কিছু মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধপন্থার ইতিহাস

।।আহনাফ তাহমিদ।।

শত্রুর দুর্ভেদ্য দেয়ালে একটি ছেদ। বিপক্ষের দুর্গে একটি শক্তি শেলের আঘাত। আঘাতগুলো হানা এবং তা কাজে রুপান্তরিত করার মাঝে রয়েছে অনেক ফারাক। তার চেয়েও চিত্তাকর্ষক হয়ে দাঁড়ায় যদি আসন্ন আঘাত সম্পর্কে দু’পক্ষই জানে কিন্তু কখন সেটি আসবে, তা নিয়ে থাকে সন্দেহ। এটি হচ্ছে এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধের আদি কিন্তু বেশ পুরানোই বলা যায়। হুমকি, প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, নীলনকশা প্রণয়ন ইত্যাদি কাজগুলোও কিন্তু যুদ্ধের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়; বরং তা কখনো কখনো ময়দানে শত্রুর সামনা সামনি হওয়ার চেয়ও বড় ভূমিকা পালন করে। আবার কিছু কিছু প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হয় রোগীর চিকিৎসায়ও। আসুন, আজ এমনই কিছু মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক-

অ্যাজটেকের বাঁশির সুর

“সহস্র মৃতের চিৎকার” সংক্ষেপে এটিই হচ্ছে অ্যাজটেক বাঁশির সুর। ১৯৯৬ সালের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মেক্সিকোতে মানুষের খুলির আকৃতির দু’টি বাঁশির মতো বাদ্য জমিন খুঁড়ে আবিষ্কার করেন। পবন দেবতার মন্দিরের সামনে উৎসর্গকৃত এক মানুষের হাতে বাঁশি দু’টো পাওয়া যায়। প্রথমে ভাবা হয়েছিল খেলনা হিসেবে এগুলো ব্যবহার করা হতো। তবে পরবর্তীতে নানা গবেষণায় জানা যায়, এই বাঁশি যুদ্ধ ও ধর্মীয় আচারে ব্যবহার করা হতো। বাঁশি বাজালে মনে হয় যেন প্রচণ্ড কষ্টে থাকা কোনো মানুষ চিৎকার করে উঠছে। তবে এটির ব্যবহার নিয়ে গবেষকদের মাঝে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন, এই বাঁশি ব্যবহার করা হতো কাউকে উৎসর্গ করা হলে, যাতে মৃতের ভূমিতে তাদের ভালোভাবে সমাধিস্থ করা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে এই বাঁশি ব্যবহার করা হতো। শরীরের রক্ত পানি করা এই বাঁশির সুরের মাধ্যমে প্রথমে শত্রুদের ভড়কে দেয়া হতো। তাদেরকে একটি মদির অবস্থানে পৌঁছে দিতে সাহায্য করত এই বাঁশি। অ্যাজটেক চিকিৎসকেরা রোগীকে সারিয়ে তুলতে এই বাঁশি ব্যবহার করতেন।

চৈনিক ৩৬ স্ট্রাটাজেমস

৩৬ স্ট্রাটাজেমস বা স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে চৈনিকদের প্রাচীন পন্থা। এগুলো ব্যবহার করা হতো ছলচাতুরির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের যুদ্ধ করার ইচ্ছা নষ্ট করে দেয়ার ক্ষেত্রে। এই সঙ্কলিত পন্থাগুলোর মাঝে “আক্রমণ করবার নকশা”, “ধ্বংসলীলা নকশা”, “অতর্কিতে আঘাত নকশা” ইত্যাদি নানা পন্থা রয়েছে। ১৯৪১ সালে সিচুয়ান প্রদেশে একজন বই বিক্রেতার কাছে এই পন্থাগুলো একত্রে সংকলিত অবস্থায় একটি বইয়ে পাওয়া যায়। বইটিকে লিখেছিলেন, তা সম্পর্কে আজও কিছু জানা যায়নি। খ্রিস্টপূর্ব ৪০৩ এবং ২২১ সালের মাঝামাঝি কোনো একটি সময়ে লেখা হয়েছিল বলে পণ্ডিতেরা ধারণা করেন। বেশিরভাগই প্রবাদ আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এদের মাঝে কিছু কিছু প্রবাদ খ্রিস্টপূর্ব ৩২ সালে সংঘটিত কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেয়া আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বইটি কোনো একক লেখকের নয় বরং শতাব্দী জুড়ে বেশ কিছু লেখকদের প্রয়াসে এই বইটি সংকলিত হয়েছে।

তৈমুরের ভয়াবহ যুদ্ধপন্থা

চতুর্দশ শতাব্দীর উজবেক শাসক তৈমুর জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৩৩৬ সালে। শরীরের অর্ধাংশ অকেজো হওয়া সত্ত্বেও তৈমুর জয় করেছিলেন মধ্য এশিয়া এবং ভারতের কিছু অংশ। তৈমুরের যুদ্ধপন্থা নিয়ে যেসব কিংবদন্তী রয়েছে, তা জানলে অবাক হয়ে যেতে হয়। তার সৈন্যরা অন্তত ১৭ মিলিয়ন মানুষকে এক কথায় কচুকাটা করেছিল বলেই ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস। তৈমুর মৃতদের খুলি দিয়ে পিরামিড তৈরি করতেন। তার বিরুদ্ধে যারা অগ্রসর হতে চাইত, এই পিরামিড মনে একটা ত্রাসের সঞ্চার তৈরি করত বলে ইতিহাসবেত্তাদের বিশ্বাস। কেউ কেউ বলেন, তৈমুর বাগদাদে ৯০ হাজার আদিবাসীকে হত্যা করেছিলেন এবং তাদের মাথার খুলি দিয়ে ১২০টি পিরামিড তৈরি করেছিলেন। দিল্লী জয় করার পর সেখানেও হত্যাযজ্ঞ চালান তিনি, যাতে সমগ্র ভারত এর থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে। তৈমুরের এই ধ্বংসলীলা থেকে নিজেদের সারিয়ে তুলতে দিল্লীর প্রায় একটি শতক সময় লেগেছিল। অটোমান সাম্রাজ্যকে হারিয়ে দেবার পর তৈমুর সুলতানকে একটি খাঁচায় বন্দী করে নিয়ে গিয়েছিলেন। অন্যান্য প্রতিপক্ষের মনে ভীতির সঞ্চার করবার জন্য এর চাইতে বড় পন্থা বোধহয় আর কিছু হতে পারে না, তাই না?

চেঙ্গিস খানের ভীতি পন্থা

শত্রুর মনে ভীতির সঞ্চার করা ছিল চেঙ্গিস খানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তার বিরুদ্ধে যেই আসুক না কেন, শত্রুপক্ষের সৈন্য কিংবা সাধারণ নিরীহ মানুষ, সকলকে নির্দ্বিধায় হত্যা করতেন তিনি। মার্ভ দখল করার সময় প্রত্যেক মঙ্গল সৈন্যকে আদেশ দিয়েছিলেন তারা যেন শহরকে আগুনে পুড়িয়ে ছাঁই করার আগে অন্তত ৪০০ আদিবাসীকে হত্যা করে। হত্যার সংখ্যা কমবেশি হতে পারে, তবে চেঙ্গিস এই কাজটি করতে চেয়েছিলেন। চেঙ্গিস শত্রুকে চিন্তায় ফেলার জন্য মাঝে মাঝেই নিজের সৈন্য সংখ্যা বাড়িয়ে বলতেন। সমরকন্দ এবং ইউরোপ অভিযানের সময় যাত্রাভিমুখে অন্তত ৮০০ মাইল সামনে চলে গিয়েছিলেন যাতে তার প্রকৃত সৈন্যের সংখ্যা শত্রুপক্ষ জানতে না পারে। চেঙ্গিস তার তীরন্দাজ বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখতেন যাতে শত্রুরা তাদের সম্পর্কে আন্দাজ করতে না পারে। এছাড়াও তিনি প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দিতেন শত্রুশিবিরে। যুদ্ধের সময় উটবাহিনীকে সামনে রাখতেন যাতে প্রতিপক্ষদের মনে অস্বস্তি তৈরি হয়।

যুদ্ধরথ

খ্রিস্টপূর্ব ১২৭৪ সালে কাদেশের যুদ্ধে হিট্টি বাহিনীরা যুদ্ধরথ চালনার মাধ্যমে দ্বিতীয় রামেসিসের বাহিনীকে ছত্রাখান করে দিয়েছিল। এই রথ দেখে রামেসিস বাহিনীর মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে যায় এবং তারা দিগ্বিদিক হয়ে ছুটতে শুরু করে। হিট্টিদের পরিবর্তে মিশরীয় বাহিনীর যুদ্ধরথ ছিল তুলনামূলকভাবে কম ভয়ঙ্কর। এটি চালনা করত একজন এবং যোদ্ধা থাকত একজন, হাতে থাকত বর্শা কিংবা তীর ধনুক। হালকা হবার কারণে এটি দ্রুতগতিতে ছুটতে পারত এবং প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করে নিজ শিবিরে ফিরে আসতে পারত নির্বিঘ্নে।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্বিতীয় অন্তবর্তীকালীন যুগে হানাদার হিকজোরা মিশরে যুদ্ধরথের প্রবর্তন করে। ১৫ শতকে তৃতীয় থুতমোজের কাছে প্রায় এক সহস্র যুদ্ধরথ ছিল। প্রতিপক্ষের অনভিজ্ঞ সৈন্যদের বিরুদ্ধে এই রথ মনস্তাত্ত্বিকভাবে খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করত।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত