Site icon ইরাবতী

ভারত গৌরব জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা (পর্ব-১) । বাসুদেব দাস

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,jyoti-prasad-agarwala-part-17
Reading Time: 4 minutes

কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

              

            অসমিয়া সংস্কৃতির যোগ্য প্রতিনিধি জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়াল অসমকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেন নি, বরং তাঁর বিশ্বপ্রেম ছিল অসম প্রেমেরই উত্তরণ।তাঁকে আমরা সহজেই বিদ্রোহী কবি নজরুলের সঙ্গে একাসনে বসাতে পারি।রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আদর্শের কথা বলতে গিয়ে জ্যোতিপ্রসাদের লেখনীতে ফুটে উঠেছে এক অপূর্ব সমন্বয়ের সুর-

            ‘আমি শিল্পী আমিই ব্যক্তি

                          সমষ্টিতে আমি

            ব্যক্তিত্বের সীমা ভেঙ্গে

আঁধারের বক্ষভেদি

নিয়ে যাই জনতাকে আলোর দিকে।’

            তিনি ছিলেন আলোর পথের যাত্রী। বিশ্বসংস্কৃতির পূজারী হিসেবে তাঁর মনোভাব ছিল আন্তর্জাতিক। নানা ভাষা,নানা জাতি,বর্ণের মধ্য দিয়ে তিনি শুনতে পেয়েছিলেন বিশ্বজগতের এক অপূর্ব সঙ্গীত। সংস্কৃতি,ভারতীয় ঐতিহ্য,অসমিয়া জাতির পুনরুত্থান এবং তার মাধ্যমে বিশ্বমানবের প্রগতি এবং কল্যাণের শীর্ষে আরোহণ-এই সবগুলির মধ্যেই এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করতে চেয়েছিলেন সুন্দরের পূজারী জ্যোতিপ্রসাদ। প্রগতিবাদী বা জনতার শিল্পী হয়েও তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল।ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে,সাহিত্য,সংস্কৃতি,সঙ্গীত প্রতিটি   ক্ষেত্রেই তার অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। প্রথম অসমিয়া চলচ্চিত্র ‘জয়মতী’১৯৩৫ সনে তৈরি করেন।

            কলকাতার সঙ্গে জ্যোতিপ্রসাদের সম্পর্ক ছিল নিবিড়।কলকাতার  ন্যাশনেল কলেজে আই-এ দ্বিতীয় বর্ষ অবধি পড়াশোনা করেন।কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনায় সমাপ্তি ঘটে।ধনীর দুলাল হয়েও তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ শোষণ এবং বঞ্চনা থেকে মুক্তি লাভ করবে,আলোর পথের যাত্রী হবে তারা।

            জ্যোতিপ্রসাদ তাঁর লেখনীতে যে ভ্রষ্টাচারের কথা বলেছিলেন আজ আমরা সমাজের চারপাশেই তার প্রকাশ দেখতে পাচ্ছি।আজকের রাজনীতি,সমাজনীতি,শিল্পকলা সমস্ত কিছুতেই দুর্নীতি বিরাজমান,পচন ধরে গেছে।এই ভয়াবহ পঙ্গু মানসিক অবস্থা থেকে মুক্তিলাভে জ্যোতিপ্রসাদের চিন্তাধারা যে আমাদের সাহায্য করতে পারে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

            জ্যোতিপ্রসাদ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতোই বিশ্বমানবতার পূজারী।মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সের জীবনে জ্যোতিপ্রসাদ মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে অবদান রেখে গেছেন তা আমাদের মনে শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ের উদ্রেক করে।

            সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অসমের সঙ্গে বাংলার এক নিবিড় সম্পর্ক বহুদিন থেকেই চলে আসছে। অসমিয়া সাহিত্যের পুরোধা লক্ষ্ণীনাথ বেজবরুয়া ছিলেন ঠাকুর বাড়ির জামাই।কলাগুরু বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা সেন্ট বিশপ কলেজে পড়াশোনা করেছেন,নতুন অসমের স্রষ্টা আনন্দরাম বরুয়া,আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন এই কলকাতাতেই উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছিলেন।সবচেয়ে বড় কথা অসমিয়া সাহিত্য চর্চার এক সময়ে আঁতুড়ঘর ছিল এই কলকাতা শহর। প্রমথেশ বরুয়া এবং ভূপেন হাজরিকা অনেকদিন আগেই বাংলার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।

            আজ যখন ধর্ম আর ক্ষুদ্র জাতীয়তার নামে,ভাষার নামে আমাদের চারপাশে একটা দেওয়াল তুলে দেবার চেষ্টা চলছে তখন মনে হয় জ্যোতিপ্রসাদের জীবন চর্চা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হবে। ‘ইরাবতী’ সুস্থ সাহিত্য এবং সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে একটা নতুন মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার যে চেষ্টা করে আসছে তার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। মূলত এই ভাবনা থেকেই   জ্যোতিপ্রসাদের এই ধারাবাহিক জীবনী লিখতে চলেছি।আমরা আশা করব এই প্রয়াস অসমের সঙ্গে বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও গভীর করে তুলবে।নমস্কার।    

(১)

            ইউরোপে নবজাগরণ যুগের প্রতিনিধি স্থানীয় ব্যক্তিদের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখি,তাঁরা ছিলেন একাধারে কবি, শিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, সমরশাস্ত্রবিদ, বৈজ্ঞানিক, অভিযাত্রী, যোদ্ধা ইত্যাদি। অসমের আধুনিক যুগের ইতিহাসে জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালাই একমাত্র ব্যক্তিত্ব-যাঁর জীবনের সাধনা ছিল রেনেসাঁস সুলভ ব্যক্তিত্ব অর্জন করা। জ্যোতিপ্রসাদ ছিলেন রাজনৈ্তিক বিপ্লবী, সাংবাদিক, কবি, গীতিকার, সুরকার, গল্পকার, স্থাপত্যবিদ, নৃ্ত্যশাস্ত্র বিশারদ, চিত্র নির্মাতা, সংস্কৃতিবিদ ও সমাজ সমালোচক। এতগুলি দুর্লভ প্রতিভার সমন্বয় ঘটেছিল বলে জ্যোতিপ্রসাদ অসমিয়া রেনেসাঁসের উজ্জ্বলতম প্রাণপুরুষ বলে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

            অসমের ডিব্রুগড় শহরের তামোলবাড়ি চা বাগানে ১৯০৩ সনের ১৭ জুন জ্যোতিপ্রসাদের জন্ম হয়।পিতা পরমানন্দ আগরওয়ালা এবং মা কিরণময়ী আগরওয়ালা।পিতা পরমানন্দ সেইসময় তেজপুর সমবায় সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ছিলেন।

            জ্যোতিপ্রসাদ তাঁর সুপরিচিত গ্রন্থ ‘জ্যোতি রামায়ণ’ এ নিজের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন-

            ‘তার পাছে শত সেবা লোয়া অগ্রয়াল

            শ্রীমন্ত বংশত মই জনমিলো ভাল।

            অগ্রসেন নৃপতির বংশ পরিয়াল

            কার্যসূত্রে কামরূপে আহি যে ওলাল।

            রাজস্থানর পরা পালেহি আসাম

            সুকুমার অগ্রয়াল নবরঙ্গরাম।

            অসমর শেষ স্বর্গদেবর রাজ্যত

            বণিক লক্ষ্ণীর হাঁহি পরিলে ভাগ্যত।

            সাদরী জীয়ারী রাজখোয়ার ঘরর

            গৃহলক্ষ্ণী পাই থাপে অসমর।

            নতুন যুগের এক নব পরিয়াল

            গমিরি গ্রামত অসমীয়া অগ্রবাল।’

জ্যোতিপ্রসাদের পূর্বপুরুষ নবরঙ্গরাম আগরওয়াল রাজপুতনার পুরুষানুক্রমে অত্যন্ত ধনী বংশের সন্তান ছিলেন। কোনো কারণে একবার সেই বংশের ভাগ্যবিপর্যয় হয়।দেশের জমিদার ঈর্ষান্বিত হয়ে পরিবারের লোকজনের উপরে নানান ভাবে অত্যাচার শুরু করে।এহেন অবস্থায় পরিবারটি ধন সম্পত্তি হারিয়ে নিজের জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়।নবরঙ্গরাম ভাগ্যের অন্বেষণে পশ্চিম থেকে পূবের দিকে যাত্রা করেন। সেই সময় অসমে ব্রহ্মপুত্রের উত্তরপারে দরং জেলার বিশ্বনাথ পর্যন্ত ইংরেজদের রাজত্ব ছিল।বিশ্বনাথে ইংরেজ সরকারের পল্টনের সদর স্থান ছিল।নবরঙ্গরাম কিছুদিন গোয়ালপাড়ায় বাস করে বিশ্বনাথের একটি মাড়োয়াড়ি ফার্মে গোমস্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন।কিছুদিন সেখানে কাজ করার পরে চাকরি ছেড়ে নিজে ব্যবসা শুর করেন। সেখানে সুবিধা করতে না পেরে কিছুদিন পরে বিশ্বনাথ থেকে কুড়ি মাইল দূরে ইংরেজ সরকারের সীমার বাইরে আহোম রাজার অধীন গমিরি গ্রামে চলে আসেন।এই গমিরিতেই তাঁর প্রতি ভাগ্যলক্ষ্ণী প্রসন্ন হয়ে ওঠে।কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর আর্থিক অবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়।অসমে স্থায়ীভাবে বসবাস করার উদ্দেশ্যে গমিরির বিখ্যাত রাজখোয়া পরিবারের মেয়ে সাদরীকে বিয়ে করেন।

            গরিমিতে অত্যন্ত দ্রুত নবরঙ্গরামের উন্নতি হয় এবং কিছুদিনের মধ্যে যথেষ্ট প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেন।এই সময়ে তিনি নিজের গোলার কারবার ছাড়াও রাবারের মহল,হাতির মহলের কারবার করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন।তিনি এরপরে কারবার বৃ্দ্ধি করার জন্য ডিব্রুগড়ে কারবার শুরু করেন এবং ডিব্রুগড়েও কারবারের প্রচুর শ্রীবৃদ্ধি হওয়ায় বিরাট আকার ধারণ করে।

            জ্যোতিপ্রসাদের ঠাকুরদা হরিবিলাস আগরওয়াল ১৮৪২ সনে জন্মগ্রহণ করেন।১৮৫৯-৬০ থেকে উজান অসমে চা-চাষের অভূতপর্ব সম্প্রসারণ শুরু হয়।এরই ফলে হরিবিলাস এবং হরিবিলাস পুত্র চন্দ্রকুমার পরবর্তীকালে যশস্বী চা-ব্যবসায়ী হয়ে উঠেন।এই চন্দ্রকুমার বহুমুখী প্রতিভাধর,প্রতিমা এবং বীণবরাগীর কবি,উনিশ শতকের অসমিয়া সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক,নতুন রমন্যাসধর্মী কাব্যধারার অন্যতম প্রবর্তক।

            এই পরিবারের আরও এজন স্বনামধন্য মানুষ ছিলেন আনন্দচন্দ্র আগরওয়ালা।তিনি অসমের একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক ছিলেন।অসমিয়া ভাষায় তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ লিখেছেন।ইংরেজি থেকে তিনি অনেক বিখ্যাত কবিতা অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেন।লোকেরা তাকে ‘ভাঙনি কোঁয়র’বলতেন।অসমিয়া ভাষায় ‘ভাঙনি’শব্দের অর্থ অনুবাদ।

            হরিবিলাসের পাঁচ ছেলে।তৃতীয়পুত্রের নাম ছিল পরমানন্দ।পরমানন্দের স্ত্রী কিরণময়ী শিবসাগরের মেয়ে। কিরণময়ী ছিলেন বড় সুন্দর স্বভাবের মহিলা।অসমিয়া আইনাম,বিয়ানাম এবং নিচুকণি গীত (ঘুমপাড়ানি গান) কিরণময়ীর মুখে মুখে ঘুরত।জ্যোতিপ্রসাদের পিতা পরমানন্দ খুব সুন্দর বেহালা বাজাতেন। তিনি খুব সুন্দর গানও গাইতেন।এই কিরণময়ীর গর্ভেই জ্যোতিপ্রসাদের জন্ম হয়।  

            পিতা পরমানন্দ সঙ্গীতগুরু লক্ষ্ণীরাম বরুয়ার সহযোগী বেহালাবাদক ছিলেন।সন্তানদের সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী দেখে কলকাতা থেকে একটি ‘অর্গেন’কিনে আনেন।এই অভিনব সঙ্গী্ত যন্ত্রটিকে জ্যোতিপ্রসাদ ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলে মনে করতেন।জ্যোতির বয়স তখন চৌদ্দ অথবা পনেরো।তাঁর মনের গভীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা সুরগুলি যেন এই যন্ত্রের অপেক্ষায় ছিল।এক এক করে বাড়িতে অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বেহালা,বাঁশি,সেতার,খোল চলে এল।১৯১৯ সনে ছাত্র সম্মেলনে সংঘটিত সঙ্গীতের আসরের আখড়ার আয়োজন বাড়িতেই করা হয়েছিল।

  

Exit mobile version