জেমস জয়েসের গল্পঃ এভেলিন

Reading Time: 6 minutes।।অনুবাদকঃ শরিফুল ইসলাম।।   জানালার ধারে বসে সে দেখছিলো এভিনিউতে সন্ধ্যা নামার দৃশ্যটা। তার মাথাটা ঝুঁকে ছিলো জানালার পর্দাগুলোর দিকে, আর তার নাকে লেগে ছিলো ধুলায় মলিন কাপড়ের গন্ধ। সে ছিলো ক্লান্ত। কয়েকটা লোক অতিক্রম করে গেলো। সর্বশেষ কুঠি থেকে বের হওয়া লোকটাও রওনা দিলো বাড়ির দিকে। শান বাঁধানো রাস্তায় হেঁটে চলা লোকটার পায়ের খটখট আওয়াজ ভেসে আসছিলো তার কানে। পরক্ষণেই লোকটা লাল বাড়িগুলোর সামনের কয়লা কাঠের রাস্তা ধরে কচকচ শব্দে এগুতে লাগলো। একসময় সেখানটায় একটা মাঠ ছিলো, যেখানে তারা প্রতি সন্ধ্যায় অন্য ছেলেমেয়ের সাথে খেলতো। তারপর বেলফাস্ট থেকে এক লোক এসে কিনে নিলো পুরো মাঠটা, বাড়ি বানালো তার উপর। এই বাড়িগুলো তাদের ছোট্ট বাদামি বাড়িগুলোর মত নয়, বরং চকচকে ছাদওয়ালা ইটের ইমারত। সে আর তার ভাইবোন আর ডেবিন, ওয়াটার, ডান পরিবারের বাচ্চারা মিলে খেলা করতো সেই মাঠে। সাথে আরও থাকতো ছোট্ট বিকলাঙ্গ কয়েগ। আর্নেস্ট কখনো খেলতো না। সে ছিলো একটু বেশিই বড়। তার বাবা প্রায়ই তাদেরকে একটা কালো লাঠি হাতে তাবড়ে বেড়াতো। ছোট্ট কয়েগ সবসময়ই নজর রাখতো, আর তার বাবাকে আসতে দেখলেই আওয়াজ দিতো। তবু মনে হতো তখনই বরং তারা সুখী ছিলো। তার বাবার স্বভাব তেমন খারাপ ছিলো না। তাছাড়া তার মাও তখন বেঁচে ছিলেন। সে কতকাল আগের কথা! সে আর তার ভাইবোনেরা ইতিমধ্যেই বড় হয়ে উঠেছিলো, যখন তাদের মা মারা যান। টিজি ডানও মরে গিয়েছিলো তখন। আর ওয়াটার পরিবারটা ফিরে গিয়েছিলো ইংল্যান্ডে। সবকিছুই বদলে যায়। এখন সেও অন্যদের মত চলে যেতে বসেছে। ছেড়ে যাচ্ছে নিজের ঘর। ঘর! কক্ষটায় ঘুরে ঘুরে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো সে সবগুলো পরিচিত আসবাব আর জিনিস। যাদেরকে সপ্তাহে অন্তত একবার ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করতো সে, বছরের পর বছর একই রুটিন মাফিক, আর ভাবতো কোথা থেকে যে এত ধুলো ময়লা  আসে! হয়তো আর কোনদিনই সে পরিচিত জিনিসগুলো দেখতে পাবে না। অথচ সে স্বপ্নেও ভাবেনি, এগুলোর সাথে তার বিচ্ছেদের কোনো সম্ভাবনা থাকতে পারে। আর এতগুলো বছরেও সে কোনোদিন জানতে পারেনি, ভাঙ্গা হারমোনিয়ামের উপরের দিকের দেয়ালে ঝুলতে থাকা হলদে ছবির ঐ পাদ্রীর নাম কী। পাদ্রী লোকটা ছিলো তাঁর বাবার বিদ্যালয়ে পড়ার সময়কার বন্ধু। যখনই তাঁর বাবা কোনো অতিথিকে ছবিটা দেখাতো, তখন ছবিটা তার হাতে দিতে দিতে গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলতো, “সে এখন মেলবোর্নে আছে।” সে চলে যেতে সম্মত হয়েছে। সে রাজি হয়েছে নিজের ঘর ছেড়ে যেতে। কাজটা কি ঠিক হলো? প্রশ্নের দুটো দিকের মধ্যেই সে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করলো। তাঁর এই ঘরে আশ্রয় ছিলো, খাদ্য ছিলো, ছিলো তারা যাদেরকে সে চিনে এসেছে সারাটি জীবন। অবশ্য তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো, ঘর আর ব্যবসা দু’জায়গাতেই। দোকানের ঐ লোকেরা কী বলবে তাঁকে নিয়ে, যখন জানতে পারবে সে একটা ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে? হয়তো বলবে মেয়েটা আসলে বোকা। তার থাকার জায়গাটা ভরে যাবে বিজ্ঞাপনে। মিস গাবান খুব খুশি হবে। মহিলাটার সবসময়ই একটা ঝাঁঝ ছিলো তার উপর। বিশেষ করে, যখন লোকজন শুনতে পেতো। “মিস হিল, তুমি দেখতে পাচ্ছো না মহিলারা অপেক্ষা করছে?” “একটু প্রাণবন্ত থাকো, মিস হিল, প্লিজ।“ দোকান থেকে বিদায় নেওয়ার বেলায় সে খুব একটা জল ঝরাবে না চোখে। কিন্তু তাঁর অজানা দূরের দেশের বাড়িতে কোনোকিছুই তো এমন থাকবে না। তখন সে হবে বিবাহিতা, বিবাহিতা এভেলিন। মানুষজন তাকে সম্মান দেখাবে। তার সাথে এমন কোনো আচরণ করা হবে না, যা তার মায়ের সাথে করেছিলো মানুষ। এমনকি এখনও, যদিও সে এখন উনিশের উপরে, মাঝে মাঝে তার বাবার হিংস্রতায়  নিজেকে অনিরাপদ মনে হয়। সে জানতো, বাবার এই হিংস্রতাই তার সকল শিহরণের মূল কারণ। যখন তারা বেড়ে উঠছিলো, তখন বাবা কখনই তার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। কারণ সে ছিলো একটা মেয়ে। বাবা সবসময় হ্যারি আর আর্নেস্টকে মাথায় তুলে রাখতো। কিন্তু পরে লোকটা তাকে হুমকি ধামকি দেয়া শুরু করলো। তার মরা মায়ের দোহাই দিয়ে বলতে লাগলো, সে তাকে কী করতো যদি তার মা বেঁচে থাকতো। তাকে রক্ষা করার মত কেউই ছিলো না। আর্নেস্ট ছিলো মৃত, আর হ্যারি, যে কিনা গির্জায় সাজগোজের ব্যবসা করতো, সবসময়েই গ্রামের এক কোণায় পড়ে থাকতো। তাছাড়া শনিবার রাতে টাকার জন্য একঘেয়ে তুচ্ছ ঝগড়াগুলো তাকে প্রচণ্ড ক্লান্ত করে তুলেছিলো। সে সর্বদাই তার পারিশ্রমিকের পুরোটা, সাত শিলিং, সংসারে দিয়ে দিতো। আর হ্যারি সবসময় যতটুকু পারে, পাঠাতো। কিন্তু সমস্যাটা বাধতো তার বাবার কাছ থেকে টাকা বের করতে গিয়ে। বাবা বলেছিলো, সে নাকি সব টাকা উড়িয়ে নষ্ট করে ফেলে। তাই তার মাথা এতটা খারাপ হয়নি যে, নিজের কষ্টার্জিত টাকা সে মেয়েকে দিবে উড়ানোর জন্যে। এমন আরও অনেক কিছুই বলতো সে। শনিবারের রাতগুলোতে সাধারণত খারাপের চরমে পৌঁছে যেতো বাবা। সবশেষে টাকাটা মেয়ের হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করতো, রবিবারের রাতের খাবার কেনার তার কোনো ইচ্ছে আছে কিনা। এভেলিন তখন যত দ্রুত সম্ভব দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বাজারে যেতো কেনাকাটা করতে। শক্ত হাতে কালো চামড়ার পার্সটা নিয়ে ভিড় ঠেলে নিজের রাস্তা বের করে সে এগুতে থাকতো। সকল নিয়ম কানুনের বোঝা মাথায় নিয়েই দেরি করে ফিরতো বাসায়। বাড়ির সবকিছু ঠিকঠাক রাখতে গিয়ে তাকে করতে হতো কঠোর পরিশ্রম। দেখতে হতো তার কাছে থাকা বাচ্চা দুটো ঠিকমতো স্কুলে যাচ্ছে কিনা, নিয়মিত চারটে খেতে পাচ্ছে কিনা। এটা ছিলো কঠোর পরিশ্রমের কঠিন একটা জীবন। কিন্তু এখন সে ছেড়ে যেতে বসেছে এসব কিছু। তার কাছে এই জীবনটা পুরোপুরি অনাকাঙ্ক্ষিত মনে হলো না। সে ফ্র্যাঙ্কের সাথে সম্পূর্ণ নতুন এক জীবনকে আবিষ্কার করতে যাচ্ছে। ফ্র্যাঙ্ক ছিলো দয়ালু, পুরুষালী, আর খোলা মনের মানুষ। সে ফ্র্যাঙ্কের হাত ধরে রাতের নৌকায় চড়ে পাড়ি জমাতে যাচ্ছে বুয়েনস আইরেসে, যেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছে একটা ঘর। যে ঘরে সে হবে ফ্র্যাঙ্কের স্ত্রী। স্পষ্টভাবে এখনো মনে পড়ে ফ্র্যাঙ্কের সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের দিনটার কথা। ফ্র্যাঙ্ক প্রধান সড়কটার পাশে একটা কুঠিতে লজিং থাকতো, যেখানে সে মাঝে মাঝে যেতো। মনে হচ্ছিলো যেন এই তো সপ্তাহ খানেক আগের কথা। ফ্র্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে ছিলো দরজার সামনে, তার সূচালো টুপিটা ছিলো মাথার পেছন দিকে সরানো। চুলগুলো তার তামাটে চেহারার উপর গড়াগড়ি খাচ্ছিলো। তারপর চেনা জানা হলো পরস্পরের সাথে। ফ্র্যাঙ্ক প্রতি সন্ধ্যায় দোকানের বাইরে তার সাথে দেখা করতো, আর তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতো। সে তাকে ‘দ্যা বোহেমিয়ান গার্ল’ দেখতে নিয়ে যেতো। এভেলিন খুশি হতো ফ্র্যাঙ্কের সাথে থিয়েটারের অস্বাভাবিক অংশটায় বসতে পেরে। ফ্র্যাঙ্ক ছিলো ভয়ঙ্কর রকমের গান পাগলা, আর একটু আধটু গাইতও। মানুষ জানতো যে, তাঁরা একে অন্যের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। ফ্র্যাঙ্ক যখন বালিকা মেয়ের গানটা গাইতো যাকে নাবিক ভালোবাসে, এভেলিন একটা সুখময় দ্বিধায় ডুবে যেতো। ফ্র্যাঙ্ক তাকে মজা করে ‘পপেন্স’ নামে ডাকতো। একজন সঙ্গী পাওয়াটা তার কাছে ছিলো উত্তেজনাকর বিষয় এবং তারপর সঙ্গীটিকে তার ভালো লাগতে শুরু করলো। ফ্র্যাঙ্কের জীবনে দূর দেশের অনেক গল্প ছিলো। এলান লাইনের কানাডাগামী জাহাজে সে প্রথম মাসিক এক পাউন্ড বেতনে ডেক বয় হিসেবে কাজ শুরু করেছিলো। কত জাহাজে সে কত রকমের কাজ করেছে, তা নিয়ে এভেলিনের সাথে গল্প করতো। মাগেলান সাগরে পাড়ি জমানোর গল্প কিংবা পাতাগনিয়ানদের ভয়ঙ্কর সব গল্পও সে শোনাতো তাকে। বুয়েনস আইরেসে এসে সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। এবং তার পুরনো দেশে ফিরে এসেছে শুধুমাত্র ছুটি কাটানোর জন্যে। অবশ্য, এভেলিনের বাবা তাদের সম্পর্কের কথাটা জেনে গিয়েছিলো আর ফ্র্যাঙ্কের সাথে যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করেছিলো। “এই ধরনের নাবিক ছেলেদের আমার চেনা আছে।” সে বললো। একদিন সে ফ্র্যাঙ্কের সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিয়েছিলো। আর তারপর থেকে এভেলিনকে লুকিয়ে দেখা করতে হতো ফ্র্যাঙ্কের সাথে। এভিনিউতে সন্ধ্যাটা গাঢ় হয়ে আসছিলো। তার কোলের উপর রাখা দুটি চিঠির শুভ্রতাও ধীরে অস্পষ্ট হয়ে উঠছিলো। একটা চিঠি হ্যারিকে লেখা, আরেকটা তার বাবাকে। আর্নেস্টই তার প্রিয় ছিলো। কিন্তু হ্যারিকেও সে পছন্দ করতো। সে খেয়াল করলো, আজকাল বাবা বুড়িয়ে যাচ্ছে। লোকটা তাকে মিস করবে। মাঝে মাঝে বাবা খুব সুন্দর ব্যবহার করতো। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন সে দিনের বেলায় ঘুমুতে গিয়েছিলো, আর বাবা পাশে বসে ভূতের গল্প পড়ে শুনিয়েছিলো। আর আগুনের পাশে বসে তার জন্য টোস্ট বানিয়েছিলো। অন্য একদিন, যখন তাদের মা বেঁচে ছিলেন, সবাই মিলে তারা পিকনিকে গিয়েছিলো হাউথের পাহাড়ে। এখনো মনে পড়ে, তার বাবা বাচ্চাদের হাসানোর জন্যে মায়ের ঘোমটাটা পরিয়ে দিচ্ছিলো। তার সময় ফুরিয়ে আসছিলো। কিন্তু সে জানালার পর্দায় মাথা ঠেকিয়ে বসেই ছিলো। তার নিঃশ্বাসে মিশে ছিলো ধুলোয় মলিন কাপড়ের গন্ধ। এভিনিউর নিচে দূরে কোথাও থেকে তার কানে ভেসে আসছিলো স্ট্রিট অর্গানের সুর। সে ঐ অদ্ভুত বাতাসটাকে চিনতো, যেটা প্রতি রাতে এসে তাকে মনে করিয়ে দেয় মাকে দেয়া তার প্রতিজ্ঞাগুলোর কথা। মাকে সে বলেছিলো, ঘরটাকে সে আগলে রাখবে যতদিন সম্ভব। তার মনে পড়লো মায়ের অসুস্থতার শেষ দিনটার কথা। সে আবারও হলের অপর পাশের সেই অন্ধকার বদ্ধ ঘরটায় ছিলো এবং শুনতে পাচ্ছিলো ইতালির বাতাসে একটা বিষণ্ণ সুর। অর্গান-প্লেয়ারটাকে ছ-পেনির পয়সা ধরিয়ে দিয়ে চলে যেতে বলা হয়েছিলো। তার মনে পড়লো, তার বাবা সদর্পে সিক-রুমে ঢুকে বলছিলোঃ “হারামজাদা ইতালিয়ান! আসছে এখানে!” সে ডুবে গিয়েছিলো ধ্যানে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো মায়ের করুণ জীবনের ছবি। সেটার আবেশ খুব দ্রুত তার পুরো সত্ত্বাটাকে সম্মোহিত করে ফেলেছিলো। গতানুগতিক সাধারণ জীবন তার সবকিছুই ত্যাগ করে দেয় জীবনের শেষ পাগলামিতে। সে কেঁপে উঠলো আবারও, তার মায়ের গলার আওয়াজ শুনে, তার অবিরাম একগুঁয়ে অর্থহীন আওড়ানো বুলি শুনেঃ “দেরেভুয়ান সেরাউন! দেরেভুয়ান সেরাউন!” সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো একটা আতঙ্কের তাড়নায়। পালাও! তাকে যে পালাতে হবে! ফ্র্যাঙ্ক থাকলে এখন তাকে রক্ষা করতো। ফ্র্যাঙ্ক তার জীবনটা ফিরিয়ে দিতো, হয়তো একটু ভালবাসাও দিতো। কিন্তু সে তো বাঁচতে চেয়েছে। তাকে কেন অসুখী হতে হবে? তারও তো সুখে একটু অধিকার রয়েছে। ফ্র্যাঙ্ক তাকে এখন বুকে টেনে নিতো, আগলে রাখতো দু’ বাহুতে। সে তাকে বাঁচাতো। নর্থ ওয়ালের স্টেশনে প্রবল ভিড়ের মধ্যে সে দাঁড়িয়েছিলো। ফ্র্যাঙ্ক তার হাতটা ধরেছিলো। সে বুঝতে পারছিলো, ফ্র্যাঙ্ক তাকে কিছু একটা বলছে, প্যাসেজ সম্পর্কে কিছু একটা বারবার বলেই যাচ্ছে। বাদামী ব্যাগওয়ালা সৈনিকে ভরে গিয়েছিলো পুরো স্টেশনটা। ইঞ্জিনশালার প্রশস্ত দরজাগুলো দিয়ে সে কালো নৌকাটা এক পলক দেখলো। নৌকাটা শুয়ে আছে ঘাটের দেয়ালটার পাশে, তার আলোকোজ্জ্বল জানালাগুলো নিয়ে। সে কোনো উত্তর দিলো না। সে অনুভব করলো তাঁর গালটা ধীরে ধীরে বিবর্ণ আর শীতল হয়ে উঠছিলো। প্রবল মানসিক চাপে পড়ে সে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলো তাকে পথ দেখাতে। সে চাইলো ঈশ্বর যেন বলে দেয়, তাঁর এখন কী করা উচিৎ। নৌকাটা একটা দীর্ঘ শোকাবহ হুইসেলের আওয়াজ ছুঁড়ে দিলো কুয়াশায়। যদি সে যেতো, তাহলে আগামীকাল সে ফ্র্যাঙ্কের সাথে সাগরে ভেসে বুয়েনস আইরেসের দিকে এগুতে থাকতো। তাদের প্যাসেজ ভাড়া করা হয়ে গিয়েছিলো। এতকিছুর পরেও কি সে এখন ফিরে যেতে পারবে? তার এই উভয় সঙ্কট পুরো শরীরে একটা ঘৃণার জাগরণ সৃষ্টি করলো। তার ঠোঁটগুলো কাঁপতে লাগলো নীরব আকুল প্রার্থনায়। তার হৃদপিণ্ডে একটা বেল ঝনঝন করে উঠলো। সে টের পেল ফ্র্যাঙ্ক তার হাতটা চেপে ধরেছেঃ “আসো!” পৃথিবীর সবকটি সাগর যেন গড়াগড়ি খেলো তার হৃদপিণ্ডের আশেপাশে। ফ্র্যাঙ্ক তাকে সেই সাগরগুলোয় টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। সে তাকে ডুবিয়ে মারবে। সে দু’ হাতে শক্ত করে চেপে ধরল লোহার রেলিংটা। “আসো!” না! না! না! এটা ছিলো অসম্ভব। তার হাত দুটো উন্মত্ত থাবায় আঁকড়ে ধরলো লোহাটাকে। সমুদ্রগুলোর বুকে সে একটা চিৎকারের আওয়াজ ছুঁড়ে দিলো যন্ত্রণায় আর ক্ষোভে। “এভেলিন! এভি!” ফ্র্যাঙ্ক দৌড়ে ব্যারিয়ার পার হয়ে গেলো আর তাকে ডেকে বললো পিছে পিছে আসতে। সে চিৎকার করে বলছিলো নৌকা না থামাতে। আবার এভেলিনকেও সে ডাকছিলো। এভেলিন তার শুভ্র মুখটাকে তার দিকে তাক করে রাখলো… অসাড়, আর অসহায় এক প্রাণির মতো। তার চোখে ফ্র্যাঙ্কের জন্যে কোনো ভালোবাসা ছিলো না, ছিলো না কোনো বিদায়ের কিংবা পরিচয়ের চিহ্ন।            

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>