কবি জসীমউদ্দীন : প্রয়াণ দিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

 

আজ ১৩ মার্চ পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের প্রয়ান দিবস। ইরাবতী পরিবার তাঁকে স্মরণ করে পাঠকদের প্রতি তুলে ধরছে আবদুল্লাহ আল মোহনের এই লেখা।

 

১.
বাংলার, বাঙালির সুখ্যাত কবি জসীমউদ্দীন, যিনি বাংলা সাহিত্যে ‘পল্লীকবি’ বিশেষণেও সমধিক পরিচিতি পেলেও ছিলেন মননে, শব্দশিল্পে আক্ষরিক অর্থেই একজন আধুনিক কবি । গ্রাম-বাংলার মানুষের সংগ্রামী জীবন আর সুখ-দুঃখের কথা যিনি স্বজনের ভূমিকায় কবিতা ও গল্পে তুলে ধরেছেন, সেই পল্লীকবি জসীমউদ্দীনকে স্মরণ করছি বিশেষ শ্রদ্ধাসহকারে। ১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ ঢাকায় ইন্তেকাল করেন তিনি। মহীরূহ এই কবির স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, তিনি ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামের মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলার পল্লী অঞ্চলের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, মানুষের মুক্তির সংগ্রামসহ বিভিন্ন বিষয়ে লিখে এই কবি সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়ার ফলে ‘পল্লীকবি’ উপাধি লাভ করেন। তাঁর স্কুল জীবনে লেখা ‘কবর’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় অবদান। ‘জসীমউদ্দীন কেন আধুনিক’ শিরোনামে গত ১১ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোর শিল্প সাহিত্য পাতায় মাযহার ভাইয়ের (মনস্বী প্রাবন্ধিক, লেখক আহমাদ মাযহার) একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এই লেখার শেষোংশে সেটিও তুলে ধরা হলো।
২.
কবি জসীমউদ্দীন (জন্ম : ১ জানুয়ারি, ১৯০৩ – মৃত্যু : ১৩ মার্চ, ১৯৭৬) ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন তিনি। পল্লীসাহিত্যের সংগ্রাহক হিসেবে জসীমউদ্দীনের কর্মজীবন শুরু। জসীমউদ্দীন বাল্য বয়স থেকেই কাব্যচর্চা শুরু করেন। কবির ১৪ বছর বয়সে নবম শ্রেণীতে থাকাবস্থায় তৎকালীন কল্লোল পত্রিকায় তার একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। ছাত্র জীবনেই ‘কবর’ কবিতাটি রচনা করে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। এ কবিতাটি পরে পাঠ্যবইয়েও নেওয়া হয়। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ রাখালী। এরপর তার ৪৫টি রসালো বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ কবি ১৯৭৬ সালে ইউনেস্কো পুরস্কার, ১৯৬৮ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিলিট উপাধি, ১৯৭৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।
৩.
কিছুদিন আগে ফরিদপুর গিয়েছিলাম সরকারি সারদাসুন্দরী কলেজে স্নাতক শ্রেণির ছাত্রীদের মৌখিক পরীক্ষার বহি:পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য। কিন্তু আমার আসল উদ্দেশ্য ছিলো প্রিয় পল্লীকবির ডালিমতলা দর্শন। লক্ষ আর উপলক্ষ তাই একাকার হয়ে ওঠে কখনো আবার উপলক্ষকে কেন্দ্র করে লক্ষই মূল আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে আমার ক্ষেত্রে। সহজ ভাষায় যাকে বলে, একই সাথে ‘রথ দেখা আর কলা বেচা’ আর কী ! ২০১৪ সালের ৭-৯ জুলাইয়ের ফরিদপুর ভ্রমণ তাই আমার জন্য হয়ে উঠেছিলো আনন্দময়, মধু গন্ধেভরা ছন্দময়। বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, আক্ষরিক অর্থেই আমি ফরিদপুরে পেয়েছিলাম ‘জামাই আদর’। সেটা অবশ্যই বৈবাহিক কারণেই।
৪.
ফরিদপুরের মধুরহাড়িতে, স্বজনবাড়িতে পেয়েছিলাম এক অসাধারণ বন্ধুর সাক্ষাৎ। তিনি প্রসেনজিৎদা। অসম্ভব অমায়িক, সজ্জন এই নতুন বন্ধুটি আমাকে বৃষ্টিভেজা দিনে দিয়েছিলেন মিষ্টিমাখা সঙ্গ। যদিও আমার আরেক পরম আত্মীয়-স্বজন শ্রদাষ্পদ আলতাফ স্যারও আমাকে সাথে নিয়ে সব ঘুরিয়ে দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত সম্মানিত এই চির সবুজ শিশু মানুষটিকে আমি বিব্রত করতে চাইনি। আলতাফ স্যার প্রতিথযশা শিক্ষক ছিলেন, হয়েছিলেন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ্যও। ফরিদপুরের শিল্প-সাহিত্য অঙ্গণে তিনি মহীরুহ হিসেবে সকল মহলে সম্মানিত। আলতাফ স্যারের সাথে আমার আত্মীয়তা প্রতিষ্ঠিত হয় সেই ১৯৯০ সালের দিকে। যখন আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে কাজ করি এবং স্যার তখন ফরিদপুরের সংগঠক ছিলেন, সেই সময় থেকেই।ফলে আলতাফ স্যারের সুসঙ্গ মানেই অনাবিল আনন্দ, আলোকিত আলাপনে ভেসে যাওয়া। কত রাত যে আমরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পুরাতন ভবনের ছাদে আড্ডা দিয়ে কাটিয়েছি তার হিসেব নেই। এবার অনেকদিন পর অবশ্য স্যারের সাথে দেখা হলো। সেই পরমজনকে কী আমি বৃষ্টিতে ভিজিয়ে আমার সাথী করতে পারি ?
৫.
এবার মন ফেরানো যাক কবির পানে। কবি জসীমউদ্দীনের পিতা আনসারউদ্দীন মোল্লা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। মা আমিনা খাতুন ওরফে রাঙাছুট। পৈতৃক নিবাস একই জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। শৈশবে ফরিদপুর হিতৈষী স্কুলে জসীমউদ্দীনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। তারপর ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা (১৯২১), রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ (১৯২৪) ও বিএ (১৯২৯) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি এমএ (১৯৩১) পাস করেন। জসীমউদ্দীনের কর্মজীবন শুরু হয় পল্লিসাহিত্যের সংগ্রাহক হিসেবে। স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে দীনেশচন্দ্র সেনের আনুকূল্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক এ কাজে তিনি নিযুক্ত হন। এমএ পাস করার পর থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে রামতনু লাহিড়ী গবেষণা সহকারী ছিলেন। ১৯৩৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে যোগদান করেন। এখানে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত চাকরি করার পর ১৯৪৪ সাল থেকে তিনি প্রথমে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকার এবং পরে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে এখান থেকে ডেপুটি ডাইরেক্টর হিসেবে অবসর গ্রহণ করে তিনি ঢাকার কমলাপুরে নিজ বাড়িতে স্থায়িভাবে বসবাস করেন।
৬.
জসীমউদ্দীনের কবিত্ব শক্তির প্রকাশ ঘটে ছাত্রজীবনেই। তখন থেকেই তিনি তাঁর কবিতায় পল্লিপ্রকৃতি ও পল্লিজীবনের সহজ-সুন্দর রূপটি তুলে ধরেন। পল্লির মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর অস্তিত্ব যেন মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল । জসীমউদ্দীন ছোটবেলা থেকেই কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। দশম শ্রেণিতে পড়াকালে রচনা করেন বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতা। রচনার কিছুদিন পরই কবিতাটি কলকাতার একটি পত্রিকায় ছাপা হয়। সাড়া পড়ে যায় চারদিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তাঁর এ কবিতাটি ডিগ্রি ক্লাসে প্রবেশিকা বাংলা সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়। কবি হিসেবে এটি তাঁর এক অসামান্য সাফল্য। জসীমউদ্দীন সাহিত্যের নানা শাখায় কাজ করেছেন, যেমন গাথাকাব্য, খন্ডকাব্য, নাটক, স্মৃতিকথা, শিশুসাহিত্য, গল্প-উপন্যাস ইত্যাদি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ রাখালী প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। তাঁর প্রধান গ্রন্থগুলি হলো: নক্সী কাঁথার মাঠ (১৯২৯), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩), রঙিলা নায়ের মাঝি (১৯৩৫), মাটির কান্না (১৯৫১), সুচয়নী (১৯৬১), পদ্মা নদীর দেশে (১৯৬৯), ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৭২), পদ্মাপার (১৯৫০), বেদের মেয়ে (১৯৫১), পল্লীবধূ (১৯৫৬), গ্রামের মায়া (১৯৫৯), ঠাকুর বাড়ির আঙিনায় (১৯৬১), জার্মানীর শহরে বন্দরে (১৯৭৫), স্মরণের সরণী বাহি (১৯৭৮), বাঙালীর হাসির গল্প, ডালিম কুমার ইত্যাদি। তাঁর রচিত বাঙ্গালীর হাসির গল্প (দুই খন্ড, ১৯৬০ ও ১৯৬৪) ও বোবা কাহিনী (১৯৬৪) উপন্যাসটি সুখপাঠ্য। জসীমউদ্দীন জারীগান (১৯৬৮) ও মুর্শীদা গান (১৯৭৭) নামে লোকসঙ্গীতের দুখানি গ্রন্থ সংকলন ও সম্পাদনা করেন। ১৯৬৮ সালে তাঁর সম্পাদনায় কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত হয় জারীগান। জারি গান একান্তভাবেই বাংলাদেশের নিজস্ব সৃষ্টি। এ গ্রন্থে জারি গানের মোট ২৩টি পালা সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থের ভূমিকায় জসীমউদ্দীন জারি গানের উৎস এবং বিভিন্ন এলাকার জারি গানের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। দ্বিতীয় গ্রন্থটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়।
৭.
তাঁর নক্সী কাঁথার মাঠ কাব্যটি দি ফিল্ড অব এমব্রয়ডার্ড কুইল্ট এবং বাঙালীর হাসির গল্প গ্রন্থটি ফোক টেল্স অব ইষ্ট পাকিস্তান নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। বাংলা কবিতার ধারায় জসীমউদ্দীনের স্থানটি বিশিষ্ট। তাঁর কবিতা অনাড়ম্বর কিন্তু রূপময়। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও লোকজীবন জসীমউদ্দীনের কবিতায় নতুন রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসিকান্না ও জীবন সংগ্রামের কাহিনীই তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। তাঁর কবিতায় দেশের মাটির সাক্ষাৎ উপলব্ধি ঘটে। এজন্য ‘পল্লীকবি’ হিসেবে তাঁর বিশেষ ও স্বতন্ত্র পরিচিতি রয়েছে। তাঁর গদ্য রচনাও বিশেষ আকর্ষণীয়; সরল, সরস, গভীর ও আন্তরিকতার স্পর্শে তা মন ছুঁয়ে যায়।
৮.
জসীমউদ্দীন ছিলেন প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী এবং এ ধরণের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। এরূপ মানসিকতার কারণেই ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিলে অনেকের মতো তিনিও এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলন (১৯৬৬-১৯৭১) এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার একজন দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। কবি জসীমউদ্দীন বেশ অনাদরে আলোচিত হন তথাকথিত আধুনিকতার ভিড়ে। ‘পল্লীকবি’ বলে সে সমস্যাকে আরো প্রকট করে তুলেছেন কেউ কেউ। খুব কম মানুষই তার কর্মকে যথাযথ মূল্যায়ন করে গভীর থেকে গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। তিনি কেবল কবি হিসাবেই পরিচিত আমাদের কাছে। কিন্তু গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান ও প্রবন্ধেও তিনি বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। খুব কম সাহিত্যিকই শিশুসাহিত্যে সফলতা পেয়েছেন, কিন্তু ব্যতিক্রম বলেই তিনি সফলতা পেয়েছেন। তিনি অনেক শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন যেগুলোর মাধ্যমে গ্রামবাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে যেমন পরিচয় করিয়ে দেন, তেমনি নানা গঠনমূলক ও নীতিকথা শিখিয়েছেন ওই সব সাহিত্যের মাধ্যমে। তার শিশুসাহিত্যগুলো নিছক মনোরঞ্জনের জন্যই সৃষ্টি নয়। আর সমাজসংস্কারের মহান দায়িত্বও তিনি পালন করেন এ রকমের নানাবিধ রচনার মাধ্যমে। জসীমউদ্দীনের এসব রচনায় সমাজ বাস্তবতার তৎকালীন চিত্রকে সঠিকভাবে ধারণ করে। তাই জসীমউদ্দীনকে কেবল পল্লীকবি বলে সীমাবদ্ধ রাখা মুর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তার প্রতিটি কর্মকে সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিকে যেমন বিশ্লেষণ করতে হবে তেমনি জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মাধ্যমেও মূল্যায়ন করতে হবে। আর চেষ্টা অব্যাহত থাকলেই কেবল জসীমউদ্দীনের লেখাতেও সমাজ বাস্তবতার কথা রয়েছে, তা যেমন খুঁজে পাবো তেমন তিনি যে আধুনিকতারও প্রতিনিধি তাও স্পষ্ট হয়ে যাবে।
৯.
জসীমউদ্দীন বাংলা সাহিত্যের একজন বিশেষ সম্মানিত ও বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত কবি। তিনি প্রেসিডেন্টের প্রাইড অব পারফরমেন্স পুরস্কার (১৯৫৮), রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি (১৯৬৯), বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক (১৯৭৬) ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (মরণোত্তর, ১৯৭৮) ভূষিত হন। তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ তিনি ঢাকায় মারা যান।
১০.
‘তুমি যাবে ভাই- যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়/গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;/মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি/মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,/মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের স্নেহের ছায়,/তুমি যাবে ভাই- যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়’ । পল্লীকবি জসীমউদ্দীন নিজের সৃষ্টিতে এভাবেই তাঁর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কবির সেই গ্রামের নাম গোবিন্দপুর। অবস্থান ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নে। কুমার নদের ছায়াঢাকা এই গ্রামেই কবির বাড়ি। বাড়ির পূর্ব ও পশ্চিমে প্রতিবেশীদের বসতবাড়ি আর দক্ষিণে ছোট একটি পুকুর। উত্তরে পারিবারিক কবরস্থান, যেখানে ‘ডালিম গাছের তলে’ ঘুমিয়ে আছেন মাটি-মানুষের এই কবি। কবির সেই বাড়ি ঘিরে এবার সরকারি উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে ‘পল্লীকবি জসীমউদ্দীন স্মৃতি সংগ্রহশালা ও জাদুঘর’। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ও জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। কবির বাড়ির চার একর জায়গা নিয়ে বিশাল কলেবরে এই জাদুঘর নির্মাণ হচ্ছে। আর জাদুঘরের জন্য জমি অধিগ্রহণ, রাস্তা মেরামত ও অন্যান্য কাজের ব্যয় পুরোটাই বহন করছে সরকার।
১১.
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কবির বাড়িতে জাদুঘরের জন্য ইতিমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচটি শৈল্পিক ও দৃষ্টিনন্দন ভবন। এর দুটিতে থাকছে জাদুঘর। অন্যটিতে অফিস কক্ষ। থাকছে গ্রন্থাগার ও রিসার্চ সেন্টার, ডরমিটরি ও সম্মেলন কক্ষ। এ ছাড়া জাদুঘর ভবনের পূর্ব ও উত্তর কোণে থাকছে উন্মুক্ত মঞ্চ। বর্তমানে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে জাদুঘরের ভেতরে সাজসজ্জার কাজ চলছে। এই কাজ শেষে সংগ্রহশালা ও জাদুঘরে স্থান পাবে কবির স্মৃতিময় নানা নিদর্শন। জানা যায়, সংগ্রহশালা ও জাদুঘরে স্থান পাবে কবির স্মৃতিময় কবিতা ও রচনার নানা পাণ্ডুলিপি, হস্তলেখা, বিভিন্নজনের লেখা চিঠিপত্র, উপহারসামগ্রী, কবির আলোকচিত্র, পুরস্কার ও সম্মাননার নানা স্মারক, কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র, জামা-কাপড়সহ নানা অমূল্য নিদর্শন। এ ছাড়া থাকবে কবির লেখা নানা বই এবং কবিকে নিয়ে লেখা বিভিন্নজনের গবেষণা গ্রন্থ।
১২.
পল্লীকবির ছোট গাঁয়ের সংগ্রহশালা জাদুঘরে থাকছে সেই বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতার পাণ্ডুলিপিও। কবির লেখা ‘নিমন্ত্রণ’, ‘প্রতিদান’, ‘আসমানী’সহ আরো কয়েকটি কবিতা এবং বেশ কিছু জনপ্রিয় গানের পাণ্ডুলিপিও থাকবে। শুধু বিখ্যাত কবিতাগুলো নয়, জাদুঘরে থাকবে কবির ব্যবহৃত নানা আসবাব, বাসন-কোসন, পোশাক, স্মৃতিময় নানা আলোকচিত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, হেনরি মিলার, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, দীনেশচন্দ্র সেনসহ নানাজনের সঙ্গে কবির ছবি শোভা পাবে জাদুঘরে। থাকবে কবির বিদেশ ভ্রমণের দুর্লভ ছবিগুলোও। কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কবির একাধিক ছবিও স্থান পাবে। কবির জীবনের শেষ ছবিটিও স্থান পাবে সংগ্রহশালায়। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর দৈনিক কালের কণ্ঠকে জানিয়েছিলেন, ‘বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য বহুমুখী কাজ করেছেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। মূলত তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে কবির চেতনা ছড়িয়ে দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কবির বাড়ি ঘিরে প্রতিবছর জেলা প্রশাসন আয়োজন করে জসীমউদ্দীন লোকজ ও কারুমেলা। জাদুঘর নির্মাণের পর এই মেলা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকষণ হবে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে মাটি ও মানুষের এই কবি সম্পর্কে।’ উল্লেখ্য, ‘পল্লীকবি জসীমউদ্দীন স্মৃতি সংগ্রহশালা ও জাদুঘর’ হবে জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা। জাদুঘরের রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের জন্য থাকবে কিউরেটর ও অন্যান্য কলাকুশলী।
১৩.
‘জসীমউদ্দীন কেন আধুনিক’
আহমাদ মাযহার (প্রকাশকাল, দৈনিক প্রথম আলো, ১১ মার্চ, ২০১৬ )
(জসীমউদ্দীন কি ‘পল্লিকবি’, নাকি তাঁর কবিতায় আছে আধুনিকতার অন্য এক মাত্রা? জসীমউদ্দীনের মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে তাঁকে নতুনভাবে অবলোকন)
বাংলা ভাষার আধুনিক যুগের কবিদের নাম বলতে গেলে প্রথমেই যে কয়েকজনের নাম মনে আসে, জসীমউদ্দীন তাঁদেরই একজন। তাঁর আগে জন্ম নেওয়া কবিদের মধ্যে মধুসূদন আর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জমিদার পরিবারের সন্তান। তাঁরা বড় হয়েছেন সচ্ছল পারিবারিক পরিবেশে। পরিবারেই তাঁরা পেয়ে গেছেন আধুনিক শিক্ষার উন্নত পরিবেশ। নাগরিক সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে বড় হওয়ায় এদিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন তাঁরা। মাইকেল মধুসূদন ও রবীন্দ্রনাথের মতো জমিদারপুত্র না হলেও জীবনানন্দ দাশও ছিলেন নগরজীবনের পরিশীলনে এগিয়ে থাকা পরিবারেরই সন্তান। নজরুলের জন্ম গ্রামে। কিন্তু তিনিও প্রধানত নগর সংস্কৃতির পরিশীলনেই নিজের চেতনাকে রঞ্জিত করেছেন। অন্যদিকে, জসীমউদ্দীনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রামে! তবে আধুনিক শিক্ষালাভের মধ্য দিয়ে তাঁরও নাগরিক সংস্কৃতির পরিশ্রুতি ঘটেছে। তবে প্রথম তিনজনের সঙ্গে নজরুল ও জসীমউদ্দীনের জীবনযাত্রা একটু আলাদা। কারণ, গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে তাঁদের দুজনের সৃষ্টিকর্ম পাখা মেলেছে। এর মধ্যে আবার নাগরিক মানসের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও জসীমউদ্দীন প্রধানত গ্রামীণ মানুষের জীবনের রূপকে কবিতা করে তুলে পরিবেশন করেছেন। যদিও তাঁর এই পরিবেশনার লক্ষ্য নগরের মানুষেরাই। নজরুল জসীমউদ্দীনের চেয়ে আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন সৃষ্টিশীলতার বৈশিষ্ট্যে বিদ্রোহী সত্তা বা জাতীয় সত্তার জাগরণকে উপজীব্য করেছিলেন বলে। তাঁর কবিসত্তা অবশ্য জসীমউদ্দীনের মতো গ্রামজীবনেই সীমিত থাকেনি। ফলে গ্রামলগ্নতার ‘অপরাধে’ জসীমউদ্দীন আধুনিকদের পঙ্ক্তিভুক্ত হতে পারলেন না।
বয়সে জসীমউদ্দীনের চেয়ে নজরুল মাত্রই কয়েক বছরের বড়। জীবনানন্দ দাশও নজরুলেরই সমবয়সী। তিনিও জসীমউদ্দীনের চেয়ে বয়সে অল্প প্রবীণ। উভয়েই রবীন্দ্রনাথের পরের কবি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পরের কিছু কবি সচেতনভাবে নিজেদের রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আলাদা বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা নিজেদের আলাদাভাবে ‘আধুনিক’ বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করলেন। নৈরাশ্য, নির্বেদ, বিবিক্তি আর অনিকেত ভাবনাকে ধারণ করে আছে ওই ‘আধুনিকবাদ’। জীবনানন্দ দাশও ছিলেন তাঁদের দলভুক্ত। ক্রমেই এই রবীন্দ্রবিরোধীরাই বেশি প্রতাপশালী হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ভাষাভাষী সাহিত্যিক সমাজে। নজরুল ওই দলটির চেয়ে একটু আগেই কবিসত্তায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে তিনিও ছিলেন আলাদা। কিন্তু আলাদা হওয়ার বিশেষত্বে গত শতাব্দীর তিরিশের দশকি আধুনিকদের তিনি ততটা দলভুক্ত ছিলেন না, যতটা ছিলেন জীবনানন্দ। জসীমউদ্দীন রবীন্দ্রবিরোধী বলে নিজেকে ঘোষণা দেননি। এমনকি পল্লিজীবন নিয়ে কবিতা লিখলেও তাঁকে কেউ কেউ রবীন্দ্রানুসারীও বলে থাকেন। ফলে তিনিও আধুনিকের দলভুক্ত হতে পারলেন না। জসীমউদ্দীনের কবিতায় আধুনিকতার সন্ধান করতে হলে বাংলা কবিতার এই বিশেষ সময়ের পটভূমিকে স্মরণে রাখতে হবে আমাদের।
গত শতকের তিরিশ দশকি আধুনিকতার সঙ্গে নগরচেতনার একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অথচ জসীমউদ্দীন গ্রামজীবনের কবি। তাহলে তিনি আধুনিক হবেন কী করে? এই প্রশ্নটা মাথায় রেখে আমরা যদি তাঁর গোটা জীবনের কথা জানতে চেষ্টা করি তাহলে হয়তো তিনি ‘আধুনিক’ কি ‘আধুনিক’ নন, সেই বিতর্কের আড়াল ঘুচতে পারে। হয়তো এর ফলে তাঁর জীবন ও কবিতার সম্পন্ন সৌন্দর্যকে ভিন্নভাবে উপলব্ধি করতে পারব আমরা।
বিগত শতাব্দীর তিরিশের দশক থেকেই বাংলা কবিতার সঙ্গে এই ‘আধুনিকতা’র সম্পর্ক গভীর হয়ে উঠেছে। ফলে বাংলা কবিতার প্রসঙ্গে ‘আধুনিকতা’ শব্দটি মোটাদাগে যে বোধকে ধারণ করে, তার কথা চলে আসে। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে ওই সময় থেকেই কবিদের মধ্যে কেউ কেউ আধুনিকতার প্রতিনিধি। ফলে আধুনিক না হলে কবিতার আলোচনায় কারও নাম আসা উচিত নয়—এমনও বলতে শোনা গেছে। মানে কবিত্ব আর আধুনিকতা যে এক নয়, সে কথা কারও কারও মনে থাকেনি। যিনি আধুনিক নন, তাঁকে কবি বলে বিবেচনা করতে রাজি নন তাঁরা। কোনো কোনো কবি যথেষ্ট ‘আধুনিক’ না হয়েও যে শক্তিমান কবি হতে পারেন, এ কথা অনেকেই ভুলে যান। জসীমউদ্দীনের কবিত্ব নিয়ে একসময় তাই এমন একটা সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল বাংলাদেশের কবিতাপ্রেমিকদের একটা অংশের মনে। অথচ জসীমউদ্দীন বোঝাতে চেষ্টা করেছেন আমাদের গ্রামবাসীদের নিয়ে যাঁরা কবিতা লিখেছেন, তাঁরাই সত্যিকারের বাঙালি কবি। আমাদের গ্রামের কৃষক, তাঁতি, কামার, কুমোর, জেলে বা মাঝিদের জীবনযাত্রা বা মনোজগৎ নিয়ে যেসব কবিতা রচনা করা হয়, সেসব কবিতাই সত্যিকারের আমাদের কবিতা। সে কবিতাই বাংলার খাঁটি সম্পদ।
পল্লিজীবনের নানা রূপ জসীমউদ্দীনের কবিতার সম্পদ। তাহলে কী হবে, যাকে বলে আধুনিকতা, তার অনেক কিছুই যে তাঁর নেই! তাই সে সারিতে তাঁকে রাখতে কারও কারও আপত্তি ছিল। আর রাখলেও রাখা হয়েছিল নিছকই ব্যতিক্রম হিসেবে। এটা কেন হয়েছে, তা যদি আমরা একটু বুঝে নিতে চেষ্টা করি, তাহলে জসীমউদ্দীনকে বুঝতে আমাদের সুবিধা হবে। হয়তো সুবিধা হবে সামগ্রিকভাবে বাংলা কবিতার সৌন্দর্য অনুভব করতেও।
‘পল্লিকবি’ ছাপ মারা ছিল বলে নগরজীবনবাদীরা তাঁকে আধুনিকদের দলে রাখতে না চাইলেও নগরেও তাঁর পাঠকপ্রিয়তা ছিল বিপুল। তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে যাঁরা কবি হিসেবে ‘আধুনিক’, তাঁদের চেয়ে অধিকসংখ্যক নগরবাসী মানুষ তাঁর কবিতা ভালোবাসে। কারণ, জসীমউদ্দীন যে কবিতা লিখতেন, তা তাঁর সমকালীন বাংলাদেশের বেশিসংখ্যক মানুষের চেনা জীবনের কথা। বাংলাদেশে হাজার বছর ধরে যাঁদের বাস, তাঁদের প্রায় সবাই গ্রাম–সমাজের অধিবাসী। নদীমাতৃক বাংলাদেশে সব সময় কৃষিই ছিল প্রধান নির্ভরতা। এখন এত যে নগরের বিস্তার ঘটেছে, তাতেও সংখ্যার দিক থেকে নগরবাসীরা গ্রামবাসীদের ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। উপরন্তু যাঁরা নগরে বাস করেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই মনে বাস করে গ্রামজীবনের স্মৃতি। ফলে জসীমউদ্দীনের সামগ্রিক কবি-চৈতন্য বিবেচনায় রাখলে তাঁর মনোভাবটিও বুঝতে পারা যায়। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে কাব্যবোধের জাগরণ ঘটেছে, তাতে গ্রামের অনুভূতির একটা বড় ভূমিকা রয়েছে।
জসীমউদ্দীনের কবিতাকে ভালোভাবে বুঝে নিতে হলে আধুনিকতা কী, তাঁকে যাঁরা আধুনিক বলে মানেন না, তাঁরা কী বলতে চান, আবার যাঁরা জসীমউদ্দীনকেই মনে করেন সত্যিকারের আধুনিক, তাঁরা কেন সে কথা বলেন—সেসব নিয়ে আরও ভালোভাবে ভাবতে হবে আমাদের।
জসীমউদ্দীনকে ‘পল্লিকবি’ বলা হলেও যাঁকে বলে লোককবি তিনি তা নন—মোটাদাগেই তা আমরা বোঝাতে পারি। এ কথা ঠিক যে গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক জীবনযাপনের মধ্য থেকেই তাঁর কবিসত্তা জেগে উঠেছে। গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গী নানা শিল্পসংরূপের মাধ্যমেই তাঁর কবিসত্তার প্রকাশ। নৈরাশ্য, নির্বেদ, বিবিক্তি আর অনিকেত ভাবনা তাঁর উপজীব্য নয় বলে তাঁকে আধুনিক কবিদের দলে ফেলা হয় না বটে, কিন্তু অন্য এক অর্থে তিনিও আধুনিকই। কী সেই আধুনিকতা?
বাংলাদেশে ক্রমেই যে নগর গড়ে উঠছে, তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এ কথাও মানতে হবে যে তাতে ইউরোপীয় নগরমানসের বাস্তবতাও নেই। যেসব কারণে ইউরোপে অনিকেত মানসিকতার সৃষ্টি, বাংলাদেশে ওই মানসিকতা সৃষ্টি হওয়ার ভিত্তি তা নয়। শিল্পবিপ্লব ও বুর্জোয়া পুঁজির বিকাশের প্রভাবে ইউরোপীয় সমাজে যে ধরনের সামাজিক রূপান্তর ঘটেছিল, তার সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজ রূপান্তরের অনেক কিছুরই মিল নেই! ফলে ইউরোপীয় নগরমানসের সঙ্গেও সামগ্রিক অর্থে বাংলার নগরমানসের মিল থাকতে পারে না।
আমরা লক্ষ করব যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের শিল্পসংরূপগুলো তাদের জীবনযাপনের প্রতিক্রিয়াজাত। ফলে বাংলাদেশের একজন কবির আধুনিকতার বোধ ইউরোপের আধুনিকতার বোধের অনুরূপ না-ও হতে পারে। ঔপনিবেশিক হীনম্মন্যতার কারণে জাতীয় জীবনের নিজস্ব সাংস্কৃতিকতার মধ্যেও যে ভিন্ন এক নাগরিক মানসের জন্ম হতে পারে এবং সেই নাগরিক মানসও যে ভিন্নার্থে এক আধুনিকতারই উৎস, সে কথা আমরা ভুলে গেছি বলে জসীমউদ্দীনের আধুনিকতাকে আমরা মূল্য দিতে শিখিনি।
তিরিশি আধুনিকতা যে অনুকারী আধুনিকতা এবং এর মধ্যে যে আত্মদীনতা রয়েছে, জসীমউদ্দীনের আধুনিকতার বোধে তার জন্য বেদনা রয়েছে। তিনি স্বজাতির আত্মিক উত্থানকে গুরুত্ব দিতেন বলে অনুকারী আধুনিকতাকে অপছন্দ করতেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গেও তিনি তাঁর এই মনোভাব প্রকাশে দ্বিধা করেননি। তাই তিনি বলতে পেরেছিলেন: ‘…আজকাল একদল অতি আধুনিক কবিদের উদয় হয়েছে। এরা বলে সেই মান্ধাতা আমলের চাঁদ জোছনা ও মৃগ নয়নের উপমা আর চলে না। নতুন করে উপমা অলংকার গড়ে নিতে হবে। গদ্যকে এরা কবিতার মতো করে সাজায়। তাতে মিল আর ছন্দের আরোপ বাহুল্যমাত্র। এলিয়ট আর এজরা পাউন্ডের মতো করে তারা লিখতে চায়। বলুন তো একজনের মতো করে লিখলে তা কবিতা হবে কেন?’ ( রবীন্দ্রতীর্থে, ঠাকুর বাড়ির আঙ্গিনায়, কলকাতা, বলাকা-সংস্করণ, ২০০৭)
আরেক জায়গায় জসীমউদ্দীন পরিষ্কার বলেছেন এই দৃষ্টিভঙ্গির সাহিত্যিকদের সম্পর্কে: ‘…আমাদের সাহিত্যের পিতা-পিতামহেরা এখন মরিয়া দুর্গন্ধ ছড়াইতেছেন, তাঁহাদের সাহিত্য হইতে আমাদের সাহিত্য হইবে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁহাদের ব্যবহৃত উপমা, অলংকার, প্রকাশভঙ্গি সম্পূর্ণভাবে বর্জন করিয়া আমরা নতুন সাহিত্য গড়িব। এই নতুন সাহিত্য গড়িতে তাঁহারা ইউরোপ, আমেরিকার কবিদের মতাদর্শ এবং প্রকাশভঙ্গিমা অবলম্বন করিয়া একধরনের কবিতা রচনা করিতেছেন। …প্রেম–ভালোবাসা, স্বদেশানুভূতি, সবকিছুর ওপরে তাঁহারা স্যাটায়ারের বাণ নিক্ষেপ করেন। তাঁহাদের কেহ কেহ বলেন, বর্তমানের সাহিত্য তৈরি হইবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতদের গ্রন্থশালায়, জনসাধারণের মধ্যে নয়।’ —যে দেশে মানুষ বড়, ঢাকা, ১৯৯৭ (প্রথম সংস্করণ: ১৯৬৮)
নিজের সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে তাঁর মনোভাব ছিল এই রকম: ‘…দেশের অর্ধ শিক্ষিত আর শিক্ষিত সমাজ আমার পাঠক-পাঠিকা। তাহাদের কাছে আমি গ্রামবাসীদের সুখ-দুঃখ ও শোষণ-পীড়নের কাহিনি বলিয়া শিক্ষিত সমাজের মধ্যে তাহাদের প্রতি সহানুভূতি জাগাইতে চেষ্টা করি। আর চাই, যারা দেশের এই অগণিত জনগণকে তাহাদের সহজ-সরল জীবনের সুযোগ লইয়া তাহাদিগকে দারিদ্র্যের নির্বাসনে ফেলিয়া রাখে, তাহাদের বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষিত সমাজের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাইতে।’(—পূর্বোক্ত)
জসীমউদ্দীনের রচনার এই উদ্ধৃতিটির মধ্যে আমরা তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকতার একটু আভাস পাই। স্বসমাজের জাগরণচেতনার আভাসও তাঁর এই গদ্যভাষ্যে মূর্ত হয়েছে। তিনি গ্রামীণ কবিদের আঙ্গিক গ্রহণ করে নক্সীকাঁথার মাঠ (১৯২৯) কিংবা সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩) রচনা করেন। কেবল এই দুই কাহিনিগাথায়ই নয়, ছোট ছোট গীতিকবিতাগুলোতেও তিনি পুরোনো জীবনবোধের অনুকারী মাত্র থেকে যাননি। কিন্তু আমরা স্পষ্টই অনুভব করি যে এসব কবিতায় তিনি বিষয়বস্তু ও জীবনবোধে বিশ শতকের ভাবধারার অনুসারী। এই আঙ্গিক হতে পারে আমাদের নতুন আধুনিকতার মাধ্যম। আধুনিক কবিতায় যখন গীতিকা আঙ্গিকটি পরিত্যাজ্য তখন জসীমউদ্দীনের নক্সীকাঁথার মাঠ ও সোজন বাদিয়ার ঘাট—এই দুই কাব্য ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল আঙ্গিকের প্রাচীনত্ব নিয়ে নয়, নতুন জীবনবোধকে ধারণের সম্ভাবনা নিয়ে। তিনি গ্রাম্য গান সংগ্রহ করতে গিয়ে পরিশীলিত নাগরিক জীবনবোধ দিয়ে লক্ষ করেছেন যে গানের প্রথম কলিটি সুন্দর, কিন্তু পরবর্তী চরণগুলোতে জনগণের কুসংস্কারকেই রূপ দেওয়া হচ্ছে! তিনি তাই প্রথম পঙ্ক্তির সুন্দর কলিটিকে রেখে পরের চরণগুলোকে নতুন করে রচনা করে দিচ্ছেন। তাঁরও লক্ষ্য বাংলার নাগরিক মানসের কাছে পৌঁছে যাওয়া। এখানেই তাঁর আধুনিকতা ও তার স্বাতন্ত্র্য।
জসীমউদ্দীনের আধুনিকতার মর্মবাণী হচ্ছে বাংলাদেশের আত্মার মধ্য থেকে জেগে ওঠো। বিশ্বের দিকে তাকাও, কিন্তু তাকিয়ে আত্মবিস্মৃত হয়ো না, বরং বিশ্বকে গ্রহণ কর নিজের আত্মাকে সমৃদ্ধ করার জন্য। তাই বলা যায়, জসীমউদ্দীন পাশ্চাত্য অনুকারী নগর গড়তে চাননি, চেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামের আত্মা থেকে ওঠা নতুন নগর। বিদেশে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন পাশ্চাত্য-অনুকারী আমাদের বিরাটগুলো প্রকৃতপক্ষে বিরাট নয়, অতিশয় ক্ষুদ্র। তাই আমাদের গ্রামীণ ক্ষুদ্রের যে বিরাটত্ব তাকেই অবলম্বন করতে হবে। আমাদের গ্রামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাতন্ত্র্যের মধ্য থেকে জাগিয়ে তুলতে হবে এর বিরাটত্বকে। এটাই তাঁর আধুনিকতার মর্মবস্তু। তাই জসীমউদ্দীনকে ‘পল্লিকবি’ বলা হলে তাঁর আধুনিকতার এই স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করা হয়। পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয় তাঁর দূরদৃষ্টিকে। তাঁর আধুনিকতার অনুসারী কবিদের পেতে আমাদের একুশ শতক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কারণ, এই নবীন শতকের তরুণ কবিদের মধ্যেই হয়তো আমরা পাব আত্মবিশ্বাসী আধুনিক কবিসত্তাকে, যাঁরা নিজেদের বিকশিত করবেন, তাঁর দেখানো আধুনিকতার পথে।

 

( তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক,পত্র-পত্রিকা, উইকিপিডিয়া, ইন্টারনেট।)

আবদুল্লাহ আল মোহন
১ জানুয়ারি, ২০১৬ / ১৩ মার্চ, ২০১৬/ ১ জানুয়ারি, ২০১৯/ ১৩ মার্চ, ২০১৯

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত