| 3 মার্চ 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প ধারাবাহিক

ভারত গৌরব জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা (পর্ব-১৭) । বাসুদেব দাস

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

       জ্যোতিপ্রসাদ কেবল একটি মাত্র উপন্যাসই লিখেছিলেন।১৯৫০ সনে রচিত উপন্যাসটিও অসম্পূর্ণ। উপন্যাসটির নাম ‘আমার গাঁও’(আমাদের গ্রাম)। উপন্যাসটিতে অসমিয়া গ্রাম্য সমাজের একটি সফল চিত্র তুলে ধরেছেন। গ্রাম্য মানুষের সংস্কার বিমুখ মনের সংঘাত,সমাজের জন্য টাকা খরচ করার পরিবর্তে মাটির নিচে পুঁতে রাখার আনন্দ,ধনী মহাজনদের সাধারণ মানুষকে শোষণ করার বাস্তব চিত্র ইত্যাদি অঙ্কনের মাধ্যমে জ্যোতিপ্রসাদ অসমিয়া গ্রাম্য সমাজকে সার্থকভাবে উপন্যাসটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসটিতে জ্যোতিপ্রসাদের চিন্তার বিবর্তন আমরা লক্ষ্য করি। লেখকের শ্রেণি-চেতনা উপন্যাসের সারবস্তু।

       উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র অভিনব বরুয়া একজন শিল্পী। ফ গান এবং সুরের স্রষ্টা।বহুবছর নিজের প্রতিভার সুরে মাতাল হয়ে বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে তার প্রতিভা বৈচিত্রহীন হয়ে পড়েছে। নতুন নতুন শিল্পীর প্রতিভা তাঁর সৃষ্টিকে পুরোনো এবং বৈচিত্রহীন করে তুলেছে।

       উপন্যাসটিতে অভিনব বরুয়া ছাড়াও কেঞামহাজন,মিশ্র,বনজোনাকী,সরুমন ইত্যাদি চরিত্র রয়েছে। শিশু চরিত্র হিসেবে বনজোনাকী এবং সরুমন বেশ আকর্ষণীয় চরিত্র।সরুমন গ্রামেরই বড় দুঃখী বিধবা মহিলার একমাত্র ছেলে। তার বয়স দশ বছর। পাঠশালায় বনজোনাকীর সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে ‘সরুমনের বাড়িতে দুটোসরুমনের বাড়িতে দুটো গরু , একজোড়া  হালের গরু এবং অল্প একটু জমি আছে। তা দিয়েই কোনোমতে  বছরটা চলে যায়। বনজোনাকীর ভাই নেই, তাই সে সরুমনকে ভাইয়ের মতো ভালোবাসে, স্নেহ করে। পিতা অসুস্থ হওয়ায় বনজোনাকী কেঞা মহাজনের বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ পিতার জন্য একটু দুধ চাইলে প্রত্যাখ্যাত হয়। তখন সরুমন নিজের ভাগের দুধটুকু বনজোনাকীর হাতে তুলে দেয়।সরুমন চরিত্রটি তার নিজের স্বভাব গুণেই সজীব এবং আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে।

উপন্যাসটিতে নীচ এবং ধনী চরিত্র হিসেবে গ্ৰামপ্রধানের চরিত্রটি দেখতে পাই। পিতা  অসুস্থ হওয়ায় বনজোনাকী গ্রাম প্রধানের কাছে সামান্য একটু দুধ চাইতে গেলে গ্রাম প্রধান তাকে মুখ ভেঙ্গিয়ে বলে উঠে–’ বাপ তো দাদাকে বড় মানুষ করার জন্য, হাকিম মুন্সেফ বানানোর জন্য কলেজে পড়িয়েছিল না? এখন দাদা টাকা পাঠিয়ে গরুদুটিকে রক্ষা করতে পারল না?’

গ্রাম প্রধানের দায়িত্ব গ্রামের মানুষের ভালো মন্দ চিন্তা করা। কিন্তু উপন্যাসটিতে আমরা গ্রামপ্রধানের চরম স্বার্থপরতা দেখতে পাই। উপন্যাসটিতে কৃপণ এবং অসামাজিক মানসিকতা থাকা চরিত্র হল বুদুরাম বুড়া। সে টাকা পয়সা খরচা করার পরিবর্তে মাটির নিচে ধন পুঁতে রাখে। আগের দিনে গ্রামের মানুষ ভাবত ছেলে মেয়ে স্কুলে গেলে খারাপ হয়, তারা সামাজিক পরম্পরাকে মানতে চায় না, এই কথাটা উপন্যাসে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।–’ জনগনের কী কী উপকার করেছ হে? তুমি জেলার স্কুলে পড়াশোনা করে নিজের জাত মেরেছ, এখন গ্রামের ছেলে মেয়েদের নষ্ট করার জন্য ওদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠিত করছ। পড়াশোনা করে তারা বাপ-দাদার কথা শুনবে না, চাষবাস করবে না, প্রত্যেকেই বাবু হয়ে ঘুরে বেড়াবে। আমাদের চাষবাস নিয়ে থাকা মানুষদের আবার পড়াশোনার কী দরকার?…’

উপন্যাসটিতে জ্যোতিপ্রসাদের জীবনের শেষের দিকের পরিবর্তিত রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাসটিতে মিশ্র রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। সাম্যবাদী মতাদর্শের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও সমাজমুখী সাংগঠনিক আদর্শের প্রতিও জ‍্যোতি প্রসাদের আস্থা প্রকাশ পেয়েছে। তাই অভিনব বরুয়া পিছিয়ে পড়া গ্রামাঞ্চলে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তোলা কাজে ব্রতী হয়েছে। এই আদর্শ ছিল গান্ধীর স্বরাজ আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত।

অবশেষে আমরা এই কথা বলতে পারি যে জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা কম সংখ্যক চরিত্রের মধ্য দিয়ে অসমের সামাজিক রাজনৈতিক এবং অর্থনীতির দিকের একটি চিত্র উপন্যাসটিতে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রই কম বেশি পরিমাণে সজীব। কিন্তু উপন্যাসটি অসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য চরিত্রগুলি নিজ নিজ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে বিস্তার লাভ করার সুযোগ পায়নি।


আরো পড়ুন: ভারত গৌরব জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা (পর্ব-১৬)


জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার নামে যে সমস্ত প্রবন্ধ পাওয়া যায় সেগুলি তিনি বিভিন্ন সভা–সমিতি,অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণের লিখিত রূপ। তিনি লিখবেন বলেই কোনো ধরনের প্রবন্ধ সেভাবে লেখেননি। সে যাই হোক না কেন জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার প্রবন্ধ গুলি গতিশীল, অযথা অলংকারের দ্বারা ভারাক্রান্ত নয়। তাছাড়া তিনি প্রবন্ধগুলিতে আবেগের চেয়ে যুক্তিকে বেশি প্রাধান্য দান করেছেন।

জ্যোতিপ্রসাদের অনেক প্রবন্ধ জীবনী ভিত্তিক।’ মহাত্মা গান্ধীর জীবন স্মৃতি’,’ চন্দ্র কুমার আগরওয়ালা( প্রথম খন্ড)’,’ বেজবরুয়ার সাহিত্য প্রতিভা’,’ তরুণ তর্পণ’,’ রবীন্দ্র স্মরণ’,’ ডাঙরীয়া হরি বিলাস আগরওয়ালা’,’ পরলোকগত স্বর্গীয় আনন্দ চন্দ্র আগরওয়ালা ইত্যাদি প্রবন্ধকে জীবনী ভিত্তিক প্রবন্ধের আওতায়  ধরা যেতে পারে। এই প্রবন্ধগুলিতে আলোচ্য মহান ব্যক্তিদের জীবন আলোচিত হয়েছে। তারা দেশের জন্য কী কী কাজ করেছিলেন সেইসব এই প্রবন্ধগুলিতে সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে।

জ্যোতিপ্রসাদ’ শিল্পীর পৃথিবী’,’ পোহর লৈ'( আলোর দিকে),’ নতুন দিনের কৃষ্টি’,’ নতুনের পূজা’,’ ভাবীকালের সংস্কৃতি’,’ অসমীয়া সংস্কৃতি’,’ অসমীয়া স্থাপত্যের নবরুপ’ ইত্যাদি প্রবন্ধে অসমিয়া সভ্যতা, কৃষ্টি- সংস্কৃতির স্বরূপ তুলে ধরেছেন। জ্যোতিপ্রসাদের মতে সংস্কৃতি হল সুন্দরের পূজা।

      

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত