কাজুও ইশিগুরো’র গল্প পারিবারিক রাতের খাবার

।।ভাষান্তর : মনির তালুকদার।।

জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপক‚লে ফুগু নামের একপ্রকার মাছ পাওয়া যায়। আমার জীবনে এই মাছের একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে: আমার মা ওই ফুগু মাছ খেয়ে মারা যান। এই মাছের যৌন লালাগ্রন্থির হালকা পদার্র থলের মধ্যে বিশ থাকে। মাছ কেটে তৈরি করার সময় সতকর্তার সঙ্গে ওই থলে ফেলে দিতে হয় অবশ্যই। তা না হলে খাবারের সঙ্গে মিশে গেলে বিষক্রিয়া অনিবার্য। আগে থেকে বলাও মুশকিল, ঠিকমতো থলে অপসারিত হলো কি-না। সেটা খাওয়ার সময় বোঝা যাবে। এর আগে নয়।

ফুগু মাছের বিষক্রিয়া অত্যন্ত ভয়ানক, সব সময়ই বিপজ্জনক। মাছ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষক্রিয়া শুরু হয় না। রাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ঘুমের মধ্যে শুরু হয় প্রচন্ড জ্বালা-যন্ত্রণা। সেক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি সারারাত যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে গড়াগড়ি যায়। তবে ভোরেরদিকে তার মৃত্যু অবশ্যই অবধারিত হয়ে ওঠে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপানে ওই মাছের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। রান্না করার আগে এতসব ঝামেলা না থাকলে এত নিয়মকানুন মানতে না হলে নিজের রান্নাঘরে বসে মাছের নাড়িভুড়ি ফেলে ওই রান্না করে প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবদের টেবিলে বসানোর জন্য ওই মাছ খুবই ফ্যাশনেবলও হতে পারতো।

মা মারা যাওয়ার সময় আমি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোনির্য়ায় ছিলাম। সে সময় মা-বাবার সঙ্গে আমার সম্পকের্র টানাপড়েন চলছিল। মা মারা যাওয়ার আগে-পরের ঘটনার বিস্তারিত কিছু আমার জানা ছিল না। দুই বছর পর টোকিওতে আসার পর সব বিস্তারিত শুনেছি। মা সব সময় ফুগু মাছ খাওয়া এড়িয়ে যেতেন। সে সময় মায়ের স্কুলজীবনের এক বান্ধবী নিমন্ত্রণ করেছিলেন। মা তাকে নিরাশ করতে চাননি বলেই ফুগু মাছের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন। বিমানবন্দর থেকে কামাকুরা শহরে আমাদের বাড়িতে যাওয়ার পথে বাবার কাছ থেকে এমনটিই শুনেছিলাম। আমরা যখন বাড়িতে পেঁৗছলাম, তখন শরতের রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের শেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। চা খাওয়ার রুমে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, বিমানে কিছু খেয়েছিলে?

হালকা নাশতা দিয়েছিল।

ও, তাহলে তো তুমি ক্ষুধাতর্। ঠিক আছে, কিকুকো এলেই আমরা খাওয়া-দাওয়া সেরে নেব।

বাবার চেহারায় একটা কঠিন ভাব ছিল, শক্ত চোয়াল, ঘন কালো ভ্রু। অনেকটা চৌ এনলাইয়ের মতো। অবশ্য বাবা হয়তো এ রকম সাদৃশ্য কখনোই মনে করেননি। বাবার পরিবারের পূবর্সূরিদের চেহারায় আসল সামুরাই রক্তের ধারা বহমান। আজকের আলাপের মুহূর্তে যেরকম মনে হলো, বাবার এ রকম নমনীয় চেহারা আগে কখনো দেখিনি। ছোটবেলার কথা মনে আছে। বাবা আমাকে খুব শাসনে রাখতেন। বকবক করার অপরাধে বাবা আমাকে বেশ কয়েকবার মেরেছিলেন। বিমানবন্দর থেকে বাড়িতে আসা পযর্ন্ত আমাদের আলাপ মোটামুটি থেমে থেমেই চলছিল। দু-চারটি কথা বলার পর আবার একটুখানি নীরবতা এ রকমই চলেছিল।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর বললাম, তোমার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানটা বসে যাওয়ার কথা শোনার পর থেকে আমার খুব খারাপ লেগেছে। আমার কথার সঙ্গে বাবা গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন।

আসলে ঘটনার শেষ এখানেই নয়। এই বিপযর্য় সহ্য করতে না পেরে ওয়াতানাবে আত্মহত্যা করেন। এই কলঙ্করেখা মুখে লেপে তিনি আর বেঁচে থাকতে চাননি। আমরা সতেরো বছর এক সঙ্গে ব্যবসা করেছি। আমি ওর সততাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতামÑ বললেন আমার বাবা।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি আবার ব্যবসা শুরু করবে নাকি?

আমি তো এখন অবসরেই চলে গেছি। নতুন কোনো ব্যবসার ঝামেলা আর আমার সহ্য হবে না। ব্যবসাপাতির ধরনও অনেকটা বদলে গেছে।আগের মতো আর নেই।বলতে গেলে অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। বিদেশিদের সঙ্গে ওঠাবসা, তাদের মন-মজির্মাফিক কাজ করা আমার আর হয়ে উঠবে না।

ওয়াতানাবেরও এসব পছন্দ ছিল না। খুবই আদশর্ ও নীতিবান লোক ছিলেন তিনি। বাবা দীঘর্শ্বাস ফেললেন।

বারান্দার যেখানে আমরা বসেছি, সেখান থেকে বাগান দেখা যায়। বাগানের সেই পুরনো কুয়োটা এখনো আছে। ছোটবেলায় ভাবতাম, ওখানে ভ‚তের আনাগোনা আছে। সূর্য নেমে আসায় ঘন ছায়ার আড়ালে পড়ে গেছে অনেকটা অংশ।

বাবা বললেন, তুমি ফিরে এসেছো ভেবে খুব স্বস্তি লাগছে। আশা করি এবার খুব তাড়াতাড়ি চলে যাবে না।

পরিকল্পনা এখনো ঠিক করতে পারিনি। কী করব, কী হবে, কিছু বুঝতে পারছি না।

অতীতে যা হয়েছে। তা আর এখন স্মরণ করে কী হবে। তোমার মাও খুব ভেঙে পড়েছিলেন।তোমাকে চিন্তা করতে করতে। তুমি আরো আগে এলে।আমরা তোমাকে সাদরে, মহাযত্নে বুকে টনে নিতাম।

বাবা, তোমার সহানুভূতির কথা বুঝতে পারি। তবে খুব তাড়াতাড়িই চলে যাব, এমন কিছু নাও হতে পারে। অবশ্য পরিকল্পনা এখনো ঠিক করিনি। হাতে আমার অনেকটা সময় আছে।

বাবা আবার বললেন, আমরা জানি তোমার মনে কোনো দোষ ছিল না। হয়তো অন্যদের কথায় তোমার মন বদলে গিয়ে থাকবে। এরকম ঘটনা।অনেকের জীবনেই হয়তো ঘটে থাকে।

বাবা, তুমিই তো বললে, আমাদের ওসব ঘটনা ভুলে যাওয়া দরকার।

আচ্ছা।ঠিক আছে। তা তুমি আরেকটু চা খাবে?

ঠিক তখন নারী কণ্ঠের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম। কে যেন আসতেছে।

বাবা উঠে দাঁড়ালেন। ওই তো অবশেষে কিকুকো এলো।

কিকুকো আমার ছোটবোন। কিকুকো এবং আমার মধ্যে বয়সের তফাৎ থাকলেও আমাদের মধ্যে বেশ অন্তরঙ্গতা ছিল। এতদিন পর আমাকে দেখে বেশ কিছুক্ষণ সে কিছুই বলতে পারলো না।

তবে শুধু ভয় আর উত্তেজনা মেশানো চমৎকার হাসি হাসল। বাবা ওকে ওসাকা সম্পকের্, ওর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পকের্ জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে সব সামলে নিলো। বাবার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে আমাকেও এটা-ওটা নানা বিষয়ে জিজ্ঞেস করল। তবে সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হয়তো ওর ভয় ছিল, না জানি কোনো অনাহূত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কিছুক্ষণ পর ওইসবও থেমে গেল। তবে কিকুকো যে এসেছে, সেটাই বড় হয়ে দেখা দিল।

বাবা উঠে পড়লেন, রান্নাবান্নার দিকে নজর দেয়ার জন্য। আমি উঠলাম। কিকুকো তোমাকে সঙ্গ দেবে। কিছু দরকার হলে ওকে বলতে হবে।

বাবা রুম ত্যাগ করার পর কিকুকো অনেকটা সহজ হয়ে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে ওর সব বন্ধু-বান্ধব আর বিশ্ববিদ্যালয়ের খবরাখবর নিয়ে আলাপ শুরু করল। হঠাৎ সে বাগানে যাওয়ার কথা বলে বারান্দায় চলে গেল। তারপর আমরা হালকা চটি পরে বারান্দা থেকে বাগানে চলে গেলাম। তখন দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কিকুকো সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে বলল, সিগারেটের নেশায় প্রায় আধাঘণ্টা অস্থির হয়ে আছি।

এত নেশা তো এতক্ষণ স্মোক করিসনি কেন?

বাড়ির ভেতরদিকে অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত করে হেসে উঠল আমার বোন।

আমি বললাম, ও আচ্ছা। আমি বুঝতে পেরেছি।

কী বুঝেছো? আরও আছে। আমার বয়ফ্রেন্ডও আছে।

তাই নাকি? তুই তো বেশ পাকা হয়ে গেছিস!

আচ্ছা ভাইয়া, এখন একটা সমস্যায়ও পড়ে গেছি। কী যে করব বুঝতে পারছি না। আমার বয়ফ্রেন্ড আমেরিকা যাওয়ার চিন্তা করেছে। সে চাইছে আমার পড়াশোনা শেষ করে আমিও তার সঙ্গে আমেরিকা যাই। আমারও খানিকটা ইচ্ছে আছে।

আচ্ছা! তাহলে তুইও যাবি। তাই তো?

হ্যঁা, গেলে পয়সা বাঁচিয়ে লুকিয়ে-চুরিয়ে যেতে হবে। লোকে বলে, এতে নাকি অনেক ঝুঁকি আছে। অবশ্য ওসাকায় ওই রকম ছোটখাটো অভিযান চালিয়ে আমার বেশ অভিজ্ঞতা হয়েছে। ইচ্ছে করলে পারব।

বুঝলাম! তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা কোথায় তোর?

পায়ে চলা ছোট পথ ধরে বাগানের ঘাস মাড়িয়ে সামান্য একটু ঘুর পথে পুরনো কুয়োটার কাছে চলে এলাম। কিকুকো মনে হলো গভীর কোনো ভাবনায় মগ্ন হয়ে সিগারেটে জোরে জোরে টান দিতে লাগল।

সমস্যাটা হলো, ওসাকাতে অনেক বন্ধু-বান্ধব জুটে গেছে। আবার সুইচিকেও ভালোবাসি। সব সময় ওর সঙ্গেই থাকতে ইচ্ছে করে। ভাইয়া, তোমাকে কি বোঝাতে পেরেছি?

হ্যাঁ,হ্যাঁ খুব বুঝেছি।

কিকুকো আবার হেসে উঠল। আমার থেকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে কুয়োটার সামনে দাঁড়াল। আমি ওর কাছাকাছি পৌঁছলে বলল, তোমার মনে আছে ভাইয়া, ছোটবেলায় তুমি বলতে, এখানে ভূতের আনাগোনা আছে?

হ্যাঁ, মনে আছে। মা আমাকে বোঝানোর জন্য বহুবার বলেছেন, আমি রাতে যা দেখেছি সেটি ভূত ছিল না। সবজির দোকানের মহিলাকে আমি দেখেছি। কিন্তু কিছুতেই আমার ভয় কাটতো না। মহিলা নাকি আমাদের বাগানের ভেতর দিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে যাচ্ছিল সে রাতে। তবে আমার চোখে এ রকম দেখলাম যেন মহিলা বাগানের দেয়াল বেয়ে পার হচ্ছে।

কিকুকো হাসতে হাসতে বাগানের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে নিবিড়ভাবে তাকাল।

আমি নীরব রইলাম। কিকুকো অন্যরকম গলায় বলল, মা কিন্তু তোমার প্রতি কখনো বিরূপ হননি। বাবাকে তার এবং বাবার দোষের কথাই সবসময় বলতেন। তোমাকে ঠিকমতো ফেরালে নাকি তুমিও আমার মতোই সুবোধ হয়ে থাকতে। আমার প্রতি তাদের যে রকম কঠোর নজরদারি ছিল, সেক্ষেত্রে সেটা নাকি তোমার প্রতি কখনো ছিল না।

আমার দিকে তাকালে দেখলাম, ওর মুখে আবার সেই মনোহর হাসিটা ফিরে এসেছে। তারপর অনেক কষ্টে বলল, মা বেশ সহজ-সরল মহিলা ছিলেন।

আমিও বললাম, হ্যাঁ, মা আসলেই সহজ-সরল মানুষ ছিলেন।

তুমি কি আবার ক্যালিফোনির্য়া ফিরে যাবে?

এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না। দেখি কী করি।

বাড়ির ভেতরের দিকে তাকিয়ে বললাম, আমাদের মনে হয় এখন যাওয়া উচিত। বাবা একা একা খাবার তৈরি করতে গিয়ে হয়তো হিমশিম খাচ্ছেন।

আমার দিকে সোজা হয়ে তাকিয়ে কিকুকো জিজ্ঞেস করল, বাবা কি ওয়াতানাবের কথা সব তোমাকে বলেছেন?

আমাকে বলেছেন, ওয়াতানাবে আত্মহত্যা করেছেন।

না, এটুকুই সব নয়। তার সঙ্গে তার গোটা পরিবারও শেষ হয়েছে। তার স্ত্রী, ছোট ছোট দুটি মেয়ে সবাই।

মেয়ে দুটির চেহারা মায়াভরা। ওরা সবাই রাতে ঘুমিয়েছিল। সে সময় তাদের বাবা গ্যাসের আগুনে ওদের পুড়িয়ে মেরেছেন। চাকু দিয়ে ওয়াতানাবেন নিজের পাকস্থলী পযর্ন্ত সব কেটে ফেলেছেন।

কিন্তু বাবা তো ওয়াতানারের সততার কথাই বলেছেন।

কিকুকো কুয়োর দিকে ঘার ফিরিয়ে দাঁড়াল।

বাগানের আলো নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে। কয়েক গজ দূরে ফাঁকা জায়গাটার দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, ওই যে ওখানে দেখেছিলাম।

কিকুকো জিজ্ঞেস করল, ভূতটা দেখতে কিসের মতো ছিল?

আমি স্পষ্ট কিছু দেখিনি। বেশ অন্ধকার ছিল তখন। দেখলাম একা বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে আমার দিকে চেয়ে।

কিকুকো কনুই দিয়ে আমাকে গুঁতো দিয়ে বললÑ আহা, থামো তো ভাইয়া। আমাকে আবার ভয় দেখানো হচ্ছে!

চলো ভাইয়া, দেখি খাবার কতদূর আগালো।

রান্নাঘরে ব্যস্ত বাবা আমাদের দিকে একপলক তাকিয়ে আবার কাজে মগ্ন হলেন।

কিকুকো হাসতে হাসতে বললো, একা একা রান্না করে খেতে খেতে বাবা একেবারে পাকা বাবুচির্ হয়ে গেছেন।

বাবা ওর দিকে ফিরে ঠান্ডা চোখে তাকালেন। তারপর বললেন, আরে না, রান্নার তেমন কিছুই শিখিনি এখনো। কিকুকো, আমার সঙ্গে একটু হাত লাগাও না।

কিকুকো বেশ সুবোধ মেয়ে। জ্ঞানবুদ্ধি চমৎকার, বাবা ওর প্রশংসা করতে করতে এগিয়ে চললেন। বাবা এরুম থেকে ওরুম যেতে লাগলেন। আমি শুধু বাবার পেছনে পেছনে চললাম আর দেখতে লাগলাম, ওই পুরনো বাড়িটা এখন আমার কাছে প্রায় অপরিচিতই মনে হচ্ছে। বিশাল বিশাল রুমের বেশিরভাগই ভয়ঙ্কর রকমের ফাঁকা।

বাবা বললেন, আমার একার জন্য বাড়িটা বেশি বড় হয়ে গেছে। আর তো কেউ নেই। একদমই ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আর এতগুলো রুমও আমার দরকার হয় না।

বাবা শেষে একটা রুম খুললেন। রুমটা বই-পুস্তক আর কাগজপত্রে ঠাসা। ফুলদানিতে হরেক করমের ফুল। দেয়ালে নানা রকমের ছবি টানানো। এক কোণায় ছোট একটা টেবিলে দেখলাম একটা মজার বস্তু। কাছে গিয়ে ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, ওটা একটা প্লাস্টিকের যুদ্ধ জাহাজ। তবে সেটা বাচ্চাদের খেলনার মতো। চারপাশে খবরের কগজের ওপর ছড়ানো আরো সব জিনিসের ছোট ছোট নমুনা। টেবিলের কাছে এসে বাবা নমুনাটি হাতে তুলে বেশ অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে উঠলেন, ব্যবসাটা শেষ হওয়ার পর এখন আমার হাতে অনেক সময়।

আমিও বাবার হাসির সঙ্গে আমার হাসির সায় দিলাম। বাবা প্লাস্টিকের খেলনাটার দিকে নিবিষ্টচিত্তে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, এসব কথা বলতে চাই না। তবে না বলেও পারি না। তোমার মায়ের মৃত্যু কোনো দুঘর্টনা নয়। হতাশা আর দুশ্চিন্তা তাকে কুরে কুরে খেয়েছে।

আমাদের দৃষ্টি নিবন্ধ রইল প্লাস্টিকের যুদ্ধ জাহাজটির দিকে।

আমি নীরবতা ভেঙে বললাম, মা আসলে চাননি, আমি চিরতরে তোমাদের ছেড়ে ওখানে থেকে যাই।

বাবা বললেন, বেশির ভাগ মা-বাবার অবস্থা এ রকমই হয়। সন্তান দূরে থাকুক এটা তো চানই না, আর অচেনা অজানা জগতে সন্তান থাকলে তাদের চিন্তার আর শেষ থাকে না।

বাবা, যুদ্ধ জাহাজটা আংগুল দিয়ে নাড়তে নাড়তে বললেন, এগুলো এখানে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিলে, ভালো হয়-তাই না?

হ্যাঁ, ভালোই হয়। দেখতেও ভালোই লাগবে।

রান্নাঘরের পাশে একটা আবছা আলোকিত রুমে খাবার প্রস্তুত ছিল রুমে আলোর উৎস বলতে ছিল একটা লাইট, টেবিলের ওপর ঝুলানো। টেবিল ছাড়া রুমের বাকি অংশ প্রায় অন্ধকার। খাওয়া শুরু করার আগে একে অন্যের দিকে ঝুঁকে বসলাম।

খাওয়ার সময় কথা বাতার্ তেমন একটা হলো না। খাবার সম্পর্কে আমি মৃদু বিনয়ী মন্তব্য করলে কিকুকো হাসি দিয়ে প্রত্যুত্তর করল মাত্র। মনে হলো, ওর আগের সেই ভয়কাতুরে চেহারাটা আবার ফিরে এসেছে।

বাবা সারাক্ষণ চুপ করেই ছিলেন। তবে শেষে বললেন, শেষমেশ তোমার জাপানে ফিরে আসাটা বেশ অদ্ভুতই মনে হচ্ছে, তাই না?

হ্যাঁ, কিছুটা অদ্ভুতই মনে হচ্ছে।

আমেরিকা ছেড়ে এসে কিছুটা খারাপ লাগার কথা …।

তা অবশ্য একটু লাগছে। তবে আমি ওখানে তেমন কিছু ফেলে আসিনি। মাত্র কয়েকটা ফঁাকা রুম।

ও, আচ্ছা।

টেবিলের ওপর দিয়ে বাবার দিকে তাকালাম। মুখটা পাথরের মতো কঠিন। আমরা আবারও অনেকক্ষণ নীরবতার মধ্যে ডুবে রইলাম।

রুমের পেছনে একটা জিনিস দেখে চোখ আটকে গেল। প্রথম কিছুক্ষণ চুপ থেকেই খেতে থাকলাম। তারপর আমার হাত আস্তে আস্তে একেবারে থেমে গেল। বাবা ও কিকুকোর চোখ এড়ালো না। আমি বাবার কঁাধের ওপর দিয়ে অন্ধকারের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।

ওখানে ওই ছবিটা কার?

বাবা আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে একটু খানিক মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোন ছবিটা?

সাদা কিমোনে পরা বৃদ্ধার ছবি। নিচের ওইটা।

বাবা ছবির দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে। এবার কথা বলার সময় বাবার কণ্ঠে একটু খানি ককর্শ শোনাল। তোমার মায়ের ছবি। তা নিজের মায়ের ছবি চিনতে পারছ না?

মায়ের ছবি! ও, অন্ধকার তো, ভালো করে দেখতে পাইনি। কিছুক্ষণ আমরা সবাই চুপ। তারপর কিকুকো ওঠে গিয়ে ছবিটা স্বযত্নে নামিয়ে এনে আমাকে দিল।

আমি বললাম, মাকে আসলেই অনেক বয়স্ক মনে হচ্ছে। বাবা বললেন, ছবিটা তার মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তোলা। আমি বললাম, অন্ধকারের জন্য ভালো দেখতে পাইনি।

ছবি থেকে চোখ তুলে দেখলাম, বাবা এক হাত এগিয়ে দিয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি ছবিটা বাবাকে এগিয়ে দিলাম। ছবিটার দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কিকুকোর দিকে এগিয়ে দিলেন। কিকুকো ছবিটা নিয়ে দেয়ালে লাগিয়ে দিল।

তরকারির আরও পুরো এক পাতিল রয়ে গেছে-

টেবিলের মাঝখানে। কিকুকো ফিরে এসে বসার পর বাবা ঢাকনা খুললেন। এক প্রস্ত বাষ্পের মেঘ ওপরের আলোটার দিকে উঠে গেল। বাবা তরকারির পাতিলটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন- নাও, তোমার নিশ্চয়ই অনেক ক্ষুধা আছে এখনো। বাবার মুখের একপাশ আলোর বিপরীতে থাকার কারণে ভালো করে কিছুই আর দেখা যাচ্ছে না।

আমি চপস্টিক হাতে পাতিলটা আমার দিকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে বললাম ধন্যবাদ বাবা। কী এটা?

মাছ?

পাতিলের ভেতর মাছের টুকরাগুলো তাকে কুকড়ে গেছে। আমি একটা টুকরা তুলে বরতনে নিলাম।

বাবা বললেন, নিয়ে খাওয়া। আরো নিলাম।

বাবা বললেন, নিয়ে খাও। আরো অনেক আছে।

ধন্যবাদ বলে আমি আরো একটা নিয়ে বাবার দিকে এগিয়ে দিলাম। বাবাও কয়েক টুকরা নিলেন। তারপর কিকুরো কয়েক টুকরা নিল। আমাদের দৃষ্টি এখন ওর দিকে। বাবা আবার বললেন, তোমার অবশ্যই ক্ষুধা আছে এখানো। আরো নিয়ে খাও। বাবা নিজে আরেক টুকরা মুখে দিলেন। আমিও নিলাম। জিবের তলায় বেশ নরম নরম স্বাদ পেলাম মাছটার। বললাম, বেশ সুস্বাদু মাছের টুকরোগুলো।

আমরা তিনজনে নীরবে খেতে লাগলাম।

খাওয়া শেষে বাবা দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়ে আয়েশের হাই তুলতে তুলতে ডাকলেনÑ

কিকুকো, মা আমার এক কেটলি চা বানাও দেখি।

কিকুকো বাবার দিকে একবার তাকিয়ে চলে গেল

বাব উঠতে উঠতে বললেন-চলো দেখি, অন্য রুমে যাই। এখানে গরম আসলেই খুব বেশি।

বাবার পিছে পিছে আমিও উঠে পড়লাম। চা খাওয়ার রুমে গিয়ে বসলাম। বিশাল বিশাল জানালাগুলো খোলা। বাগান থেকে বাইরের ঠাÐা মৃদু মলয় আসছে। কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল। তারপর আমি বলালাম, – বাবা…।

হ্যঁা, বলো।

কিরকুকো বলল, ওয়াতানোবে নাকি তার গোটা পরিবারসহ আত্মহত্যা করেছেন।

বাবা দৃষ্টি নিচের দিকে নামিয়ে মাথা ঝঁাকালেন। কয়েক মুহ‚তর্ বাবা গভীর চিন্তামগ্ন থাকলেন। শেষমেশ বললেন, ওয়াতানাবে ব্যবসার প্রতি খুব নিবেদিত প্রাণ ছিল এ জন্য বিপযর্য় মেনে নিতে পারেনি। ওর নিজের প্রতি আস্থাও শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি বললাম, বাবা, তোমার কী মনে হয়, তার কোথাও কোনো ভুল হয়েছিল?

না, না তা অবশ্যই হবার নয়।

এরপর আমরা আবার নীররতায় ডুবে গেলাম। সেসময় বাগান থেকে ঝিঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। কুয়োটা আর দেখা যাচ্ছে না। বাবা আবার জিজ্ঞেস করলেন কী করবে কিছু ঠিক করেছে জাপানে কিছুদিন থাকবে?

আমি বললাম, না বাবা আমি আসলে আগে থেকে কিছুই ঠিক করে রাখিনি।

তুমি এই বাড়িতে যদি থাকতে চাও সেক্ষেত্রে তোমাকে অবশ্যই ধন্যবাদ। তবে বুড়ো বাপের সঙ্গে থাকতে তোমার আপত্তি যদি না থাকে।

ঠিক আছে, বাবা। এ নিয়ে পরে ভেবে দেখব। আমি আবার বাগানের অন্ধকারের দিকে তাকালাম।

বাবা বললেন, অবশ্য এই বাড়িটা এখন পোড়া অবস্থায় আছে। লোকজন নেই বললেই চলে হয়তো তোমার বেশি ভালো লাগতে নাও পারে। শিগগিরই তুমি হয়তো আমেরিকায় যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে উঠবে। হয়তো হতে পারে। আমি এখনো নিশ্চিত নই।

বাবা কিছুক্ষণ আনোমনে হাতের তালুর উল্টো দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নীরবতা ভেঙে বললেন, কিকুকো আগামী বসন্তে পড়াশোনা শেষ করবে।

আশাকরি, তারপর ও এখনে চলে আসবে নিজের মেয়ে বলে বলছিনা, আসলেই সে খুব ভালো মেয়ে।

আসলে ভালেই হবে। সবকিছু বদলে যাবে।

হ্যঁা, আমিও নিশ্চিত। সব কিছু বদলে যাবে। সুন্দর হয়ে যাবে।

আমরা আবার নীরবতায় ডুবে গেলাম। অপেক্ষায় থাকলাম, কিকুকো চা নিয়ে আসবে।

 

লেখক পরিচিতিঃ

২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান কাজু ও ইশিগুরো। বতর্মান গল্পটি কাজু ও ইশিগুরো প্রথম জীবনে লেখা ছোট গল্প। ‘এ ফ্যমিলি সাপার’-এর বাংলা অনুবাদ।

কাজু ও ইশিগুরো ১৯৫৪ সালের ৮ নভেম্বর জাপানের নাগাসাকিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের ৯ বছর আগে এই নাগাসাকিতেই ঘটেছিল পারমাণবিক হামলার মতো একটি জঘন্যতম অপরাধের ঘটনা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার পরিবারের সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে আসেন। সমুদ্রবিজ্ঞানী বাবা সিজু ও ইশিগুরো ১৯৬০ সালে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সারেতে অবস্থিত বড়শহর গিল্ডকোর্ডে সমুদ্র বিজ্ঞান বিষয়ে রিসাচর্স করার জন্য আসেন। এবং সেখানেই স্ত্রী সিজুকো, পুত্র ইশিগুরো এবং দুই কন্যাকে নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ইশিগুরো ১৯৭৮ সালে বেস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোসের্ মাস্টাসর্ করেন। তিনি ১৯৮০ সালে ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোসের্ মাস্টাসর্ করেন। তিনি ১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেন। তিনি একাধারে ছোটগল্পকার ঔপন্যাসিক, অনুবাদক, বিজ্ঞান লেকক, গীতিকার এবং চিত্র নাট্যকার।

ইশিগুরোর সাহিত্য হচ্ছে এমনই যা কাফকা ও জেন অস্টিনের লেখক শৈলীর সমন্বয়ে তৈরি এক নতুন লেখক শৈলী। তার প্রথম উপন্যাস এ পেইল ভিউ অব হিলাম ১৯৮২। দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে এর জন্য বুকার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে।

২০০৯ সালে ইশিগুরোর প্রথম গল্প সংকলন ‘নকটানর্স ফাইভ স্টোরিজ অব মিউজিক অ্যান্ড নাইটফল’ প্রকাশিত হয়। ‘এ পেইল ভিউ অব হিলস’ এর জন্য উইনিফ্রেড হল্টবাই অ্যাওয়াডর্ পান ১৯৮৩ সালে ইশিগুরো ‘ইন লাভ এগেইন’ ‘আই নো আই ড্রিম’ ‘দ্য চেঞ্জিং লাইটস’ ‘ড্রিমার ইন কনসাটর্’ ইত্যাদি সংগীত তিনি রচনা করেন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত