জানালার সুধা

সুধা, এইখানে আমের মুকুল ধূলির ভিতর গন্ধময় হয়ে উঠলো আর ইথারে ভেসে উঠলো তোমার দীর্ঘশ্বাস। আমি জানতাম না যে তোমার-আমার ডাকঘর বাড়ি গেছে। অসহ্য কষ্টের ভিতর আমি চোখ মেলে জানলা ছাড়া কিছু পেলাম না। আমার এই একটাই জানলা আর জানলার ওপারে তুমি যেনো বা দিগন্ত, ছন্দময় তরঙ্গিণী, ফুল তুলতে যাও। আমার জন্যে ফুল নিয়ে এসো, হ্যাঁ? তুমি ঠিক আনবে জানি—আমি তখন জানলা দিয়ে চোখের সঙ্গে আকাশের একটি তারা অথবা সুদূর দিগন্তের মেঘের একটি মাটিরং রেখার কাছে চলে যাবো। তুমি এসে জানলায় চোখ রেখে দেখবে শুয়ে আছে আমার শরীর অন্ধকারের পেটে।

তুমি জানতে চেয়েছিলে কবিরা ভয়ানক কষ্টের মধ্যে থাকলে কী করে? বলেছিলাম চিৎকার করে কান্না করে। তারপর তুমি তোমার নাম না-জানা তিনটা কষ্টের কথা বলেছিলে। আমি যদিও কিছুই বুঝতে পারিনি—তারপরও বললাম, তবে চিৎকার করে কাঁদো। তোমার চিৎকার করে কাঁদার জায়গা নেই! তাহলে পাড়ার যে-পুকুরটিতে তুমি স্নান করো প্রতিদিন—পুকুরে ডুব দিয়ে সবুজাভ আলোর ভিতর গলা ফাটিয়ে চিৎকার করো। এই কথা শুনে তুমি কোনো প্রত্যুত্তর করলে না। তুমি কি ডুব দিয়ে চিৎকার করেছিলে, সুধা? তুমি জানো, জানি আমিও—আমার একটা জানলা ছাড়া আর কিছু নেই।

তুমি সুধাপুষ্প এসে দাঁড়াবে জানলার পাড়ে আর তারপর আমরা রক্তক্ষরণ শেষে পুনর্বার উড়ে যাবো। দস্তানাজোড়া ঝুলে থাকবে চন্দনের ডালে, একা একা। বিতৃষ্ণায় ভোর হবে রাত। আমি ভাবি এইসব কথা, আমার দরোজাবিহীন ঘরে যেদিন দরোজা হবে, তুমি ঢুকবে দীঘল ছায়া ফেলে একটা অন্যরকম স্নিগ্ধ সাঁঝবেলায় আর আমি বলবো, ছায়া জমে জমে ঘর ভরে গেছে। এসো এইবার আলো নিভিয়ে দিই, ছায়ারা মরে যাক। এইখানে নির্জনতা এনে আমরা ভুলে যাবো কোলাহল, কেবল নিশ্বাসের ফিসফাস শব্দে জেগে থাকবে রাত্রি চিরদিন। এইসব কল্পনা, এইসব কথায় তুমি কান দিও না, সুধা। কেননা তুমি জানো, আমার একটা জানলা ছাড়া আর কিছু নেই।

তুমি আমাকে একটা চিঠি লিখতে বলেছিলে তোমার কাছে। তোমার বন্ধু ঘাসফুল এই কথা আমাকে জানালো। আমি ভুলে গেলাম। তোমার বন্ধু কাকপাখি আমাকে জানালো, আমি যেনো তোমার কাছে একটা চিঠি লিখি। আমি ভুলে গেলাম। তারপর তুমি বললে। এইবার আমি বললাম, লিখবো কখনো। আর তুমি অমলের প্রতীক্ষার কথা বললে। সেই অমল। আসলে আমিই অমল। কেননা, আমার একটা জানলা ছাড়া আর কিচ্ছু নাই। আমি ফুলের প্রতীক্ষা করতে করতে তোমার-আমার ডাকঘর বাড়ি চলে গেছে। তাই ইথারে লিখছি চিঠি। এই হাওয়াবন, এই থামি থামি রোদ, পাতার শব্দ সব চিঠির মধ্যে দিলাম। একটা পলাশ পাঠালাম জানলার ওপারে, তার সঙ্গে তোমার ফুল বিনিময়।

কী ফুল আনবে, সুধা? বকুল! বকুলের গন্ধে আমি তিনশো চারবছর ঘুমিয়ে ছিলাম। আমার একটি মাত্র জানলা তুমি ফুরিয়ে গেলে আমি পুনর্বার ঘুমিয়ে পড়তে চাই।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত