| 2 মার্চ 2024
Categories
সময়ের ডায়েরি

স্মৃতিতে ধান কাটার মৌসুম

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

১৯৮৩ আথবা ১৯৮৪ সালের কথা। বর্ষা সেবার একটু আগেই শুরু হয়েছিলো। টানা বৃষ্টিতে মাঠ ঘাট থৈ থৈ। কৃষকের ক্ষেতের পাকা ধান ডুবে যাচ্ছে কাটার আগেই। হঠাৎ টানা বৃষ্টিতে সবাই দিশেহারা। পড়িমড়ি করে পাকা, আধ-পাকা ধান কেটে আনছে সবাই।ধান কাটা তো হল, শুকানো হবে কিভাবে।বৃষ্টি থামার কোন নাম নিশানা নেই যে!

আমাদের সকল জমিই গ্রামের কাকাদের কাছে বর্গা দেওয়া। তাদের অধিকাংশেরই আর্থিক অবস্থা ভালনা। তো, বৃষ্টির আগে যে ক্ষেতের ধান কাটা হয়েছিলো, তারা বাবাকে এসে বলে গেছেন, দাদা ধান তো কেটেছি। তো আমার ভাগ দিলে না যে? কাকাদের উত্তর ছিলো দাদা, আপনার গোলায় তো এখনো গত বছরের ধান আছে। আমরা আগে খেয়ে বাঁচি। পরের ক্ষেত কাটলে আপনাকে দিয়ে যাবো। বাবা শুধু বলতো দেখো ভুলে যেয়ো না আবার! ব্যাস, কাকারা নিশ্চিন্ত হয়ে চলে যেত।

কিন্তু, মজাটা হল তখন, যখন টানা বৃষ্টিতে মাঠ ডুবে যাচ্ছে বলে বাধ্য হয়ে তাদের ক্ষেতের পাকা, আধ- পাকা ভেজা ধান কেটে আনতে হল। এবার বর্গাদার কাকারা এখান থেকে আর তাদের অংশ রাখলেন না।পুরোটাই আমাদের বাড়িতে।

ধান যখন আসতো সে এক অন্য রকম মজা।একে তো নতুন ধানের গন্ধেই মন খুশিতে নেচে উঠে! তার উপর কাকা কি যে মনোযোগ দিয়ে দাড়িপাল্লা নিয়ে এই মনকে মন ধান মাপতেন এক বিশেষ কৌশলে!  একে এক, একে দুই, দুয়ে দুই, দুয়ে তিন…। ছন্দে ছন্দে, তালে তালে।

আমরা ভাই বোনেরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম।গুনতে চেষ্টা করতাম, এক সময় খেই হারিয়ে ফেলতাম। তো, এত ধান৷ সব ভেজা। বাবার তো মাথায় হাত। কোথায় রাখবে, কিভাবে শুকানো হবে, ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে! শিকড় গজিয়ে যাচ্ছে, ভেজা গন্ধের সাথে যুক্ত হল একটি বোটকা গন্ধ। শোবার ঘরের মেঝেতে টিন বিছিয়ে ধান রাখা হল। এভাবে তিন থাকে। তাও তো কুলোচ্ছেনা। এবার?

আমাদের যে পশ্চিম ঘর ছিলো, যেখানে অনাথ কাকা আর কাকীমা তাদের ছোট ছেলে বিমলকে নিয়ে থাকতেন (তাদের বাড়ি ছিলোনা বলে বাবা এই ঘরের এক অংশে থাকতে দিয়েছিলেন), সেই ঘরেও একইভাবে ধান রাখা হল। বৃষ্টি থামার নাম নেই। সকালে ধরে তো বিকেলে আবার নামে। রোদও উঠেনা, উঠোন ও শুকোয়না।

আমাদের বাড়িতে ধানের সময় আশেপাশের গ্রামের তিন চারজন মেয়ে থাকতো ধান সেদ্ধ, শুকানোসহ যাবতীয় কাজে মাকে সাহায্য করার জন্য। তারা ঘুমাতো এই পশ্চিম ঘরে। বারান্দায় ঢেঁকি। একদিকে ধান সেদ্ধ, শুকানো, চাল করা সব হত এই সময়ে।সারা বছরের প্র‍য়োজনীয় চাল এই সময়েই করা হত। বাকিটা শুকিয়ে উঠতো বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি বড় বড় ডোল আর ব্যারে।এক একটি ডোলে পঞ্চাশ ষাট মন ধান ধরতো। আর ব্যারে? আমার জানা নেই। অত বড় ব্যার! সে হিসেবে আমাদের দরকার ছিলোনা। আমরা তো সারাদিন এই ভাজা ধান নিয়ে খেলি।

গ্রামে শিকর বের হওয়া ধান শুকিয়ে ঢেঁকিতে কুটে তার গুড়া দিয়ে দুধের সাথে একটি বিশেষ খাবার তৈরি হত। নাম পাচই। একটু টক টক পচা পচা গন্ধ খানিকটা। এই মৌসুমে নতুন জামাইকে আদর করে খাওয়ানো হতো এই বিশেষ খাবার। তো, অনেকেই আমাদের বাড়ির সেই শিকড় গজানো ধান নিয়ে গেলো। তা আর কতটুকু হবে? দশ সের? (তখন কেজির মাপ শুরু হয়নি)। তার বেশি তো আর না। মনকে মন ধান কি হবে? সবই তো শিকর বের হয়ে যাচ্ছে! যে দিদিরা আমাদের বাড়িতে মাকে সাহায্যের জন্য থাকতো তখন তারা বলতো, ইস! যদি একদিন রোদ উঠতো, রোদে শুকিয়ে কত্ত না পাচই রান্ধা যেতো! আহা! কেন যে রোদের টিকিটিও দেখা যায়না।

সেবার পশিম ঘরের সেই টিনের উপরে রাখা ধানের উপর চট বিছিয়ে সেই গ্রামের দিদিদের সাথে আমি আর আমার বড় বোনও রাতে ঘুমিয়েছি আর পাচই খাওয়ার স্বপ্ন দেখেছি ঘুমের মধ্যে। বাস্তবে তখনো সেই বিশেষ খাবারটির স্বাদ জানতাম না। মা কখনোই এটি রান্না করেনি। কিন্তু, ওই যে স্বপ্নে খেয়ে স্বাদ আস্বাদন করেছিলাম, তার প্রমাণ পেয়েছিলাম অনেক বছর পর ছলিম ভাইদের বাড়িতে পাচই খেয়ে। ছলিম ভাইয়ের বড় মেয়ে নাজমার বর আসা উপলক্ষ্যে এটি অনেক যত্নে ভাবী রান্না করেছিলো। আর আমিও সুযোগ পেয়ে তার স্বাদ গ্রহণ করে ধন্য হয়েছিলাম।

আহা! গ্রামের সেই দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেত কি আর এখন আছে? যাওয়া হয়না অনেক বছর। গ্রামে লোক সংখ্যা বেড়েছে, গ্রাম বিস্তৃত হয়েছে। ফসলের ক্ষেত দখল করে নতুন ঘর উঠেছে। কমেছে ফসলের ক্ষেত, কমেছে মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, সহমর্মীতা। আর? আর বেড়েছে বিদ্বেষ, হিংসা, প্রকৃতির প্রতি শোষণ।

এখন ধান কাটার মৌসুম চলছে গ্রামে। খুব মনে পড়ছে সেই সময়গুলোকে, সেই সময়ের মানুষগুলোকে, হারিয়ে যাওয়া বাবাকে, আর ছোটবেলার ছোট ছোট অনুভূতিগুলোকে।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত