নিঃসঙ্গ যুবরাজ- প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর

১৭৯৪ সন, মেছুয়া বাজার অঞ্চলে বর্তমান জোড়াসাঁকোতে শাঁখ বেজে উঠল ভোরবেলায়। নীলমণি ঠাকুরের নাতি এলো তার বড় ছেলে রামমণির ঘরে। এই নিয়ে পর পর দুই ছেলে কিন্তু মেজ ছেলে রামলোচন নি:সন্তান ছিলেন। এই দ্বিতীয় পুত্র কে অলকাসুন্দরী দেবী ও রামলোচন  দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহন করেন। ইতিহাস পালটে দেন এই পুত্র পরবর্তীতে বীজ মহিরুহতে পরিণত হয় কালে কালে।  খুব অল্প বয়েসেই রামলোচন মারা গেলে তাঁর জমিদারী পরগনা গুলি হাতে আসে দ্বারকা নাথের। তিনি পারিবারিক সম্পত্তি দেখা শোনার ফাঁকে শিখে নেন ফার্সী ইংরেজি এবং আইন। জমিদারি আয় থেকে টাকা জমিয়ে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পুরুষ টি নিজের স্বাধীন ব্যবসা চালু করেন। সেই সময় যারা বাংলায় ইংরেজ দের সাথে ব্যবসা করতেন বেশির ভাগ মানুষ এজেন্সি নিতেন ট্রেড লাইসেন্স সে অর্থে কারুর ছিল।না। মুৎসুদ্দি বা বাণিয়ার মত ছিল। দ্বারকানাথ প্রথম আবগারি বিভাগের কাজ ছেড়ে মেসার্স কার ঠাকুর এন্ড কোম্পানি বলে একটি সংস্থা চালু করেন।  কয়লা খনি, চিনি শিল্প, নীল চাষ কি না তিনি করেছেন এবং সফল হয়েছেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই। নিজের জাহাজে করে ইউরোপে  তিনি নীল রেশম  রপ্তানি করতেন। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম সফল স্টিভেডর ছিলেন।  তার জাহাজগুলি ছিল এরিয়েল, মাভিস এবং রেজোলিউশন।  জাহাজের পাশাপাশি তিনি সুদে টাকা খাটাতেন এবং  ১৮২৯ সালে   ষোলো লক্ষ টাকা দিয়ে ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক খুলে ফেলেন। এই উদ্যমী পুরুষ টি  পাশাপাশি সাহাজাদপুর বিরামপুর শিলাই দহ পান্ডুয়া বালুয়া এবং পশ্চিম বঙ্গের বহু ভুমি ক্রয় করে নেন। তিনি শুধু সফল বানিজ্য পুরুষ ছিলেন না সেই সময় বঙ্গদেশের প্রতিটি সমাজ কল্যাণ মূলক কাজে তার কল্যান স্পর্শ ছিল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শিক্ষা বিস্তার স্ত্রী শিক্ষা বিস্তার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, মেধাবী ছাত্রের বৃত্তিপ্রদান সমস্ত দিকেই তার আধুনিক চিন্তাবোধ ছিল। তাঁর এই চিন্তাধারার সার্থক ভার বহন করেছিলেন তার উত্তরসূরি রা। কেমন ছিল এই অভিজাত পুরুষ টির ব্যক্তিগত জীবন? তাঁকে বহু মানুষ  ভোগীবিলাসী বলে জানতেন। তার বেলগাছিয়া প্রমোদ ভবনে ইংরেজ নারী পুরুষ দের অবাধ বিচরন ছিল। তার পোষাক পরিচ্ছদ ছিল আধুনিক এবং মহার্ঘ। তার জুতোতেই বসানো থাকত চমকপ্রদ দুটি হীরে।


তার স্ত্রী সমমনস্ক ছিলেন না। এই আধুনিক উদার ধর্মী মানুষটিকে গ্রহন করার মত উদার তিনি ছিলেন না। তিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতকের নারীর প্রতিচ্ছবি স্বামী সেবা ঠাকুর ঘরের বাইরে তার কোন জগত ছিল না। স্বামীর বিলেত গমন, ম্লেচ্ছদের সাথে ওঠাবসা তিনি গ্রহন করতে পারেন নি। স্বামীর সাথে আলাপচারিতার পর সাতঘড়া গঙ্গা স্নানের বিধান দিয়েছিলেন তার পুরোহিতেরা। তিনি সেই মত চলতেন। স্ত্রীর এ হেন আচরণে বাধ্য হয়েই দ্বারকানাথ বৈঠক খানা রোডের বাড়িতে উঠে যান।


তাঁর দ্বিতীয় মনস্তাপের কারন ছিল তার বিপুল  অধোগামী বাণিজ্য জগত। কোন পুত্র ই বাণিজ্য মুখী এবং পরিশ্রমী ছিল না তাঁর মত, তাই বাধ্য হয়েই ইউনিয়ন ব্যঙ্ক ও কার ঠাকুর কোম্পানী বিক্রি করে দিতে হয় আগেই।। তিনি বুদ্ধি করে তার মৃত্যুরআগেই এমন ভাবে ঊইল করে যান যে এবং সম্পত্তি  বন্টন করে ট্রাস্ট তৈরি করেন যে, তার পরের প্রজন্মের কাউকে অর্থ কষ্টে ভুগতে হয়নি। যদিও তার মৃত্যুর পর দেনার দায়ে পর পর ই বেশ কটি  চালু খনিজ  ব্যবসা বিক্রি করে দিয়েছিল তার তিন পুত্রেরা।  দ্বারকানাথের অবর্তমানে কোন পুত্র ই আর সে ভাবে কোন আয়পত্র বাড়াতে সক্ষম হন নি।
পুত্রদের সাথে তার মানসিক দুরত্ব সময়ের সাথে বাড়তে থাকলে, নি:সঙ্গ কর্মবীর অভিজাত এই মানুষ টি বিলেত গমন করেন। দেবেন্দ্রনাথের প্রবল ধর্মভাব এবং কর্ম বিমুখতা তাকে পীড়া দেয়। বিলেতে তিনি তার অনুচরদের নিয়ে একাই  বসবাসকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর পুত্রেরা মৃত্যু সংবাদ পান দেড়মাস বাদে। এবং কুশপুত্তলিকা দাহ করেন লৌকিক মতে।
তার অতি প্রিয় জৈষ্ঠ পুত্র সরেই থাকেন পিতাকে ভুল বুঝে। মৃত্যু তেই তার পরিসমাপ্তি ঘটে। ব্রিটেনের কেনসল গ্রীন সমাধি ক্ষেত্রে ১৮৪৫ সালের ১লা আগস্ট তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তার শবযাত্রায় বহু অভিজাত রাজপুরুষ এবং ব্রিটেনে তার অর্থানুকুল্যে প্রতিপালিত ছাত্ররা সঙ্গী হয়।অদ্ভুত ভাবে তাঁর কথা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস কথা থেকে যেন আলাদা রাখা হয়।  বহু মানুষ তাঁকে  ভোগী বিলাসী বলেই যেন জানেন। অথচ তিনি ছিলেন আধুনিক মানুষ রামমোহন রায়ের সার্থক ভাবশিষ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর ঠাকুরদার স্মরণ কিছু করেন নি তেমন ভাবে, অথচ যে জমিদারি,  তার অসংখ্য রচনার সাথে স্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুর কুঠিবাড়ি পদ্মাবোট সব ই ছিল তার ঠাকুরদার দান। ঠাকুরদার স্মৃতিবিজড়িত সমাধি ক্ষেত্রটির করুন অবস্থা দেখে সমাধি ক্ষেত্রের সুপারিন্টেনডেন্ট গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি দিলে ১৯০৭ সালে  তিনি চার পাউন্ড ও ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাত পাউন্ড পাঠিয়ে কর্তব্য শেষ করেন। কালের অতলে হারিয়ে যাওয়া দ্বারকানাথ ঠাকুর,নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা বাণিজ্য জগতের প্রবাদ প্রতিম, সফল উদ্যমী  বাঙ্গালীকে সে ভাবে স্থান দেওয়া হয়নি ঠাকুরবাড়ির ইতিবৃত্তে।

গ্রন্থ সূত্র–ঠাকুরবাড়ির কথা– হিরন্ময় বন্দোপাধ্যায়

নীলা মজুমদার — প্রতিভাস

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত