বাঙালির মননে যতীন্দ্রমোহন বাগচী

আজ ২৭ নভেম্বর কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি ।


 

 

আখতার হামিদ খান

যতীন্দ্রমোহন নদীয়া জেলার জমশেরপুরের অধিবাসী ছিলেন, সেখানে শ্রী নারায়ণ নিকেতনে ১৮৭৮ সালের ২৭ নভেম্বর তার জন্ম। বাবা হরিমোহন বাগচী, মা গিরিমোহিনী দেবী। বহরপুরে তার প্রাথমিক শিক্ষালাভ, খাগড়ার লন্ডন মিশন স্কুলে। পরবর্তীকালে ১৮৯০ সালে কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। এরপর প্রেসিডেন্সি ও ডাফ কলেজ। ১৯০২ সালে বিএ পাস।
১৮৯১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে বালক যতীন্দ্রমোহন এমন শোকার্ত হয়েছিলেন যে, তিনি একটি শোকগাথা রচনা করেছিলেন। তেরো বছর বয়সে লেখা সেই রচনাটিই যতীন্দ্রমোহনের প্রথম মুদ্রিত কবিতা বলে জানা যায়। সেই ছাত্রাবস্থা থেকেই ঠাকুরবাড়ীর বিখ্যাত সাহিত্যপত্রিকা ভারতী এবং সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকায় যতীন্দ্রমোহনের প্রথম যুগের কবিতা একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে। যদিও জমিদার বংশে যতীন্দ্রমাহনের জন্ম, কিন্তু তিনিও উপার্জনের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করেছেন। প্রথম জীবনে সাহিত্যনুরাগী বিচারপতি সারদাচরণ মিত্রের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেন। কিছু সময় কলকাতা করপোরেশনের লাইসেন্স ইন্সপেক্টর পদে যুক্ত ছিলেন। ওই সময় নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং মহারাজ যতীন্দ্রমোহনকে প্রাইভেট সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত করেন। যদিও মহারাজ মানসী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, কিন্তু তিনি নামেমাত্র ছিলেন; যতীন্দ্রমোহনই ছিলেন মূল পরিচালক। তিনিই ক্রমেই পত্রিকাটিকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। মহারাজের মৃত্যুর পর এফএম গুপ্তা পেন্সিল কোম্পানির ম্যানেজার পদে যোগ দেন। পরে কোলিয়ারির কাজ, ব্যবসা ইত্যাদি বিভিন্ন রকম কাজই তিনি করেছেন।
এই সময় থেকেই তার লেখা বলিষ্ঠ হতে থাকে। মানসী, বঙ্গদর্শন, সাহিত্য, ভারতী, প্রবাসী, সাধনা, সবুজপত্র, মর্মবাণী, পূর্বাচল, যমুনা ইত্যাদি পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে তিনি লিখেছেন বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে (১৩২২ বঙ্গাব্দে) মর্মবাণী পত্রিকার সঙ্গে তাকে যুক্ত দেখা যায়। ১৯২১-২২ খ্রিস্টাব্দে (১৩২৮ ও ১৩২৯ বঙ্গাব্দ) অবধি যমুনা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং প্রথম সংখ্যা থেকে আমৃত্যু পূর্বাচল পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি।
যতীন্দ্রমোহন ছিলেন রবীন্দ্র-পরিম-লের কেন্দ্রমণি। কলকাতায় তার বাড়িতে তিনি গড়ে তোলেন রবীন্দ্র সাহিত্যচক্র এবং ১৯১২ সালে রবীন্দ্র-সংবর্ধনার আয়োজন করেন। টাউনহলে অনুষ্ঠিত ঐ সংবর্ধনা-সভার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন যতীন্দ্রমোহনই। এ উপলক্ষে টাউনহলের বিস্তৃত বারান্দায় একটি রবীন্দ্র প্রদর্শনী খোলার ব্যবস্থাও হয়েছিল। ১১ জন গায়কের কোরাসে যতীন্দ্রমোহন রচিত গান দিয়ে ঐ সভা শুরু হয়-
বাণীবরতনয়ে আজি স্বাগত সভামাঝে।
অযুত চিত-কমলে যেথা আসন তব বাজে।…
…এসো হৃদয়বন্ধু, এসো-এসো হে কবিসূর্য,
মায়ের ঘরে বাজিয়ে তব অভিবাদন তূর্য-
স্বাগত কবিরাজ-অধিরাজ বরসাজে!
যতীন্দ্রমোহনের আত্মজীবনী থেকে আমরা জানতে পারি, তার লেখা কবিতার বইটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিকে আরও কবিতা লেখার জন্য উৎসাহিত করেন। দ্বিতীয় বই লেখা আরও চার বছর পরে ১৮৯০ সালে প্রকাশিত হয়। লেখা এবং পরবর্তীকালে অপরাজিতা প্রকাশিত হওয়ার পর তার কবিখ্যাতি সর্বাধিক প্রচারিত হয়। এই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, করুণানীধান বন্দোপাধ্যায়, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, হেমেন্দ্রকুমার রায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, কালিদাস রায়, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, নরেন্দ্র দেব, রাধারানী দেবী প্রমুখ কবি ও সাহিত্যিকদের মজলিস বসত তার বাড়িতে। সেখানে গানের আসরও বসত। সেই আসরে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, রাধিক্য গোস্বামী, জ্ঞান গোস্বামী, গিরিজাভূষণ, নলিনীকান্ত সরকার প্রমুখ অনেক বিখ্যাত গায়ক অংশ নিতেন।
যতীন্দ্রমোহন শরৎচন্দ্রের স্নেহসান্নিধ্য থেকেও বঞ্চিত হননি। বহু রচনা থেকেই তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা আমরা জানতে পারি। শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘যতীনকে আমি সত্যিই ভালোবাসি। শুধু কবি বলে নয়, তার ভেতরে এমনই একটি স্নেহ-সরস বন্ধুবৎসল ভদ্র মন আছে যে তার স্পর্শে নিজের মনটাও তৃপ্তিতে ভরে আসে। যতীন জানেন, আমি তার কবিতার একান্ত অনুরাগী। যখন যেখানেই তাদের দেখা পাই বারবার করে পড়ি। স্নিগ্ধ সকরুণ নির্ভূল ছন্দগুলো কানে-কানে যেন কত কি বলতে থাকে।’
যতীন্দ্রমোহন শুধুমাত্র রবীন্দ্রভক্ত অথবা রবীন্দ্রনাথ আর শরৎচন্দ্রের স্নেহধন্য ছিলেন তাই নয়, অনুজ কবিদের কাছেও খুব জনপ্রিয় ছিলেন। তাদের উৎসাহিত করেও তিনি অত্যন্ত আনন্দ পেতেন। যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত নিজের সাহিত্যজীবন সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে লিখেছেন- যতীন্দ্রমোহন তখন স্বনামধন্য আর যতীন্দ্রনাথের একটি আধটি কবিতা ছাপা হয়েছে, কিন্তু যতীন্দ্রমোহনের চোখ এড়ায়নি সেই কবিতা। কৃষ্ণনগরে তাদের পরিচয় হয় এবং তৎক্ষণাৎ প্রায় দশ বছরের ছোট যতীন্দ্রনাথকে যতীন্দ্রমোহন কাছে টেনে নেন এবং শপথ করিয়ে নেন তারা পরস্পরকে ‘মিতা’ সম্বোধন করবেন, কোনো দাদা বা ভাই নয়। যতীন্দ্রমোহনের সহানুভূতি ও উৎসাহের ফলেই যে তিনি নিয়মিতভাবে কবিতা রচনা আরম্ভ করেন। এমন স্বীকৃতিও যতীন্দ্রনাথের রয়েছে।
যতীন্দ্রমোহন যে গুণীর মান দিতে জানতেন, এমন তথ্য আমরা বহু জায়গা থেকেই জানতে পেরেছি। মোহিতলাল মজুমদার লিখেছিলেন, ‘কবি যতীন্দ্রমোহনের কাব্য আমার সাহিত্যিক জীবনের উন্মেষকালের সহিত একটি সুখমধুর স্মৃতি জড়িত হইয়া আছে। কতদিন হইয়া গেল তবু মনে হয় সেদিন যতীন্দ্রমোহন তাহার তৎকালীন কলিকাতাস্থ গৃহে একটি অতিকায় ভাবপ্রবণ কবিতামুগ্ধ বালকের সাক্ষৎ প্রায়ই পাইতেন এবং সস্নেহে তাহার সেই কাব্যানুরাগকে লালন করিতেন। তখন আমি কবিযশপ্রার্থী ছিলাম না, কবি-হৃদয়-সন্ধানী ছিলাম। যতীন্দ্রমোহন সেকালের সেই পরিচয়হীন অর্বাচীন বালককে এক মুহূর্তে সমধর্ম ও সমপ্রাণের অধিকার ও গৌরব দিয়াছিলেন।’
কাজী নজরুলও কবির অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। নজরুল যতীন্দ্রমোহনকে ‘যতীনদা’ বলতেন এবং যতীন্দ্রমোহন তাকে ‘তুই’ সম্বোধন করতেন। আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল গ্রামনিসর্গের চমৎকার বর্ণনামূলক বহু কবিতার রচয়িতা যতীন্দ্রমোহন। যদিও গ্রামের তুলনায় শহরেই অধিকাংশ দিন থেকেছেন, তবু তার জন্মস্থান বা তার শিশুবেলা ও বালক বয়সের দিন কখনোই বিস্মৃত হয়নি তার সত্তা থেকেÑ
ওই যে গাঁটি যাচ্ছে দেখা আইরি খেতের আড়ে-
প্রান্তটি যার আঁধার করা সবুজ কেয়াঝাড়ে,
পুবের দিকে আম-কাঁঠালের বাগান দিয়ে ঘেরা,
জটলা করে যাহার তলে রাখাল বালকেরা-
ওইটি আমার গ্রাম, আমার স্বর্গপুরী
ওইখানেতে হৃদয় আমার গেছে চুরি।
-পল্লীর প্রতি যতীন্দ্রমোহনের ছিল স্বাভাবিক আকর্ষণ, একইসঙ্গে তার জন্ম-সংস্কার। সে কারণেই পল্লীর এমন মোহনরূপ তার কবিতায়, সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই। কোথাও পল্লী-প্রকৃতির উৎকট রোমান্টিক ভাবুকতাকে তিনি প্রশ্রয় দেননি। সহজ এবং বাস্তব ঘটনার বর্ণনাই ছিল তার কবিতার বৈশিষ্ট্য। তার পল্লী-কবিতা শুধুমাত্র পল্লী বর্ণনায় পরিণত হয়নি, হৃদয়ের উত্তাপে জীবনের স্পন্দন লাভ করেছে।
কবিতা তো ইতিহাস নয়, দর্শনও নয়। কবিতা হলো হৃদয়ের ভাব, একইসঙ্গে অন্তরের ছবিও এবং যতীন্দ্রমোহন সেখানে সার্থক। সহজ করে সহজ কথা বলে পাঠকের হৃদয় অধিকার করতে জানেন। মোহিতলাল মজুমদার বলেছিলেন, ‘যতীন্দ্রমোহনের কাব্যে প্রকৃতি ও মানব-হৃদয়ের একটি অতিসহজ-সরল অনাড়ম্বর মধুর সম্পর্কের দিক ফুটিয়া উঠিয়াছে, সেখানে কোনো জোরজবরদস্তি নাই। কল্পনার দুরূহ প্রয়াস বা ভাবনার ধনুর্ভঙ্গ পণ নাই; আছে আলো-ছায়ার সহজ মাধুরী, সমবেদনার শরৎ প্রসন্নতা। কিন্তু সবচেয়ে গৌরবজনক তাহার ভাষার শুচিতা।’
বাংলা কাব্যে একক নাকটীয় সংলাপ প্রয়োগেও তিনি ছিলেন সার্থক। এই বিষয়ে তার অন্ধবধূ কবিতাটি জ্বলন্ত উদাহরণ-
পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী।
আস্তে একটু চল না ঠাকুরঝি-
ওমা এ যে ঝরা বকুল। নয়?
গা শিউরে ওঠে অনুভবে। কোনো চক্ষুম্মানের এভাবে কোনো অন্ধ নারীর বেদনা অনুভব করতে পারা এবং তার বর্ণনায় পাঠকের হৃদয়কে নাড়া দিতে পারা মোটেই সহজ নয়। যতীন্দ্রমোহন সেখানে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন বারবার। বঞ্চিতা নারীর হৃদয়-বেদনায় তার লেখনী ছিল নিজস্ব। তার বহু কবিতাতেই নিরক্ষর দরিদ্র সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে।
যতীন্দ্রমোহন কাহিনীমূলক কবিতা রচনায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। দুর্যোধন, কর্ণ, শবরীর প্রতীক্ষা প্রভৃতি কবিতায় তিনি যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। পৌরাণিক কাহিনীগুলোকে এমন সুন্দরভাবে উপস্থাপনের বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। কোনো উচ্ছ্বাস-প্রাবল্যে কবিতার সীমারেখা কখনোই তিনি অতিক্রম করেননি। যতীন্দ্রমোহনের প্রথম কবিতার বই লেখা ৬৬টি কবিতা ও গানে সমৃদ্ধ হয়ে জমশেরপুর থেকে প্রকাশিত হয় এবং রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গিত করা হয়। লেখা কাব্যগ্রন্থেই সেই বিখ্যাত দিদিহারা কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল-
বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই-
মাগো আমার শোলোক-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুরধারে নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে-
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই;
মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?…
এমন সহজ শব্দে এমন অসাধারণ চিত্রকল্প সৃষ্টি যতীন্দ্রমোহনই পারতেন। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার চিত্রকল্পের ব্যবহার। এই কবিতাটিতে কোনো পান্ডিত্য পূর্ণ বিশ্লেষণ নেই, তত্ত্ব বা ভাষার আতিশয্যও নেই। কিন্তু অত্যন্ত সহজ ভাষায় লেখা এই কবিতাটি যে কোনো হৃদয়কেই নাড়া দেয়। কাজলা দিদির শোকে কাতর ভাইটি যে প্রত্যেক পাঠকের বুকের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, এইখানেই যতীন্দ্রমোহন অনন্য। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই কবিতাটি সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন ‘কবিতাটি সোনার অক্ষরে ছাপানো উচিত ছিল।’
যতীন্দ্রমোহন শুধুমাত্র ঘরোয়া সুখ-দুঃখের কবিতা বা নিসর্গচিত্রের রচয়িতাই ছিলেন না, প্রেমের সুমধুর কত কবিতাও তিনি লিখেছেন। তার প্রেমের কবিতায় গভীর ভাবাবেগ যেমন আছে, সেরকমই হৃদয়-নিবেদনের সংযত প্রকাশ।
তুমি শিশির ভেজা কাশের বনে বিছিয়ে দিয়ে আঁচল,
সিত জ্যোৎস্নামাখা হাঁসের পাখায় এলিয়ে দিয়ে কাঁচল
সাদা ঝিনুক-পাতা বালির তটে ঘুমিয়েছিলে রানী…
(জ্যোৎস্না লক্ষ্মী)
-প্রেমের কবিতায় ছিল যতীন্দ্রমোহনের সুমিত প্রকাশ। তিরিশের যুগে কল্লোল পত্রিকাগোষ্ঠীর সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থাপিত হয় যে কবিতাটির মাধ্যমে সেটি হলো যৌবন চাঞ্চল্যÑ
ভুটিয়া যুবতী চলে পথ
আকাশ কালিমাখা কুয়াশায় দিক ঢাকা
চারিধারে কেবলি পর্বত;
যুবতী একেলা চলে পথ!
কোনো কষ্টকল্পিত শব্দের ব্যবহার নেই, সর্বত্র আবেগ আর স্বচ্ছতায় আঁকা মুগ্ধতার বর্ণনা।
যতীন্দ্রমোহনের বিভিন্ন বই বলাবাহুল্য আজ আর পাওয়া যায় না। লেখা (১৯০৬), লেখা (১৯১০), অপরাজিতা (১৯১৩), নাগকেশর (১৯১৭), বন্ধুর দান (১৯১৮), জাগরণী (১৯২২), নীহারিকা (১৯২৭), মহাভারতী (১৯৩৬), কাব্যমলঞ্চ (১৯৩৬), পাঞ্চজন্য (১৯৪১), রবীন্দ্রনাথ ও যুগসাহিত্য (১৯৪৭)। হাইনরিখ হাইনের অনেক কবিতা তিনি একসময় অনুবাদ করেন, যদিও সেগুলো অগ্রন্থিত। যতীন্দ্রমোহনের রচিত মা এবং অন্য নাটিকা একসময় একাধিকবার অল ইন্ডিয়া রেডিওতে অভিনীত হয় এবং উচ্চ প্রশংসিত হয়। তার পথের সাথী উপন্যাসও প্রভূত পরিমাণ খ্যাতি লাভ করেছিল। তার কাজলাদিদি গানটি সুধীন দাশগুপ্তের সুরে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে রেকর্ড হয়েছিল, আজও সকলের মুখে মুখে ফেরে। যতীন্দ্রমোহনের আরও দুটি গান একসময়ে খুবই খ্যাতি লাভ করেছিল শচীন দেববর্মণের কণ্ঠেÑ
১. ঝুলনে ঝুলিছে শ্যামরাই
গৃহকাজে বাঁধা রাধা
আসিতে না পায়..
২. বাইবো না আর উজান ঘরে
খ্যাতনামা সাহিত্যিক রাজশেখর বসু (পরশুরাম) যতীন্দ্রমোহনকে ‘গদ্যে পদ্যে সার্বভৌম’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। যতীন্দ্রমোহন ‘কবি কুলেশ্বর’ উপাধিতেও ভূষিত হন, কিন্তু তিনি কখনও ব্যবহার করেননি। ১৯৩১ সালে জলধর সেনের সভাপতিত্বে রসচক্র সাহিত্য সংসদের পক্ষ থেকে বেলঘরিয়ার একটি উদ্যান, সম্মেলনে যতীন্দ্রমোহনকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। ১৯৪৪ সালে তাকে দেশবাসীর পক্ষ থেকে মহারাজা শ্রীশচন্দ্র নন্দী, মহারাজা যোগেন্দ্রনারায়ণ রায় এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ড. অতুলচন্দ্র গুপ্তের সভাপতিত্বে অভিনন্দিত করা হয়।
যতীন্দ্রমোহনকে লেখক-জীবনের খ্যাতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখকে সঙ্গে করে চলতে হয়েছে। তার তিন কন্যা-সন্তানের অকালমৃত্যু এবং স্ত্রী ভাবিনী দেবীর মৃত্যু তাকে বারবার ধাক্কা দেয়। এই বিষয়ে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘ইলাবাস’ কবিতাটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সন্তান ও পতœীর বিয়োগব্যথা যতীন্দ্রমোহনকে অনেক কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
রবীন্দ্র-অনুজ কবিগণ অনুকারক ছিলেন না, নিজস্ব অভিজ্ঞতার নিখাদ উপস্থানাই তাদের লেখায় ফুটে উঠেছিল। যদিও সাহিত্যের ইতিহাসে তাদের গায়ে রবীন্দ্রানুসারী তকমা এঁটে দেয়া হয়েছে এবং তার ফলেই আজ সেই উল্লেখযোগ্য কবিরা বিস্মৃতপ্রায়, কিন্তু বিস্মরণের মতো কবি নন তারা কেউই।
সেই কবিসমাজের অন্যতম যতীন্দ্রমোহনকেও শুধুমাত্র রবীন্দ্রানুসারী বলে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। কেননা যতীন্দ্রমোহনের কবিতায় স্বকীয়তা প্রথম থেকেই স্পষ্ট। রবীন্দ্রধারায় কবিতা লিখতে আরম্ভ করেছিলেন একথা সত্য, কিন্তু তার পদক্ষেপটি একেবারেই তার নিজস্ব।
রবীন্দ্রনাথের লেখনী যখন প্রবল তেজের সঙ্গে চলছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রখর সূর্যতাপে দগ্ধ না হয়েও যতীন্দ্রমোহন যে এমন স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে নিজের স্থান করে নিতে পেরেছেন, এ বড় কম কথা নয়। শুধুমাত্র ছন্দে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তা নয়; তার কবিতার ভাষাও এমনই যে, সে সর্বকালের আধুনিক ভাষা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। যেহেতু কবিতা বিষয়টি এমনই যে, যতবার পড়া যায় ততবারই নতুন নতুনভাবে কবির সঙ্গে পরিচয় ঘটে, আজ তাই আরও একবার নতুনভাবে যতীন্দ্রমোহনকে চিনে নেয়া প্রয়োজন আমাদের।
যদিও অনেক আধুনিক প্রথিতযশা মানুষ যতীন্দ্রমোহনের কবিতা পড়েননি একথা গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করেন। তবু আমি মনে করি, যতীন্দ্রমোহন সম্পর্কে মোহিতলাল মজুমদার লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রোত্তর বাংলাকাব্যে বাংলাভাষা যাহারা রক্ষা করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে যতীন্দ্রমোহন অগ্রগণ্য।… যতীন্দ্রমোহনের কাব্যে অতিসরল স্বাভাবিক সুখ-দুঃখ সৌন্দর্য সংবেদনায় ভাব-ভাষায় ইডিয়মকেই আশ্রয় করিয়া বড় সুন্দর ভঙ্গি স্পন্দিত হইয়াছে…’ যে যতীন্দ্রমোহনের কলমের ধার রবীন্দ্রনাথ চিনেছিলেন বা তদানীন্তন প্রথিতযশারা- সেই যতীন্দ্রমোহনের কবিতার যথার্থ মূল্যায়ন যদি আমরা না করতে পারি, তবে লজ্জা আমাদেরই।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত