জীবনানন্দ দাশের একগুচ্ছ কবিতা

Reading Time: 2 minutes    আমি যদি হতাম আমি যদি হতাম বনহংস; বনহংসী হতে যদি তুমি; কোনো এক দিগন্তের জলসিঁড়ি নদীর ধারে ধানক্ষেতের কাছে ছিপছিপে শরের ভিতর এক নিরালা নীড়ে; তাহলে আজ এই ফাল্পুনের রাতে ঝাউয়ের শাখার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে আমরা নিম্নভূমির জলের গন্ধ ছেড়ে আকাশের রুপালি শস্যের ভিতর গা ভাসিয়ে দিতাম- তোমার পাখনায় আমার পালক, আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন- নীল আকাশে খইক্ষেতের সোনালি ফুলের মতো অজস্র তারা, শিরীষ বনের সবুজ রোমশ নীড়ে সোনার ডিমের মতো ফাল্গুনের চাঁদ। হয়তো গুলির শব্দঃ আমাদের তির্যক গতিস্রোত, আমাদের পাখায় পিস্‌টনের উল্লাস, আমাদের কন্ঠে উত্তর হাওয়ার গান! হয়তো গুলির শব্দ আবারঃ আমাদের স্তব্ধতা, আমাদের শান্তি। আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো মৃত্যু আর থাকত না: থাকত না আজকের জীবনের টুকরো টুকরো সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার; আমি যদি বনহংস হতাম, বনহংসী হতে যদি তুমি; কোনো এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারে ধানক্ষেতের কাছে।   তুমি নক্ষত্রের চলাফেরা ইশারায় চারি দিকে উজ্জ্বল আকাশ; বাতাসে নীলাভ হয়ে আসে যেন প্রান্তরের ঘাস; কাঁচপোকা ঘুমিয়েছে—গঙ্গাফড়িং সেও ঘুমে; আম নিম হিজলের ব্যাপ্তিতে পড়ে আছ তুমি। ‘মাটির অনেক নীচে চলে গেছ? কিংবা দূর আকাশের পারে তুমি আজ? কোন্‌ কথা ভাবছ আধারে? ওই যে ওকানে পায়রা একা ডাকে জমিরের বনে; মনে হয় তুমি যেন ওই পাখি-তুমি ছাড়া সময়ের এ-উদ্ভাবনে আমার এমন কাছে—আশ্বিনের এত বড় অকূল আকাশে আর কাকে পাব এই সহজ গভীর অনায়াসে–’ বলতেই নিখিলের অন্ধকার দরকারে পাখি গেল উড়ে প্রকৃতিস্থ প্রকৃতির মতো শব্দে—প্রেম অপ্রেম থেকে দূরে।

আমাকে তুমি

আমাকে তুমি দেখিয়েছিলে একদিন; মস্ত বড় ময়দান — দেবদারু পামের নিবিড় মাথা — মাইলের পর মাইল; দুপুরবেলার জনবিরল গভীর বাতাস দূর শূন্যে চিলের পাটকিলে ডানার ভিতর অস্পষ্ট হয়ে হারিয়ে যায়; জোয়ারের মতো ফিরে আসে আবার; জানালায় জানালায় অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে: পৃথিবীকে মায়াবী নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়। তারপর দূরে অনেক দূরে খররৌদ্রে পা ছড়িয়ে বর্ষীয়সী রূপসীর মতো ধান ভানে — গান গায় — গান গায় এই দুপুরের বাতাস। এক-একটা দুপুরে এক-একটা পরিপূর্ণ জীবন অতিবাহিত হয়ে যায় যেন। বিকেলে নরম মুহূর্ত; নদীর জলের ভিতর শম্বর, নীলগাই, হরিণের ছায়ার আসা যাওয়া; একটা ধবর চিতল-হরিণীর ছায়া আতার ধূসর ক্ষীরে গড়া মুর্তির মতো নদীর জলে সমস্ত বিকেলবেলা ধরে স্থির! মাঝে মাঝে অনেক দূর থেকে শ্মশানের চন্দনকাঠের চিতার গন্ধ আগুনের — ঘিয়ের ঘ্রাণ; বিকেলে অসম্ভব বিষণ্নতা। ঝাউ হরিতকী শাল, নিভন্ত সূর্যে পিয়াশাল পিয়াল আমলকী দেবদারু– বাতাসের বুকে স্পৃহা, উৎসাহ, জীবনের ফেনা; শাদা শাদাছিট কালো পায়রার ওড়াওড়ি জোছনায়–ছায়ায়, রাত্রি; নক্ষত্র ও নক্ষত্রের অতীত নিস্তব্ধতা! মরণের পরপারে বড়ো অন্ধকার এই সব আলো প্রেম ও নির্জনতার মতো।  

কমলালেবু

একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে? আবার যেন ফিরে আসি কোনো এক শীতের রাতে একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে কোমো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>