শ্রদ্ধাঞ্জলি কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য

আজ ৭ মার্চ, বাংলা লোকগানের জনপ্রিয় দল ‘দোহার’-এর প্রতিষ্ঠাতা, লোকগানের উজ্জ্বল নক্ষত্র কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের মৃত্যুদিন । এই দিনে ইরাবতী পরিবার তাঁকে স্মরণ করে পাঠকদের প্রতি তুলে ধরছে “আবদুল্লাহ আল মোহন”এর একটি প্রবন্ধ।

 

কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য
ছবিঃ ইন্টারনেট

১.
বাংলা লোকগানের জনপ্রিয় দল ‘দোহার’-এর প্রতিষ্ঠাতা, লোকগানের উজ্জ্বল নক্ষত্র কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা লোকসঙ্গীত ‘গানের দল’ (‘ব্যান্ড নয়’) ‘দোহার’-এর মুখ্য গায়ক ছিলেন অকাল প্রয়াত কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। তাঁর মতোন সমমনাদের যূথবদ্ধতায় দোহার বাংলা গানে গেঁড়েছে স্থায়ী এক নোঙ্গর, যা সবার কাছেই আরাধ্য। বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য তাঁর দল ‘দোহার’-এর মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছিলেন নিজস্ব কণ্ঠজাদুতে। আপন পরিচয়ের প্রশ্নে বারংবার স্বীকার করেছেন, ‘‘কালিকাপ্রসাদ কোনও দিন ‘দোহার’ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ‘দোহার’ আমার প্রাথমিক আইডেন্টিটি। … ‘দোহার’ ব্যান্ড নয়, গানের দল। … আমরা যেহেতু উত্তরপূর্ব ভারতের গান নিয়ে কাজ করি। এই অঞ্চলের মানুষ আমাদের তাদের প্রতিনিধি ভাবে।’’ বাংলা সংগীতের জগতে শুদ্ধ, সাবলীল এবং দক্ষ, মেধাসম্পন্ন কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন কালিকাপ্রসাদ। ১৯৭১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর আসামের শিলচরে জন্ম কালিকাপ্রসাদের। অসম্ভব প্রিয়, অকাল প্রয়াত মহান এই শিল্পীর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালের ৭ মার্চ এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘৃটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রয়াণকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো মাত্র ৪৭ বছর। স্ত্রী ঋতচেতা গোস্বামী আর মেয়ে আশাবরীকে রেখে গেছেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। কালিকাপ্রসাদের অকাল প্রয়াণে বাংলার শিকড়ের গানের ভুবনে যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর আকস্মিক অকালপ্রয়াণে শোকাহত, মর্মাহত হন সকল বাঙালি। তাঁর চলে যাওয়া আমাদের সঙ্গীত পিপাসুদের, শিল্প রসিকদের মনে বিশেষ শূন্যতা সৃস্টি করে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ একজন ক্ষণজন্মা শিল্পীকে হারাল। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছি। তিনি যেখানেই থাকুন, চিরশান্তিতে থাকুন। সুরসাধক, শিল্পী কালিকাপ্রসাদ আমাদের মতোন সুরাসক্ত ভক্তের অন্তরে থাকবেন অনন্তকাল। প্রিয় ছোটভাই বহুল আলোচিত ‘ভূবন মাঝি’ চলচ্চিত্র নির্মাতা আরেফিনের (Fakhrul Arefeen) ভাষায় বলি, ‘এক সাথে থাকা, যতদিন, যতদূর, যতভাবে. ….এক সাথেই বাঁচতে চাই।’ ইউটিউবে তাঁর গান ও কথা শুনি, দেখি আর প্রবল বেদনা নিয়ে প্রতিনিয়ত স্মরণ করি প্রিয় এই শিল্পীকে।

২.
কালিকাপ্রসাদ ছিলেন এক সুরমাঝি, মানুষের প্রাণের সঙ্গীত লোকসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ, বিশুদ্ধ সঙ্গীতের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাংলা লোকগীতির কিংবদন্তি, সবার অন্তরের মানুষ। সোশ্যাল মিডিয়াকে তাঁর আনরিয়েল লাগতো। অজস্র লাইক মানেই গান হিট নয়। টালিগঞ্জের বেশ কিছু ছবির সঙ্গীত পরিচালক হলেও বাংলা গান নিয়ে বেশ হতাশ ছিলেন কালিকাপ্রসাদ। কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য বাংলা ভাষায় রচিত লোকসঙ্গীত চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সহজ কথায় তিনি লোকসঙ্গীত গাইতেন। আরও সহজ করে বললে তিনি লোকসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। দুই বাংলায় একজন তুমুল জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। ‘দোহার’ নামে কলকাতাকেন্দ্রিক গানের দলের এই প্রাণপুরুষের সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি, সরাসরি মঞ্চে তাঁর গান শোনারও সুযোগ হয়নি।তবুও তিনি আমার পরম আপনজন হয়ে উঠেছিলেন, সুরের মহাসাগরে নিত্য স্নাতক হতাম বলে। তাঁকে অকালে হারানোটা বড়ই বেদনার। আর পাবো না তাঁর লোকগীতির বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গী, তাঁর অসাধারন পরিবেশনা। এই ক্ষতি শুধু বাংলা বা ভারতের নয়। এ ক্ষতি সমগ্র সঙ্গীত জগতের। তাই তাঁর আকস্মিক অকাল প্রয়াণে দুঃখ আমাদের থাকবেই। তিনি আমাদের মনে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকবেন। আমরা জানি, প্রকৃত শিল্পী বা স্রষ্টার মৃত্যু হয় না কখনো।শিল্পী বা স্রষ্টা বেঁচে থাকেন তাঁর সৃজনশীল সৃষ্টি আর কাজে। তিনি আমাদের অনেক দিয়েছেন,আরো অনেক দিতে পারতেন। তাঁর গবেষণা, প্রতিভা অসাধারণ। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী মানুষ হিসাবেও তিনি ছিলেন অনন্য।

৩.
২০১৭ সালের ৭ মার্চ এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অজানালোকে চলে গেছেন এই গুণী শিল্পী। কলকাতা থেকে বীরভূমের সিউড়ি শহরের দিকে যাবার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁদের গাড়িটি উল্টে যায়। ঘটনাটি ঘটেছে হুগলি জেলার গুড়াপে। গাড়িতে কালিকাপ্রসাদ ছাড়া আরও ৫ জন যাত্রী ছিলেন। সবাইকেই বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই মৃত্যু হয় কালিকাপ্রসাদের, এমনটাই জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। লাখো-কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে বড্ড অসময়ে চলে গেছেন না-ফেরার দেশে; যা আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় ও অচিন্তনীয়! তবু বাস্তবতা মেনে নিতে হয়। তাঁর অসময়ে চলে যাওয়াতে বাংলার শিকড়ের গানে যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো, তা বছরে বছরে কিংবা যুগে যুগে পূরণ হবে কি না সন্দেহ। কালিকাপ্রসাদের মৃত্যুতে বাংলা কীর্তনের ‘নষ্টকোষ্টী’ উদ্ধারের কাজও থমকে গেল, আপাতত। ঘুরে-ঘুরে রেকর্ড করেছেন কীর্তন, ইচ্ছে ছিল গড়ে তুলবেন লোকগানের সংগ্রহালয় আর গবেষণা কেন্দ্র । পরিচিতদের কাছে কালিকাপ্রসাদ বারবার বলেছিলেন, নবদ্বীপে লোকগানের সংগ্রহালয় এবং বাংলা কীর্তন গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে চান। চেয়েছিলেন, একখণ্ড জমিতে গড়ে তুলবেন তাঁর সাধের প্রতিষ্ঠান। কালিকা যে ভাবনা মাথায় নিয়ে চলছিলেন, তার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অনেক বন্ধু। যত দিন না তাঁর নিজস্ব গবেষণা কেন্দ্র হয়, তত দিন পুরাতত্ত্ব পরিষদ ভবনের দরজা কালিকাপ্রসাদের জন্য ছিল অবারিত। মহাপ্রভু মন্দিরের পরিচালন সমিতির সম্পাদক জয়ন্ত গোস্বামী বলছেন, “কীর্তন সংরক্ষণের যে কাজ উনি করছিলেন, তা ভারী আশাপ্রদ। কিন্তু মহাপ্রভু এ কী করলেন?”

৪.
পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের নানা ধরণের লোকসঙ্গীত সংগ্রহ করে সারা পৃথিবীর বাঙালীদের কাছে পরিবেশন করত ‘দোহার’। সঙ্গীত পরিবেশন ছাড়াও লোকসঙ্গীত নিয়ে গবেষণাও করতেন কালিকাপ্রসাদ। তাঁর প্রয়াণের পর মুক্তিপ্রাপ্ত দুই বাংলার জনপ্রিয় ‘ভুবন মাঝি’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন তিনি। প্রয়াণের মাত্র কয়েকদিন আগে, সবশেষে এ বছরেরই ১ মার্চ ঢাকায় ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে এসেছিলেন কালিকাপ্রসাদ। ‘ভুবনমাঝি’র পরিচালক ফাখরুল আরেফিন তাঁর প্রয়াণ সংবাদ পেয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলো, ‘‘সোমবার রাতেও ফেসবুক মেসেঞ্জারে জানতে চেয়েছেন, ছবি কেমন চলছে? ছবির কোনও শিল্পীর সম্মান দক্ষিণা বাকি নেই। কেবল কালিকাদাকে জোর করেও দিতে পারলাম না। সঙ্গীত তৈরির সময় প্রায় ১৬দিন তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছিলাম। খবরটা সব এলোমেলো করে দিল।’’ তাঁর প্রয়াণে ব্যথিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেছেন, ‘‘কত পরিকল্পনা, কত আয়োজন- সব ভেস্তে গেল। সেলিম আল দীনের পর কাউকে খুঁজে পেয়েছিলাম, যাঁর সঙ্গীত প্রজ্ঞা মুগ্ধ করে। তিনি আমাদেরই লোক ছিলেন। তাই তো গান বেঁধেছিলেন শাহবাগ নিয়ে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের ভাষার প্রতি তাঁর বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা অগাধ ছিল। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান দেখে যখন বিচলিত বোধ করেছি, কালিকা তখন প্রবোধ দিয়েছে। বলেছে, দেখো বাংলাদেশ ঘুরে দাড়াঁবে। এই হচ্ছে কালিকাপ্রসাদ। যে নিজেকে সবসময় বাঙালি ভেবেছে।’’ গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার সেই স্মৃতি মনে করে বলছিলেন, ‘‘দুই বাংলাকে সমান ভাবে ধারণ করতেন কালিকাপ্রসাদ।’’ একাত্তরের বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীও সে কথাই বলছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘প্রাণে শাহবাগ জেগেছিল বলেই তাঁর গান এসেছিল। কালিকা আমাদের স্বজন। তিনি আমাদের রাজপথের সাথী!’’

৫.
তিনি ছিলেন আদতে আসামের শিলচরের মানুষ। বড় হওয়া, সঙ্গীত শিক্ষা – সবই সেখানে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান শুনে বড় হওয়া। ছোট বেলা থেকেই মন ছুটত টুসু,ভাদু,ভাওয়াইয়ায়। ভাটিয়ালি সুরের উজান বাওয়া গান শুনতে শুনতে একসময় মনে হল জোট বাধা দরকার। তৈরি হল দোহার। কলকতায় ১৯৯৯ সালে আরও কয়েকজন বন্ধু গায়ক-যন্ত্রীর সঙ্গে তিনি তৈরি করেছিলেন লোকগানের দল ‘দোহার’। নিজের ও দোহার নিয়ে বলেছিলেন, ‘‘দোহার’-এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালের ৭ আগস্ট প্রথম অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। আমার বেড়ে ওঠা আসামের শিলচরে। নিজেদেরকে আমরা ‘সুরমা’ সিলেটী সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বলে মনে করি। শিলচর-করিমগঞ্জে তারই একটা পরম্পরা ছিল। আমি ওখানে বড় হয়েছি। এরপর ১৯৯৪ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ে ভর্তি হয়ে কলকাতায় আসা। শিলচরে বেড়ে উঠেছি গানের-সংস্কৃতির মাঝে। আমার বড় জ্যাঠা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের ছাত্র ছিলেন। আমার আরেক কাকা মুকুন্দ ভট্টাচার্য ছিলেন গণনাট্য সঙ্গীতের দক্ষ শিল্পী। আমার বাবা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বড় মাপের সংগঠক ছিলেন। আমার পিসি আনন্দময়ী ভট্টাচার্য সুদক্ষ সঙ্গীতশিল্পী। শিলচর সঙ্গীত প্রতিষ্ঠানটা উত্তরপূর্ব ভারতের সবচেয়ে পুরনো সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ আমার বেড়ে ওঠা সঙ্গীতের মাঝে। বাড়িতে পড়তে না বসলে বকা খেতে হয়নি; কিন্তু সন্ধ্যায় তবলার রেওয়াজে না বসলে বকা খেতে হয়েছে।’

৬.
লোকগানের এই বাণিজ্যিকীকরণের বিপক্ষে ছিলেন তিনি। লোকগানের সারকথা, আধ্যাত্মিক দর্শনকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে পেরেছিলেন কালিকাপ্রসাদ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হওয়ার পরও গোঁড়া ধর্মীয় আর সামাজিক বেড়াজালকে ছিন্ন করা বাউলেরা যেভাবে গানে গানেই প্রচার করেছেন নিজেদের দর্শন, ঠিক একইভাবে একালের গণজাগরণের আন্দোলনেও নিজের হাতিয়ার হিসেবে গানকেই তুলে নিয়েছিলেন তিনি। ২০১৩ সালে সেভাবেই তৈরি হয়েছিল ‘শাহবাগ দিচ্ছে ডাক’ গানটি। এ প্রসঙ্গে কালিকা বলেছিলেন, সাধারণত গান না লিখলেও ‘প্রাণের তাগিদে’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শুরু হওয়া শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে তিনি লিখেছিলেন গানটি। সিনেমাতে কালিকাপ্রসাদ-এর গাওয়া গান এর আগে ব্যবহার হয়েছে দুবার, সৃজিত মুখোপাধ্যায়-এর ‘জাতিস্মর’ আর গৌতম ঘোষ-এর ‘মনের মানুষ’-এ। তবে বাংলাদেশের প্রতি নিজের ‘প্রাণের তাগিদে’ই প্রথমবারের মতো সংগীত পরিচালনা করেন তিনি সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভুবন মাঝি’তে। মুক্তিযুদ্ধ এবং সমকালীন সময়ের মৌলবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঘিরে তৈরি হওয়া সিনেমাটির প্রাণই ছিল কালিকাপ্রসাদ-এর সংগীত।

৭.
কালিকাপ্রসাদের জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালে। এ কারণে তিনি নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। জন্ম শিলচরে হলেও তাঁর প্রাণটা ছিল পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি সিলেটে। বর্তমান বাংলাদেশের পদকর্তাদের পদ তিনি গাইতেন পরম যত্নে। সুযোগমতো তুলে ধরতেন বৈশ্বিক শ্রোতাদের সামনে। শ্রোতাদের জানাতেন, পৃথিবীতে বাংলাদেশ নামে একটি দেশ আছে। সেই দেশে শাহ আবদুল করিমের মতো গীতিকার জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান, সুরসাধনায় ছিল সিলেট। সিলেট লোকসংস্কৃতি, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের বাউল ও মরমি গানকে তিনি গণমানুষের খুব কাছে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি লালন, শেখ ভানু, শাহ আবদুল করিম, দুরবিন শাহ, হাসন রাজা, আরকুম শাহ, উকিল মুন্সি, শিতালং, রাধারমণসহ দুই বাংলার বাউল-ফকিরকে খুঁজে খুঁজে বের করে তাঁদের বাণী, শব্দ সৃষ্টি ও সুর এবং লোকশিল্পী ও সাহিত্যিকদের নিয়ে গবেষণা করতেন। আর গাইতেন এবং গাওয়ার জন্য উৎসাহ দিতেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিখ্যাত সুরকাররা যখন লোককবি হিসেবে শীতলং শাহ কিংবা রাধারমণের পদ থেকে তাদের পরিচয় মুছে দিয়ে পদটাকে নিজের বলে চালাতে কার্পণ্য করেননি, তখন কালিকাপ্রসাদ শেখ ভানু, শীতলং শাহ কিংবা রাধারমণকে পূর্ণ পরিচয়ে অধিষ্ঠিত করেছেন নাগরিক পরিসরে, ব্যাপক মাত্রায়। প্রকৃত সুর ও বাণী তুলে ধরে সুরে সুরে তা প্রকাশ করেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। এই কৃতিত্ব কালিকাপ্রসাদেরই প্রাপ্য। এ প্রসঙ্গে কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের একটি কথা খুব মনে পড়ে, ‘চারিদিকে এত গান, নতুন করে গান বানানোর কোন দরকারই নেই।’

৮.
সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা নিয়েও কালিকাপ্রসাদ হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন মরমি কবিদের। লালন, শাহনূর, দুরবিন শাহ, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম কিংবা রাধারমণের গান গেয়ে গেয়ে ভারত-বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও শহরে ঘুরেছেন। হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা, মাটি-মানুষ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন। বাউল-ফকিরদের হারিয়ে যাওয়া শিকড়ের গানগুলোকে খুঁজে খুঁজে বের করেছেন। নিজে গেয়েছেন এবং নতুন প্রজন্মকে উদ্দীপনা দিয়েছেন গাওয়ার জন্য। কালিকাপ্রসাদ শুধু শিল্পী বা স্বদেশের দর্শনের প্রচারকই ছিলেন না; তিনি সচেতন ছিলেন বিকৃত লোকসঙ্গীত বিষয়ে। আগ্রহী ছিলেন শ্রোতাদের অবিকৃত বাণী ও সুর শোনাতে। যখনই সুযোগ পেয়েছেন তিনি বলে গেছেন কোন গান কীভাবে বিকৃত হয়েছে। এই গুণটি তেমন দেখা যায় না অন্য কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রে। লোকসঙ্গীতের ক্ষেত্রে গভীর মনোযোগ এবং ব্যাপক অনুসন্ধান না থাকলে এই বিকৃতি সহজে ধরা যায় না। কালিকাপ্রসাদ যে শুধু হারিয়ে যাওয়া বাংলার লোকসঙ্গীতই ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তা নয়। বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রসঙ্গীতের দাপটে আমাদের নিজস্ব যেসব বাদ্যযন্ত্র হারিয়ে যেতে বসেছিল সেগুলোও তিনি ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। সারিন্দা, দোতারা, ডুগডুগি ছিল আমাদের বাংলার লোকসঙ্গীতের অন্যতম বাদ্যযন্ত্র। এসব বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে লোকসঙ্গীত গেয়েই এই গান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এই বাদ্যযন্ত্রগুলো এখন আর তেমন দেখা যায় না। বলা যায় এগুলো এখন হারিয়েই গেছে। কালিকাপ্রসাদ নতুন করে লোকসঙ্গীতের মতো বাঙালীর এই নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রগুলো তুলে এনে নতুন করে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছিলেন। একটি কথা তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন এবং সর্বত্রই বলতেন যে বাংলার লোকসঙ্গীত যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এই ভাণ্ডার কখনই শেষ হবে না। প্রয়োজন শুধু আমাদের জীবনে এই সঙ্গীতকে ধারণ করা। আর এই কাজটাই কালিকা প্রসাদ করছিলেন।

৯.
শুধু লোকগানই নয়, চিরায়ত ধ্রুপদি সঙ্গীতেও ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত। লোকগানকে বাণিজ্যের মোড়কে বাঁধেননি তিনি কখনও। তাঁর গানে বরাবরই প্রাধান্য পেয়েছে লোকায়ত বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। কালিকাপ্রসাদ বলতেন, ‘আমরা লোকগান গাই। নতুন গান লিখি না বা গাই না। আমাদের গানে পশ্চিমি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হয় না। সেই জন্যই ‘দোহার’ গানের দল। ব্যান্ড নয়।’ আর সেই কারণেই ব্যতিক্রমী ‘দোহার’ পরিচিতি পেয়েছিল আবহমান বাংলার বাউল, কীর্তন, বিচ্ছেদী, ঝুমুর, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, চটকার মতো ভুলতে বসা লোকগান নতুন করে তুলে এনে। কালিকাপ্রসাদ ১৯৯৯ সালের আগস্টে গানের দল ‘দোহার’ জন্ম দেওয়ার পর দলের সহশিল্পীদের নিয়ে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি (বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত) গেয়েছেন, যা একবার শুনলে বারবার শুনতে ইচ্ছে করবে। ‘দোহার’ সদস্যদের গাওয়া প্রতিটি রবীন্দ্রসংগীত অসাধারণ। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত। ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ বিষয়ক এক টিভি আলোচনায় তাঁর বক্তব্যের গভীরতা আমাকে আজো প্রবলভাবে নাড়া দেয়। রবীন্দ্রনাথকে তাঁর নিত্যসঙ্গী করেছিলেন। তিনি লোকসংগীতের পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীতও গাইতেন, তবে তাঁর মতো করে প্রাণের আকুলতা দিয়ে। তাঁর কণ্ঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ আমার মনে দাগ কেটেছে।

১০.
বাংলার বাউল শাহ আবদুল করিমের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ ছিলো। এ নিয়ে বলেছিলেন, ‘২০০০ সালে শাহ আবদুল করিমের সঙ্গে দেখা করার জন্যে প্রথম বাংলাদেশ আসা। উনার গান আমরা ছোটবেলা থেকেই শিলচরে শুনেছি। আমার কাকার কাছে লোকসঙ্গীতের প্রথম যে গানটি শিখেছি ওটা ছিল শাহ আবদুল করিমের। গানটি ছিল ‘তোমার কি মায়া লাগে না’। কিন্তু তখন আমি জানতাম না যে, এই শাহ আবদুল করিম সেই শাহ আবদুল করিম। কারণ, আমার ধারণা ছিল, যারা গান লিখেছেন তারা কেউ বেঁচে নেই। কারণ লালন বলে, হাসন বলে, রামপ্রসাদ বলে—গানের মধ্যে যাদের ভণিতা পাই, তারা তো পুরানা লোক। হঠাৎ আমরা শুনলাম, আমরা যে বলি, ‘করিম কয় তোমার কাছে মায়া যদি পাই’, এই করিম বেঁচে আছেন। তখন তার সঙ্গে দেখা করার জন্য খোঁজ লাগালাম। শুনলাম সিলেটে থাকেন। চলে এলাম বাংলাদেশ।’ তখন ছিলো ফেব্রুয়ারি মাস। আর তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই একুশে ফেব্রুয়ারি আর ভাষা আন্দোলন নিয়ে স্মৃতির খাতার পাতা খুলে তিনি বলেন, ‘এলাম যখন তখন ফেব্রুয়ারি মাস, ভাবলাম যে ফেব্রুয়ারির উদযাপনটা দেখে যাবো। চলে এলাম ঢাকায়। কি দেখবো জানতাম না। জানতাম যে একুশে ফেব্রুয়ারিতে এখানে বিরাট কিছু একটা হয়। জানার একটা কারণ আছে। আমি যে শহরে থাকি, সেই শহরে ভারতবর্ষে প্রথম ভাষার জন্যে ১১জন প্রাণ দিয়েছিলেন। ফলত ৫২’র ভাষা আন্দোলনের কোথাও তার একটা রেখাপাত করেছিল। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক মানুষ আমাদের ওখানে গিয়ে উঠেছিলেন। আমার কাকারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ওখানে গান গেয়ে টাকা তুলতেন। একাত্তর সালে আমার বয়স দেড় বছর। কাকা আমাকে একটা রেকর্ড প্লেয়ার বানিয়ে দিয়েছিলেন। তার একপাশে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ, অন্যপাশে অংশুমান রায়ের বিখ্যাত গান ‘বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।’ বাড়ির বড়রা বলেন, মুজিবের ভাষণ শুনে নাকি আমি কেঁপে কেঁপে উঠতাম, ওটা শুনেই নাকি আমার মুখে বুলি ফুটেছে। … আমি অনেক জায়গায় বলেছি, এখনো বলি, সব বাঙালির যদি কোনো তীর্থ হয়, সেটা একুশের ঢাকা। বাঙালি হিসেবে যদি তীর্থ করতে আসে, তাহলে তার একুশের ঢাকায় আসা উচিত।’

১১.
দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার সাথে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে খোলা মনে, অকপটে বলেছেন আপন ভাবনার কথাগুলো। স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া ‘সোশ্যাল মিডিয়াকে আনরিয়েল লাগে’ শিরোনামের তাঁর বিস্ফোরক কথার সেই সাক্ষাৎকারটির পাঠ নেওয়া যাক। –
২০১৬-য় কি দোহারের গায়ক কালিকাপ্রসাদের আর ২০১৭ সঙ্গীত পরিচালক কালিকাপ্রসাদের?
এটা ঠিক নয়। কালিকাপ্রসাদ কোনও দিন ‘দোহার’ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ‘দোহার’ আমার প্রাথমিক আইডেন্টিটি। সদ্যই যেমন ২০১৭-র সানফ্রানসিসকোর বঙ্গ সম্মেলনে হাজার বছরের বাংলা গান একটি মিউজিকাল সয়েরির পরিচালনার দায়িত্ব পেলাম। এই দায়িত্বটা গায়ক কালিকাপ্রসাদের যেমন, তেমন পরিচালক কালিকাপ্রসাদেরও। এই যে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বিসর্জন’ ছবিতে কাজ করলাম সেখানেও ‘দোহার’ গান গেয়েছে। ফলে পরিচালকের সত্তা থেকে গায়ক কিন্তু আলাদা নন।
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বিসর্জন’য়ে তো নচিকেতা প্রথম ফোক গাইলেন।
হ্যাঁ। নচিদা দারুণ গেয়েছেন। কৌশিকদার এই ছবিতে অন্য বাংলা ছবি বা অ্যালবামের মতো কিন্তু কম্পিউটেড মিউজিক বাজেনি। সারিন্দা থেকে উডুক্কাই (বড় ডমরু) অনেক অপ্রচলিত যন্ত্রের লাইভ রেকর্ডিং হয়েছে। এটা আমার কাছে একটা বিরাট অভিজ্ঞতা। বুঝলাম কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় কতটা মিউজিক্যালি সাউন্ড। তবে নচিদার প্রসঙ্গ যখন এলই তখন একটা গান নিয়ে একটু বলতে চাই।
বলুন না…
সম্প্রতি ‘জুলফিকার’য়ে ‘এক পুরনো মসজিদে’ গানটা খুব কানে বেজেছে। নচিদা তো অসাধারণ গেয়েছেন। অ্যারেঞ্জমেন্টও খুব ভাল। কিন্তু মুশকিল হল ‘এক পুরোনো মসজিদে গান ধরেছে মুরশিদে’— এই মুরশিদ কথাটাতেই কিন্তু গানের মৃত্যু হয়ে গেছে। মুরশিদ কখনই মসজিদে
গান ধরতে পারে না। মুরশিদ
দরগায় বা আখরায় গাইবে। শুধু মাত্র ছন্দমিল ছাড়়া মসজিদের সঙ্গে মুরশিদের কোনও মিল নেই। এটা লিরিকের সমস্যা, তাই না বলে পারলাম না। এটাই এখনকার
বাংলা গানের সমস্যা। গান ভাল। অজস্র লাইক পেয়েও কোথাও গিয়ে আটকে যাচ্ছে।
অজস্র লাইক পাওয়া মানেই গান হিট নয়, বলছেন!
নাহ্। নয়। সোশ্যাল মিডিয়াকে আমার খুব আনরিয়েল লাগে। দেখবেন একটা লোক, যে কোনও দিন আপনার কাছাকাছি আসেননি, তিনি হঠাৎ আপনার কোনও ইভেন্টে ‘কামিং’ লিখে বসলেন। আপনিও খুশি! আপনার ইভেন্টে অজস্র ‘কামিং’। অথচ দেখা গেল হল অর্ধেকও ভরল না। তবে গান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই মাধ্যমটা খুব জরুরি।
আর হিট গানের ক্ষেত্রে?
লোকে কী ভাবে নেবে জানি না। তবে ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ বা ‘বারান্দায় রোদ্দুর’য়ের পর আমার মনে হয় না আর কোনও বাংলা গান হিট করেছে।
কালিকাপ্রসাদ পাঁচটা ছবির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে। সিনেমায় প্লে ব্যাকের জন্য ফোন আসে না?
যে গান যাকে দিয়ে হবে না কেউ ফোনে বললেও আমি সেটা করব না।
যদি প্রোডিউসার বলেন?
এখন অবধি এ রকম কোনও প্রেশার আমাকে নিতে হয়নি। আমি ফরমায়েশি গান লিখতে পারব না। আমি বলছি না ফরমায়েশি গান লেখা খারাপ। কবি নজরুল তো ফরমায়েশি গান লিখেছেন। এ রকমও হয়েছে একসঙ্গে একবার আঙুরবালাকে তিনি চার লাইন গাওয়াচ্ছেন, আবার ইন্দুবালাকে। ওই ক্ষমতাটাই আলাদা।
আজকাল তো কাকে দিয়ে কোন গান গাওয়ানো হবে তা পরিচালক আর প্রযোজক ঠিক করেন। আপনি কী করবেন?
দেখুন, সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনা করাটা কিন্তু আমার পেশা নয়। ঈশ্বরের আশীর্বাদে যদি আমার গলাটা বেঁচে থাকে তা হলে আমি আরও দশ বছর গাইতে পারব। সত্যি কথা বলতে কী কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় যখন ফোন করে ‘বিসর্জন’য়ের গল্পটা শোনালেন তখন ভেবেছিলাম ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করা কি আমার কাজ? পরে মনে হল ছবির গানের ধরন আলাদা। মনে হল চ্যালেঞ্জটা নিই।
বাংলাদেশের ছবিতেও তো সুর দিলেন।
বাংলাদেশের ছবির কাজ জাস্ট শেষ করলাম। সরকারি অনুদানে বাংলাদেশের ছবির নাম — ‘ভুবন মাঝি’। মুক্তিযুদ্ধ, শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে ছবি। ভারতীয়দের মধ্যে আমি আর পরমব্রত আছি। পরম একটা গানও গেয়েছে। ওখানেও আধুনিক গান লিখে সুর দিতে হয়েছে। দেখলাম কাজটা সকলের পছন্দ হয়েছে। কিন্তু বাংলা গানে সে রকম হিট গান এখনও পাচ্ছি না।
কেন ‘বসন্ত এসে গেছে’ বা ‘তুমি যাকে ভালবাস’ তো হিট গান?
লোকে টানা ছ’ মাস একটা গান শুনছে মানেই কিন্তু সেটা হিট নয়। আমরা সকলেই অপেক্ষায় আছি বাংলা গানে আবার বিরানব্বইয়ের মতো আগুন জ্বলে উঠবে। নতুন কিছু সৃষ্টি হবে। ছবির গানের যা প্রচার হয় তাতে তো সেই গান লোকে শুনবেই।
মানে? ঠিক কী বলতে চাইছেন?
‘প্রাক্তন’, ‘জুলফিকার’ এই ধরনের ছবির দু’-তিন মাস ধরে প্রোমোশন হয়। এত প্রোমোশন হওয়ার পর ছবির গান তো লোকের কাছে পৌঁছেই যায়। কিন্তু একজন বেসিক গান গেয়ে, কোনও বিজ্ঞাপন ছাড়া শুধু নিজের জোরে যদি হাজার শ্রোতা জোগাড় করেন, তা হলে আমি বলব সেটা অনেক বেশি কৃতিত্বের।
ইন্ডাস্ট্রিতে সদ্য সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। আর এ ভাবে সোজা কথা বলছেন। এ দিকে সৃজিত মুখোপাধ্যায় ডাকলে তো ঠিক চলে যাবেন।
সৃজিত তো ‘জাতিস্মর’য়ে আমায় দিয়ে গাইয়েছে। অভিনয়ও করিয়েছে। তাতে কী! তবে মিউজিক নিয়ে কোনও চাটুকারিতা করতে পারব না।
আর নতুন কী ছবি করছেন, বলবেন?
আশিস রায়ের পরিচালনায়, আবুল বাশারের গল্প নিয়ে একটা ছবি হচ্ছে। ওখানে মিউজিক করছি। সাবকালচারের গল্প, আন্ডারওয়ার্ল্ডের গল্প। ছবিতে নৌকো চালানোর দৃশ্য আছে। পরিচালক এক দিন বলছিলেন ‘দোহার’ যে ভাবে ‘ সামাল সামাল ভাই রে’ আর ‘এবার তোর মরা গাঙে’ মিলিয়ে গায়, সেভাবে গানটা রাখতে। আমি ওকে বোঝাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের মানুষের চৌহদ্দির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ নেই। লোকের অভ্যেস হয়ে গেছে সিনেমা বা সিরিয়ালে রবীন্দ্রসঙ্গীত রাখার। আসলে রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে খুব সহজে দর্শকের কাছে পৌঁছনো যায়।
তাই যদি হতো তা হলে শুধু রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে নাম করা যেত।
কে বলল যায় না? শ্রাবণী সেনকে দেখুন। রবীন্দ্রসঙ্গীত ওর আইডেনটিটি। পাড়ার অনুষ্ঠান থেকে শীতকালের জলসা, সবেতেই গাইছেন। তবে আরেকটা কথাও সত্যি।
কী কথা?
সবাই সব গান গাইছে। শিল্পীদের কোনও আইডেন্টিটি তৈরি হচ্ছে না।
আপনার রিয়েলিটি শো তো এখন সে ভাবেই শিল্পী তৈরি করছে!
সে কারণেই তো মেয়াদ ছয় মাস।
সে কী! ‘সারেগামাপা’–র মেন্টর এই কথা বলছেন?
এটাই তো বাস্তব। এই যে নতুন ‘সারেগামাপা’ এসেছে, আবার নতুন তারকা তৈরি হবে! আসলে কী জানেন? আমরা যখন সিনেমা বা নাটক দেখি তখন সেটা আমাদের পছন্দে যাই। টিকিট কেটে দেখি। কিন্তু টিভি তো খোলা। কোনও দাম নেই। সেই কারণে টিভি থেকে উঠে আসা সব রকম গান জানা শিল্পীদের অবস্থা আরও খারাপ। তাদের পারিশ্রমিকও খুব কম। স্ট্রাগল অনেক বেশি।
ইদানীং লোকগানের চাহিদা কিন্তু বাড়ছে।
হ্যাঁ, ‘সারেগামাপা’-র পর থেকেই কিন্তু দেখছি এই ট্রেন্ডটা। জয়তী (চক্রবর্তী) ফোক গানের অ্যালবাম করল, পুরোনো ‘সারেগামাপা’-র দীপান্বিতা, রাঘব (চট্টোপাধ্যায়) বলছে করবে। রূপঙ্কর (বাগচী) আগেই করেছে।
সবাই তো ফোক গাইতে পারে না?
না। লোপা (লোপামুদ্রা মিত্র) যখন গাইতে চাইল বলেছিলাম তুমি গানটা ফোক গাইছ ভেবে গেয়ো না। একটা পদ গাইছ, ভেবে তোমার মতো করে গাও।
কিন্তু আপনি একইসঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত, ফোক সব গাইছেন। আপনি কি এতটাই ভার্সেটাইল?
আমি কিছুই না। শুধু নিজেকে ভাঙছি। এই যে ‘বাবার নাম গাঁধী’র পরিচালক পাভেলের ছবিতে মিউজিক করছি, কাজটা খুব ইস্টারেস্টিং। আবার বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ‘চন্দ্রাবতীর কথা’ অন্য ধরনের কাজ। গামছা পরা ফোকের ব্যবহার এখানে চলবে না। সম্পূর্ণ ক্ল্যাসিকাল লুক আনতে হবে। এ ভাবেই চেষ্টা করছি।
১৭ বছর ধরে একটা লোকগানের ব্যান্ড মহিলা বর্জিত কেন?
আরে সেরকম কোনও ব্যাপার নেই। প্রথম কারণ আমরা চড়া পর্দায় গাই। মহিলা কণ্ঠের পক্ষে সেটা সমস্যার। আর আগে ‘দোহার’য়ের রিহার্সাল হতো মাঝরাতে। কোনও মহিলার পক্ষে সময়টা কতটা গ্রহণযোগ্য হতো জানি না। তবে লোকসঙ্গীত কিন্তু মানুষকে টানে। মানুষ আজও লোপার কাছে ‘ছাতা ধরা হে দেওরা’ শুনবে। আমরাও যখন ঢাকঢোল নিয়ে মঞ্চে গান গাইতে এলাম তখন ভরা রক-য়ের সময়। সেখানেও লোকে ‘দোহার’কে নিয়েছে। নাড়ির টানটা না থাকলে কি লোকগান নিয়ে এতটা রাস্তা পেরোতে পারতাম?
রাস্তা পেরোতে গিয়ে এত মহিলা ফ্যান-দের সামলাচ্ছেন কী করে?
এ কী! আমার তো মনে হয় আমার পুরুষ ফ্যানও আছে।
আপনি কিন্তু এড়িয়ে যাচ্ছেন।
দেখুন, ফ্যানদের মুগ্ধতা থাকতেই পারে। আমিও তো অভিনেত্রী রেখা-য় মুগ্ধ। সেটা আর যাই হোক প্রেম নয়। তো সে রকম মুগ্ধতা অনেকই আছে। সবটাই আসলে মনে মনে। কেউ তো সামনে এসে বলেও না। বলতেই পারে!
(দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৬ )

১২.
বাউল লালন সাঁইজি একান্তমনে আশা করেছিলেন, পৃথিবীটা একদিন মানুষের পৃথিবী হয়ে যাবে। সাধক বাউল হয়ে তিনি সর্বাঙ্গীন মানব মুক্তির কথা ভেবেছিলেন। কারণ বাউলের এই মুক্তি শুধু রাষ্ট্রের, দেশের বা সমাজের মুক্তিতে শেষ হয় না, তাঁরা আত্মমুক্তির পথ খোঁজেন। বাউলের সাধনায় মুক্তির চেতনা নিয়ে লিখেওছিলেন কালিকাপ্রসাদ। তাঁর ভাব-ভাবনার সেই অমূল্য রচনাটিই তুলে ধরা যাক। ‘লালন সাঁই’ শিরোনামের সেই নিবন্ধে তিনি লিখছেন,
‘‘ওইরূপ যখন স্মরণ হয়
থাকেনা লোক-লজ্জার ভয়
লালন ফকির ভেবে সদায়
প্রেম যে করে সে জানে’’
—ফকির লালন শাহ
এই শতকের সাধক বাউল আব্দুল করিম বলতেন, ‘‘গুরু আমাদের মন্ত্র নয়, মন্ত্রণা দেন।’’ জিগ্যেস করলাম, মন্ত্রণাটা কী? বললেন, ‘‘আমাদের গানই আমাদের মন্ত্র, আমাদের মন্ত্রণা।’’ আসলে, বাউল-ফকির সহ গৌণধর্মের সাধকরা তাঁদের সাধনার পথ, তাঁদের মতাদর্শ, তাঁদের বয়ান রচনা করেন গানে গানে। আর এ এমনই বয়ান, যেখানে পরতে পরতে আমাদের চিরাচরিত প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস, ধর্মবোধ, জীবনচর্চাকে ফাঁসিয়ে দিতে থাকে। প্রচলিত শাস্ত্রশিক্ষা বলে, সাধনা হয় ঈশ্বরের আর বাউল-ফকিররা বলেন দেহ-সাধনার কথা। শাস্ত্র বলে, পুঁথি, আচার, জ্ঞান আর বাউলরা বলেন, মন আর মনের মানুষ। শাস্ত্র বলে, জাহির (প্রকাশ) আর বাউলরা বলেন, বাতুন বা বাতিন (গোপন)। আর ঠিক এ ভাবেই আমাদের প্রান্ত ঘিরে গড়ে ওঠে এক সমান্তরাল জীবনচর্চা, এক সমান্তরাল বিকল্প দর্শন। যা আমাদের চেনা-জানা ছককে ভেঙে দেয়, প্রশ্ন করে আমাদের নিত্য নৈমিত্তিককে। প্রচলিত বিশ্বাস ভেঙে তাঁরা এক নতুনের মুক্তি সন্ধান করেন বলেই অবলীলায় বলতে পারেন ‘‘খোদ-ই খোদা আল্লার রাধা দোস্তের মোহাম্মদ।’’
এমনকী আজ থেকে দেড়শো বছর আগে লালন শিষ্য দুদ্দু শাহ বলে ওঠেন, মহম্মদের জন্ম যদি আরবে না হয়ে বাংলাদেশে হতো, তবে তো মহম্মদও বাংলাতেই কথা বলতেন। আর দুদ্দুর গুরু লালন তো সব সীমারেখা ভেঙে কবেই জানান দিয়েছেন, ‘‘আপন দেহ সৃষ্টি করলে সাঁই/ শুনি মানবের উত্তর কিছু নাই/ দেহ দেবতাগণ করে আরাধন জন্ম নিতে মানবে/ মন যা কর ত্বরায় এই ভবে।’’ মনে পড়ছে কি, সপ্তম শতকে পারস্যের সুফি সাধক মনসুর হল্লাজ বলেছিলেন, ‘আনাল হক’ মানে আমিই সে বা আমিই ঈশ্বর। আর এই বলার জন্য তাঁকে শূলে চড়তে হয়েছিল। ‘‘বাউল-ফকির ধ্বংস ফতোয়া’’, যার জের আজও চলছে। আজও দুই বাংলা জুড়েই তাঁদের উপর অত্যাচার জারি রয়েছে। ক’দিন আগে তো খোদ লালন ভূমিতেই আক্রান্ত হলেন বাউলেরা। কেন বার বার এই আক্রমণ? কারণ তাঁরা অন্য স্বপ্ন দেখেন, অন্য জীবন, অন্য দর্শনের কথা বলেন। যা আমাদের খাপে খাপ তো খায়ই না, বরং ভেঙে দিতে থাকে আমাদের রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক বিশ্বাস। তাই শুধু রাষ্ট্র নয়, সমাজ শাসন চালায় তাঁদের ওপর। আবার এ-ও সত্য, দেড়শো-দু’শো বছর আগে বাংলায় একপ্রান্তে থাকা জমিদার হাছন রাজা তাঁর সাতপুরুষের জমিদারি থাকতেও প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে হয়তো মনসুর হল্লাজের সুরে সুর মিলিয়েই বেঁধেছিলেন তাঁর গান: ‘‘আমি হইতে আল্লাহ-রসুল আমি হইতে কূল/পাগল হাছন রাজা বলে তাতে নাই ভুল।’’ আর রবীন্দ্রনাথ তাঁর হিবার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতায় উদ্ধৃত করেছিলেন হাছন রাজার এই পদ।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ সার্কুলার জারি হওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ একের পর এক স্বদেশি গান রচনা করে তাঁর স্বদেশি গানে যে বই প্রকাশ করেছিলেন, তার নাম দেশ, স্বদেশ, মুক্তি, স্বাধীনতা ইত্যাদি কিছুই ছিল না, সে বইয়ের নাম ছিল ‘বাউল’। অবশ্যই স্বদেশি গানের প্রচুর গানই ছিল লোকসুর বা লোক-আঙ্গিকে। যাকে বলা হয় ‘বাউলাঙ্গের গান’। কিন্তু সে বইয়ে ছিল অনেক টপ্পা, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ইত্যাদি লোকসুরের বাইরেও অনেক স্বদেশি গান। তার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। এবং রবীন্দ্রনাথ তো কখনওই তাঁর ‘বাউলাঙ্গের গান’কে বাউল গান বলে দাবি করেননি। বরং বলেছেন, ‘‘আমার গান বাউলের গান নহে।’’ তবে কেন এই স্বদেশি গানের সংকলনের নাম ‘বাউল’? না, রবীন্দ্রনাথ এর সরাসরি কোনও উত্তর দেননি। কিন্তু আমরা এই উত্তর পরে পেয়ে যাই যখন দেখি, ফাল্গুনী থেকে শুরু করে রক্তকরবী-সহ প্রায় সব নাটকেই কখনও বাউল, কখনও বৈরাগী, কখনও পাগল, কখনও বা অন্য কোনও নামে এমন একেক প্রান্তিক চরিত্রকে উপস্থাপন করেন যাঁরা আপনমনে গান তো গায়ই, উপরন্তু এমন এক সামাজিক অবস্থান তারা নেয় যা আদতে প্রশ্ন করে আমাদের জরাজীর্ণ বন্ধ্যাকে, যারা ভাঙতে চায় অচলায়তন বা যক্ষপুরীর গরাদ, যারা মুক্তির কথা বলে। তবে বাউলের এই মুক্তি শুধু রাষ্ট্রের, দেশের বা সমাজের মুক্তিতে শেষ হয় না, তাঁরা আত্মমুক্তির পথ খোঁজেন। তাই বোধহয় লালন ফকির তাঁর সাধনসঙ্গীতের ভণিতায় বলে ওঠেন:
‘‘পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
আমার যম যাতনা সকল যতো দূরে
সে আর লালন একখানে রয়
শুধু লক্ষ যোজন ফাঁকরে’
আবার ফিরে আসি, শেষে বাউল শাহ আব্দুল করিমের কথায়। তিনি বলতেন, ‘‘আমি স্বপ্ন দেখি এই পৃথিবী একদিন বাউলের পৃথিবী হয়ে যাবে।’’ জিগ্যেস করেছিলাম, মানে? সারা পৃথিবীতে সবাই বাউল হয়ে যাবে? বাউল গান গাইবে? বাউলের পোশাক পরে? তিনি বললেন, ‘না তা নয়। আমরা বাউলরা তো মানুষের কথা বলি, মনের মানুষের কথা…। স্বপ্ন দেখি, পৃথিবীটা একদিন মানুষের পৃথিবী হয়ে যাবে।’
এ বছর বাউল শাহ আব্দুল করিমের জন্মশতবর্ষ। আসুন, আমরাও স্বপ্ন দেখি বাউলের পৃথিবী…জয় গুরু!’
(দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ অগস্ট, ২০১৬)

১৩.
অকালপ্রয়াত শিল্পী কালিকাপ্রসাদকে স্মরণ করে বান্ধব, কবি শ্রীজাত ৮ মার্চ লিখেছিলেন ‘মাটির শ্লোক’। কবিতার ভাষা, ছন্দ, কল্পনায় শোকের উচ্চারণ কাব্যভাষ্যটি অনুরণন জাগায়, চোখে জল আনে। ‘মাটির শ্লোক’-এ পরম প্রিয় বন্ধুহারা কবি বেদনাহত হয়ে লিখছেন,
‘ফুলের গন্ধ ভাল্লাগে না। কাদের বাড়ি সাজায় শোক?
গান ফিরেছে মাটির কাছে। মৃত্যু কেবল মিথ্যে হোক।
পিছু নিচ্ছে হরিধ্বনি। তোমার হরি করিম শা’…
চোখের পাতায় ঘুম নেমেছে, হাতের পাতায় অবজ্ঞা
তোমার মধ্যে মাটিই ছিল। মাটির দোহা, মাটির শ্লোক –
গান ফিরেছে মাটির কাছে। মৃত্যু কেবল মিথ্যে হোক।
হাসতে হাসি বেমানানের, এই নগরের ফকিরচাঁদ
সাথ সঙ্গত রইল পড়ে, ঠান্ডা হাতেই মেটাই সাধ।
চুপের পরে আর কী কথা… ধূপের ধোঁয়া জ্বালায় চোখ…
গান ফিরেছে মাটির কাছে। মৃত্যু কেবল মিথ্যে হোক।
আর ক’টা দিন থাকলে হতো। চড়ুইভাতি’র সময় শেষ,
দোতারা যায় আকাশপানে, সেই যেখানে গানের দেশ…
সবাই আগুন পেরিয়ে এলাম। সবাই তোমার গানের লোক।
গান ফিরেছে মাটির কাছে। মৃত্যু কেবল মিথ্যে হোক।’

১৪.
বহুল আলোচিত ‘ভুবন মাঝি’ চলচ্চিত্রের জন্য কালিকাপ্রসাদের লেখা, সুর করা ও গাওয়া গানটির বাণী পাঠ খুবই প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করি।
আমি তোমারই, তোমারই, তোমারই নাম গাই
আমার নাম গাও তুমি,
আমি আকাশ ও রোদের দেশে ভেসে ভেসে বেড়াই
মেঘের পাহাড়ে চড় তুমি,
আমি তোমারই, তোমারই, তোমারই নাম গাই
আমার নাম গাও তুমি ।।
ভালবাসা করে আশা তোমার অতল জল
শীতল করবে মরুভূমি,
জলে ডাঙ্গায় কেন ডুবতেও রাজি আছি আমি
যদি ভাসিয়ে তোল তুমি,
আমি তোমারই, তোমারই, তোমারই নাম গাই
আমার নাম গাও তুমি ।।
তুমি এসো ফসলের ডাকে বটের ঝুরির ফাকে
আর এসো স্বপ্ন ঘুমে,
এই স্বপ্ন দুচোখ খুলে জেগে দেখা যায়
যদি নয়ন তারায় বসো তুমি,
আমি তোমারই, তোমারই তোমারই নাম গাই
আমার নাম গাও তুমি ।।
কবিতা গেল মিছিলে মিছিল নিয়েছে চিলে
অসহায় জন্মভূমি,
আজ এক তারার চিলা তোমার স্পর্শ চায়
যদি টংকার দেও তুমি,
আমি তোমারই, তোমারই, তোমারই নাম গাই
আমার নাম গাও তুমি ।।

১৫.
‘আমি তাঁর নাম গাইতে পারলাম না’ শোকাঞ্জলিতে ‘ভুবন মাঝি’র পরিচালক ফাখরুল আরেফীন স্মৃতিচারণ করে লিখেছে, ‘কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে হাসান আরিফ ভাইয়ের মাধ্যমে প্রথম পরিচয়। সদ্য মুক্তি পাওয়া ভুবন মাঝির পাণ্ডুলিপি লেখা শেষ করলাম। এরই মাঝে সরকারি অনুদান পেলাম। হাসান আরিফ ভাইকে বললাম, ছবির সংগীতায়োজনের জন্য এমন একজনকে দরকার, যিনি মাটির গান করতে পারেন। একদম বাংলার ভেতরের সংগীতটা বোঝেন। আমাকে সংগীতের মধ্য দিয়ে ১৯৭০ সালকে ধরতে হবে, ধরতে হবে ২০১৩ সালকেও। আবার ফিউশনও বোঝেন, ফোকটাও বোঝেন। আরিফ ভাই বললেন, ‘কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে দেখা করো।’ কালিকার সঙ্গে ছবি নিয়ে আলাপে তিনি বললেন, ‘আমি তো কখনো সংগীত পরিচালনা করিনি। তোমার গল্পটা পড়ার পর মনে হলো প্রধান চরিত্রটি অসাধারণ।’ আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। তারপর থেকে কেমন করে যেন আমরা ভাইয়ের মতো হয়ে গেলাম। উনি শুধু আমার সংগীত পরিচালক ছিলেন না, আমার বড় ভাই ছিলেন। এক দিনের জন্যও পারিশ্রমিকের কথা বলেননি। আমি যখন যা পেরেছি, দিয়েছি। উল্টো আমাকে টাকা ফেরত দিয়ে বলতেন, ‘তোমার কাছে যদি টাকা না থাকে আমাকে বোলো।’ মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। লালন সাঁইজির আখড়ায় এসে হাউমাউ করে কেঁদেছেন। সাঁইজির আখড়ায় এসেছেন, তা বিশ্বাসই করতে পারছেন না। বাংলার লোকগানের ওপর ছিল তাঁর অসম্ভব দখল। ভুবন মাঝির প্রতিটা টিউন নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন। ছবিতে কানের দুল পরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যের আবহ সংগীতটা এত চমৎকার করে করলেন যে আমি বোকা হয়ে গেলাম। এই অংশটি নিয়ে সবাই প্রশংসা করেছে। এই মানুষটাকে কোথায় পাব? তিনি ‘আমি তোমারই নাম গাই’ গান তৈরি করলেন। আমি তো তাঁর নাম গাইতে পারলাম না। কালিকা বাংলাদেশে এসে যখন শুনেছেন লাখো মানুষ তাঁর গান শোনে, খুব খুশি হয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আরেফীন, এটাই আমার সার্থকতা। তোমাদের মানুষ আমার গান শুনছে।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ০৮ মার্চ ২০১৭)

১৬.
প্রিয় বন্ধু, স্বজন কালিকাপ্রসাদের প্রয়াণে ব্যথিত আমার রবিদা (Ravisankar Maitree) যে শোকগাঁথাটি রচনা করেছিলেন ফেসবুকে, সেটে পড়ে আমার মন কেঁপে উঠেছিলো। রবিদা’র ভাষ্য পাঠ করা যাক। ‘লিঙ্গ-পরিচয়হীন মানুষদের নিয়ে লেখা অসামান্য একটি উপন্যাস– কিম্পুরুষ। কিম্পুরুষের স্রষ্টা বিপ্লব দাশ আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন বিশ বছর আগে। তাঁর মরদেহ ঢাকার পোস্তগোলা শ্মশানে দাহ করে আসার পর একমাস আমি প্রায় নির্বাক হয়েছিলাম। শিশুপুত্র রাজ্যকে রেখে বিপ্লব দাশ কেনো চলে গেলেন, বড্ড অকালে চলে গেলেন, কেনো? আমার কাছে, কারো কাছে এই প্রশ্নের সঠিক কোনো উত্তর নেই। বিশ বছর পর আজ আমি আরেকবার মুষড়ে পড়েছি।গত পরশু কালিকাপ্রসাদ তাঁর শিশুকন্যা আশাবরীকে রেখে আচমকা কোথায় চলে গেল? কেনো গেল? কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে গানের বাইরেও আমার সম্পর্কটা অনেকটাই অন্যরকম, নামহীন, গভীর। এই তো চারদিন আগে, বাঁ-কাঁধের লিম্প নোড নিয়ে আমাকে উদ্বিগ্ন না-হবার আশ্বাস দিয়েছিল কালিকাপ্রসাদের স্ত্রী ঋতচেতা গোস্বামী। ঋতচেতাকে আমি আজ কী বলব? কবে কী বলতে পারব? রাজ্য এখন বড়ো হয়েছে, অনেক বড়ো। রাজ্যর বড়ো হওয়া মুখটা আমরা অনেকদিন দেখিনি। বিপ্লবদা চলে যাবার পর আমি বেশ কবছর রাজ্যর মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। রাজ্য, তোর জন্য আমি কিছুই করতে পারিনি। তোকে ছুঁয়ে একটি বেলা বসে থাকিনি। রাজ্যকে বড়ো করে তোলার জন্য ওর মা রীতা সরকারই যথেষ্ট। আমি আমরা প্রকৃতপক্ষে কেউ নই, কিছু নই। আড়াই বছর আগে ঋতচেতা আর প্রসাদের আশাবরীকে দেখে এসেছি ওদের কোলকাতার বাড়িতে। পিতৃমুখ নিয়ে আশাবরী একটু একটু করে বড়ো হয়ে উঠবে স্বাভাবিকভাবেই, কিন্তু ওর মুখের দিকে তাকানোর মতো সাহস কি আমি পাব? একজন মহান শিল্পী যে কতোটা ঘরসংলগ্ন হতে পারে, কতোটা বন্ধুমগ্ন এবং সম্পর্কদায়পূর্ণ হতে পারে কালিকাপ্রসাদকে না দেখলে আমার জানা হত না। আমরা কবিতা বলি, লিখি, গান লিখি, গাই– আমাদের এসকল ছন্নসৃষ্টি জগতের ধুলো কাদা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা ধুলো ওড়াই, বৃষ্টিজলে ধুলো ধুয়ে কাদামাটি খেলি–এই ধুলোকাদা খেলার বাইরে সকল স্রষ্টা শিল্পীর ঘরেও বালিশের পাশে জলপট্টি থাকে, হাতপাখা থাকে, আঁচলের ভাঁপ থাকে, গরম ভাতে লালচে ঘিয়ের সঙ্গে তরতাজা কাঁচা মরিচ আর একটুখানি লবণ থাকে, পেটে খিললাগা তুমুল হাসি থাকে, জানলা ধরে একলা একা তাকানো থাকে, স্নানঘরে অঝোর কান্না থাকে, মরে যাবার ঘন-অভিমান আর ভয় থাকে– তুলোর মতো সুখ থাকে, পাষাণ কঠিন দুঃখ থাকে। আমি কারো কারো দুঃখ ছুঁয়ে বসতে চাই, বাঁচতে চাই– পারি না, কিছুতেই পারি না– একেকটি মহান মৃত্যু এসে খেলার ছলে দুচোখে ধুলো দিয়ে আমার প্রাণের মানুষগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।’

১৭.
‘আমাদের কালিকাপ্রসাদ’ শোকাঞ্জলিতে ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক বাহার উদ্দিন লিখছেন, ‘আমাদের কালিকা, কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য মহান উনিশ এর আরেক গর্বিত সন্তান। তার সহজসঙ্গী রাজীব দাসও দুই বাংলার ভাষা-আন্দোলনের ভাবাবেগে সরাসরি প্রাণিত। যতদূর জানি, দোহার এর লোকসংগীতের চর্চা ও পরিবেশনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যারা— তাদের প্রত্যেকের হূদয়ে সমানভাবে জাগ্রত ভাষা রক্ষার একাধিক লড়াইয়ের অঙ্গীকার। কালিকা উঠতি বয়সে কবিতা লিখত, পরেও কবিতার সঙ্গ ছাড়েনি। যখন শিলচর থেকে যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য পড়তে এল, সহপাঠীদের কেউ কেউ বলত, আসামের ছেলে হয়েও এত ভালো বাংলা বলিস! এই খোঁচা তার বুকে বাজত। একদিন সে ছোট্ট একটি কবিতায় এর জবাব দেয়— আমিও শিখেছি অ-য় অজগর/ব মানে বন্যা/ প্রথম প্রেমের শব্দ বলেছি— শ্যামল বরণী কন্যা/ আমার বাউল মুরশিদ গানে এপার-ওপার বাঁধা/বাংলা কখনো ফাতেমা বিবি, বাংলা কখনো রাধা।

১৭. ২
সপ্রতিভ, সচেতন তরুণ, নিজে গান লিখত না। লিখেছে মাত্র একবার— এপার-বাংলা, ওপার বাংলা মধ্যে জলধি নদী/নির্বাসিত নদীর বুকে বাংলায় গান বাঁধি/আমার বাংলা ভাসে, বেহুলা ভেলায়/ দেশ বিভাগের শ্মশানে/ একুশে উনিশে রফিক-কমলা জ্বলে/রাজপথে ময়দানে।— এই দুটি গান আর কবিতার অভিব্যক্তিকে তার লোকসংগীতের সুরে, পরিবেশনে, বিভক্ত, খণ্ডিত বাংলার নানা প্রান্তে, বিদেশেও ছড়িয়ে দিয়ে গেছে সে। ভেতরে সবসময় জাগিয়ে রাখত লোকসত্তা আর নির্বিশেষের অভিপ্রায়। বাউল-মারফতি গানের রহস্যময় ভাণ্ডার নিয়ে নাগরিক মনকে এত দ্রুত আলোড়িত করার যে সহজিয়া কৌশল কালিকা অর্জন করেছিল, তার পেছনে ছড়িয়ে আছে সংশয়হীন চেতনা আর পারিবারিক ঐতিহ্য। নিষ্ঠাবান, উদার ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। আদিপুরুষের বাড়ি অবিভক্ত সিলেটে। বাবা রামচন্দ্র ভট্টাচার্যের জন্ম শিলচরে। লেখাপড়াও ওখানে। ব্যবসায়ী, উত্সাহী ক্রীড়া সংগঠক। শিলচর ডিসিও (জেলা ক্রীড়া সংগঠন)র সহ-সভাপতি ও ইন্ডিয়া ক্লাবের সদস্য ছিলেন বহুদিন। তারই তত্পরতায় শহরে গড়ে ওঠে ‘সংগীতচক্র’ ও ‘জয়দেব সংগীত সম্মেলন’। কালিকার মা গীতাঞ্জলিও গান গাইতেন। বাড়ির প্রায় সবাই গান বাজনা-নৃত্য নিয়ে মজে থাকতেন। রামচন্দ্রের বড়দা শ্যামাপদ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সাক্ষাত্ শিষ্য, তার মেজভাই মুকুন্দমাধব লোকনৃত্যের স্বনামধন্য শিল্পী। লখনউ-এর ভাতখণ্ড সংগীত মহাবিদ্যালয়ের লোকনৃত্য বিভাগ গড়ে ওঠে তার হাতে। কালিকার আরেক কাকা অনন্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আদ্যোপান্ত রসিক। অল্প বয়সে তার সঙ্গে বরাকের এক মেলা থেকে আরেক মেলায়, পীর-ফকিরের দরগায়, উরস উত্সবে ঘুরে বেড়াত কালিকা। অনন্ত লোকগান সংগ্রহ করতেন, আর বাড়িতে এসে এসব গানের সুরচর্চায় মগ্ন থাকতেন। তার কাছেই কালিকা লোকগান পরিবেশনের ‘টেকনিক’ শিখেছে। তাদের বাড়িতে ছিল দুটি ধারা— শাস্ত্রীয় আর লৌকিক সংগীতের। বৃহত্তর সুরমা-বরাক উপত্যকার চড়াই উত্রাই পরিবেশ ছুঁয়ে এই দুই সেছ কালিকার গান -শৈশব। পরে যাদবপুরে পড়তে এসে নিজের উত্সকে অক্ষত রেখে তার ক্রমাগত উত্তরণ ঘটতে থাকে। জুটল নতুন নতুন বন্ধু ও অভীক মজুমদার-এর মতো প্রাণবন্ত শিক্ষক। এদের সংস্পর্শ তাকে আরো ঋদ্ধ করে। সম্ভবত তখনই বুঝতে শেখে লোকগানই তার নিরন্তর প্রাণভোমরা।

১৭. ৩
যাদবপুরে পড়তে পড়তে কিছুদিন চাকরি করল স্বেচ্ছা সংগঠন ‘দুর্বার’-এ। ইতোমধ্যে ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন অব্ আর্টস-এর একটি ফেলোশিপ পেয়ে গেল। গবেষণার বিষয়, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফোক সংগস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া। ওই সময় সে হরদম ঘুরে বেড়ায় চা বাগান, তেলখনি অঞ্চল আর কোলিয়ারিতে এবং অজস্র প্রচলিত, অপ্রচলিত, অল্প পরিচিত, অপরিচিত গানের সঙ্গে তার নিবিড় পরিচয় ঘটতে থাকে। তার মানে, শৈশব থেকে উঠতি যৌবনে উচ্চারিত-অুনচ্চারিত গান আর লৌকিক জীবনের সত্তার সঙ্গে তাঁর যে পরিচয় ঘটে, ওই পরিচিতির বিস্তারকে ঘিরে সে ও তার সহসঙ্গীরা ৯৯ সালে স্বতন্ত্র গানের দল গড়ে তুললেন। বাংলা গানের জগতে, সুমন ও নচিকেতার আত্মপ্রকাশের পর ‘দোহান’ (নাম দিয়েছিলেন অভীক) এর প্রতিষ্ঠা আর কালিকার সসঙ্গী উন্মোচন আর ক্রমাগত উত্তরণের গুরুত্বকে অস্বীকার করা অসম্ভব। ৭ মার্চ, তার মৃত্যুদিনের সন্ধ্যায়, কলকাতার কোনো এক টেলিভিশন চ্যানেলে একজন সুপরিচিত গায়কের মন্তব্য—দোহার এর যাত্রা শেষ—শুনে আমরা স্তম্ভিত। এই ভুল হিসেব, ভুল ইঙ্গিত বাড়িয়ে দিল স্বজনহারাদের বেদনা। আশা করি এ বেদনার রোদনকে হজম করে, যোজন যোজন শূন্যতা পেরিয়ে কালিকার স্মৃতি, কালিকার চেতনাপ্রবাহ এবং দোহার এর যাত্রাসঙ্গীরা অবশ্যই আবার অপ্রতিহত হয়ে উঠবে। ভাঙন দেখে, ভাঙনের মোকাবিলা করতে করতে যারা বড় হয়, তাদের ক্ষত আর দাহ দ্রোহে রূপান্তরিত হয়ে, অনির্বাণ শিখা হয়ে জেগে থাকে। বিপর্যয় ভুলে গিয়ে সমবেত, সজল বন্ধুত্ব সদর্থক চেহারা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ‘রাজপথে আর ময়দানে’। কালিকাও এ অশেষ পথের প্রাণপুরুষ হয়ে বেঁচে থাকবে। তাঁর ভেতরে যে বাউল, যে সদানন্দ ফকির বাস করত, রিক্ত ছিল না সে, আবহমানের সম্পদে সিদ্ধ আর ঋদ্ধ। মৃত্যুর পরেও থামতে জানে না যে, জাগিয়ে রাখে প্রতিজ্ঞার অপূর্ণতাকে পূর্ণ করার কাজে।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ মার্চ, ২০১৭)

১৮.
কালিকাপ্রসাদ শুধু একজন শিল্পীই ছিলেন না, বাংলার লোকসঙ্গীত ছিল তাঁর প্রাণ। বাংলার লোকসঙ্গীতকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। তাঁর প্রচেষ্টাতেই এদেশের গ্রামবাংলার গান এখন নতুন প্রজন্মের বাঙালির মুখে মুখে। গণমানুষের গান একজীবনে যেভাবে তুলে এনেছেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য, তাতে করে চিরস্মরণীয় হয়েই তিনি রয়ে যাবেন দুই বাংলাতেই। এসব গানের চর্চার মধ্য দিয়েই কালিকাপ্রসাদকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য, হে প্রিয় শিল্পী, অনন্য মানুষ, আপনি যেখানেই থাকুন, নিজের মতোন থাকুন।

 

(তথ্যসূত্র : দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, দৈনিক ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত