জোড়া ডলফিন

লক্ষ্মীর মেয়ে অনামিকার আজ বিয়ের তারিখ। এই দিনটা আসলেই মন খারাপ হয়ে যায় লক্ষ্মীর। কি পরিস্থিতিতে পড়ে মাত্র ষোলো বছর বয়েসে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল লক্ষ্মী, সেসব কথা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মনে হয় যেন সিনেমা দেখছে।

বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে লক্ষ্মী বোঝে গরম চাটু থেকে জ্বলন্ত উনুনের মধ্যে এসে পড়েছে সে। গরিব ঘরের মেয়ের বিয়ে যেমন হতে পারে তেমনি বিয়ে হয়েছিল লক্ষ্মীর। বাবা দাদারা সম্বন্ধ করে বিয়ে দিয়েছিল। এক বিঘে জমি বেচে, ধারদেনা করে ছেলের বাড়ির পণের চাহিদা মিটিয়ে বিয়ে হল লক্ষ্মীর। মায়ের পছন্দ ছিলনা এই সম্বন্ধ। কিন্তু তাকে কেউ মানুষ মনে করলে তবে না কথা শোনার প্রশ্ন!

বিয়ের এক বছরের মধ্যে লক্ষ্মীকে বাড়ি থেকে দেওয়া সামান্য গয়নাটুকুও কেড়েকুড়ে মদ আর জুয়ায় লাগিয়ে দেয় ওর বর সনাতন। কিছু বলতে গেলেই চড় চাপ্পড় জুটত। এভাবে থালা বাসনটুকুও চলে গেল। দুবেলা ভাত জোটানো মুশকিল হয়ে দাঁড়াল।

লক্ষ্মীর বাপের বাড়ি গরিব হলেও দুবেলা পেট ভরে ভাত জুটত অন্তত। এখানে লক্ষ্মীর খিদে পায় কিন্তু খাবার পায়না। বাপের বাড়ি আসতে দেয়না শাশুড়ি। খিদেয়, কষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়ে লক্ষ্মী। একদিন পুকুরঘাটে কাপড় কাচতে যাবার নাম করে কোনমতে পালিয়ে আসে লক্ষ্মী।

সব শুনে মা লক্ষ্মীকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবেনা বলে ঠিক করে। সংসারের সবার মুখঝামটা খেয়েও এই সিদ্ধান্ত থেকে নড়ে না লক্ষ্মীর মা। মাসখানেক যেতে না যেতেই বোঝা যায় লক্ষ্মী অন্তঃসত্ত্বা।

মেয়ে হল লক্ষ্মীর। ইতিমধ্যে সনাতন বার দুয়েক এসেছিল লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু প্রতিবারই চুর মাতাল হয়ে। অতয়েব, লক্ষ্মী আপাতত বাপের বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেল।

লক্ষ্মী মেয়ের নাম দেয় অনামিকা। দুই দাদার বিয়ে হয়। বৌদিরা আসে। তারা  লক্ষ্মীকে একটু ব্যাঁকা চোখেই দেখে। বিবাহিত মেয়ে বাপের বাড়িতে কেন পড়ে আছে, ভাবখানা এমনই। উঠতে বসতে গালি দেয়, খোঁটা দেয়। তার মধ্যেই লক্ষ্মীর মা যতটা সম্ভব আগলে রাখে মেয়েকে আর দুধের শিশুটিকে।

অভাবের সংসারে দুধের শিশু মিছরির জল খেয়ে খেয়ে বাড়তে লাগল যতদিন না ভাত খাবার বয়েস হয়। মায়ের ভরসায় বেশি বেশি বৌদিদের আর খানিক খানিক দাদাদের গঞ্জনা হজম করেও দাঁতমুখ এঁটে পড়ে ছিল লক্ষ্মী।

ক্রমশ পরিস্থিতি ঘোরালো হতে থাকায় চার বছরের অপুষ্ট মেয়েকে মায়ের জিম্মায় রেখে কাজ করতে নামল লক্ষ্মী। খাওয়া পরার বাঁধা কাজ। প্রথম প্রথম চূড়ান্ত অসুবিধে হলেও আসতে আসতে সেই জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে উঠল লক্ষ্মী। শিখল শহুরে আদব কায়দা। বুঝল লেখাপড়া না শিখলে অনামিকাকেও ওর মতো লোকের বাড়ি কাজ করে বেঁচে থাকতে হবে। তাই দু-তিনমাস অন্তর বাড়ি গিয়ে মাকে বলে আসত যত বাধাই আসুক, অনামিকার লেখাপড়ায় যেন কোনো অসুবিধে না হয় । অন্তত টেন ক্লাসটা পাশ করতেই হবে। কাজের বাড়ির বৌদিও এই কথা বার বার বলে।

অনামিকার বয়েস এখন পনেরো। ক্লাস এইটে পড়ে। একটু স্বস্তি এসেছে লক্ষ্মীর জীবনে। এক দুপুরে ভাত খেতে বসেছে লক্ষ্মী, দারোয়ান এসে খবর দিল দেশ থেকে লোক এসেছে। ছাঁৎ করে উঠল লক্ষীর বুকের ভেতরটা। এই অসময় দেশ থেকে কে এল আবার?

নিচে নেমে লক্ষী দেখল, ছোড়দা দাঁড়িয়ে আছে। গতকাল রাতে মা চলে যাবার খবর নিয়ে।

লড়াইয়ের পরিধিটাকে খানিকটা নিজের আয়ত্তে এনেছিল লক্ষ্মী। বিপদ একেবারে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সামনে। মায়ের কাজে বাড়ি গিয়ে লক্ষ্মী শুনল, ‘ তোমার মেয়েকে আমরা আর পুষতে পারবনা পষ্ট করে বলে দিলাম। তুমি যত শিগগির পারো ওকে নিয়ে যাও এখান থেকে। আপদ যত। ‘ দাদারাও নিশ্চুপ। 

কাজের বাড়িতে মেয়ে নিয়ে যাওয়া যাবেনা। অকুল পাথারে পড়ে মায়ের শোক ভুলে মেয়ের ব্যবস্থা কী করবে সেই ভাবনায় পাগল হয়ে গেল লক্ষ্মী। সেজমামীমা এসে পাশে বসে বলল, ‘ শোন, ভালো একটা পরামর্শ দি। আমার ছোট জায়ের ভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখাদেখি চলছে। অনামিকার কথা বলি বরং। দেখুক এসে। যদি লেগে যায় তাহলে তুইও বাঁচবি আর ও-ও বাঁচবে। ভালো কথা বললাম কিনা? ‘

ষোলো  বছর সাত মাস বয়েসে বিয়ে হয়ে গেল অনামিকার। ছেলে বিশেষ কিছু করেনা, অবস্থাও তথৈবচ। কিন্তু লক্ষ্মীর আর কোনো উপায় ছিল না।

মেয়ের বিয়ে দিয়ে লক্ষ্মী ফিরে গেল কাজের বাড়িতে। বুকের ভতরটা ধুধু ফাঁকা লাগছে এখন। মায়ের শোক, মেয়ের ভবিষ্যতের চিন্তা এই মুহূর্তে আচ্ছন্ন করে ফেলল লক্ষ্মীকে।

মেয়েটা কেমন থাকে তার খবর পাবারও উপায় নেই। যখন তখন তো আর কুটুম বাড়ি যাওয়া যায়না। হাতদুটো জোড়া করে মাথায় ঠেকায় লক্ষ্মী, ‘ আমার মেয়াটাকে ভালো রেখো মাগো। ‘ হঠাৎই মনে পড়ে জোড়া ডলফিনের কথা।

যে বাড়িতে থাকে লক্ষ্মী সেই বাড়ির বৌদির বিয়ের ফটোর পাশে জোড়া মাছ রাখা দেখে একদিন সাহস করে জিগ্যেস করেছিল লক্ষ্মী, ‘ বৌদি, তোমার আর দাদার ফটোর পাশে এই জোড়া মাছ রাখা কেনো গো? ‘

– মাছ নয় গো লক্ষ্মীদি, এগুলোকে বলে ডলফিন। ঘরে জোড়া ডলফিন রাখা শুভ, বুঝলে? হেসে বলেছিল বৌদি।

দাদা মাঝেসাঝে টলতে টলতে ফিরলেও মোটের ওপর শান্তি আছে সংসারে। বৌদি খুব একটা কিছু বলেনা এসবের জন্য। দাদাও উদার। বৌদি তো  খরচ করতে ওস্তাদ।

লক্ষ্মী ঠিক করে নেয় বৌদিকে বলবে অনামিকার জন্য  ওই রকম একটা জোড়া ডলফিন এনে দিতে, টাকা লক্ষ্মী দিয়ে দেবে।

সাত মাসের মাথায় জোড়া ডলফিন নিয়ে সঙ্গে আরো নানান জিনিসপত্র নিয়ে লক্ষ্মী রওনা দেয় বেয়াই বাড়ির উদ্দেশ্যে। খুশি উপচে পড়ছে শরীরময়। ‘আশাকরি মেয়েটা ভালো আছে। বৌদি বলেছে, কোনো খবর নেই মানে সব ভালো আছে।’ — ভাবতে ভাবতে নৌকায় ওঠে লক্ষ্মী। বাস থেকে নেমে ছোট একটা নদী পেরতে হয়। ওপারে নেমে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই অনামিকার শ্বশুরবাড়ি।

এতদিন বাদে অনামিকাকে দেখে মুখ শুকিয়ে গেল লক্ষ্মীর। এ কি চেহারা হয়েছে! রোগা মেয়েটা দড়ির মতো পাকিয়ে গেছে যেন। লক্ষ্মীকে দেখেই বুকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে অনামিকা। বুকের কাপড় ভিজে যায় অনামিকার চোখের জলে।

লক্ষ্মী জানতে পারে অনামিকা সন্তানসম্ভবা। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছে কিনা জিগ্যেস করলে অনামিকা ঘাড় নাড়ে। বুঝে নেবার দায়িত্ব লক্ষ্মীর। বেয়ানকে খুব মিহি গলায় বৌমাকে একটু দেখাশোনার কথা বললে  বেয়ান একটু কড়া ভাবে বলে, ‘ রুগ্ন মেয়েই তো দিয়েছ তুমি,  আমি আর কী দেখাশোনা করব? ‘

দুরাত কেটে গেল। মা মেয়েতে তেমন কথা হল না কারণ জামাই মাতাল হয়ে ঘরে ঢুকে বকবক করে কানের মাথা খেয়ে নিল। একখানাই ঘর, লক্ষ্মী যে অন্য ঘরে চলে যাবে তারও উপায় নেই। অদ্ভুত দুশ্চিন্তা ভর করল লক্ষ্মীর মাথায়। ‘মেয়েটা ঠিকমতো খেতে পায় তো? পেটে আবার বাচ্চা!তারও তো পুষ্টি দরকার। জামাইয়ের যা হাল দেখছি! ‘ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে লক্ষ্মী।

আজ লক্ষ্মী ফিরে যাবে। ঝোলা থেকে জোড়া ডলফিন বের করে মেয়েকে বলে,  ‘ এই জোড়া ডলফিন খুব শুভ। তোর ঘরে রাখ। সরাবি না। সব ভালো হবে। ‘ মা’র কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে অনামিকা। এমন মাছ কখনো দেখেনি ও। ল্যাজের কাছটা জোড়া, বাকি শরীরটা একটা মাছ এদিক দিয়ে আর অন্য মাছটা ওদিক দিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি। মুখের কাছটা সরু, অনেকটা পাঁকাল মাছের মতো।

বড্ড গরিব অনামিকার শ্বশুরবাড়ি। এই সময় মেয়েটার পেট ভরে ভাত খাওয়ার দরকার। কিন্তু সেটুকুও বা রোজ জুটছে কই! মেয়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে লক্ষ্মী বলে, ‘ পারলে একটু ফল কিনে খাস। লুকিয়ে খাবি, যেন তোর শাশুড়ি না দেখে। দশটা কথা শোনাবে নয়তো। আর জামাই যেন না জানতে পারে। ‘ নিজের অতীত যেন ফিরে দেখা দিয়েছে লক্ষ্মীর সামনে।

অনামিকা জানে, একদানা সরষেও লুকিয়ে মুখে দিতে পারবে না সে। মা চলে গেলেই চেপে ধরবে সনাতন। টাকা চাইবে। ও জানে বউয়ের মা কিছু টাকাপয়সা নিশ্চয়ই দিয়ে গেছে মেয়ের হাতে। জুয়া, মদের জন্য কদিন নিশ্চিন্ত।

লক্ষ্মী চলে আসার সময় বেয়ানের সঙ্গে দেখা করতে যেতেই সে বলল, ‘ কমাস বাদেই তো আমার নাতি আসছে ঘরে। তখন আবার এসো গো। ‘ ধক করে মাথায় লাগল কথাটা।  নাতিই হবে একথা কি জোর দিয়ে বলা যায়? ঈশ্বর যা দেবেন তাকেই তো ভালোবেসে বুকে তুলে নেওয়া উচিত। দুগগা, দুগগা! না, না, ভালোই হবে, জোড়া ডলফিন দিয়ে এসেছে, আর চিন্তা নেই।

বারান্দায় কাপড় মেলছিল লক্ষ্মী। ছোড়দা আসছে দেখতে পেল। কদিন ধরেই মনটা চঞ্চল হয়ে আছে। অনামিকার বাচ্চা হবার সময় হয়ে গেছে। ওদিককার কোনো খবর পাচ্ছে না লক্ষ্মী। ছোড়দাকে দেখে দৌড়ে নিচে নেমে এসে সদর দরজা খুলে দাঁড়ায় সে। নিশ্চয়ই কোনো খবর আছে। প্রাণটা যেন গলার কাছে চলে এসেছে।

– অনামিকার যমজ মেয়ে হয়েছে বলে ওর শাশুড়ি বের করে দিয়েছে বাড়ি থেকে। জামাই বাচ্চা শুদ্ধু অনুকে রেখে গেছে আমাদের বাড়িতে। তুই কিছু একটা ব্যবস্থা কর লক্ষ্মী।

   

  

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত