে মনে হয় না, কেননা দাস ও দাসীদের যখন তার বিয়েতে দান করে দেওয়া হচ্ছে, তখন এতে তার কোনো আপত্তি দেখা যায় না।

কুসংস্কারাচ্ছন্ন

বর্তমান সমাজে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। টিকটিকি ডাকলে এই হবে, হাতে চুলকানি হলে ওই হবে, সন্ধ্যাবেলা চুলখোলা রাখা অনুচিত, রাতে নখ কাটা যাবে না এমন কুসংস্কারের অভাব সমাজে নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল অবতার রামচন্দ্রের মধ্যেও এই ধরণের কুসংস্কারও বিদ্যমান ছিল।

আরণ্যকাণ্ডের ৬০ স্বর্গে বলা হয়েছে,“এরপর পথের মধ্যে রামের বাম চোখ স্ফুরিত সর্বাঙ্গ কম্পিত এবং পদস্খলন হতে লাগল। তিনি এই সমস্ত দুর্লক্ষণ দেখে লক্ষ্মণকে বারবার সীতার কুশল জিজ্ঞেস করতে লাগলেন এবং তাকে দেখবার আশয়ে একান্ত উৎসুক হয়ে তাড়াতাড়ি চলতে লাগলেন।”

বাল্যবিবাহকারী

বাল্যবিবাহকে বর্তমান সময়ে খুব খারাপ চোখে দেখা হয়ে থাকে। বাল্যবিবাহের ফলে শিশুদের শরীর ও মনের উপর কুপ্রভাব পড়ে থাকে। কিন্তু ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ রামকে বাল্যবিবাহের মত গর্হিত কাজে লিপ্ত হতে দেখা যায়।  রাম সীতাকে বাল্যাবস্থায় বিয়ে করেছিলেন। রাম যখন সীতাকে বিয়ে করেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। সীতাকে অপহরণের পূর্বে ছদ্মবেশী রাবণ সীতার পরিচয় জানতে চাইলে সীতা রাবণকে বলেছিলেন, “আমি মিথিলার অধিপতি মহাত্মা জনকের কন্যা, রামের সহধর্মিণী, নাম সীতা।  আমি বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে  বারো বছর  নানারকম সুখ ভোগ করে কাটাই। পরে ত্রয়োদশ বর্ষ উপস্থিত হলে, দশরথ উপাধ্যায়দের সাথে সমবেত হয়ে রামের রাজ্যাভিষেকের সঙ্কল্প করেন। অভিষেকের সামগ্রীও সংগ্রহ হল। এই অবসরে আর্যা কৈকেয়ী সত্যপ্রতিজ্ঞ রাজাকে অঙ্গিকার করিয়ে রামের নির্বাসন ও ভরতকে রাজ্যে স্থাপন এই দুটি বর প্রার্থনা করলেন এবং বললেন, রাজন! আমি পান ভোজন ও শয়ন করবো না ; যদি রামকে অভিষেক করো, তবে এই পর্যন্তই আমার প্রাণান্ত হল।

কৈকেয়ী এমন বললে রাজা দশরথ তাকে ভোগসাধন প্রচুর ধন দিতে রাজি হলেন কিন্তু তখন তিনি তার কোনো কথায় সম্মত হলেন না। তখন রামের বয়স পঁচিশ এবং আমার আঠারো। “   (৩/৪৭)

সীতা যখন এই কথা বলছিলেন তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর। ইতিমধ্যেই তিনি বারো বছর রামের সাথে সংসার করেছিলেন। তাহলে কত বছর বয়সে সীতার রামের সাথে বিয়ে হয়েছিল? অঙ্কটি খুব সরল, সদ্য যোগ বিয়োগ শেখা বাচ্চারাও এই অঙ্কটি খুব সহজে করে ফেলতে পারবে।

১৮ থেকে যদি ১২ বিয়োগ করা হয়, তবে থাকে ৬ । অর্থাৎ মাত্র ছয় বছর বয়সেই রামের সাথে সীতার বিয়ে হয়েছিল। আর রামের বয়স ছিল তখন ২৫-১২=১৩ বছর।

দেখতে গেলে বর্তমান সময়ের মানদণ্ডে উভয়েরই বাল্যবিবাহ সংগঠিত হয়েছিল। রাম যদি স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার হয়ে থাকেন এবং সীতা যদি লক্ষ্মীর অবতার হয়ে থাকেন, তাহলে এমন বাল্যবিবাহের লীলা করে এই অবতারেরা সমাজকে কি শিক্ষা দিয়ে গেলেন? বাল্যবিবাহের শিক্ষা?

নাস্তিক  বিধর্মীদের প্রতি রাম

কথায় আছে, নানা মুনির নানা মত। শুধুমাত্র মুনিদের ক্ষেত্রেই এই কথাটি খাটে না, যেকোনো মানুষ, সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই এই কথাটি খাটে। মানুষেরা স্বতন্ত্র্য চিন্তার অধিকারী, তাই স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের মধ্যে নানা মতের পথের সৃষ্টি হয়, সৃষ্টি হয় নানা ধর্মের, দর্শনের। মানব সমাজে মানুষের মাঝে  এই মতপার্থক্য থাকা খুব স্বাভাবিক। আর নানা পথের, মতের মানুষদের মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় রাখার জন্য সহিষ্ণুতাও ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, সম্প্রদায় আছে যারা ‘দ্বিমতকে’ দলন করতে চায়, প্রতিষ্ঠা করতে চায় ‘একমত’। যার ফলশ্রুতিতে সম্প্রদায়গুলোর মাঝে সৃষ্টি হয় বিদ্বেষ, ঘৃণা ও সহিংসতার।

তথাকথিত ‘মর্যাদা পুরুষোত্তমের’ মাঝেও পরমত দলনের বৈশিষ্ট্যই পরিলক্ষিত হয়। এর প্রমাণ স্বরূপ বলা যায়।

লোকায়তিক মত অবলম্বন করে ঋষি জাবালি যখন রামকে অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন, তখন রাম তাকে নানাভাবে অপমান করেছিলেন।

রাম চোর নাস্তিক এবং বৌদ্ধদের সমতুল্য বলেছেন। অযোধ্যাকাণ্ডের ১০৯ তম সর্গে জাবালিকে ভর্ৎসনা করতে গিয়ে রাম বলেছেন, “চোর যেমন বুদ্ধও তেমন। জানবেন যে তথাগতেরা নাস্তিক। তারা মানুষের মধ্যে সবচাইতে অবিশ্বাসযোগ্য। জ্ঞানী মানুষদের নাস্তিকদের পরিত্যাগ করা উচিত।“

এই বিষয়ে আমি আগে একটি আর্টিকেল লিখেছিলাম, সেখান থেকে এই বিষয়টি বিস্তারিত জানতে পারবেন। আর্টিকেলটি হলঃ

  • রামায়ণের ঋষি জাবালি কি নাস্তিক ছিলেন?

সীতা কি রামকে মর্যাদা পুরুষোত্তম বলে মনে করতেন?

আমরা না হয় রামকে ‘পুরুষোত্তম’ বলে মনে করিনা। কিন্তু রামের স্ত্রী সীতা কি রামকে ‘পুরুষোত্তম’ বলে মনে করতেন? এই বিষয়ে রামায়ণে কি বলা আছে দেখা যাক।

অযোধ্যাকণ্ডের ৩০ তম সর্গে সীতা রামকে উপহাস করে বলেছেন, “আমার পিতা যদি তোমাকে আকারে পুরুষ ও স্বভাবে স্ত্রীলোক বলে জানতেন, তাহলে তোমার হাতে কখনোই আমায় সম্প্রদান করতেন না।“

আমি কুলকলঙ্কিনীর মত তোমাকে ছাড়া অন্য পুরুষকে কখনো মনেও দর্শন করিনি।এই কারণে বলছি আমি তোমার সাথে যাব । তুমি আমাকে অনন্য পূর্বা জেনেই আমাকে বিয়ে করেছ, দীর্ঘদিন হল, আমি তোমার ঘরে আছি , এখন জায়াজীবের মত আমাকে অন্য পুরুষের হাতে সমর্পণ করা তোমার কি ঠিক হচ্ছে?”

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রামের স্ত্রী সীতা নিজেই রামকে ‘পুরুষোত্তম’ বলে মনে করতেন না।তাই রামকে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ প্রমাণ করতে অর্বাচীনদের দলেরা যে লম্ফঝম্ফ শুরু করেছে তাতে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাওয়া ছাড়া আর কিছু করার আছে বলে মনে হয়না।

রামের বানরসেনা যেখানে রামকে ‘পুরুষোত্তম মনে করতো নাসেখানে

শুধু সীতা নয়, রামের বানর সেনাও রামকে ‘পুরুষোত্তম’ বলে মনে করতো না।বানরসেনার চোখে রাম ছিল স্ত্রৈণ। বাল্মীকি রামায়ণে বলা হয়েছে,  “ বানরগণ কুমার অঙ্গদের এই কথা শুনে করুণকন্ঠে বলতে লাগল সুগ্রীব উগ্রস্বভাব, রাম স্ত্রৈণ, নির্দিষ্ট কালও অতিক্রান্ত হয়েছে; এখন আমরা জানকীর খোঁজ না নিয়ে গেলে সুগ্রীব আমাদের রামের প্রীতির জন্য হত্যা করবেন।” (৪/৫৩)

স্ত্রৈণ শব্দটি ভীষণ পুরুষতান্ত্রিক। এমন শব্দের প্রয়োগ এবং এমন মানসিকতাকে আমি মোটেই সমর্থন করিনা। কিন্তু রামের সহায়ক বানরেরাও যে রামকে পুরুষোত্তম বলে মনে করতেন না তা দেখনোর জন্য এই অংশের উদ্ধৃতি দেওয়া।

সীতা এবং কপিগণের বক্তব্যে এটাই প্রমাণিত হয় যে, তৎকালীন সময়েও সকলের চোখে রাম ‘পুরুষোত্তম’ বলে বিবেচিত হতেন না।

মানুষের মাঝে ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই থাকে। যার খারাপের পাল্লাটা ভারী তাদের আমরা খারাপ বলে বিবেচনা করি, আর যার ভালোর পাল্লাটা ভারী তাদের আমরা ভালো বলি। শুরু থেকে শেষ অবধি রামের অনেক সমালোচনা করার পরও একথা বলা আবশ্যক যে, রামচন্দ্রের মধ্যে কোনো ভালোদিকই যে ছিল না তা আমি মনে করিনা। তার মধ্যেও অনেক ভালো দিকও বিদ্যমান ছিল। ভবিষ্যতে এই লেখাটিতে সেইসব দিকও যুক্ত করে এই লেখাটিকে বর্ধিত করার চেষ্টা করবো। পিতার নির্বোধ সত্য পালন করার জন্য ১৪ বছরের জন্য বনে গমনকে আমি অযৌক্তিক বলে মনে করলেও, রাম যে  কাজটি করেছেন তার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে আত্মত্যাগের প্রয়োজন।চারপাশের স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতার মাঝে এমন নিঃস্বার্থপরতা, আত্মত্যাগের মূল্যবোধ আমরা রামচন্দ্রের কাছ থেকে গ্রহণ করতেই পারি, এর কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ তথ্যসূত্র দেওয়ার সময় প্রথমে কাণ্ডের সংখ্যা, এরপর সর্গের সংখ্যা এবং এরপর শ্লোকের সংখ্যা দেওয়া হয়েছে। যেমন ১/১/১ বলতে বোঝাবে বালকাণ্ডের প্রথম সর্গের প্রথম শ্লোক। কোথায় যদি ১/১ এমন রেফারেন্স দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে এখানে কেবল কাণ্ড সংখ্যা এবং সর্গ সংখ্যার কথা বলা হয়েছে, শ্লোকসংখ্যার কথা বলা হয়নি।

সহায়ক গ্রন্থঃ এই লেখাটিতে  তথ্যের সোর্স হিসাবে বাল্মীকি রামায়ণ ব্যবহার করা হয়েছে। বাল্মীকি রামায়ণের অনুবাদের ক্ষেত্রে হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং পঞ্চানন তর্করত্নের অনুবাদ দেখা হয়েছে। রেফারেন্সগুলো মূলত হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের অনুবাদ থেকেই দেওয়া হয়েছে, তাই রেফারেন্স মেলাতে চাইলে সর্বপ্রথমে হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের অনুবাদ খুলতে হবে।


 

তথ্যসূত্র এবং টীকাঃ

[1] বরং তোমরা আমাকে ভক্ষণ কর কিন্তু আমি কোনোমতে তোমাদের অনুরোধ রক্ষা করিব না । আমার পতি রাম দীন বা রাজ্যহীন হউন তিনিই আমার পূজ্য। – ৫/১৪

[2] বনবাসে যাওয়ার সময় সীতার বক্তব্যঃ “ নাথ! পিতা, মাতা, ভ্রাতা ও পুত্রবধূ ইহারা আপন আপন কর্মের ফল আপনারাই প্রাপ্ত হয় , কিন্তু একমাত্র ভার্যাই স্বামীর ভাগ্য ভোগ করিয়া থাকে। সুতরাং যখন তোমার দণ্ডকারণ্যবাস আদেশ হইয়াছে, তখন ফলে আমারও ঘটিতেছে। দেখ, অন্যান্য স্বসম্পর্কীয়ের কথা দূরে থাক, স্ত্রীলোক আপনিও আপনাকে উদ্ধার করিতে পারে না, ইহলোক কিংবা পরলোক কেবল পতিই তাহার গতি। প্রাসাদশিখর, স্বর্গের বিমান ও আকাশগতি হইতেও বঞ্চিত হইয়া স্বামীর চরণছায়ায় আশ্রয় লইবে। পিতামাতাও আদেশ দিয়াছেন যে, সম্পদে বিপদে স্বামীর সহগামিনী হইবে। অতএব নাথ! তুমি যদি অদ্যই গহন বনে গমন কর , আমি পদতলে পথের কুশকন্টক দলন করিয়া তোমার অগ্রে অগ্রে যাইব…”- ২/২৭

[3]  অযোধ্যাকণ্ডের ১৯ তম সর্গে আছে, দ্যুতেরা আজিই ইহার আদেশে দ্রুতগামী অশ্বে আরোহণ পূর্বক ভরতকে মাতুলালয় হইতে আনয়ন করিতে যাক।

[4] অযোধ্যাকাণ্ড/১ম সর্গ

[5] একপ্রকার মণি

[6] পঞ্চানন তর্করত্ন এই অংশের এভাবে অনুবাদ করেছেন-

“ সুগ্রীব গৃহে প্রবেশ করলে এবং গগনমণ্ডল মেঘবিহীন হলে, বর্ষারাত্রে অবস্থিত কামশোকপীড়িত রাম পাণ্ডুবর্ণ আকাশ , বিমন চন্দ্রমণ্ডল এবং জ্যোৎস্নানুলিপ্তা শারদিয়া রজনী দেখে জনকনন্দিনী সীতাকে অপহৃতা এবং সুগ্রীবকে কামাসক্ত ও সময় অতিবাহিত হয়েছে মনে করে অতিশয় আতুর হয়ে মোহ প্রাপ্ত হলেন। পরন্তু সেই মতিমান নরেন্দ্র রঘুনন্দন রাম মুহূর্তকালমধ্যে চেতনা পেয়ে বিদেহরাজ-নন্দিনী সীতা হৃদয়সন্নিহিতা হইলেও তাহাকে চিন্তা করিতে লাগিলেন। …” [ বাল্মীকি রামায়ণ/ কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড/ ত্রিংশ সর্গ/১-৭ ; অনুবাদক- পঞ্চানন তর্করত্ন ; পাবলিশার- বেণীমাধব শীলস লাইব্রেরী]

[7] পঞ্চানন তর্করত্ন এই অংশের অনুবাদ করেছেন এইভাবে-

“প্রশস্তহৃদয় সুমিত্রাপুত্র লক্ষ্মণ রামকে বিজনস্থিত, দুঃসহচিন্তাযুক্ত এবং সংজ্ঞাশূণ্য দেখিয়া ভ্রাতার বিষাদের জন্য সাতিশয় দুঃখিত হইয়া দীনভাবে তাহাকে বলিলেন, আরয! আপনি কামবশবর্তী হইয়া অকারণ আপনার বীর্যহানি করিতেছেন কেন? কাম হইতে শোক জন্মে , তাহা হইতেই সমাধি বিনষ্ট হইয়া থাকে; সুতরাং আপনার সমাধি অবলম্বনপূর্বক শোকনিবারণে যত্নবান হওয়া কর্তব্য। “ [কিষ্কিন্ধ্যা /৩০/ ৮-১৮ ; পঞ্চানন তর্করত্ন]

[8] ১০২ তম শ্লোক

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>