জলছবি

 

গল্পটা লিখে পত্রিকায় পাঠানোর আগে শাওন একবার দেখাতে গেল বন্যাকে। মনটা ভাল ছিল না ওর। তবুও মানিয়ে গুছিয়ে পড়তে লাগল। যেহেতু ওটা শাওনের লেখা। পুরো গল্পটার মাঝে ওর মুখে হাসি দেখতে পাচ্ছিল শাওন। আসলে গল্পটা লেখা ছিল বন্যাকে নিয়েই। তাই সে মজা পাচ্ছিল। কিন্তু শেষের অংশটা দেখে মুখটা শুকিয়ে গেল বন্যার। এ অংশে তাকে শুধু বন্ধু বলে স্বীকার করেছে শাওন। তাতে বন্যার মন ওঠেনি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সান্তনা দেয়ার জন্যই যেন বলে ফেলল যা হোক, ভাল বন্ধু তো হতে পেরেছি। আর কিছু না পারি।
বন্যা বুঝল, শাওন ওকে ভালোবাসে কেবল গল্পের ভাষা খুঁজতে। পুরোটাই স্বার্থপরের মতো। ও বন্যাকে ভালোবাসে গল্প লেখার জন্য, ভালোবাসার জন্য নয়। আসলে কবি সাহিত্যিকরা কেবলই স্বর্থপর। এ যুক্তির যথার্থ প্রমাণ শাওন। গল্পটা পড়ে বন্যা ভেবেছিল শাওন সে গোছের নয়। ও সত্যিই বন্যাকে ভালোবাসে। কিন্তু সব আশায় ছাই পড়ে গেল গল্পের শেষ চরণে। আর সে স্বার্থপর পরিচয় রেখে গেছে এখানেই। শাওন অন্য সবের বেলায় উদার হলেও প্রেমের বেলায় কৃপণ। শাওনকে বড় নিষ্প্রাণ মনে হতে লাগল বন্যার।

‘আর কিছু’ কথাটার অর্থ খোঁজে শাওন। বন্যা কি শুধু বন্ধুত্বে তৃপ্ত নয়? ও কি আরো কিছু চায়? বন্যাকে প্রশ্ন করতে চেয়েও আবার চেপে গেল শাওন। বন্যা গল্পটা পড়ে খুবই প্রশংসা করতে লাগল। সত্যিই তুলনা হয় না। শাওনের প্রতিভা খুবই প্রখর। শাওন বলল বন্যা, এই প্রতিভার মাঝে রয়েছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয়। তুমি আমার অতীত সম্পর্কে যা জানো তা খুবই সামান্য। এক সময় ঠিক তোমার মতো একটা মেয়ে এভাবে আমার সামনে বসে থাকতো। কথা বলতো, মিষ্টি করে হাসতো, গান গাইত। আমার প্রতিভার জন্মটা সেই দিয়েছিল। এজন্য আমি ওর নাম দিয়েছিলাম প্রতিভা। অবশ্য একটা অন্য নাম ছিল তার। কিন্তু আমি সে নামে কখনো ডাকিনি তাকে। আমি ওকে নিয়ে গল্প, কবিতা লিখতাম। সে ঠিক তোমার মতোই খুশী হতো। তোমার মতোই আমার কোনো কিছুতেই আপত্তি ছিল না তার। একদিন সে আমাকে বলল :
দেখ শাওন, আমি তোমাকে চুপষে দেয়ার জন্য কথাটা বলছিনে। তোমাকে তোমার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বলছি। আমাকে তুমি মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসো, এতে কোনো সন্দেহ নেই আমার। আমিও তোমাকে ছেড়ে বাঁচতে পারব না। এ সত্য প্রমাণ করতে আমি মরতেও রাজি। তবে আমি বলব, তুমি আমাকে নিয়ে এত ভেব না। তার কিছুটা দেশ, জাতি, মানুষ, সমাজ, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে ভাবো। এ সব নিয়ে লেখালেখি করো। তাহলে তুমি কেবল আমার কাছে নয়, দেশের মানুষের কাছে একজন প্রিয় মানুষ হতে পারবে।
কিন্তু প্রতিভা, তুমি আজ যে-কথা বললে, এ যে গুরুর কথা। তুমি তো আমার ঘরে যাবে না। গুরুকে তো ঘরে নেয়া যায় না।
আমি গুরু হয়ে আদেশ করিনি শাওন। আমি আমার ভবিষ্যৎ স্বামীকে স্ত্রীর উপদেশ দিয়েছি মাত্র। এটাকে তুমি গুরু বাক্যে নিও না।
তারপর আমি আর কিছু বলিনি। কিন্তু পৃথিবীতে বেঁচে থাকলেও আমার জীবন থেকে সে মরে গেছে। জানি না সেদিন সে কোন মরণের কথা বরেছিল। আমি আমার প্রতিভা দিয়ে তাকে ধরে রাখতে পারিনি। এ ভয় তোমাকে নিয়েও। বন্যা, কষ্টের সিঁড়িগুলো ভাঙতে ভাঙতে আমি অতি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। নতুন করে আর কোনো কষ্টকে বুকে আশ্রয় দিতে চাইনে। তাইতো আমি তোমাকে ভালোবাসার কথা বলিনি। তারপরও কি তুমি আশা করেছিলে; তোমার হাতে হাত রেখে বলি- বন্যা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। ঠিক মরণের মতো!
তুমি চুপ করো শাওন। আমি আর শুনতে পারছি না। এবার আমাকে বলতে দাও। শাওন, আমি তোমার অমর্যাদা করতে পারব না কখনো। তুমি গল্পের মধ্যে বলে গেছ মনের কথা প্রকাশ না করতে। এখন তোমার প্রশ্নের উত্তর দেব কিভাবে বল! তোমার গল্পের সব কথাগুলো তো আমাকে নিয়েই। এটাই তো বেশ মজার। তুমি আমাকে নিয়ে গল্প লিখবে। আর পড়ে পড়ে আমাকে শোনাবে। আমার চোখে তোমার গল্পের ভাষা খুঁজে পাবে। আবার নতুন গল্প লিখবে। এর বেশি আর কিছু জানতে চেও না শাওন। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনে। বন্যার চোখ জলে টুবু টুবু হয়ে গেল। আর কোনো কথা বলতে পারলো না।
তাহলে দীর্ঘশ্বাস কেন, কেনই বা চোখে জল?
তুমিই বা এত করছ কেন? আমার চিকিৎসার জন্য গায়ে পড়ে তুমি যে সব ঝামেলা পোয়াচ্ছ, এটা করতে কোনো ডাক্তারের মা মরে ঘরে পড়ে থাকে না।
আমার মা আজও মরেননি। শুধু বল তোমার ধারণাটা কী। আমার কোনো ধারণা নেই। কেবলই প্রশ্ন। ধারণা থেকেই প্রশ্নের জন্ম হয়।

শাওন, তুমি আমাকে ভালোবাসনি, পেতে চাওনি, তাহলে কেন আমার জন্য এত করছ?

বন্যা, ভালোবাসার কথা মুখে বলাটা আদিক্ষেতা। হৃদয়ের সাখে হৃদয়ের লেনদেনই হলো ভালোবাসা। মুখের কথায় নয়। আমি আমার চলন বলনেই সেটা বোঝাতে চাই। যদি সে না বোঝে, সেটা আমারই ব্যর্থতা। এক্ষেত্রে তুমি সার্থক। তুমি কিন্তু আমাকে বোঝাতে পেরেছ; তুমি আমাকে ভালোবাসো। আর তুমি যে এখানে কম চালাক তা নয়। আগেই আমাকে জানিয়েছ যে তুমি অন্য কোথাও বাঁধা। তাইতো আর বৃথা চেষ্টা করিনি। শুধু বন্ধু বলেই জেনেছি। অন্তত তোমার মনের আনাচে কানাচে এতটুকু জায়গা পাব বলে। আর অন্দরে থাক তোমার বাঁধন। তুমি তোমার বাঁধনকে নিয়ে ভাবো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে। কিন্তু ইদানিং তোমাদের দু’জনের মাঝে একটা জলছবির মতো দেখতে পাচ্ছ আমাকে। ভাবছ, এই ছায়ামূর্তিটা চকচকে মূর্তিমান হয়ে না ওঠে। ভয়ে আঁতকে উঠছ। শিউরে উঠছে তোমার শরীর। অসহ্য লাগছে এই জলছবির মানুষটাকে। কিন্তু না বন্যা, আমি একদিন হারিয়েই যাব একেবারে। তোমাদের মাঝে আমি বাধা হয়ে থাকব না। শুধু তোমার শরীরটা যতদিন না পুরো সুস্থ হয়। এর মাঝে আমাকে তোমার যত অসহ্য লাগুক আমার কোনো আপত্তি নেই। যেমনটি আমার কোনোটাতে তোমার আপত্তি থাকে না।
বাহ শাওন বাহ! দুনিয়ার সব মানুষকে ঋণী করে তুমি মহান হয়ে থাকতে চাও, না? এ কারণেই তুমি প্রতিভাকে হারিয়েছ। আসলে তুমি কৃপণ। তোমার প্রতিভা খুবই প্রখর। কিন্তু তা দিয়ে কিছু জয় করার মনোবল তোমার নেই কেন? তুমি চেষ্টা না করে পরাজয়ের গ্লানি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছ সারা জীবন। তারপর আবারও…! তোমার কি গল্পের ভাষাই শুধু প্রয়োজন, আর কিছু নয়!

বন্যা, আমি সব পেয়েছি। তোমাকে পেয়েছি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে। তোমার মনটাকেও। বাকি শুধু শরীরটা। বলতে পারো ওটাও পেয়েছি। তোমার মনে পড়ে বন্যা, জলবসন্তের স্পট দেখাতে কী দ্বিধাহীনভাবে কামিজটা ফাঁক করে তোমার বুকটা আমাকে দেখিয়েছিলে। যা কোনো রোগীর পক্ষেই সম্ভব হয়নি আজও। আমি সেদিন তোমার ভরা বুকের সবটুকুই দেখতে পেয়েছিলাম। ওদিনই আমার বুঝতে বাকি নেই, তোমার সবই আমার। কিন্তু আমি ওটা ব্যবহার করিনি। তুলে রেখে দিয়েছি। নির্জন ঘরে দু’জন বসে থেকেও কখনো তোমার বুকে হাত রাখিনি। যদিও জানি তুমি ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
না, তুমি সব মিথ্যে বলছ শাওন। আমি তোমাকে আমার বুক দেখাইনি। ডাক্তারকে দেখিয়েছি জলবসন্তের স্পট। তাইতো এত সহজে পেরেছি।
না বন্যা, আমি এক বিন্দু মিথ্যে বলিনি। তুমিও। সত্যিই তুমি স্পট দেখিয়েছিলে। কিন্তু সেই ফাঁকে আমি তোমার বুকটা দেখতে পেয়েছিলাম ঠিক চাঁদ দেখতে গিয়ে আকাশ দেখার মতো। তুমি এ সব কথাও আমাকে বিশ্বাস করতে বলো না শাওন। তরুণ বয়স তোমার। এমন সুযোগ বুঝতে পারলে তুমি এতদিন আমার দেহটাকে নিয়ে…!
হ্যাঁ বন্যা, আমি তারুণ্যকে জয় করতে চাই। ভালোবাসলে যে তার সবটাই পেতে হবে এমন কোনো নিয়ম ভালোবাসার সংবিধানে নেই। এ কথাগুলো মনে প্রাণে মেনে নিতে পারলে তবেই আমি তরুণ। তরুণ মানে উশৃংখল জীবন নয়। তরুণ মানে সমস্ত অনিয়মকে ভেঙে উপড়ে ফেলার দৃঢ় প্রত্যয়। বন্যা, আমি তোমাকে অবহেলা করেছি ভেবো না। আমি শুধু প্রকৃতিগতভাবেই সত্যকে মেনে নিয়েছি। তুমি জানো বন্যা, ফুলের বুকে অলি বসে যখন মধু চুষে নেয়, ফুলের জীবন সার্থক হয় বটে। তাতে স্রষ্টার শিল্পত্ব নষ্ট হয়। তবুও সৃষ্টিকে চলমান রাখতে অলি ও ফুলের উপস্থিতিটাই চিরন্তন। আর সব বাড়াবাড়ি।

বন্যা, আমি জানি তুমি বাঁধনকে বিয়ে করবে। আবার আমাকেও ভুলতে পারবে না। তুমি দু’জনকেই জীবন দিয়ে ভালোবাসো। এখন উপায় খুঁজে পাচ্ছ না। সিদ্ধান্তটা আমিই দিয়ে দিই। তুমি সেদিন বলেছিলে যারা প্রেম করে বিয়ে করে তাদের রাতগুলো ভালোই কাটে। আর দিনগুলো যায় কষ্টে। বন্যা, আমি তোমার জীবনের একটা মুহুর্তও কষ্টের কারণ হতে চাইনে। তোমার প্রতিটি মুহুর্ত আমি সুখের দেখতে চাই। তাই তোমাকে পাওয়ার আশা করিনি। তুমি বাঁধনকে পাবে বাস্তবে। আর আমি থাকবো স্মৃতিতে। সারাদিন আমার স্মৃতি মন্থন করে আসবে রাতে বাঁধনের বাস্তব স্পর্শ। রাত শেষে আবার আমার ফিকে জলছবিটা…।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত