জুড়ি থেকে গঙ্গা

 

 ডাকে আশৈশব থেকে , সেই পথের মধ্যে চলে নদী দূর্বার ।  মূলাধার থেকে সহস্রার বিরজার নদীর পাড়ে পাড়েই তো পরিভ্রমণ । যাত্রা শুরু কোন শৈশবে , পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘপথ । গন্তব্য  কোথায় জানা নেই । জন্ম থেকে জন্মান্তর , এঘর থেকে ওঘর ।মনপাখি হরবোলা । এই গাছ থেকে ওই গাছ । বিষয় থেকে বিষয়ান্তর নিয়ত ওড়ে বেড়ায় । এক জায়গায় কিন্ত সে স্থির যখন ডানা মেলে ওড়ে বেড়ায় দেশ বিদেশ । মন যে সুযোগসন্ধানী । মন যে জলনামা । কুশিয়ারা থেকে গঙ্গা , জুড়ি  গাঙ থেকে বরলোহিত । মন কেবল ওড়ে বসে এগাছ থেকে ওগাছ । বারিধারা বুক বেয়ে নামে । বুকের জল না নয়নজল ? তৃষার্ত হলেই মুখ ডুবাও প্রবাহিনীর হৃদমাঝারে ।

আরে এ কোন্ সুন্দরী কন্যা জল ভরে মনের কুতূহলে দেওছড়ার জুড়ি গাঙ্গের কোমল শীতলতায়  ?জলদর্পণে কন্যা দেখে আপন মুখ । এমুখে উঁকি দেয় অন্য কোন মুখ ? জুড়ি গাঙ্গের বনকুমারী আজও প্রহর গুণে আপন দয়িতের আসমান চাঁদের জ্যোৎস্নায় ।   আমি দেখেনি তাঁর বদনশ্রী , কিন্তু দেখেছি তাঁর প্রতীক্ষা ।  দীঘল চুল এলিয়ে আকাশের পরী জলমুকুরে খোঁজে বেড়ায় প্রিয়তমের বদনসুধা । ধর্মনগরের পাশ ঘেঁষে ছোট নদী জুড়ি  । হয়তো একদা ঝোরা ছিল , প্রবল স্রোতের টানে পাড় ভেঙে ঝোরা আজ বহমান নদী জুড়ি  । তার তীরে বাস করে এক বনকুমারী , জ্যোৎস্না লাঞ্ছিত মুখছবি তাঁর, হৃদয়ে বাস করে এক শর্বরী সাধিকা । উন্মুক্ত দীঘল কালো কেশে দেওছড়ার আকাশ ঢেকে রেখেছে । আজন্ম ব্রহ্মচারিণী ব্রহ্মবাদিনী  স্বল্পক্ষর ।   ত্তরোত্তীর্ণা  বালিকাটি জুড়ি গাঙ্গের কোলে বসে নুইয়ে পরা বাঁশের কচি ডালের সঙ্গে এক্কা দুক্কা খেলে আর গুণ গুণ করে সুর ভাঁজে , ‘ প্রেমের  মর্ম কথা ভবে নাহি মিলে শ্রোতা …’। দুচোখে নদী বহে যায় । দুটি গাঙ জন্ম পায় তাঁর নয়ন জলে । সূর্য রশ্মি গায়ে মেখে কোন জাদুকর ডাক দিয়েছিল নিশুতি রাতে ।  চাঁদ চাঁদ কন্যাটির শরীর বেয়ে নেমে এসেছিল খরস্রোতা নদী । সেই নদীতে ডুব সাঁতার খেলতে খেলতে কন্যা হারিয়ে ফেলেছিল কালাকাল । এক নিপুণ বাঁশিওয়ালা ডাক দিয়েছিল , ‘সখি আয় গো নামি জলে , শোন গো সখি বসনখানি রাখনা তীরে ফেলে’। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে মুগ্ধা কিশোরী কিনেছিল আজীবনের কালকূট বিষ ।

দয়িত চলে গেল আসমানের দেশে । বলে গেল , অবশ্যই আসব । নিয়ে যাবো তোমায় সহরে । আমার আঙিনায় । কন্যা বিশ্বাস করে ,- আসবে সে আসবে । হিরণ্যগর্ভ পুরুষ  অবশ্যই আসবে ।

সরল প্রতীক্ষায় কন্যা আজও প্রহর গুণে স্বপ্ন পুরুষের ।  দুচোখে দুটি নদীর জন্ম দেয় কুমারী । সেই নদীর জলে খোলা চুলে  আত্মমুখ খোঁজে বনকুমারী । চাঁদ সুরজ একাকার হয় জুড়ি গাঙ্গের পাড়ে ।  

জুড়ি গাঙ্গের বনকুমারীর ডেরা ছেড়ে মন ওড়ে চলে হরিদ্বারের পথে । পথে পথে ঘর , ঘরে ঘরে নারী নদী হয় । সেই নদীর তীরে বসত বাঁধে আউল বাউল  দরবেশ মুসাফির । কে যেন হাঁক পাড়ল , ওরে মন ডেরা ডাণ্ডা উঠাও ভেসে চলো উজান স্রোতে । ঘুরে ঘুরে হরিদ্বার । কেন আসা হয় বারবার ? কিসের সন্ধানে ? মানুষের মেলা দেখতে ? ধর্ম অধর্ম দুইই পায়ের নুপূর । পরলেই বাজে ঝমঝমাঝম  । তাই নুপুর পরি না ! তবে ঘরের বন্ধন ছেড়ে বারবার পাগলা মন হরিদ্বার আসে কেন ? ধর্ম অধর্মের বালাই ঘুচেছে বহুদিন । কিন্তু মানুষ দেখার নেশা দিনদিন বাড়ছে বই কমছে কোথায় । ঘরের চারদেয়াল খুলে দিয়েছে যাবতীয় আগল । বেরিয়ে পর দেখি মানুষ দেখতে । জনপথ পেরিয়ে জল উসবের উন্মাদনা দেখতে এপার থেকে ওপার ছুটে চলা । জল নাকি জীবনের অপর নাম ।গঙ্গা থেকে কুশিয়ারা পদ্মা থেকে মেঘনা বিদ্যুত বেগে ছুটে চলছে জীবন তার দয়িতের সন্ধানে । নদী তোমার নাম কী । হরিদ্বারের প্রবাহিনী কুল কুল হাসে । বুকের ভেতর সোহাগে সোহাগ ঝরায় । ফিসফিসে বলে কুশিয়ারা কুশিয়ারা । বুদ্ধি চেতনা ধমকে বলে যত মিথ্যে বুলি । এর নাম অলকানন্দা । কিংবা গঙ্গা নামেও ডেকেছিল কেউ কেউ । ভাগীরথীকে জটা থেকে নামিয়ে বইয়ে দিতে গিয়ে শিব বলেছিল গঙ্গা তুমি গঙ্গা । নদী ছাড়া জীবন কোথায় ? নদী ছাড়া জনপদ কোথায় । জনপথ ছাড়া সভ্যতা কোথায় ? জল না হলে কৃষি নেই । বিদ্যুত নেই । গাছ লতা পাতা নেই । সভ্যতার বিকাশ নেই । নদীর তীরে তীরেই বসতি পত্তন হয়েছে নগর বন্দর সহর গ্রাম ফ্যাক্টরি আর ধর্মবোধের। ধর্মের মোড়কে নদীকে বেঁধে দিয়েছে আর্য ঋষি । নদী কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তীর্থ ক্ষেত্রগুলি ।

নদী এখানে পূজিতা মাতৃমহিমায় । জীবন দায়িনী গঙ্গা । চন্দ্রবংশী রাজা ভগীরথ হিমালয়ের দুর্গম পার্বত্য গুহা থেকে এই পর্বত কন্যাকে মুক্তি দেন । এই মানুষের সাগরেও রয়েছে এক নদী নারীর কাহিনি ।
দিনরাত এক এখানে । মানুষ এখানে অকথা বলে কথার সাথে রাতভর । মহাভারতের শান্তি পর্বে পিতামহ ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলে ছিলেন পৃথিবীতে ধর্মবণিকদের সংখ্যা বেশি । এঁরা ধর্মটা বোঝে না । ধর্মের বাণিজ্য করে । এঁদের থেকে দূরে থেকো । 
কথাটা মহাভারতের আমলেও তাহলে প্রযোজ্য ছিল । অথচ মহাভারত নিয়েই কত তুগলকী ধর্মযুদ্ধ । 
যাক যাক রসাতলে উন্মাদনা । ফিরে আসি জলকেলিতে । ফিরে আসি অনার্য রমণীর অমর প্রেমগাথায় ।  নীলনদ থেকে সিন্ধুনদ । জীবননদীর আয়ুরেখা ওই তটে তটে । আর্যবর্তের গিরিপথ ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছিল আর্যরা লুটেরার বেশে । এক হাতে জ্ঞান অন্য হাতে তরোয়াল । উন্নত যুদ্ধকৌশল আর বেগবান অশ্বারোহীদের আটকাতে পারে নি পাহাড়িয়া সরল নিরীহ বর্শাধারীরা । গতির কাছে হেরে গেল প্রকৃতির সন্তান । কিন্তু এত সহজে আর্যদের বিজয় করায়ত্ত হয় নি । অনার্য ভূমিজ পুত্ররা দুর্বার গতিতে রুখে দিয়েছিল আর্য বিজয়রথ । দীর্ঘকাল লেগেছে আর্য অনার্য সন্ধি হতে । একদিকে জয় শিয়ারাম তো অন্যদিকে হর হর মহাদেব । পাহাড় গিরিখাতের অবিসংবাদিত ধর্মদেব মহাদেব । পূর্ব থেকে উত্তর ভারত গোটা হিমালয় পর্বত জুড়ে হর হর মহাদেব ধ্বনি । পর্বতকন্যা পার্বতী ও কৈলাশ অধিপতির জনপ্রিয়তা ও পরাক্রমের কাছে আর্য বহুলাংশে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল । বিস্তর লোকক্ষয় ধনক্ষয়ের পর আর্য সাম্রাজ্যবাদীদের রণকৌশল পাল্টে গেল । বিয়ে ও প্রেমকে হাতিয়ার করেন আর্যরা ।  আর্যদের নেতা শান্তনু প্রেমে পড়েন পর্বত কন্যা রূপসী গঙ্গার । গঙ্গার জলতরঙ্গের ঝিলিমিলি ঢেউ খেলে শান্তনুর বুকে । পর্বতের খাঁজে খাঁজে নেচে নেচে তরতরিয়ে নামছিল চঞ্চলা দুরন্ত কিশোরী । অপূর্ব সুন্দরী কন্যার রূপ তরঙ্গে হস্তিনাপুরের সম্রাট শান্তনু বহে গেল জন্মের মতো । রাজ অন্তপুরে আর্যরাজ্ঞীর অভাব নেই , কিন্তু রানীরা পুত্রবতী নন কেহ-ই । মৃগয়া শৌখিন রাজা নিজেই শিকার হয়ে গেলেন কিশোরী গঙ্গার চপল কটাক্ষে । বিশুদ্ধ আর্য পুরুষের বাহু বন্ধনে ধরা দিলেন গঙ্গা । সর্ত রাখলেন যেদিন প্রেম গৌরব হারাবে সেদিন গঙ্গা চলে আসবেন চিরতরে । কামাতুর শান্তনু এক স্বাধীনচেতা স্বাভিমানী পাহাড়িয়া দূর্বার কন্যাকে ঘরের বাঁধনে বাঁধতে চাইলেন । ঘরে এলো মেয়ে । এক স্বাধীন প্রাণচঞ্চলা কিশোরী । গঙ্গা ! গঙ্গা শান্তনু ডাকে গদগদ কণ্ঠে । সাড়া দেয় গঙ্গা । ধরা দেয় প্রেমাতুর রাজার বাহুবন্ধনে । মিলন হয় আর্য – অনার্যের ।

 সেই মিলনে সূত্রপাত হয় মহাভারতের । শান্তনু গঙ্গা মিলনে পৃথিবী পেল অনাদিকালের শীর্ষ পুরুষ আজন্ম ব্রহ্মচারী সত্যদ্রষ্টা চিরত্যাগী চিরবঞ্চিত প্রাজ্ঞ স্থির প্রতিজ্ঞ এক পিতামহ । গঙ্গাপুত্র দেবব্রত ভীষ্ম । 

এই হরিদ্বার সেই মিলনের সাক্ষ্য বহন করে আজো । ধর্ম বণিকদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে কিছু  যাযাবর করে আজও বিতর্কিত প্রেমের সুলুক সন্ধান । অনেকেই বলেন গঙ্গা চঞ্চলা , তিনি প্রেমিক স্বামী শান্তনুকে সামান্য কারণে ত্যাগ করেছেন । আসলে ইতিহাস বলে অন্যকথা ।

 রাজনীতির বলি হল গঙ্গা ও তাঁর পুত্ররা । জন্ম মাত্র অজ্ঞাত গুপ্তচর জানায় গঙ্গা মৃত বৎসা  নিস্পাপ কন্যা বিশ্বাস করে সে মৃত পুত্রের জন্ম দান করেছে । কিন্তু প্রতিবার ?   রাজ অন্তপুরচারী আর্য চক্রান্ত টের পেতে পেতে গঙ্গা হারালো তাঁর সাতপুত্রকে ।  অর্নায কন্যার পুত্রকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার দেবে না । তাই সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুদের জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলা হয় । গঙ্গা টের পেলেন বড় দেরিতে । ইতিমধ্যে তাঁর সাতটি পুত্র বিনষ্ট হয়েছে । অষ্টম গর্ভের সূচনা হতেই পিতৃগৃহ থেকে ধাই নিয়ে আসেন । সন্তান ভূমিষ্ঠ হতেই ধাইমার সহযোগে শিশুপুত্র নিয়ে গঙ্গা পালিয়ে যান পর্বত গুহায় । রাজনৈতিক ওই মেকি রাজকীয় প্রেমের বন্ধন ছিন্ন করে অষ্টম সন্তানের জন্মের পরে অন্তঃপুরের রাজনীতি থেকে পুত্রকে বাঁচাতে গঙ্গা ফিরে গিয়েছিলেন পিতৃগৃহে । আর্য অন্তঃপুরে গঙ্গার অষ্টম পুত্রও আতুরঘরেই মৃত বলে ঘোষিত হয় ।
সেই পুত্র মায়ের কাছে শিক্ষা লাভ করেন । অস্ত্র থেকে জ্ঞান, সত্য থেকে বিজ্ঞান গঙ্গা পুত্রকে একজন বীরযোদ্ধা জ্ঞানী প্রজ্ঞাবান সত্যদ্রষ্টা ত্রিকালজ্ঞ রূপে শিক্ষিত করে তোলেন । আর দেবব্রতের ষোল বছর বয়সে মাতৃহৃদয়ে আগলবেঁধে গঙ্গা পুত্রকে পিতা শান্তনুর হস্তে প্রদান করেন । কিন্তু ষড়যন্ত্রের আতুরঘরে আর ফিরে যান নি । আর ইতিহাস জানে গঙ্গা পুত্র ভীষ্ম কখনও হস্তিনাপুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকার পান নি । গঙ্গাপুত্র চিরবঞ্চিত থেকে গেছে আজীবন ।


হিমালয়ের  পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে  এইসব কথারা ছড়িয়ে আছে অনাদিকাল থেকে । মন্দাকিনী অলকানন্দা ভাগিরথী কিংবা গঙ্গা সুন্দরী কল্লোলিনী বহে চলে উসবে ব্যসনে আসনে পতিতপাবনী হয়ে তাঁর অনাদি দুঃখ হৃদয়ে চাপা রেখে ।  

জুড়ি গাঙের সুন্দরী নদীর জলে পা ডুবিয়ে একবার আকাশ ও ধরিত্রীর মিলন চিত্র আঁকে প্রবাহিত জলকল্লোলে । তাঁর দুই গাল বেয়ে গঙ্গা যমুনা জুড়ির জলে মিশে যায় ।

জুড়ি গাঙের তীরে বসে বিরহিনী ক্রমশ শ্রীরাধা হয়ে যায় । ভাগ্যবঞ্চিতা রোদনবেথুলা রাধা । যমুনা আর জুড়ি  । আজও ঝুরে অঝরে …।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত