গল্প কবিতায় যুগান্তর মিত্র


আজ ১৭ মে কবি,কথাসাহিত্যিক যুগান্তর মিত্রের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


শ্মশানযাত্রীরা

.

দাউদাউ নিভে গেলে শ্মশানযাত্রীরা ফিরে আসে। আবার প্রাত্যহিক এসে চিবুক নেড়ে দিয়ে বলে, চলো একবার খুঁজে দেখি হারানো লাটিম।
.

এই তো সামনেই শুয়ে আছে পথ আর পথের কঙ্কাল। দু’পাশে সারি সারি গাছ, পসরা সাজানো মানুষজন আর কথার জঞ্জাল। এসবই তো চেয়েছিলে সকাল পেরিয়ে যাওয়া দিনে ! যখন মাথার কাছে মৌমাছির ডানার গুঞ্জন, “হয়ে ওঠো, হয়ে ওঠো” বলে কারো কারো আর্তনাদ ঝাঁপিয়ে পড়ছিল তোমার নিজস্ব উঠোনে। আর তুমি ঘুমের আচ্ছন্নতা নিয়ে ছুটে গেছো পশ্চিমের খোলা জানালার আলো লক্ষ করে।
.

আবার শ্মশানযাত্রীরা পৌঁছে যাবে যে যার পোশাক খুলে রেখে। তখন তোমার নিসুতো শরীরে মাটির গন্ধ পাবে যাবতীয় ওম-মাখা ঘাস লতাপাতা। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, তোমাকেও পৌঁছে দিয়ে ক্ষতবিক্ষত পথের ধারে,শ্মশানযাত্রীরা ঠিক ফিরে আসবে, যেভাবে একদিন তুমিও ফিরে এসেছিলে এইখানে …

শিরোনামহীন ১

টিকটিকি উঠে যাচ্ছে দেয়াল বেয়ে। যেন কোমল ধৈবত। সুর ধরে হেঁটে যাচ্ছে পাললিক শিলা। প্রাগৈতিহাসিক কাদাজল মেখে কারা বরাবর চলে যেতে চায় ! আমি তাদের অন্ধ অনুগমন করি। আর অন্ধকারের চোরাস্রোতে বসে বসে আমার পূর্বপুরুষ আমাকে বেঁচে থাকার কৌশল শেখায়। হাত ধরতে চায় কয়েকজন তরুণ সন্ন্যাসী। অথচ আমি প্রবল অবিশ্বাসে হাত ধরি কামুক পৃথিবীর। হতাশ সন্ন্যাসীরা ফিরে যায় নিজস্ব কোটরে।

#

আমি এখন চেয়ে আছি নতুন হাওয়ার দিকে।

#

আমার হাত ধরো, হাত ধরো, হাত ধরো হে পাগল বৈশাখ। উড়িয়ে নিয়ে যাও …

গন্তব্য

ডানদিকে একটা রাস্তা রেখে, বাঁদিকে আর-একটা, আমি হেঁটে যাই মাঝবরাবর। মাথা উঁচু রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু বারবার নত হয়ে পড়ে। কোলের ছেলেটা কেঁদে কঁকিয়ে ওঠে। হাওয়ায় ফিসফাস। দূর থেকে মাদলের শব্দের সঙ্গেই মাদকবিরোধী স্লোগান ভেসে আসে। কেউ কেউ হাত বাড়িয়েও সরিয়ে নেয়। আবার কারও নরম হাতের ছোঁয়ায় আভূমি কেঁপে উঠি থরথর। আমি কালপুরুষের তরবারি লক্ষ করি, তার চকচকে ধার বোঝার চেষ্টা করি আপ্রাণ।
.
এক টুকরো আলো চলকে উঠে আমার ডান পাশে গড়িয়ে পড়ে। আর-এক টুকরো আলো বাম পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। এতক্ষণে আবিষ্কার করি আমি একা ভাবছিলাম নিজেকে। আসলে আমার মতোই একা হয়ে অনন্তের দিকে হেঁটে যাচ্ছে আরও কেউ কেউ।
.

কোমরের ঘুঁনসি থেকে চাবির গোছা খুলে এনে ছেলের হাতে ধরিয়ে দিই অবলীলায়। সে মুঠোবন্দি করতে শেখেনি। তবু আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। যেমন আমিও মুঠো-করা জানা নেই বলে ঘুঁনসিতে আটকে রেখেছি এতকাল।

.
ওগো বাঁশি বাজানো হ্যামলিন, একবার মৃত্যুচিৎকার থেকে সুর চুরি করে গানে গানে ভরিয়ে দাও চরাচর, জেগে উঠুক তাবৎ বিস্ময়। শুধু আমি ঘুমিয়ে পড়তে চাই মাটির উঠোনে।

যুগান্তর মিত্রের অণুগল্পঃ

মাকড়ি

সোনার ধান হচে গো। আহা, আমার সোনার পিত্তিমে য্যান! প্রাণভরে শ্বাস নেয় ফিরোজ। মনে তার হাওয়ার উথালপাথাল।

অন্ধকারেরও একটা আলো থাকে। সেই আলোর সঙ্গে আকাশের ভাঙা চাঁদ আর তারাদের আলোয় মাখামাখি হয়ে একরকম জ্যোতি সৃষ্টি হয়েছে। ফিরোজের সারা শরীরে এই জ্যোতি লুটোপুটি খায়।

রুকু ছিল তার বউ, তার মনবারান্দায় হেসেখেলে থাকা বউ। রুকুর একমাত্র সোনার টুকরো কানের মাকড়ি দুটো বন্ধক রাখে ফিরোজ। রুকু প্রাণে ধরে দিতে চায়নি, ফিরোজ অনেক বুঝিয়ে মাকড়িটা নিয়েছে। সোনার ধানের লোভে বন্ধকের সামান্য টাকা নিয়েই নেমে পড়েছিল চাষে।

এবার এত বাদলা হল যে ধানের গোড়ায় জল থইথই। সবাই হাহুতাশ করল, সব ধান মাঠেই পচবে। ফিরোজ শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিল। রুকু সন্দেহ করেছিল তার মাকড়ি আর ফেরত আসবে না।

–সবুর কর রুকু। আমি ঠিক তোর মাকড়ি নে আনব। এট্টু সবুর কর।

সবুর সে করতে পারেনি। দিলু ভ্যানওলার হাত ধরে চলে গেছে। সেই দুঃখে দিন পনেরো জমির ধারেকাছে যায়নি ফিরোজ। দেখা হয়নি তার জমিন। বৃষ্টি ধরে আসার কয়েকদিন পরে জমিতে আসে সে। তখন সন্ধে উতরে গেছে। আধো-অন্ধকারে সোনালি ধানের গায়ে হাত বোলায় ফিরোজ। জল নেমে গেছে জমির, ফুরফুরে হাওয়ায় দুলে দুলে উঠছে ধানগাছ।

–ওরে রুকু, দেখি যা, তোর মাকড়ির ছোঁয়া লেগিচে ধানে। আয় আয়, দেকি যা।

বলতে বলতে সোনালি ধানের গায়ে গায়ে দৌড়োয় ফিরোজ। সরু সরু গাছ নুয়ে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। তারাও হেসে ওঠে খিলখিলিয়ে। ছোট্ট ছোট্ট সোনার মাকড়ি দুলে ওঠে গাছের মাথায়।

একসময় ফিরোজের হাসির থেকে দমকে দমকে কান্না ঠেলে আসে। ধানগাছেরা তা শুনতেও পায় না। তারা হেসেই চলে। হাসি-কান্নায় ভরে ওঠে জমি আর তার আশপাশের বাতাস।

 

.

নির্ভার

আজকাল তেমন কাউকে মনের কথা বলার লোক পান না নিঃসন্তান সমীরবাবু। বলার মতো লোক ছিল তাঁর স্ত্রী। তিনিও গত হয়েছেন বছর কয়েক হল।

–বুঝলি নাড়ু, সারাক্ষণ কী যেন নেই নেই মনে হয় আমার। কিন্তু কী যে…

–কন কি কত্তা, আপনারও?

–অ। তার মানে তোরও এইরকম হয় বুঝি?

নাড়ু আগে রিকশা চালাত। বয়স আর রোগের ধারেভারে আজকাল আর পারে না। ছেলেরাই সংসারের দায়দায়িত্ব নিয়েছে। সময় কাটাতে মাঝে মাঝে বিকেলে সমীরবাবুর বাড়ির দাওয়ায় এসে বসে। সমীরবাবুও একজন মন খুলে কথা বলার লোক পেয়ে খুশি। নাড়ুকেই তাই মনের কথাটি বলেছেন।

–আমি তো পেরায় হপন দেহি। কুনুদিন দেহি পা নাই, কুনুদিন হাত, নাইলে মাতা। বুঝলেন নি, এট্টা এট্টা করি শইলের কলকব্জা নাই হয় আর আমি দেইখ্যা আমোদ পাই।

–বলিস কিরে? আমোদ হয়?

–দ্যাহেন কত্তা, এই শইলের নানা কলকব্জা বহুত দিন খাটাইলাম। এইবার যদি নাই হইয়া যায়, খেতি কী কন?

–সত্যি সত্যি তো আর হচ্ছে না। স্বপ্নে হচ্ছে।

–হ। আমিও হেইডাই ভাবতাম। এহন দেহি সত্যই আমার হাত পা মাতা বুক প্যাট কিচ্চু নাই।

–আর এই যেসব আমি দেখছি এগুলো তাহলে কার? মজা পেয়ে বলেন সমীরবাবু।

–ভগায় জানে। তয় মনে লয় এগুলান আমার শইলে নাই।

বিস্ময়ে হাঁ করে সমীর তাকিয়ে থাকেন নাড়ুর দিকে।

–তা ছাড়ান দ্যান আমার কতা। আপনের যে ডাইন পা আর বাম চুখ খোয়া গেচে, ট্যার পান না? আর আর…

সমীরবাবু তাকিয়ে দেখেন সত্যিই তাঁর ডান পা নেই। বাম চোখে হাত দিয়ে বোঝেন সেখানে একটা গর্ত। এরপর আবিষ্কার করেন তাঁর সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গই ‘নেই’ হয়ে আছে।

–চলেন কত্তা, হাবায় ভাইস্যা পড়ি।

সমীরবাবু আর নাড়ু হাত ধরাধরি করে ভেসে পড়েন হাওয়ায়। ভাসতে ভাসতে দেখেন আরও অসংখ্য মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন অবয়ব হাওয়ায় ভাসছে। তাঁরা দুজনেও অন্যদের ভিড়ে মিশে যান।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত