যতীন সরকারের সাক্ষাৎকার

যতীন সরকার বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, মার্কসীয় চিন্তক। সর্বোপরি তাঁর কন্ঠস্বর প্রান্তিক ও ছিন্নমূল মানুষের পক্ষে। যাঁর লেখনির দৃঢ় অবস্থান সকল মৌলবাদ ও অসাম্যের বিরুদ্ধে। তাঁর বহু মাত্রিক মৌলিক চিন্তা বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সুতীক্ষ্ন যুক্তি ও ঐতিহ্যভিত্তিক সাম্যবাদী চেতনা বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথকে করেছে সুদৃঢ়। যদিও যতীন সরকার নিজেকে ‘কষ্ট লেখক’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি গর্ববোধ করেন মাস্টার পরিচয়ে। বাংলাদেশের এ বরেণ্য বুদ্ধিজীবীর জন্ম ১৯৩৬ সালে ১৮ আগস্ট নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে। তিনি দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে। ২০০৫ সাল থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন নেত্রকোনা শহরের দক্ষিণ সাতপাই তাঁর নিজ বাড়ি ‘বানপ্রস্থে’। অসংখ্যা মননশীল বইয়ের এই স্রষ্টা  পেয়েছে দেশের সর্বোচ্চ পদক ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’। তাঁর এ সাক্ষাৎকারটি শিশির রাজনের ‘যতীন সরকারের জ্ঞানাশ্রম’ বই হতে সংকলিত।


স্যার বাংলা কবিতায় মাইকেলের অবস্থানটা কোথায়? আর ‘লোক সাহিত্য’ হিসেবে যা প্রচলিত আপনি তাকে বাংলা ভাষার মূল ধারা বলেন কেন ?

যতীন সরকারঃ মাইকেল তো আধুনিকতার প্রবর্তক বাংলা সাহিত্যে। কী অর্থে আধুনিকতা? শোন, আমার দৃষ্টিতে আমি বলি-‘বাংলা কবিতার মূল ধারা’ যেটা সেটা কিন্তু লিখন সাহিত্যে ভারতচন্দ্র,রামপ্রসাদ পর্যন্ত শেষ হয়ে গেলেও এই অর্থে এর পরেই ইংরেজ রাজত্ব আসলো। ইংরেজ রাজত্ব আসার পরে ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থা আসলো। পৃথিবীর সাহিত্য, ধর্ম, দর্শনের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটলো। আমরা ধাক্কা খেলাম। এই ধাক্কার ফলে যে নতুন চিন্তা চেতনা যুক্ত হলো সেই চিন্তা চেতনার সাহিত্যটা যিনি সৃষ্টি করলেন তিনি হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বুঝতে পেরেছো, কাজেই এটাই হলো আধুনিক কবিতার সূত্রপাত। মাইকেল থেকে হলো, সেই মাইকেলের ধারা ধরে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল,জীবনানন্দ এখন যা চলছে। কিন্তু এই ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ পর্যন্ত এই ধারা টি শেষ হয়ে গেছে? নিশ্চয়ই না। সেই ধারাটা চলছে কোথায়? এটা আমরা ভদ্রলোকেরা নাম দিয়েছি ‘লোকসাহিত্য’। যা শতকরা ৯০ জন মানুষের। কিন্তু মাইকেল রবীন্দ্রনাথ যত বড় কবিই হোন , অনেক বড় এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই ধারাটা বড় বা আলাদা হতে পারে। যা দিয়ে আমরা বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি কিন্তু এটা বাংলা কবিতার মূলধারা না। মূলধারাটা হলো এই ভারত চন্দ্র, রামপ্রসাদ হতে লালন ফকির, দুদ্দু শাহ্ , হাছন রাজা, জালাল খাঁ, শাহ্ আব্দুল করিম এর মধ্যে দিয়ে চলিষ্ণু এবং সেই মূলধারার সাথে যুক্ত যে আধুুনিক কবিতা তা নজরুল রচনা করছেন। লেটো গান…..ইত্যাদি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছেন। তিনি বুঝেছিলেন আমাদের সেই জায়গায় যেতে হবে। কিন্তু যেতে পারেন নি। এমন এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ জন্মেছেন-

‘সমাজের উচ্চ মঞ্চে বসেছি সংকীর্ণ বাতায়নে।
মাঝে মাঝে গেছি আমি ওপাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে;
ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিলনা একেবারে।
জীবনে জীবন যোগ করা
না হলে, কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।
তাই আমি মেনে নেই সে নিন্দার কথা-
আমার সূরের অপূর্ণতা।
আমার কবিতা, জানি আমি,
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।।
কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,
কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,
যে আছে মাটির কাছাকাছি,
সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।’

বুঝতে পারছো। এই হলো রবীন্দ্রনাথ।সেই রবীন্দ্রনাথ জীবদ্দশায় দেখছেন যার প্রতিভা আছে…. নজরুল কে বলছেন…

নজরুল যখন অনশন করলো।

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ, ‘আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়।’ নজরুলকে ‘বসনÍ’ নাটক উৎসর্গ করলেন রবীন্দ্রনাথএবং রবীন্দ্র পরিমন্ডলের সবাই বিরক্ত হলো। তারা বললো নজরুলকে কেন ‘কবি’ বলে তাকে ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করলেন রবীন্দ্রনাথ। এটা নিয়ে এতো হইচই কেন? কারণ- রবীন্দ্রনাথ তার পরিমন্ডলের বাইরে আর কাউকেই বই উৎসর্গ করেন নি। যতগুলো উৎসর্গ সব তার পরিমন্ডলে তার পরিবার, আশেপাশে যাঁরা আছেন। বলতে গেলে অশিক্ষিত, সেই কবিকে তিনি ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করলেন। এই বিষয়টাকে রবীন্দ্র পরিমন্ডলের মানুষেরা মাইন্ড করছে। তখন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে দেখো, আজকের দিনে যে চাওয়া-পাওয়া তা নজরুলের মাঝে আছে। আমি যদি এখন কবি হতাম তাহলে নজরুলের মতোই কবিতা লিখতাম । (হাসি)

স্যার মাইকেল কে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারার বিদ্রোহী কবি বলা হয়, নজরুলের আগে। তার বিদ্রোহী অ্যাখ্যাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করেন?

যতীন সরকারঃ বিদ্রোহী- এই অর্থে যেমন ধরো রামায়ণ, মহাভারত এই গুলোতে তিনি ‘অমিত্রাক্ষর’ ছন্দ প্রবর্তন করছেন। বাংলায় তো তা ছিলোনা। ইলিয়াড ওডিসি থেকে আরম্ভ করে মিল্টন, বাইরন এদের ধারাটা তিনি বাংলায় আনলেন, তিনি বিশ্ব সাহিত্য জানতেন।

ইটালীয় কবি পের্ত্রাকের সনেট আনলেন।

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ, কাজেই বলতে গেলে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করে যে নতুন ধারা তা তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রবর্তন করলেন। সেই অর্থে তো বিদ্রোহীই। কিন্তু মাইকেল সম্বদ্ধে এতটুকু বললেই হবে না। আমি একটা প্রবন্ধ লিখতে ছিলাম…..

মাইকেল সম্পর্কে তো স্যার আপনার কোন প্রবন্ধে …. খুব বিস্তৃত লিখা নেই…..

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ তা ঠিক। মাইকেল কিন্তু কৃত্তিবাসের রামায়ণ থেকে নিয়েছেন।

মেঘনাদ বধ কাব্য?

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ, তা আমাদের চোখে পড়ে না। আমরা সবাই বলি যে তিনি তা পাশ্চাত্য থেকে এনেছেন। হ্যাঁ, পাশ্চাত্য থেকে এনেছেন কিন্তু ভিত্তিটা কৃত্তিবাসের রামায়ণ থেকে নিয়েছেন। তিনি অসাধারণ কবিতা লিখছেন সনেট। কৃত্তিবাস ও মধুসূদন নিয়ে লেখা শুরু করছিলাম ২০০৬ সালে তারপর আর লিখিনি। এটা মনে করেছি লিখবো। আমি তো লেখক না। কষ্ট লেখক। কলম ধরেই আমি লিখতে পারি না। কষ্ট করে লিখি। এই যে দেখো মাইকেল মধুসূধনের কৃত্তিবাস কবিতাটা দিয়ে- কৃত্তিবাসে যে সনেট লেখছেন-

‘জনক জননী তব দিলা শুভ ক্ষণে
কৃত্তিবাস নাম তোমা !- কীর্ত্তির বসতি
সতত তোমার নাম সুবঙ্গ-ভবনে,
কোকিলের কণ্ঠে যথা স্বর, কবিপতি,
নয়নরঞ্জন-রূপ কুসুম যৌবনে ,
রশ্মি মানিকের দেহে; আপনি ভারতী,
বুঝি কয়ে দিলা নাম নিশার স্বপনে,
পূর্ব-জনমের তব স্মরি হে ভকতি!
পবন-নন্দন হনু, লঙ্ঘি ভীমবলে
সাগর, ঢালিয়া যথা রাঘবের কানে
সীতার বারতা-রূপ সঙ্গীত-লহরী
তেমনিত, যশস্বি, তুমি সুবঙ্গ-মন্ডলে
গাও গো রামের নাম সুমধুর তানে,
কবি-পিতা বাল্মীকিকে তপে তুষ্ট করে।’

তাহলে কৃত্তিবাসের প্রতি তার কতোখানি শ্রদ্ধা ছিলো? ছোট বেলা থেকেই তো কৃত্তিবাস পড়েছেন। কিন্তু আমরা সমালোচকরা এই দিকে নজর দেইনা। মনে করে যে পাশ্চাত্য থেকে এনেছেন। আমি লিখেছিলাম-
‘প্রাক্ আধুনিক যুগে সর্বাধিক জন-নন্দিত কবি কৃত্তিবাসের এমন প্রশস্তি বাংলা কবিতা আধুনিকতার ভগীরথ শ্রী মধুসূদন ছাড়া আর কে রচনা করতে পারতেন? বঙ্গভূমিতে জন্ম নিয়ে, বঙ্গ ভাষাকে অবহেলা করে যিনি অবরেণ্যকে বরণ করেছিলেন ও পরধন লোভে মত্ত হয়ে সমস্ত সুখ পরিহার করে পরে বিদেশে ভিক্ষুক রূপে দীর্ঘকাল কাটিয়ে ছিলেন, তিনিই যখন সম্বিৎ ফিরে পান ও মহামূল্য মণির পূর্ণ মাতৃভাষার রূপ খনি সন্ধাণ পেয়ে যান তখন তার পক্ষেই তো রত্ন রাজির প্রকৃত মূল্য অবধারণ করা সম্ভব। এটা বুঝেছো?

হ্যাঁ, স্যার এ বঙ্গ ভান্ডারে….

যতীন সরকারঃ হুম…. হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন…… কেন লিখলেন ? এর কারণ এই যে, প্রচুর পড়াশুনা করছেন। ইংরেজিতে কবিতার বই বের করলেন, কিন্তু দেখা গেলো এটার ২০ কপিও বিক্রি হলো না। তিনি চাইছিলেন যে মিল্টনের মতো কবি হবেন। তখন কোলকাতার ‘ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন” বলে একজন ইংরেজ, বাঙালিদের খুব সুহৃদ ছিলেন। এই বেথুন কলেজ যাঁর নামে, এই দেশে নারী শিক্ষায় যাঁর ব্যাপক ভূমিকা। তিনি মাইকেলের ইংরেজি কবিতার বই পড়ে গৌরদাস বসাক কে বললেন- শুনো এই যে কবিতা লিখছে যত ভালোই কবিতা লিখুক সে, ইংরেজিতে ইংরেজের চেয়ে ভালো কবিতা লিখতে পারবে না। কাজেই ইংরেজরা তার কবিতা পড়বে কেন? তোমার বন্ধুকে বলো তার যে প্রতিভা আছে, যদি সে মাতৃভাষায় প্রয়োগ করে তাহলে সে অসাধারণ কিছু করতে পারবে। তখন সেই অভিমত গৌরদাস বসাক মাইকেলকে লিখে জানালেন। ইতোমধ্যে মাইকেলেরও মোহমুক্তি ঘটে যাচ্ছে। তখন মাইকেল দেখলেন তা তো ঠিকই কিন্তু ওখানে তার কাছে বাংলা কোন বইপত্রই নেই। তখন সে গৌরদাস বসাককে বললো- তুমি আমাকে কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’ আর কাশিদাসের ‘মহাভারত’ পাঠাও। আমি আবার বাংলা পড়বো। তখন গৌরদাস এগুলো পাঠালেন, পাঠানোর পরেও তার পক্ষে পড়া সম্ভব না। ওখানের- পরিবেশটাই অন্যরকম। আর রেবেকা বলে একটা মেয়েকে বিয়ে করেছেন তার সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না পরে তাকে ছেড়ে দিলেন। ডিভোর্স হয়নি।

আবার হেনরিয়েটাকে বিয়ে করলেন।

যতীন সরকারঃ বিয়ে হয়নি। বিয়ে কিন্তু হতে পারে না আগের ‘স্ত্রী’কে ডিভোর্স না করলে। হেনরিয়েটার সঙ্গে একত্র বাস করতেন সেটা বলতে পারো।

ওই পাশ্চাত্য সংস্কৃতি লালন করেছেন?

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ, তারপর দেশে এসে তিনি বাংলা সাহিত্য রচনা করলেন। কিন্তু ওই জায়গাটি আমাদের সমালোচকরা দেখেনা, কৃত্তিবাসের কাছ থেকে মানে এই দেশের ঐতিহ্য থেকে তিনি কী নিয়েছেন। আমাদের সমালোচকরা তো একচোখা। ভিতরে প্রবেশ করেনা। এই যে বলছি- শ্রী মধুসূদন রামায়ণের মূল রচয়িতা বাল্মীকি এবং সংস্কৃত ভাষায় তার উত্তরসূরী সকল প্রধান প্রধান কবির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। এবং সেই কবিবৃন্দের প্রত্যেকের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল। তবু রামায়ণের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় যে কবির কাব্য পাঠ করে সেই কৃত্তিবাসের কথা কখনো তিনি ভুলে যেতে পারেননি। একান্ত শৈশবেই তার পরিচয় কৃত্তিবাসের রচনার সঙ্গে। যখন সাগরদাড়িতে, যশোরে।’
আমি তো গেছি সেখানে, প্রচুর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। ওই বাড়িটা মিউজিয়াম করে রাখছে। ওইখানে দেখলাম তার ভাস্কর্যও আছে। যাই হোক।
‘শৈশবের সেই পরিচয়ের স্মৃতি তার সমস্ত সত্তার অনপেনেয়রূপে জড়িত মিশ্রিত হয়ে না থাকলে ‘মেঘনাদ বধের’ মতো নবযুগ প্রবর্তক একটি কাব্য কিছুতেই তাঁর হাত দিয়ে বের হতনা। পরিণত বয়সে বিশ্ব সাহিত্যের সনিষ্ঠ পাঠ তাঁর সত্তাকে তীক্ষ্ন ও মার্জিত করেছে অবশ্যই, তবু ভুললে চলবে না যে শৈশবেই তার শিল্পী সত্তার গোড়া পত্তন পাক আধুনিক বাংলা কাব্যের কথাবস্তুর সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে।’
শুধু কৃত্তিবাস নয়, কাশিদাস, মালাধর বসু, কবি মকুন্দরাম এদের কাব্য পড়েছেন। ওই বিদেশে বসে থেকে তাদের সবার সর্ম্পকে সনেট লিখছেন। কেন? এই গুলোর প্রতি কারো নজর নেই। এগুলোর মর্যাদা বুঝতে পারে না। দেখো, বলা হয়ে থাকে চিঠি লিখলেন তার বন্ধু রাজনারায়ণের কাছে- ‘আমি রাম এবং তার সাঙ্গপাঙ্গকে ঘৃণা করি, রাবণের যে মাহাত্ম্য আমাকে মুগ্ধ করে, রাবণ মহান’ এর কারণে অনেকেই মনে করে যে তিনি রাবণকে বড় করছেন রামকে ছোট করছেন। মূলত এটা মাইকেলের কথা না। রাবণকে বড় করা হয়েছে আমাদের দেশেই। এখানেই, এই কৃত্তিবাসের রামায়ণেই আছে। বুঝেছো?

হ্যাঁ স্যার, বলেছিলেন।

যতীন সরকারঃ এই দেশের লোকায়ত ঐতিহ্যের মধ্যে ব্রাহ্মণ সমন্ধে যা বলেছে। বলেছিলাম তোমাকে?

বলেছিলেন….বিভীষণ বলছিল-আমি যদি কথার অন্যথা করি তাহলে কলিতে ব্রাহ্মণ হবো। একশত পুত্রের পিতা হবো……।

যতীন সরকার:- হ্যাঁ হ্যাঁ….
‘কলির বামুন ঢোড়া সাপ
যে না মারে তার পাপ’
এই জিনিস গুলো তো লক্ষ্য করতে হবে। লৌকিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে ….শিকড়ের সাথে যুক্ত না থাকলে ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন আমরা কী করি শিকড়ের সাথে যুক্ত না হয়ে উপর দিকে চেয়ে থাকি। এই জায়গাটাই তো মুশকিল এবং রবীন্দ্রনাথ তা বুঝেছিলেন। সমাজের উচ্চ মঞ্চে বসে থেকেও তিনি তো খুঁজে খুঁজে বের করেছেন। এই যে- লালনের গান, গগন হরকারার গান। উনি খুঁজে খুঁজে কেন বের করছেন? ওইখানেই মূলটা নিহিত কিন্তু এই মূলের থেকে যাঁরা এসেছেন তাঁরা কেন করতে পারেন না ? তার অভিযোগটা হলো ওইখানে, এবং দেখো রবীন্দ্রনাথ একেবারে সেই সময়ে……

একটা প্রবন্ধে বাউল গান সম্পর্কে লিখেছেন।

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ, বাউল গান সম্পর্কে লিখেছেন। তোমাকে পড়তে দিয়েছিলাম। চিন্তা করে দেখছো। তখন তার ২২ -২৩ বছর বয়স। এবং যে কথাটা তিনি বলেছেন তা তো অসাধারণ কথা। এখানে বলা হচ্ছে যে- ‘ … বাঙালি জাতির যথার্থ ভাবটি যে কী তাহা আমরা ধরিতে পারি নাই- বাঙালি জাতির প্রাণের মধ্যে ভাবগুলি কিরূপ আকারে অবস্থান করে তাহা আমরা ভালো জানি না। এই নিমিত্ত আধুনিক বাংলা ভাষায় সচরাচর যাহা লিখিত হইয়া থাকে তাহার মধ্যে যেন একটি খাঁটি বিশেষত্ব দেখিতে পাই না। পড়িয়া মনে হয় না, বাঙালিতেই ইহা লিখিয়াছে, বাংলাতেই ইহা লেখা সম্ভব এবং ইহা অন্য জাতির ভাষায় অনুবাদ করিলে তাহারা বাঙালির হৃদয় জাত একটি নূতন জিনিস লাভ করিতে পারিবে। ভালো হউক,মন্দ হউক আজকাল যে সকল লেখা বাহির হইয়া থাকে তা পড়িয়া মনে হয় যেন এমন লেখা ইংরেজিতে বা অন্যান্য ভাষায় সচরাচর লিখিত হইয়া থাকে বা হইতে পারে। ইহার প্রধান কারণ এখনো আমরা বাঙালির ঠিক ভাবটি, ঠিক ভাষাটি ধরিতে পারি নাই! সংস্কৃতবাগীশেরা বলিবেন, ঠিক কথা বলিয়াছ, আজকালকার লেখায় সমাস দেখিতে পাই না, বিশুদ্ধ সংস্কৃত কথার আদর নাই। এ কি বাংলা! আমরা তাঁহাদের বলি, তোমাদের ভাষাও বাংলা নহে, আর ইংরেজিওয়ালাদের ভাষাও বাংলা নহে। সংস্কৃত ব্যাকরণেও বাংলা নাই, আর ইংরেজি ব্যাকরণেও বাংলা নাই, বাংলা ভাষা বাঙালির হৃদয়ের মধ্যে আছে। ছেলে কোলে করিয়া শহরময় ছেলে খুঁজিয়া বেড়ানো যেমন, তোমাদের ব্যবহারও তেমনি দেখতেছি। তোমরা বাংলা বাংলা করিয়া সর্বত্র খুঁজিয়া বেড়াইতেছ, সংস্কৃত ইংরেজি সমস্ত ওলট-পালট করিতেছ কেবল একবার হৃদয়টার মধ্যে অনুসন্ধাণ করিয়া দেখ নাই। আমাদের সমালোচ্য গ্রন্থে একটি গান আছে-

‘আমি কে তাই আমি জানলেন না
আমি আমি করি কিন্তু, আমি আমার ঠিক হইল না।
কড়ায় কড়ায় কড়ি গণি
চার কড়ায় এক গন্ডা গণি
কোথা হইতে এলাম আমি তারে কই গণি।’

আমাদের ভাষা আমরা যদি আয়ত্ত করিতে চাই, তবে বাঙালি যেখানে হৃদয়ের কথা বলিয়াছে, সেইখানে সন্ধান করিতে হয়।’
দেখো, সেই সময়ে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে বসে সেটা উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। আর তোমরা? তোমরা কত খানি? নেত্রকোনা তো গ্রাম। গ্রামেই তো তোমাদের জন্ম। তোমরা সেদিকে তাকাও না। শুধু উপর দিকে চেয়ে থাকো।

সে দিন আধুনিক বাংলা সাহিত্য সর্ম্পকে আরো কী যেন বলেছিলেন…

যতীন সরকারঃ এই যে ছোট গল্প ও কবিতা তৈরি হয়েছে, তখন কী ছিলো ? পরিষ্কার ভাবে মনে রাখবে, একটা সমাজ ব্যবস্থা যখন বর্ধিঞ্চু থাকে (growing থাকে) তখন সেই সমাজ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত শিল্প সাহিত্য থাকে growing, যখন সেই সমাজ ব্যবস্থা ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে যায়, তখন সেই ধারার সমস্ত শিল্প সাহিত্য ক্ষহিষ্ণু। সেই ধারাকে বাতিল করে দিয়ে নতুন ধারার সঙ্গে যারা যুক্ত হয় তারাই বেরিয়ে যেতে পারে। এই যে মনে করো, নির্মুলেন্দু গুণ। নির্মুলেন্দু কত বড় কবি সেটা মোটেও বড় কথা না। কিন্তু নির্মুলেন্দু গুণ যুগের ধারাটাকে ঠিকমতো ধরতে পেরেছিলো। ১৯৫০ থেকে আমাদের পূর্ব পাকিস্তানে যে কবিতা চাষ হয়েছে সেটার একটা পজেটিভ এবং আর একটা নেগেটিভ দিক আছে। পজেটিভ দিকটা কী? একটা নেগেটিভ দিক কে বাতিল করে একটা পজেটিভ দিক এসেছে। ৫০ এর পূর্ব পর্যন্ত বা ৫০ এর পরেও কিছু দিন আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের কবিরা সব ইসলাম নিয়ে কবিতা লিখতেন। এবং সেই কবিতাকে পূর্ববর্তী- একেবারে বলতে গেলে- আধুনিকতারও আগের ধারায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এটা প্রতিক্রিয়াশীল। সেই অবস্থা থেকে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আহ্সান হাবীব, শামসুর রাহমান প্রমুখ কবিরা একটা নুতন ধারা নিয়ে আসলেন। সেই নুতন ধারাটা কী? নুতন ধারা হলো- তিরিশের যে বাংলা কবিতা অর্থাৎ রবীন্দ্রোত্তর যে বাংলা কাব্য সেই খানে তাঁরা গেলেন। এটা পজেটিভ দিক এই অর্থে বাংলা সাহিত্যে এই যে ধারাটা প্রতিক্রিয়াশীল ধারার বিপরীত ধারার সঙ্গে যুক্ত হলেন। নিজেদের জন্য সে জায়গায় এই তিরিশের কবিতার যে অবক্ষয় দেখা দিয়েছিল, কেন অবক্ষয়? কারণ তিরিশের কবিদের রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। আধুুনিক কবিতা, আধুুনিক কবিতা বলতে কী বুঝায়? আধুনিকতা তো সময় দিয়ে না, মেজাজ দিয়ে। আমাদের বাংলা সাহিত্যে আধুুনিকতা শুরু হয়েছে মাইকেল মধুসূদনকে দিয়ে। সেই ধারায় রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এসেছে। এরপর আর একটা যুগকে বলা হতো অতি আধুনিক। যা রবীন্দ্রোত্তর আধুুনিকতা। যখনই কবিতা লিখতে যায় তখনই রবীন্দ্রনাথের মতো হয়ে যায়। তখন রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। তো রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো কবি এই দেশে হতে পারে না। তখন তারা করলো কী, যেহেতু দেশের মাটির সাথে যোগ নেই। তাঁরা পশ্চিমের দিকে তাকালো। সেই পশ্চিমের যত অবক্ষয়ী কবিতা টি. এস. এলিয়াড, এজরাপাউন্ড থেকে আরম্ভ করে এগুলি তারা পড়লো এবং তাঁরা শিক্ষিত লোক ছিলো, তাই এগুলো বাংলা ভাষায় এক ধরণের অনুবাদের মতো করে দিয়ে গেলেন। ঐখানে তো সমাজের অবক্ষয় হয়েছে, কিন্তু আমাদের এখানে তো কিছুই হয়নি। তো আমাদের এখানে এটা অনুকরণ না হয়ে বুঝেছ, হনুকরণ হয়ে গেলো, যার ফলে হলো কী, ঐ এদের হাতে কবিতার দুর্লক্ষণ সৃষ্টি হলো। এবং এইটা নির্দেশ করছেন কে? আবু সয়ীদ আইয়ুব। আবু সয়ীদ আইয়ুব কে আমি বলি আধুনিক কবিতার জহুরী। ‘আধুনিকতায় রবীন্দ্রনাথ’ এর মধ্যে তিনি যা লিখেছেন, তিনিই এখানে প্রথম …।

উনি তো বাংলা ভাষার লোক ছিলেন না।

যতীন সরকারঃ নো, উর্দু ভাষী, শোন, আবু সয়ীদ আইয়ুব কে মনে হয় দুনিয়ার একটা বিস্ময়। তিনি যখন কলেজে পড়তেন তখন বাংলা জানতেননা। তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে বাংলা ভাষা শিখায় আগ্রহী হলেন। তারপর তিনি যখন বাংলা শিখলেন তখন এমন শিখাই শিখলেন যেটা বলতে গেলে একেবারে মহাবিস্ময় । দুইটা সংকলন বের করেছেন। ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’।। রবীন্দ্রনাথের পরে, রবীন্দ্রনাথ দিয়ে শুরু আর ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’। এবং তিনি আধুুনিক কবিতার সংজ্ঞা যেভাবে নির্দেশ করছেন। যেটা আর কেউ পারেননি।
তিনি বলেন,- ‘কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ পরবর্তী (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ), ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত, অন্তত মুক্তি প্রয়াসী কবিতাকেই আমি আধুুনিক কবিতা বলি।’ এটাই হলো সংজ্ঞা।

তাহলে স্যার এই সংজ্ঞার মাঝে তো রবীন্দ্রনাথের কবিতা আধুনিকতার পর্যায়ে পড়েনা।

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ, এটাই তো মজার কথা। রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়ে শুরু করতে হয়। আধুনিক কবিতার যে সংকলন করা হয় রবীন্দ্রোত্তর যেমন ‘পুনশ্চ’, ‘শেষ সপ্তক’ এর মতো কবিতা আধুনিকরাও লিখতে পারেননি। ‘বাঁশি’ কবিতার মতো আধুুনিক কাব্য লিখতে পারেন নি।

তাহলে আবু সয়ীদ আইয়ুব কী রবীন্দ্রনাথ কে বাতিল করে আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা দিয়েছেন?

যতীন সরকারঃ না, না, বাতিল করে না, রবীন্দ্র প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা এবং কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ পরবর্তী। লিখেছেন- রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত। প্রভাব- মুক্ত না হতে পারলেও অন্তত মুক্তি প্রয়াসী এবং এটাতে দেখা গেলো মোটামুটি ভাবে পাঁচ জন কবি আধুনিক কবিতার পুরোধা হলেন। জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী এই পাঁচ জন।

পঞ্চ পান্ডব।

যতীন সরকারঃ এখন কথা হচ্ছে এই কবিতা দুর্বোধ্য। কেন দুর্বোধ্য? কারণ হলো এই বিষয়টা আমাদের বাংলাদেশের ভাবনা চিন্তার সাথে কোন মিল নেই।

বাইরে থেকে এনেছেন।

যতীন সরকারঃ বাইরে থেকে এনেছেন। কিন্তু কবিরা তো হলো এমন যাঁরা এক কবি আরেক কবির সমালোচনা করেন। কিন্তু অন্যরা যখন সমালেচনা করে তখন তাদের সহ্য হয় না। (হাসি) এক কবিকে কিন্তু আরেক কবি দেখতে পারেন না প্রত্যেক কবিই মনে করেন তার কবিতা নোবেল প্রাইজ পাওয়ার যোগ্য। অন্যদের কবিতা হয়না (হাসি)। টি এস এলিয়াড পর্যন্ত তা বলছেন তাঁর সাথের কবিদের। এইখানে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বলছেন আবু সয়ীদ আইয়ুবকে- ‘আচ্ছা, বল তো দেখি, তুই তো এই যে আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা এই সব লিখিস, তুই এগুলো বুঝিস? আমি তো বুঝি না।’ (হাসি)
এখন ধরো, এই সুধীন দত্ত, বুদ্ধদেব বসুদের বাংলা ভাষায় বিরাট অবদান। এটা কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু তাদের সমস্যা টা কোন জায়গায়? ওই জায়গায়- তারা ওই অবক্ষয়ী সাহিত্যের ধারা ধরে এসেছে বলে কী হয়েছে? কবিতা কেউ বুঝে না, কী লাভ তাতে? এই কবিতায় বাংলা সাহিত্যে কী উপকার হলো? উপকার হয়েছে শব্দের ক্ষেত্রে। যেমন ধর শব্দ না শুধু, কবিতার কিছু কিছু লাইন। অনিকেত, ধেৎ. . . মনে পরছে না। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে এঁরা আসলে শব্দের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন।

পাঠক থেকে বিচ্ছিন্ন?

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ, পাঠক থেকে বিচ্ছিন্ন! কিন্তু সেই অবস্থা দূর করছে কারা? মার্কসবাদী কবিরা, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত এরা। কিন্তু তারাও বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেন নি। তার কারণ টা কী জানো?

মার্কসবাদী কবিরা তারা আবার ওই গুলো জানে।

যতীন সরকারঃ ওইগুলো জানে, আবার তারা কিন্তু জনবোধ্য কবিতা লিখেছেন। খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি কেন? কবিকে ভিত্তি করতে হবে নিজের দেশ, নিজের সমাজের যে ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্য আমাদের গ্রাম বাংলায়। আমি যাকে বলি বাংলা ভাষার মূলধারা।

হ্যাঁ, বাংলা কবিতার মূলধারা।

যতীন সরকারঃ বাংলা কবিতার তার সঙ্গে শহুরের মধ্যবিত্ত কবিদের কোনো সম্পর্ক ছিলোনা। সুকান্তরও ছিলোনা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়েরও ছিল না, সমর সেনেরও ছিল না, মঙ্গলরাচরণ চট্টপ্যাধায়েরও ছিল না।কাজেই তাঁরাও একটা জায়গায় গিয়ে আটকে গেলন। সেই সময়ে এলো মুসলমানরা।
মুসলমানরা তো…. সেই হিন্দুর সব কিছু, রবীন্দ্রনাথও বাদ দিতে হবে। এই একটা ধারা পাকিস্তান এসব করে এ দেশের সাহিত্যকে সর্বনাশ করে দিলো। সেই সর্বনাশ থেকে বাঁচানোর জন্যে যারা এসেছেন তাদের মধ্যে প্রধান হলেন শামসুর রাহমান। তিনি করলেন কী, তিরিশের কবিতার ধারার সঙ্গে যুক্ত করলেন আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের কবিতাকে। এটা একটা প্রগতিশীল চিন্তা, এটা ইতিবাচক দিক। কিন্তু ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে ’ হতে আরম্ভ করে ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’ পর্যন্ত এগুলো তিরিশের কবিদের লাইন এবং তার গুণ ও দোষ সবগুলোই তার মধ্যে বিদ্যমান।১৯৬৯ এর গণ- আন্দোলনের সময় কবি নির্মলেন্দু গুণ সে আন্দোলনে তিনি নজর দিলেন নিজ দেশের মানুষের দিকে অন্যকিছুর না হোক অন্তত সে আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক ধারার যে পরিবর্তন হয়েছে এটা সে ধরতে পেরেছেন। ১৯৬৯ সালে লিখলেন ‘হুুলিয়া’ কবিতা । ‘হুলিয়া’ কে আমি বলি আমাদের বাংলা সাহিত্যের টার্নিং পয়েন্ট। বদলে গেলো এদেশের কবিতার ধারা। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, ময়মনসিংহের ডি.সি.একজন কে বলছেন- “কী বলেন আধুুনিক কবিতা বুঝা যায় না? নির্মলেন্দুর কবিতা পড়েছেন?” তখন নির্মলেন্দুকে মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন অনেকেই। সাধারণ পাঠকও। ডিসি তো কবিতা বুঝেন না। ‘এক কবিতে কাব্য লিখেন আরেক কবি বুঝেন’ কিন্তু ডি. সি তো কাব্য লিখেন না। এই যে কবি কাব্য লিখে না সে কাব্য পড়েন। এটা কিন্তু নির্মলেন্দু গুণ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে, মানে এই দেশের সাহিত্যে এটা আগে কেউ করতে পারেননি। এবং আমি বলি নির্মলেন্দুর চেয়ে শামসুর রাহমান যেহেতু যথার্থ অর্থই কবি, তিনি তখন লিখলেন ‘বন্দি শিবির থেকে’। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দেখা গেলো নির্মলেন্দুর ধারা ধরে…

শামসুর রাহমান এগিয়ে গেলেন।

যতীন সরকারঃ এগিয়ে গেলেন, এবং আগের ধারা থেকে তিনি নিজেকে পূর্ণ বিচ্যুত করে নিলেন বলেই শামসুর রাহমান মারা গেলেও জনগণ আজও তাঁর কবিতা পড়ে। কবিতা না পড়লেও নাম জানে। নজরুল যখন মারা গেলেন, আমার মনে আছে আমি জেলখানায় বসে থেকে পড়লাম। আমার কোনো একটা বইয়ে আছে। নজরুল যখন মারা গেছেন। তখন জেলখানায় আমি পড়ছি। শামসুর রাহমান তখন ‘দৈনিক বাংলার’ সম্পাদক। তিনি লিখলেন-আচ্ছা নজরুল মারা যাওয়াতে রাস্তায় হাজার হাজার লোক আসলো এরা সবাই তো নজরুলের কবিতা পড়েনি, তবু জানে নজরুল একজন বড় কবি, তাদের কবি। এটা কেন হয়? আমি তো এটা বুঝতে পারিনা। তাঁর ভিতরে একটা নাড়া দিল। বুঝেছো।
তোমরা তো মনে করো, ধুর, কবিতা সব পাঠক বুঝেনা। নাক সিটকানো ভাব। (হাসি)। সুধীন দত্তের নিজে কথায় ‘আধুনিক কবিতা দুর্বোধ্য নয় দুরূহ, যে দুরূহতা পাঠকের আলস্যে, তার জন্যে কবির প্রতি দোষারোপ অন্যায়’। ‘সহেনা সহেনা আর জনতার জঘন্য মিতালী’ কাজেই এ জায়গাতে আমাদের বাংলা কবিতা কে ফিরিয়ে আনলেন? শামসুর রাহমান আর এর মূল স্থপতি নির্মলেন্দু গুণ। নির্মলেন্দু গুণ এর চেয়ে অনেক বড় কবি যে শামসুর রাহমান এ বিষয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর হাতেই বাংলা কবিতার এই ধারা আসলো কিন্তু এর পরেও দেখা যায় তোমরা যখন কবিতা লিখো তখন মনে করো কবিতা না বুঝার মাঝেই হলো কবিতার মাহাত্ম্য। (হাসি)।
এখন ধরো, কবিতার বই পড়ে মহাদেব সাহার, কেন মহাদেব সাহার কবিতার বই? সে বড় কবি বলে নয়, কবিতার ধারাটিকে জনগণের সাথে যুক্ত করে রেখেছে বলে। তিনি তো আর জালাল খাঁর মতো কবিতা লিখেননি, সেতো আধুনিক কবিতা লিখছেন। তাঁর শক্তি অনুযায়ী। তোমার শক্তি অনুযায়ী তুমিও লিখবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে, জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাহীন যে লোক তার শক্তির কোনো দাম নেই। শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা তাদের শক্তি অনুযায়ী জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এ পর্যন্ত এসেছেন তাদের কবিতার বইও বিক্রি হয়। আর এ রকম দু’চার জন। যেমন ধরো হেলাল হাফিজ।

আবুল হাসান।

যতীন সরকারঃ হে, আবুল হাসানের কবিতা। সবারই কিছু কিছু। এখন দেখা যাবে তোমাদের মধ্যেও কয়েকটা লাইন বা কিছু কিছু কবিতা। যেমন আছে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদ্দুল্লাহ্ প্রত্যেকেরই কিছু কিছু আছে। আমি হেলাল হাফিজকেও উচ্চ মর্যাদা দেই। কারণ নিজেকে বুঝে ফেলেছেন, যে আমি আর পারবো না। ৪৬ বছর যাবৎ সে কবিতা লিখেন না। কিন্তু পাঠকরা তো তাকে ভোলে নি। তাকে তুলে এনে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দিয়েছে। কেন?

পাঠকের সাথে সম্পর্ক।

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ।

কিন্তু স্যার এই তিরিশের দশকের বুদ্ধদেব বসু. . . . যাঁদের কথা আপনি বললেন। তাঁরা কেন এখনো বাংলা সাহিত্যে কবি হিসেবে বেঁচে আছেন?

যতীন সরকারঃ তাঁরা কবিতাকে তো অনেক কিছু দিয়েছেন। এই শব্দের পরিবর্তন। মানে ধরো, বুদ্ধদেব বসুরা, তাঁরা কবিতাকে তব, মম, এই সমস্ত থেকে বাঁচিয়েছেন। কবিতাকে একেবারে গদ্যের ভাষার সাথে যুক্ত করা, এগুলো তো তাঁদের কাজ। কিন্তু এদের মাঝে সত্যিকারের কবি কে জানো? জীবনানন্দ দাশ। বুদ্ধদেব বসুর বড় অবদান কী জানো? জীবনানন্দের কবিতা কেউ হয়তো পড়তো না, তাঁকে প্রতিষ্ঠা করেছেন বুদ্ধদেব বসু। তাকে খুঁজে বের করে এনেছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানো? তাঁর মধ্যে obsession ছিল- যখনই কবিতায় রাজনীতি, অর্থনীতির কথা এসে যাবে তখনই কবিতা নষ্ট হয়ে গেলো। তাই জীবনানন্দ যখন ‘১৯৪৬’ লিখলেন তখন বুদ্ধদেব বসু তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। যেমন তিনি সুকান্তের কবিতা সম্পর্কে যা তা বলেছেন। কেন? সুকান্ত কিন্তু তার কাছে কবিতা পাঠাতেন। ছন্দ ঠিক করে দেওয়ার জন্যে, বুদ্ধদেব বললেন- সুকান্ত ভালো কিন্তু তাকে রাজনীতি নষ্ট করে দিয়েছে। যখন সুকান্ত লিখেন-

‘দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে
লিখি কথা।
আমি যে বেকার,পেয়েছি লেখার
স্বাধীনতা।।

সকালে বিকালে মনের খেয়ালে
ইঁদারায়
দাঁড়িয়ে থাকলে অর্থটা তার
কি দাঁড়ায়?”

কী চমৎকার কথা কিন্তু যখন লিখে- ‘রানার পিঠেতে টাকার বোঝা /তবু এ টাকাকে যায় না ছোঁয়া।’ ছুঁতে পারলে কি ভালো হতো? সুকান্ত লিখে- ‘রক্তে আনো লাল’। বুদ্ধদেব বললেন- ‘রক্তে আবার লাল আনবে কীকরে?’ রক্ত তো সব সময়ই লাল।
তখন বুদ্ধদেবকে কী বলতে হয়? রক্ত আনো লাল মানে কী? রক্তে আনো লাল মানে সমাজতন্ত্র। সাম্যবাদ নিয়ে এসেছে। কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর যে কীর্তি, আমরা হচ্ছি সেই মানুষ (মার্কসবাদীরা) যার যা অবদান তার থেকে তাকে বঞ্চিত করিনা। সবটাই স্বীকার করি। বুঝেছ…। স্বীকার করি বলেই ইকবালের বিষয়ে প্রবন্ধ লিখি, স্বীকার করি বলেই দেওয়ান মোঃ আজরফের মতো ধার্মিক মানুষ সম্পর্কেও লিখি। যার যতটুকু প্রাপ্য তাকে সেটা দিতে হবে। কিন্তু যার যা নয় তাকে তা দিবো কেন?
এখন তিরিশের কবিদের এই যে জিনিস গুলি, তিরিশের কবিরা যে ভাষা সৃষ্টি করেছেন এর বিপরীতে গিয়ে তুমি কবিতা লিখতে পারবে না। কিন্তু কবিতার বিষয়, শামসুর রাহমান কি সেই বিপরীতে গিয়েছেন? কবিতার বিষয়বস্তু, কবিতার লক্ষ্য সেটা কিন্তু আলাদা। সেটা মনে রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের কবিরা শামসুর রাহমানও একদিকে সে জায়গায় যেতে পারেননি। তিনি কিন্তু- জালাল খাঁ, হাসন রাজা, লালন, দ্বিজদাস তাদের কোনো খোঁজ রাখতেন না। কিন্তু সেই সূত্র ধরে যদি আধুনিক কবিতা লিখা হয়, তবে এই আধুনিক কবিতা হবে জনগণের। শতকরা নব্বই জন মানুষের কবিতা। সেই ধারায় আমাদের কবিরা যেতে পারেনা। লক্ষ্যটা তো উপর দিকে চেয়ে থাকা। তোমার বাড়ি নেত্রকোনা। কিন্তু নেত্রকোনার কবিদের খবর তুমি রাখোনা। দেখবে ঢাকার কবিরা কী লিখে আর তুমি যদি ইংরেজিটা ভালো জানতে পারো তাইলে দেখবে বিদেশী কবিরা কী লিখে।

সম্ভাবনা অতুল এবং এখনো মনে করি আমাদের কবিদের পরিবর্তন হবে। মনে করো মদনের মতো মফস্বল এলাকা থেকে ‘সড়ক’ নামক ছোট কাগজটি বের হয়েছে তার কথা। ওখানকার কবিরা যে ভাবেই কবিতা লিখুক, এই মদন এলাকায় কারা কারা ঘাটু গান করেছেন এ সমস্ত বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে হয়। প্রবন্ধ ছাপতে হয়। এখন এদের সবার তো শক্তি নেই কিন্তু কোনো শক্তিমান কি এর মধ্যে পাওয়া যাবেনা? সরোজ মোস্তফার নেয়া আমার সাক্ষাৎকার এর মধ্যে ছেপেছে। কেন ছেপেছে? আমার কথা সবটা মানতে হবে এমন কোনো কথা না। কিন্তু আমার কথাকে বিবেচনার মধ্যে না রেখে পরছেনা। কবিতা বিষয়ক আমার কথার বিরুদ্ধে অনেক কথা তাদের থাকতে পারে। কিন্তু আমার কবিতা বিষয়ক কথা গুলো বিবেচনা করতে হবে এই বোধটা এখন অন্তত এসেছে। কিন্তু আমার কথাই চূড়ান্ত হবে এটা কে বলছে! (হাসি)। আমি তো চূড়ান্ত কথা বলি না। এই যে কবিতার ‘ঋত’ সম্পর্কে আমি লিখেছি, এটাতো আমার নিজের কথা। আমি তো এইভাবে লিখি। কবিতা আসলেই এমন একটা বিষয়। কবিতা কে বাদ দিয়ে…। এখন আমাকে ধরা হলো আমি কবিতার বিরুদ্ধে, কবিতার বিরুদ্ধে যে যায় সেতো মানুষই না। কিন্তু কবিতার নামে ‘যাহা তাহা হইব তাহাকেই বলিতে হইবে যে এইডা কবিতা হইছে’- সে কেমন কথা! এই যে দেখো, নেত্রকোনার অনেক তরুন কবি। শক্তি আছে তাদের। কিন্তু মুশকিলটা হলো কী জানো- ওরা কিন্তু ওই লাইনে যাবে না। পড়াশুনা করে বুঝে, কবিতার ধারাটা কী, ইতিহাসটা কী, কী চায়, ওই জায়গায় যাবে না।

নজরুলকে আপনি খাঁটি বাঙালি কবি বলেন, বর্তমানে নজরুল চর্চা সম্পর্কে বলবেন?

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ। নজরুল চর্চা যেভাবে হওয়া উচিত সেটা হয়নি। নজরুল এখন সাহিত্যের একটা ব্যবসায়িক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এবং নজরুল চর্চা যান্ত্রিক অবস্থানে পরে গেছে। ‘নজরুল একাডেমি’, ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’ হচ্ছে গতানুগতিক কথাবার্তা। কিন্তু নজরুল যে কতো বড়ো সেটা রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন। নজরুলকে কখনো রবীন্দ্র বিরোধীতা করতে হয়নি। রবীন্দ্রনাথকে তিনি বলেছেন-

“একা তুমি জানতে হে কবি মহা ঋষি
তোমারই বিচ্যুতছটা আমি ধূমকেতু।
আমি জানি মোর আগে রবি নিভিবে না।’

নজরুল সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অনেক কথা আমি আগেও বলেছি। নজরুল কেন ‘খাঁটি বাঙালি কবি’- নজরুল রবীন্দ্রনাথের ভিতরে মানুষ হয়েছেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথকেও অনেক ক্ষেত্রে অতিক্রম করে গেছেন। তার জন্য রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করতে হয়নি। নজরুল যেখানে জন্মগ্রহণ করেছেন, বেড়ে উঠেছেন তা হলো বাঙালির খাঁটি সংস্কৃতির জায়গা। লেটোর গান, যাত্রা, কবি গান ইত্যাদি। তারপর ময়মনসিংহের ভাটিয়ালি অর্থাৎ বাঙালির মূল ঐতিহ্য যেখানে বিদ্যমান তার সঙ্গে যুক্ত থেকে আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন নজরুল, এটা অন্য কোনো কবি করেনি। জসীম উদ্দীন কিছু কিছু লিখেছেন কিন্তু সামগ্রিক ভাবে খাঁটি বাঙালি ঐতিহ্যকে ধারণ করে নজরুলের মতো আধুনিক কাব্য, গান কেউ লিখেন নি। নজরুলের সেই দিকটার প্রতি আমাদের গবেষকদের নজর নেই। নজরুলের গতানুগতিক বিষয়গুলো তারা দেখেন। নজরুল বিদ্রোহী, প্রেমের কবিতা লিখেছেন এসব আর কি। নজরুলের ভিতরে প্রবেশ করার যে প্রয়াস, চিন্তা সেটাই আমাদের নেই। আর আমার মনে হয়, এখনকার ছেলে মেয়েরা নজরুল পড়েও না। নজরুলের বিরোধিতা করার হিম্মত নেই কারো। কাজেই এখন একটা ব্যাপার হয়েছে ‘কন্সপিরেসি অব সাইলেন্স’। নজরুল সম্পর্কে নীরব থাকে। অথচ আমাদের কবি সাহিত্যিকরা যদি নজরুল ভালোভাবে পড়তো, উপলব্ধি করতো তাহলে তাদের হাত ধরে নতুনতর সাহিত্য সৃষ্টি হতো।

নজরুলের ধারা ধরে?

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ, নজরুলের ধারায়।

 

জীবনানন্দকে ‘পরাবাস্তব কবি’, ‘নির্জনতার কবি’, ‘রূপসী বাংলার কবি’ বিভিন্নভাবে বলা হয়ে থাকে। আপনি জীবননান্দের কবিতাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করেন?

 

যতীন সরকারঃ জীবনানন্দের পরিবারটি ছিল শিক্ষিত, মার্জিত, বিদগ্ধ, নীতিপরায়ণ ও কলাকুশল; কিন্তু আর্থিক ও বৈষয়িক বিচারে নিতান্ত হতদরিদ্র না হলেও দারিদ্রের ধার ঘেঁষা নিন্ম মধ্যবিত্ত। সহজ সরল জীবনযাপনেই এই ধরণের পরিবারকে তুষ্ট থাকতে হয়। জীবননান্দের পিতৃপরিবারটিকেও সে রকমই থাকতে হয়েছিল। তবে বাধ্য হয়ে অবস্থার চাপে পড়ে এ রকম জীবন যারা যাপন করে যায়, কিন্তু অন্তরে থাকে ভোগস্পৃহা চরিতার্থ -করতে- না- পারাজনিত ক্ষোভ ও হতাশা, জীবনানন্দের পরিবারটি সে রকম ছিল না। পরিবারটি ছিল ব্রাহ্ম। ‘সরল জীবন ও উচ্চ চিন্তাই’ ছিল ব্রাহ্মদের জীবনাদর্শ। জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশ ব্রাহ্ম সমাজের আচার্যের কাজ করতেন। পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষক, ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের পত্রিকা‘ ব্রহ্মবাদী’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, প্রবন্ধ লেখক। মাতা কুসুমকুমারীও ছিলেন কবি। বরিশালের মতো মফস্বল শহরে গুটিকয়েক ব্রাহ্ম পরিবার নিয়েই ছিলো তাদের ব্রাহ্ম সমাজ। ব্রাহ্মদেরকে বলা হয় ‘আলোকিত হিন্দু’। সাধারণ হিন্দুসমাজের থেকে তাদের দূরত্ব ছিল বিস্তর, অন্তত জীবননান্দের শৈশবকালের জেলা শহর বরিশাল তো ছিলই। সে সময়েও শহরের শিক্ষিত হিন্দুরাও জাতপাত ভেদমূলক আচারের দেয়াল পুরোপরি ভেঙে দিয়ে ব্রাহ্মদের সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতেন না। এবং বৃহত্তর সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন থেকেই বরিশালের ব্রাহ্মরাও নিজেদের একটি পরিমন্ডল গড়ে নিয়েছিলেন, সে পরিমন্ডলেই চলতো তাঁদের মনন ও বৈদগ্ধ্যমন্ডিত বিশিষ্ট জীবনচর্যা। এ রকম জীবনচর্যার মধ্য দিয়েই তাঁরা আত্মিক বিচ্ছিন্নতা ঘোচানোর প্রয়াস পেতেন। সেই জীবনচর্যার উত্তরাধিকার নিয়েই জীবনানন্দের জন্ম হয়েছিল।জন্ম সূত্রে প্রাপ্ত তাঁর আর্টিস্টিক টাইপের স্নায়ুবিক সংগঠন ও ফ্লেগম্যাটিক ব্যক্তিত্ব ও সেই উত্তরাধিকারের উপাদান নিয়েই পুষ্ট হয়ে উঠেছিলো। অত্যন্ত উচ্চমেধা ও স্নায়ুতন্ত্রে ও কবি জনোচিত বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে জীবনানন্দ যে পারিবারিক ও সামাজিক পরিমন্ডলে তাঁর শৈশব অতিবাহিত করেছিলেন, সে পরিমন্ডলই তাঁর আত্মমুখী চরিত্রেরও অনেকটাই তৈরি করে দিয়েছিল। বুদ্ধদেব বসু যে বলেছেন-‘অবগুন্ঠিত ব্যক্তিত্ব নিয়েই জীবনানন্দ সারা জীবন কাটিয়েছিলেন’ সে কথাটি মোটেই অসত্য নয়। তবু ‘অবগুণ্ঠিত ব্যক্তিত্ব’ ও আত্মমুখিতা সত্ত্বে ও, জীবনানন্দ সম্পর্কে কেউ যদি ‘আত্মকেন্দ্রিক’ বিশেষণটি ব্যবহার করেন, তবে তিনি অবশ্যই ভুল করবেন। আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব থেকে তিনি ‘নির্জনতার কবি’ হননি। ‘নির্জনতার কবি’ অভিধাটির সদর্থক তাৎপর্যটি বুঝে নেয়া খুবই জরুরি। নির্জনতায় অবস্থান করেই বৃহত্তর জনতার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা নিরসনের এক অভিনব সাধনায় ব্যাপৃত ছিলেন জীবনানন্দ, জনতার অন্তর্গত নানা ধরনের ব্যক্তির হৃদয়স্পন্দন তিনি আপন হৃদয়ে অনুভব করেছিলেন তাঁর কবিজনোচিত ‘এমপ্যাথি’ দিয়েই। তীব্র গভীর প্রচন্ড ‘এমপ্যাথি’ না থাকলে কি তিনি লাশকাটা ঘরে শুয়ে থাকা আত্মঘাতী সেই মানুষটির বোধের এমন ভাষারূপ নিয়ে রচনা করতে পারতেন ‘আট বছর আগের একদিন’ এর মতো কবিতা? যে মানুষ কোনো ‘নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই,’ যার ‘বিবাহিত সাধ কোথাও রাখেনি কোন খাদ,’ ‘হাড় হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে এ জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই,’ যার সেও কেন আত্মঘাতী হয়? এ প্রশ্নের জবাব মনোবিজ্ঞানী সমাজবিজ্ঞানীরা তাঁদের বিজ্ঞানের আলোতে সন্ধান করতে পারেন। আত্মঘাতী হওয়ার তেমন বিজ্ঞানসম্মত কারণ কবি নিশ্চয়ই নির্দেশ করতে পারবেন না। কিন্তু প্রচন্ড ‘এমপ্যাথির’ বলেই কবি সেই আত্মঘাতী মানুষটির অতৃপ্ত বোধের সঙ্গে একান্ত একাত্ম হয়ে বলে দিতে পারেন-

‘জানি- তবু জানি
নারী হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ- নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত-ক্লান্ত করে;
লাশকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।

এখানে নয় শুধু। ‘বোধ’ শিরোনামে রচিত কবিতাটি তিনি শুরুই করেন এভাবে-

‘আলো অন্ধকারে যাই-মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়-শান্তি নয়-ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে;
সব কাজ তুচ্ছ হয়- পন্ড মনে হয়,
সব চিন্তা-প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।’

এই বোধ কি কবির একান্ত নিজেরই ব্যাক্তিগত বোধ? আরো আরো অনেক মানুষের বোধের যদি সার সংকলন এখানে না থাকতো, তাহলে কোনো পাঠকেরই বোধে এটি প্রবিষ্ট হতে পারতো না। অর্থাৎ এখানেও কাজ করছে কবির সেই অসাধারণ ‘এমপ্যাথি’।

জনে জনে মিলেই তো হয় জনতা। ব্যাষ্টিজনের হৃদয় যেমন কবি অনুভব করতে পারেন, তেমনি সমষ্টি জনতার হৃদয়ের স্পন্দনও তাঁর অনুভূতিকে স্পন্দিত করে। সেখানেই ইতিহাস-চেতনা কবির ভেতরে ভেতরে কাজ করে যায়, ‘ নানা রকম চরাচরের সম্পর্কে এসে’ তাঁর ভাবনা ও কল্পনা কবিতারূপে মূর্ত হয়ে ওঠে। তখনই তাঁর উপলব্ধিতে আসে-

মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব
থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে
আরো ভালো- আর স্থির দিকনির্ণয়ের মতো চেতনার
পরিমাপে নিয়ন্ত্রিত কাজ
কতোদূর অগ্রসর হয়ে গেল জেনে নিতে আসে।

জীবনানন্দের কবিতায় ‘মানুষ’ শব্দটি একবচনরূপে প্রযুক্ত হয়ে ‘মানব’ হয়ে গেল বহুবচন, সেই মানবই তাঁর কবিতায় বারবার ‘আমরা’ হয়ে আসে। তাঁর ‘আমি’র মধ্যেও থাকে ‘আমরা’রই ব্যঞ্জনা। এ কারণেই জীবনান্দকে ‘নির্জনতার কবি’ বলতে হলেও এর বহুমাত্রিকতাকে বোধের ভেতর জাগ্রত রেখেই তা বলতে হবে।
জীবনানন্দ পুরোপুরি আত্মসচেতন কবি, তাঁর নিজের কবিতা রচনার সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে তিনি বিজ্ঞানীর মতো নির্মোহ ও বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিতে অবলোকন করেন, কবিতাসৃষ্টিকে তিনি জানেন একান্তই সজ্ঞান কর্ম বলে, নির্জনবাদীদের তত্ত্ব কে তিনি সত্য বলে মানতে পারেন না। তাই তিনি বলতে পারেন-‘কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাস চেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।’ তাঁর নিজের কবিতায় এটি কিভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে, সে বিষয়েও তিনি পূর্ণ সচেতন-
‘মহাবিশ্বলোকের ইসারার থেকে উৎসারিত সময়চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো; কবিতা লিখবার পথে কিছুদূর অগ্রসর হয়েই এ আমি বুঝেছি, গ্রহণ করেছি। এর থেকে বিচ্যুতির কোনো মানে নেই আমার কাছে। তবে সময় সচেতনতার নতুন মূল্য আবিষ্কৃত হতে পারে। ’
অথচ এই কবিই অন্তঃপ্রেরণাকেও স্বীকার করেন; কিন্তু সে অন্তপ্রেরণার তাৎপর্য তাঁর কাছে অন্যরকম। বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর আত্মকথন-
‘কবিতার রচনাপদ্ধতি সম্পকে সংক্ষেপে বলতে পারা যায় এই যখনই ‘ভাবাক্রান্ত’হই, সমস্ত ভাবটা বিভিন্ন আঙ্গিকের পোশাকে ততটা ভেবে নিতে পারি না, যতটা অনুভব করি একই এবং বিভিন্ন সময়ে। অন্তঃপ্রেরণা আমি স্বীকার করি। কবিতা লিখতে হলে ইমাজিনশনের দরকার; এবং অনুশীলনের।’
তাঁর কাছে- ‘ইমাজিনেশন’ মানে কল্পনা প্রতিভা বা ভাবপ্রতিভা’। ‘যে কবির কল্পনা প্রতিভা আছে সে ছাড়া আর কেউ কাব্যসৃষ্টি করবার মতো অন্তঃপ্রেরণার দাবি করতে পারে। বলে তিনি মনে করেন না। ইমাজিনেশনের সঙ্গে সঙ্গেই কবিতার রচনার জন্যে যে অনুশীলনে তিনি ছিলেন সতত সনিষ্ঠ। এই কবির অনুশীলনের একেবারে প্রথম পর্বটি তাঁর কবিমাতার প্রভাব বলয় থেকেই শুরু হয়। এরপর সে বলয় থেকে বেরিয়ে এসে তিনি তাঁর সাধনার দিকে দৃষ্টিপাত করেন। নিজস্ব কবি ধর্মটিকে চিনে নিয়ে নিয়ত তারই চর্চা ও চর্যায় নিরত থেকেই সাংসারিক সব বিরূপতার আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। তিনি যে কবিই এবং কবি ছাড়া আর কিছুই নন, এটা তিনি স্পষ্ট অনুভব করেছিলেন। আর কবিতাই যে কবির ধর্ম এ বিষয়ে স্থির প্রত্যয়ী হয়েই তিনি লিখেছিলেন-
‘প্রত্যেক মনীষীরই একটি বিশেষ প্রতিভা থাকে- নিজের রাজ্যেই সে সিদ্ধ। কবির সিদ্ধিও তার নিজের জগতেঃ কাব্য সৃষ্টির ভিতর।…প্রতিভা যাকে কবি বানিয়েছে কিংবা সঙ্গীত বা চিত্রশিল্পী বানিয়েছে-বুদ্ধিও সমীচীনতা নয়-শিল্পের দেশেই সে সিদ্ধ শুধু- অন্য কোথাও নয়। একজন প্রতিভাযুক্ত মানুষের কাছ থেকে আমরা যদি তার শ্রেষ্ঠ দান চাই, কোনো দ্বিতীয় স্তরের দান নয়, তা হলে তা পেতে পারি সেই রাজ্যেও পরিধির ভিতরেই শুধু যেখানে তার প্রতিভার প্রণালী ও বিকাশ তর্কাতীত।’
জীবনানন্দ তাঁর নিজের প্রতিভাকে ও প্রতিভা বিকাশের তর্কাতীত ক্ষেত্রটিকে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু কোনো বড় প্রতিভাই নিতান্ত একমাত্রিক হতে পারে না, যিনি কেবলই কবি তাঁরও কবি প্রতিভা একই বৃত্তে প্রতিনিয়ত ঘুরতে পারে না। জীবনানন্দের কবিধর্মও কবিতার নানামাত্রিক সাধনা করেছে, তেমনটি না করলে কোনোমতেই তাঁকে শক্তিমান কবি বলা যেতে পারে না। শক্তিমান কবি বলেই জীবনানন্দেও জীবনের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তমান সমাজ বাস্তবাতর বিভিন্ন ধরনের প্রতিফলণে তাঁর চৈতন্য উদ্দীপিত হয়েছে, সেই সব উদ্দীপকে তাঁর সাড়াও বিভিন্ন রকম হয়েছে, এবং বিভিন্ন রকম সাড়াই বিভিন্ন রকম কবিতারূপে অভিব্যক্তি পেয়েছে। অথচ সমালোচকরা এক সময় জীবনানন্দের কবিতার ওপর বিশেষ বিশেষ আখ্যার ছাপ মেরে দিতেন, একজনের দেয়া ছাপের সঙ্গে অন্যজনের ছাপ মিলতো না, অনেক সময় তাঁর একই কবিতার ওপর সম্পূর্ণ বিপরীত আখ্যার ভিন্ন ভিন্ন ছাপও পড়ে গেছে। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র ভূমিকায় কবি নিজেই এ সবের প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
একজন কবি ‘শুদ্ধতম কবি’ হলেও শুদ্ধে-অশুদ্ধে, ভালোয়-মন্দে, আলোয়-আঁধারে মিশ্রিত এই জগৎবাস্তবকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করতে পারেন না। বাস্তবের সুন্দর যেমন তাঁকে পুলকিত করে এবং সেই পুলক কবিতা হয়ে বেরিয়ে আসে, তেমনি কুৎসিতও তাঁকে ক্ষুব্ধ করে এবং সেই ক্ষোভও কবিতার রূপ ধারণ করে। এমনি করেই একই কবির কবিতাও নানা রকম হয়ে যায়। জীবনানন্দের কবিতাও তাই হয়েছে। কোনো প্রকৃত কবিই শেষ পর্যন্ত শুদ্ধতম থাকতে পারেন না, জীবনানন্দও পারেন নি। অর্থাৎ কবি যেমন সকলেই হয় না কেউ কেউ হয়, তেমনি সকল কবিই এক রকম হয় না, এবং একই কবিও সকল সময়ে ও সকল অবস্থাতে এক রকম থাকে না। মনোবিজ্ঞানের জটিল নিয়ম এখানে কার্যকর থাকে। থাকতে বাধ্য।

আপনার পড়া বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে প্রিয় বই কোনটি? কেন প্রিয় সংক্ষেপে বলবেন কি?

যতীন সরকারঃ কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’ই হচ্ছে আমার সবচেযে প্রিয় বই। মধ্যযুগের রচিত হলেও এ বইয়ে আমি অসাধারণ আধুনিকতা প্রত্যক্ষ করি। এ বইয়ে মানুষকে দেবতার চেয়েও বড় করে তোলা হয়েছে। দেবতাগণও মানুষ রূপে জন্ম গ্রহণ না করে কোনো কার্য সাধন করতে পারেন না। লংকার রাজা রাবণ তো আসলে শক্তিমান ও বুদ্ধিমান মানুষেরই প্রতিরূপ হিসেবে কৃত্তিবাসের রামায়ণে উঠে এসেছে। মাইকেল মধুসূদন যে তার ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যে রাবণকে অনেক বড় করে অঙ্কিত করেছেন তার মূলটি তিনি কৃত্তিবাসের রামায়ণই পেয়ে গিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে মধুসূদনের উপর মিল্টন প্রমুখ পাশ্চাত্য কবিদের প্রভাবের কথা বলা হয়ে থাকে, তা বহুলাংশেই অতিকথন।
সনাতন হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী ব্রাহ্মণই সমাজে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অন্য সকল বর্ণের পূজ্য। কিন্তু কৃত্তিবাসের রামায়ণে দেখানো হয়েছে সে মহাপাপীরাই কলিযুগে ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মগ্রহন করবে। কলিকালের রাজাদেরও সে একান্ত দুরবস্থা হবে সে কথাও কৃত্তিবাসের রামায়ণে রামের মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে। রামের অস্ত্রাঘাতে রাবণ যখন মৃত্যু শয্যায় শায়িত, তখন রাম ও লক্ষণ রাবণকে প্রণাম করেন এবং বিনীত ভাবে রাবণের কাছ থেকে রাজনীতি শিক্ষার অভিলাস ব্যক্ত করেন। রাবণ তখন রাজনীতির যথার্থ তাৎপর্য ও প্রকৃত রাজনীতি সম্পর্কে রাম লক্ষণকে অবহিত করেন।এ রকম আরো অনেক বক্তব্য মধ্যযুগের কবি কৃত্তিবাসের রামায়ণে উঠে এসেছে যে সবকে শুধু আধুনিক নয়, রীতিমত বৈপ্লবিক বলে চিহ্নিত করতে হয়। আমি এখনো কৃত্তিবাসের রামায়ণ পড়ে উদ্বুদ্ধ হই।

আপনার পাঠের তালিকায় কোন ধরণের বিষয়বস্তুর বইয়ের প্রাধান্য বেশি?

যতীন সরকারঃ একটা ব্যাপার হলো আমি তো সাহিত্যিক না। নিজেকে কখনোই লেখক মনে করি না। আমি মাস্টার, মাস্টারি করি সবখানে। আমার সমাজতত্ত্ব, ধর্ম চিন্তা, এই সমস্ত বই ভালো লাগে পড়ি। মানুষের সমাজব্যবস্থার সাথে যুক্ত, সমাজের বিকাশ ঘটে এই সমস্ত বিভিন্ন বিষয় বুঝার জন্যে যা যা পড়ার দরকার আমার সাধ্যমতো পড়ি। আমার লেখার মধ্যে যে মাস্টারি থাকে তা ঐ সমস্ত বিষয়কে কেন্দ্র করেই।
’A learned  man is he knows something of everything and evrything of something’ আমার ’everything of something’ কিছু নেই কিন্তু ‘something of everything’কিছু আছে। (হাসি)

কোনো প্রিয় বই হারিয়ে ফেলা আক্ষেপজনিত স্মৃতি আপনার আছে কি?

যতীন সরকারঃ পাকিস্থান আমলে আমি অনেক মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু মুক্তি যুদ্ধের সময় সেই সব লুণ্ঠিত হয়ে যায়। সেই দু:খ আমি কোনো দিনই ভুলতে পারবো না। তবু একান্তই যদি কোনো বিশেষ বইয়ের কথা বলতে হয় তবে বলতে হবে কেদারনাথ মজুমদারের ‘রামায়ণের সমাজ’ বইটির কথা। এ বই দুষ্প্রাপ্য বাংলাদেশে।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত