| 16 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত প্রবন্ধ

অনুবাদ প্রবন্ধ: জে কে রাওলিংয়ের রহস্যশিল্প । মেজবাহ উদদীন

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

জ্যাকসন হাইটস, ঘড়ি অনুযায়ী মধ্যরাত পেরিয়েছে অনেকক্ষণ। মেঘের বন্দিত্ব ঘুচিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় নেমে আসছে জলের ধারা। সাইরেন বাজিয়ে এগিয়ে আসছে পুলিশের গাড়ি। বিটুমিন আর নুড়ি পাথরের বিছানায় কিছুটা অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে পড়ে আছে আপাত দৃষ্টিতে মদ্যপ মনে হওয়া লোকটি। মারা গেল? নাকি নড়ে উঠে হাঁটা ধরবে বাড়ির পথে? না, রহস্য উপন্যাস লেখা আমার কাজ নয়। রহস্য উপন্যাস লেখায় হাত পাকিয়েছেন যিনি, চিত্রকল্পে তাকেই বরং ডেকে নেই- রবার্ট গ্যালব্রাইথ।

আমি যখন রবার্ট গ্যালব্রাইথ প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস পড়ি, একজন খুনির মুখোশ উন্মোচনের ক্ষেত্রে লেখক যে এতটা নাটকীয় সমাপ্তির জন্ম দিতে পারেন সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আজ পৃথিবী যে রবার্ট গ্যালব্রাইথকে জানে তিনি আসলে জে.কে. রোলিং। রোলিংয়ের নামটুকুই তার বইগুলো পড়তে আরও বেশি প্রভাবিত করে। যেটা তিনি সত্যিই এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন। আর সে কারণেই তিনি রবার্ট গ্যালব্রাইথ ছদ্মনামটি বেছে নিয়েছিলেন।

‘প্রাইভেট আই’ হিসেবে করমরান স্ট্রাইকের প্রথম ভ্রমণের উত্তেজনাই হয়তো তার ভেতরে এক ধরনের কম্পনের সৃষ্টি করেছিল, যা গ্যালব্রাইথকে লেখকদের সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। যেটা মুক্ত মনের পাঠকদের বিশেষ শংকিত করে তোলে। তিনি দেখিয়েছেন, সাহিত্য জগতে প্রবেশের ক্ষেত্রে একজন মানুষকে অনেক অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। উচ্চ বংশীয় ছেলেমেয়েরা তাদের বংশ ঐতিহ্য দিয়ে সাহিত্য জগৎটা নিজেদের করে রেখেছে। তারপরও রবার্ট গ্যালব্রাইথ আপন মেধা, নিজের প্রতি বিশ্বাস এবং সর্বোপরি নিজস্ব স্বকীয়তায় এই জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। ‘হ্যারি পটারে’র মতো পৃথিবীব্যাপী আলোচিত বইয়ের লেখক রবার্ট গ্যালব্রাইথ।

‘দি সিল্কওর্ম’ বা রেশম পোকা বইটির নামকরণ থেকেই রহস্যের শুরু। উত্তেজিত রহস্যের এই জলাভূমিতে আমাদের নিয়ে আসেন এক পায়ের একজন প্রাক্তন মিলিটারি পুলিশের কর্মকর্তা করমরান স্ট্রাইক, যার নামকরণ হয় কর্নিষ রূপকথার দানবের নামে, যে কিনা প্রবৃত্তির অন্ধ অনুসারী, কিছুটা ব্যভিচারী, আবার কখনও কখনও যার মন ন্যায়বিচারের পথেও হাঁটে। এ কারণেই করমরান স্ট্রাইককে শুধু আর্থিকভাবে লাভজনক ‘কেস’ নিতেই দেখা যায়। এভাবেই পরিচয় হয় অখ্যাত এবং অসফল ঔপন্যাসিক ওয়েনের অত্যাচারিত বউ লিওনোরার সঙ্গে। যে, করমরান স্ট্রাইককে তার অসভ্য স্বামীকে অনুসরণের জন্য বলে। কিন্তু যখন করমরান স্ট্রাইক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে ওয়েনকে পায় মৃত অবস্থায় এবং পুলিশ সন্দেহ করে লিওনোরাকে, তখন তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করা এবং আসল খুনিকে খুঁজে বের করার জন্য করমরান স্ট্রাইককে সম্পূর্ণ বিপরীত ভূমিকায় নামতে দেখা যায়।

গ্যালব্রাইথের রহস্য উপন্যাস অনেক বেশি প্রাণবন্ত। তিনি যেন একটি দোয়েল, যে তার নির্ভুল চোখে তুলে আনে ঐতিহ্যবাহী এবং সমকালীন রীতিনীতিগুলো। তিনি প্রচলিত ধারায় বিদ্যমান শক্তি গ্রহণ করে নিজের গল্পের ‘প্লট’ হিসেবে ব্যবহার করেন এবং এটা অনেক ভালো কাজ দেয়।

‘দি সিল্কওর্ম’-এর মধ্যে সোনালি যুগের লেখক কৃষ্টি, সায়ার্স, অ্যালিংহাম এবং মার্শদের ইংলিশ রহস্য উপন্যাসের প্রাচীন ধারায় ফিরে আসার লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষীদের ধারাবাহিক জিজ্ঞাসাবাদ, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি লক্ষ্য করা, প্রত্যেকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করা, যাতে ‘ডিটেকটিভ’ খুনির মুখোশ উন্মোচন করতে পারে। এখানে সমাজের উচ্চবংশীয় লোকদের জীবন-চিত্র যেমন পাই, তেমনি আমাদের চারপাশের প্রতিদিনের অতি সাধারণ জীবন যাপন খুঁজে পাওয়া যায়। যৌনতার অতি আধুনিক দেবমূর্তি এবং মানসিক গঠনের প্রকাশও লক্ষ্য করা যায় এখানে। গ্যালব্রাইথ তার ‘দি সিল্কওর্ম’-এ রহস্যের প্রাসাদ তৈরিতে শেষ যে ইটটি ব্যবহার করেছেন তা হল, মানসিক শক্তির প্রচণ্ডতা নিয়ে অন্ধকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পাঠককে বাধ্য করা। এর কাহিনীর ধারাবাহিকতা পাঠককে নিজ ইচ্ছায় বেঁধে রাখে চরম অস্থির প্রকৃতির হিংস তায়ও। এখানে তিনি জীবনকে এঁকেছেন অবিমৃশ্যতার তুলিতে।

‘দি সিল্কওর্ম’ বা রেশম পোকা উপন্যাসে লেখক প্রতিটি চরিত্রের দাবি মিটিয়েছেন অসামান্য মুন্সিয়ানায়। আর প্রতিটি চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছেন পাঠকের স্পর্শের দুনিয়ায়। বলা যায় সম্পূর্ণ উপন্যাসের প্রায় প্রতিটি মোড়ই পাঠকের কল্পনা শক্তির নিশ্চিত পরীক্ষা নেবে। কারণ বরাবরের প্রত্যাশিত পথ শেষ মুহূর্তে দিক পরিবর্তন করে এমন একদিকে চলে যায় যা আগের অবস্থান থেকে মনে হয়েছিল কষ্টকল্পনা।

‘দি সিল্কওর্ম’ বা রেশম পোকা-এর কাহিনী বর্ণনা নিয়ে আমার কিছুটা অভিযোগ আছে। রাস্তাঘাট এবং ভ্রমণ সম্পর্কে একটু যেন বেশিই আলোচনা করা হয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় এটা বুঝি লন্ডন ভ্রমণ। যদিও গ্যালব্রাইথের কাছে সেটা হয়তো কাহিনীর দাবিই মনে হয়েছে। কিন্তু এই সামান্য অতিরঞ্জন বাদ দিলে রহস্যপ্রিয় এবং ভাবনায় আধুনিক মানুষের কাছে ‘দি সিল্কওর্ম’ অন্য এক মূল্যই পাবে।

[সূত্র : গার্ডিয়ান অনলাইন]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত